ওয়ালাউকছিমুবিন্নাফছিল লাওওয়া-মাহ।উচ্চারণ
আর না, আমি শপথ করছি তিরস্কারকারী নফসের। ২ তাফহীমুল কুরআন
এবং শপথ করছি তিরস্কারকারী নফসের মুফতী তাকী উসমানী
আরও শপথ করছি তিরস্কারকারী আত্মার।মুজিবুর রহমান
আরও শপথ করি সেই মনের, যে নিজেকে ধিক্কার দেয়-মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
আরও শপথ করছি তিরস্কারকারী আত্মার। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
আমি আরো কসম করছি আত্ম-ভৎর্সনাকারী আত্মার!আল-বায়ান
আমি আরো কসম করছি সেই মনের যে (অন্যায় কাজ ক’রে বসলে) নিজেকে ধিক্কার দেয় (যে তোমাদেরকে অবশ্যই আবার জীবিত করে উঠানো হবে)।তাইসিরুল
আর না, আমি শপথ করছি আত্মসমালোচনাপরায়ণ আত্মার।মাওলানা জহুরুল হক
২
কুরআন মজীদে মানুষের নফসের তিনটি রূপ উল্লেখ করা হয়েছে। এক, একটি ‘নফস’ মানুষকে মন্দ কাজে প্ররোচিত করে। এটির নাম ‘নফসে আম্মারা’ । দুই, একটি ‘নফস’ ভুল বা অন্যায় কাজ করলে অথবা ভুল বা অন্যায় বিষয়ে চিন্তা করলে কিংবা খারাপ নিয়ত রাখলে লজ্জিত হয় এবং সেজন্য মানুষকে তিরস্কার ও ভৎর্সনা করে। এটির নাম নফসে ‘লাউয়ামাহ’। আধুনিক পরিভাষায় একেই আমরা বিবেক বলে থাকি। তিন, যে নফসটি সঠিক পথে চললে এবং ভুল ও অন্যায়ের পথ পরিত্যাগ করলে তৃপ্তি ও প্রশান্তি অনুভব করে তাকে বলে ‘নফসে মুত্মাইন্নাহা’।
এ আয়াতে আল্লাহ তা’আলা কি কারণে কিয়ামতের দিন এবং তিরস্কারকারী নফসের কসম করেছেন তা বর্ণনা করেননি। কারণ পরবর্তী আয়াতটি সে বিষয়টির প্রতিই ইঙ্গিত করছে। যে জন্য কসম করা হয়েছে তাহলো, মানুষের মরার পর আল্লাহ তা’আলা পুনরায় তাকে অবশ্যই সৃষ্টি করবেন। তা করতে তিনি পুরোপুরি সক্ষম। এখন প্রশ্ন হলো এ বিষয়টির জন্য এ দু’টি জিনিসের কসম করার পেছনে কি যৌক্তিকতা আছে?
কিয়ামতের দিনের কসম খাওয়ার কারণ হলো, কিয়ামতের আগমন নিশ্চিত ও অনিবার্য। গোটা বিশ্ব-জাহানের ব্যবস্থাপনাই প্রমাণ করছে যে, এ ব্যবস্থাপনা অনাদী ও অন্তহীন নয়। এর বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতিই বলে দিচ্ছে এটা চিরদিন ছিল না এবং চিরদিন থাকতে ও পারে না। মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি এ ভিত্তিহীন ধ্যান-ধারণার সপক্ষে ইতিপূর্বেও কোন মজবুত দলীল-প্রমাণ খুঁজে পায়নি যে, প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তনশীল এ পৃথিবী কখনো অনাদি ও অবিনশ্বর হতে পারে। কিন্তু এ পৃথিবী সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান যতই বৃদ্ধি পেতে থাকে এ বিষয়টি তার কাছে ততই নিশ্চিত হতে থাকে যে, এ চাঞ্চল্য মুখর বিশ্ব-জাহানের একটি শুরু বা সূচনা বিন্দু আছে যার পূর্বে এটি ছিল না। আবার অনিবার্যরূপে এর একটি শেষও আছে যার পরে এটি আর থাকবে না। এ কারণে আল্লাহ তা’আলা কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে কিয়ামতেরই কসম করেছেন। এ কসমটির ধরন এরূপ যেমন আমরা অতিশয় সন্দেহবাদী কোন মানুষকে-যে তার আপন অস্তিত্ব সম্পর্কেও সন্দেহ করছে-সম্বোধন করে বলিঃ তোমার প্রাণ সত্তার কসম, তুমি তো বর্তমান। অর্থাৎ তোমার অস্তিত্বই সাক্ষী যে তুমি আছ।
কিয়ামতের দিনের কসম শুধু এ বিষয়টি প্রমাণ করে যে, একদিন বিশ্ব-জাহানের এ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে। এরপর মানুষকে পুনরায় জীবিত করে উঠানো হবে। তাকে নিজের সমস্ত কাজের হিসেব দিতে হবে এবং সে নিজের কৃতকর্মের ভাল বা মন্দ ফলাফল দেখবে। এর জন্য পুনরায় ‘নফসের লাউয়ামাহ’ কসম করা হয়েছে। পৃথিবীতে এমন কোন মানুষ নেই যার মধ্যে বিবেক বলে কোন জিনিস নেই। এ বিবেকের মধ্যে অনিবার্যরূপে ভাল এবং মন্দের একটি অনুভূতি বিদ্যমান। মানুষ ভাল এবং মন্দ যাচাইয়ের যে মানদণ্ডই স্থির করে থাকুক না কেন এবং তা ভুল হোক বা নির্ভুল হোক, চরম অধঃপতিত ও বিভ্রান্ত মানুষের বিবেকও মন্দ কাজ করলে কিংবা ভাল কাজ না করলে তাকে তিরষ্কার করে। এটিই প্রমাণ করে যে, মানুষ নিছক একটি জীব নয়, বরং একটি নৈতিক সত্ত্বাও বটে। প্রকৃতিগতভাবেই তার মধ্যে ভাল এবং মন্দের উপলব্ধি বিদ্যমান। সে নিজেই ভাল এবং মন্দ কাজের জন্য নিজেকে দায়ী মনে করে। সে অন্যের সাথে যখন কোন খারাপ আচরণ করে তখন সে ব্যাপারে নিজের বিবেকের দংশনকে দমন করে আত্মতৃপ্তি লাভ করলেও অন্য কেউ যখন তার সাথে একই আচরণ করে তখন আপনা থেকেই তার বিবেক দাবী করে যে, এ ধরনের আচরণকারীর শাস্তি হওয়া উচিত। এখন কথা হলো, মানুষের নিজ সত্তার মধ্যেই যদি এ ধরনের একটি “নফসে লাউয়ামাহ” বা তিরষ্কারকারী বিবেকের উপস্থিতি একটি অনস্বীকার্য সত্য হয়ে থাকে, তাহলে এ সত্যটিও অনস্বীকার্য যে, এ “নফসে লাউয়ামা"ই মৃত্যুর পরের জীবনের এমন একটি প্রমাণ যা মানুষের আপন সত্তার মধ্যে বিদ্যমান। কেননা যেসব ভাল এবং মন্দ কাজের জন্য মানুষ দায়ী সেসব কাজের পুরস্কার বা শান্তি তার অবশ্যই পাওয়া উচিত। এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক দাবী। কিন্তু মৃত্যুর পরের জীবন ছাড়া আর কোনভাবেই তার এ দাবী পূরণ হতে পারে না। মৃত্যুর পরে মানুষের সত্তা যদি বিলীন ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় তাহলে তার অনেক ভাল কাজের পুরস্কার থেকে সে নিশ্চিতরূপে বঞ্চিত থেকে যাবে। আবার এমন অনেক মন্দ কাজ আছে যার ন্যায্য শাস্তি থেকে সে অবশ্যই নিষ্কৃতি পেয়ে যাবে। বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন কোন মানুষই এ সত্য অস্বীকার করতে পারে না। অযৌক্তিক একটি বিশ্বে বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ জন্মলাভ করে বসেছে এবং নৈতিক উপলব্ধি সম্পন্ন মানুষ এমন এ পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে বসেছে মৌলিকভাবে যার পুরা ব্যবস্থাপনায় নৈতিকতার কোন অস্তিত্বই নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ এ অর্থহীন ও অযৌক্তিক কথাটি স্বীকার না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে মৃত্যুর পরের জীবনকে অস্বীকার করতে পারে না। একইভাবে পুনর্জন্ম বা জন্মান্তরবাদী দর্শন প্রকৃতির এ দাবীর যথার্থ জবাব নয়। কারণ মানুষ যদি নিজের নৈতিক কাজ-কর্মের পুরস্কার ব শাস্তি লাভের জন্য একের পর এক এ কাজ-কর্ম করতে থাকবে যা নতুন করে পুরস্কার বা শাস্তি দাবী করবে। আর এ অন্তহীন ধারাবাহিকতার ঘুর্ণিপাকে পরে তার হিসেব-নিকেশের কোন ফয়সালা হবে না। বরং তা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে। সুতরাং প্রকৃতির এ দাবী কেবল একটি অবস্থায়ই পূরণ হতে পারে। তাহলো, এ পৃথিবীতে মানুষের একটি মাত্র জীবন হবে এবং গোটা মানব জাতির আগমনের ধারা শেষ হয়ে যাওয়ার পর আরেকটি জীবন হবে সে জীবনে মানুষের সমস্ত কাজকর্ম যথাযথভাবে হিসেব-নিকেশ করে তাকে তার প্রাপ্য পুরো পুরস্কার বা শস্তি দেয়া হবে। (আরো ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কোরআন, আল আরাফ, টীকা ৩০)।
‘তিরস্কারকারী নফস’-এর দ্বারা মানুষের সেই অন্তঃকরণ বোঝানো হয়েছে, যা মন্দ কাজের কারণে তাকে ভর্ৎসনা করে। ‘নফস’ হল মানুষের অভ্যন্তরীণ এক অবস্থার নাম, যেখানে বিভিন্ন রকমের চাহিদা ও ইচ্ছা সৃষ্টি হয়। কুরআন মাজীদে তিন রকমের ‘নফস’-এর উল্লেখ আছে। (ক) ‘নফসে আম্মারা’ অর্থাৎ মন্দ কাজে প্ররোচিতকারী আত্মা (দেখুন ১২ : ৫৩)। (খ) ‘নফসে লাউওয়ামা’ অর্থাৎ তিরস্কারী আত্মা, যার উল্লেখ এ আয়াতে রয়েছে। এ আত্মা ভালো কাজে উৎসাহ যোগায় ও মন্দ কাজের জন্য তিরস্কার করে। (গ) ‘নফসে মুতমাইন্না’ ‘প্রশান্ত আত্মা’ (দেখুন ৮৯ : ২৭)। এটা এমন আত্মা, যা নিরবচ্ছিন্ন সাধনা ও প্রয়াসের পর ভালো কাজে অভ্যস্ত হয়ে গেছে ও তাতে প্রশান্তি লাভ করে। এরূপ আত্মায় মন্দ কাজের আগ্রহ হয়ত সৃষ্টিই হয় না, আর হলেও তা অতি দুর্বল থাকে। এখানে আল্লাহ তাআলা ‘নফসে লাউওয়ামা’-এর শপথ করেছেন। এর তাৎপর্য এই যে, আল্লাহ তাআলা প্রতিটি মানুষের স্বভাবে এমন এক চেতনা নিহিত রেখেছেন, যা তাকে মন্দ কাজের দরুণ ভর্ৎসনা করে। মানুষের চিন্তা করা উচিত এই যে তিরস্কার ও ভর্ৎসনাকারী একটা জিনিস তার অস্তিত্বের মধ্যে গচ্ছিত রাখা হয়েছে, এটাই প্রমাণ করে যেই মহান সত্তা তাকে সৃষ্টি করেছেন তিনি তাকে অহেতুক সৃষ্টি করেননি। নিশ্চয়ই আখেরাত আছে এবং সেখানে মানুষকে তার ভালো-মন্দ কাজের বদলা দেওয়া হবে। তা না হলে তার অস্তিত্বের মধ্যে এই ‘নফসে লাউওয়ামা’ নিহিত রাখার কী প্রয়োজন ছিল?
২. আমি আরও শপথ করছি ভর্ৎসনাকারী আত্মার।(১)
(১) لوامة শব্দটি لوم থেকে উদ্ভুত। অর্থ তিরস্কার ও ধিক্কার দেয়া। ‘নাফসে লাওয়ামা’ বলে এমন নফস বোঝানো হয়েছে, যে নিজের কাজকর্মের হিসাব নিয়ে নিজেকে ধিক্কার দেয়। অর্থাৎ কৃত গোনাহ অথবা ওয়াজিব কর্মে ত্রুটির কারণে নিজেকে ভর্ৎসনা করে বলে যে, তুই এমন করলি কেন? সৎকর্ম সম্পর্কেও নিজেকে এই বলে তিরস্কার করে যে, আরও বেশী সৎকাজ সম্পাদন করে উচ্চমর্যাদা লাভ করলে না কেন? সারকথা, কামেল মুমিন ব্যক্তি সর্বদাই তার প্রত্যেক সৎ ও অসৎ কাজের জন্যে নিজেকে তিরস্কারই করে। গোনাহ অথবা ওয়াজিব কর্মে ত্রুটির কারণে তিরস্কার করার হেতু স্পষ্ট। সৎকাজে তিরস্কার করার কারণ এই যে, নফস ইচ্ছা করলে আরও বেশী সৎকাজ করতে পারত। সে বেশী সৎকাজ করল না কেন?
এই অর্থের ভিত্তিতেই হাসান বাসরী রাহেমাহুল্লাহ নফসে-লাওয়ামার তফসীর করেছেন নফসে মুমিনাহ। তিনি বলেছেনঃ আল্লাহর কসম, মুমিন তো সর্বদা সর্বাবস্থায় নিজেকে ধিক্কারই দেয়। সৎকর্মসমুহেও সে আল্লাহর শানের মোকাবেলায় আপন কর্মে অভাব ও ত্রুটি অনুভব করে। (কুরতুবী) কেননা, আল্লাহর শানের হক পুরোপুরি আদায় করা সাধ্যাতীত ব্যাপার। ফলে তার দৃষ্টিতে ত্রুটি থাকে এবং তজ্জন্যে নিজেকে ধিক্কার দেয়। পক্ষান্তরে অসৎ কাজ হলে মুমিনের কাছে এটা অত্যন্ত কঠোর হয়ে দেখা দেয় ফলে সে নিজেকে ধিক্কার দেয়। (বাগভী)
মূলতঃ নফস তিনটি গুণে গুণান্বিত হয়। নফসে আম্মারা, লাওয়ামা ও মুতমায়িন্নাহ। সাধারণত নাফসে আম্মারা বা খারাপ কাজে উদগ্ৰীবকারী আত্মা প্রতিটি মানুষেরই মজ্জগত ও স্বভাবগত। সে মানুষকে মন্দ কাজে লিপ্ত হতে জোরদার আদেশ করে। কিন্তু ঈমান, সৎকর্ম ও সাধনার বলে সে নফসে-লাওয়ামা হয়ে যায় এবং মন্দ কাজ ও ত্রুটির কারণে অনুতপ্ত হতে শুরু করে। এটাকেই অনেকে বিবেক বলে। কিন্তু মন্দ কাজ থেকে সে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয় না। অতঃপর সৎকর্মে উন্নতি ও আল্লাহর নৈকট্যলাভে চেষ্টা করতে করতে যখন শরীয়তের আদেশ-নিষেধ প্রতিপালন তার মজ্জাগত ব্যাপার হয়ে যায় এবং শরীয়তবিরোধী কাজের প্রতি স্বভাবগত ঘৃণা অনুভব করতে থাকে, তখন এই নফসই মুতমায়িন্নাহ বা সন্তুষ্টচিত্ত উপাধি প্ৰাপ্ত হয়।
এ ধরনের নাফস যাদের অর্জিত হয় তারা দ্বীনী ব্যাপারে কোন প্রকার সন্দেহ বা প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে মুক্ত হয়ে ‘কালবে সালীম’ বা সুস্থ হৃদয়ের অধিকারী হয়। আর এ সমস্ত লোকদের প্রশংসায় আল্লাহ্ তা'আলা অন্য আয়াতে বলেছেন, “যে দিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন কাজে আসবে না; সে দিন উপকৃত হবে শুধু সে, যে আল্লাহর কাছে আসবে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে।” (সূরা আশ-শু'আরা: ৮৮–৮৯)
(২) আমি শপথ করছি তিরস্কারকারী আত্মার। (1)
(1) অর্থাৎ, ন্যায় ও ভালো কাজ করলেও তিরস্কার করে যে, তা বেশী করে কেন করেনি। আর অন্যায় ও মন্দ কাজ করলেও তিরস্কার করে যে, তা থেকে কেন বিরত থাকেনি? দুনিয়াতেও যাদের বিবেক সচেতন, তাদের আত্মাও তাদেরকে তিরস্কার করে। নচেৎ আখেরাতে তো সকলের আত্মাই তিরস্কার করবে।