নাহনুজা‘আলনা-হা-তাযকিরতাওঁওয়া মাতা-‘আল লিলমুকবিন।উচ্চারণ
আমি সেটিকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার উপকরণ ৩৩ এবং মুখাপেক্ষীদের ৩৪ জন্য জীবনোপকরণ বানিয়েছি। তাফহীমুল কুরআন
আমিই তাকে বানিয়েছি উপদেশের উপকরণ এবং মরুচারীদের জন্য উপকারী বস্তু। #%২২%#মুফতী তাকী উসমানী
আমি একে করেছি নিদর্শন এবং মরুচারীদের প্রয়োজনীয় বস্তু।মুজিবুর রহমান
আমি সেই বৃক্ষকে করেছি স্মরণিকা এবং মরুবাসীদের জন্য সামগ্রী।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
আমি এটাকে করেছি নিদর্শন এবং মরুচারীদের প্রয়োজনীয় বস্তু। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
একে আমি করেছি এক স্মারক ও মরুবাসীর প্রয়োজনীয় বস্তু।আল-বায়ান
আমি তাকে (অর্থাৎ আগুনকে) করেছি স্মারক (যা জাহান্নামের আগুনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়) আর মরুর অধিবাসীদের জন্য দরকারী ও আরামের বস্তু।তাইসিরুল
আমরাই তাকে বানিয়েছি এক নিদর্শনসামগ্রী এবং মরুচারীদের জন্য এক প্রয়োজনসামগ্রী।মাওলানা জহুরুল হক
৩৩
আগুনকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার উপকরণ বানানোর অর্থ হচ্ছে, আগুন এমন জিনিস যা প্রয়োজনের মুহূর্তে প্রজ্বলিত হয়ে মানুষকে তার ভুলে যাওয়া শিক্ষা স্মরণ করিয়ে দেয়। আগুন যদি না থাকতো তাহলে মানুষ জীবনে পশুর জীবন থেকে ভিন্ন হতো না। মানুষ পশুর মতো কাঁচা খাদ্য খাওয়ার পরিবর্তে আগুনের সাহায্যে তা রান্না করে খাওয়া শুরু করেছে এবং আগুনের কারণেই মানুষের জন্য একের পর এক শিল্প ও আবিষ্কারের নতুন নতুন দরজা উদঘাটিত হয়েছে। এ কথা সুস্পষ্ট, যেসব উপকরণের সাহায্যে আগুন জ্বালানো যায় আল্লাহ যদি তা সৃষ্টি না করতেন এবং আগুনে যে সব বস্তু জ্বলে তাও যদি তিনি সৃষ্টি না করতেন তাহলে মানুষের উদ্ভাবনী যোগ্যতার তালা কোন দিনই খুলতো না। কিন্তু মানুষের স্রষ্টা যে একজন বিজ্ঞ পালনকর্তা যিনি একদিকে তাকে মানবিক যোগ্যতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং অন্যদিকে পৃথিবীতে সেসব উপকরণ ও সাজ-সরঞ্জাম ও সৃষ্টি করেছেন যার সাহায্যে তার এসব যোগ্যতা বাস্তব রূপ লাভ করতে পারে সে কথা মানুষ একদম ভুলে বসে আছে। মানুষ যদি গাফিলতি ও অমনযোগিতায় নিমগ্ন না হয় তাহলে সে দুনিয়াতে যা যা ভোগ করছে তা কার অনুগ্রহ ও নিয়ামত সে কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য এক আগুনই যথেষ্ট।
৩৪
মূল আয়াতে مقوين শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ভাষাবিজ্ঞ পণ্ডিতগণ এর বিভিন্ন অর্থ বর্ণনা করেছেন। কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন মরুভূমিতে উপনীত মুসাফির বা পথচারী। কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন ক্ষুধার্ত মানুষ। কারো কারো মতে এর অর্থ হচ্ছে সেসব মানুষ যারা খাবার পাকানো, আলো পাওয়া কিংবা তাপ গ্রহণ করার কাজে আগুন ব্যবহার করে।
উপদেশের উপকরণ বলা হয়েছে এ কারণে যে, এর ভেতর চিন্তা করলে আল্লাহ তাআলার কুদরত উপলব্ধি করা যায়। কিভাবে তিনি তাজা গাছ থেকে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন! দ্বিতীয়ত এর দ্বারা জাহান্নামের আগুনের কথাও স্মরণ হয়, ফলে তা থেকে বাঁচার চিন্তা জাগ্রত হয়। এ গাছ যদিও সকলের জন্যই আগুন জ্বালানোর কাজে আসে, কিন্তু এক সময় মরুভূমিতে যারা সফর করত, তাদের জন্য এটা অতি বড় নি‘আমত ছিল। ভ্রমণকালে যখন আগুন জ্বালানোর প্রয়োজন হত, তখন তারা এর দ্বারা সে প্রয়োজন মিটিয়ে ফেলত। এ কারণেই বিশেষভাবে মরুচারীদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
৭৩. আমরা এটাকে করেছি স্মারক(১) এবং মরুচারীদের প্রয়োজনীয় বস্তু।(২)
(১) মুজাহিদ বলেন, এর অর্থ, আমরা এ আগুনকে স্মরণিকা করেছি, এ আগুন আখেরাতের আগুনকে স্মরণ করিয়ে দিবে। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের এ আগুন যা তোমরা জালিয়ে থাক তা জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের একভাগ। সাগর দিয়ে দু’বার এটাকে ঠাণ্ডা করা হয়েছে। যদি তা না হতো তবে তা থেকে কেউ উপকৃত হতে পারত না। (মুসনাদে আহমাদ ২/২৪৪, সহীহ ইবনে হিব্বান ৭৪৬৩, মুসনাদে হুমাইদী ১১২৯, অনুরূপ বর্ণনা বুখারী ৩২৬৫, মুসলিম: ২৮৪৩)
(২) উপসংহারে সবগুলোর সার-সংক্ষেপ এরূপ বৰ্ণিত হয়েছে যে, “আমরা এটাকে করেছি স্মারক এবং পথচারীদের জন্য উপভোগ্য”। আয়াতে مُقْوِينَ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ভাষাভিজ্ঞ পণ্ডিতগণ এর বিভিন্ন অর্থ বর্ণনা করেছেন। কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন মরুভূমিতে উপনীত মুসাফির বা পথচারী। কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন ক্ষুধার্ত মানুষ। কারো কারো মতে এর অর্থ হচ্ছে, সেসব মানুষ যারা প্রান্তরে অবস্থান করে খাবার পাকানো, আলো পাওয়া কিংবা তা গ্ৰহণ করার কাজে আগুন ব্যবহার করে সে সমস্ত মুসাফিরদেরকে বোঝানো হয়েছে। কারণ এ সমস্ত মরুচারী ও মুসাফিররা খাবারের জন্য যেমন আগুনের প্রয়োজন বোধ করে তেমনি নিজের শরীরের তাপমাত্ৰা ঠিক রাখার জন্যও আগুনের প্রতি বেশী মুখাপেক্ষী। আয়াতের উদ্দেশ্য এই যে, এসব সৃষ্টি আমার শক্তি-সামর্থ্যের ফসল। সুতরাং তোমরা ভেবে দেখা কার গুণ-গান করবে। (কুরতুবী)
(৭৩) আমি একে করেছি উপদেশের বিষয়(1) এবং মরুচারীদের প্রয়োজনীয় বস্তু। (2)
(1) এইভাবে যে, এর প্রভাব ও উপকারিতা বিস্ময়কর ব্যাপার। পৃথিবীর অসংখ্য জিনিস প্রস্তুত করণে এর প্রয়োজনীয়তার কথা অনস্বীকার্য। এটা আমার অসীম ক্ষমতার একটি নিদর্শন। তাছাড়া যেভাবে আমি পৃথিবীতে আগুন সৃষ্টি করেছি, অনুরূপ পরকালেও সৃষ্টি করার ক্ষমতা আমি রাখি। আর সেই আগুনের তাপ পৃথিবীর আগুনের তুলনায় ৬৯ গুণ বেশী হবে। যেমন এ কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
(2) مُقْوِيْنَ হল مُقْوِيْ এর বহুবচন। অর্থঃ قَوَآءٌ অর্থাৎ নির্জন মরুভূমিতে প্রবেশকারী। উদ্দেশ্য মুসাফির। অর্থাৎ, মুসাফির মরুভূমি এবং বন-জঙ্গলে এই গাছগুলো দ্বারা উপকৃত হয়। এ থেকে আলো ও তাপ গ্রহণ করে এবং ইন্ধন হিসাবেও কাজে লাগায়। কেউ কেউ مُقْوِين বলতে বুঝিয়েছেন এমন সব দরিদ্র মানুষকে, যাদের পেট ক্ষুধার কারণে খালি থাকে। কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন, مُسْتَمْتِعِيْنَ (উপকারিতা অর্জনকারী)। এতে ধনী, গরীব, গৃহবাসী ও মুসাফির সবাই এসে যায়। আর সবাই আগুন থেকে উপকৃত হয়। এই জন্যই হাদীসে যে তিনটি জিনিসকে সার্বজনীন রাখার ও তা থেকে কাউকে বাধা না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে পানি ও ঘাস সহ আগুনও বটে। (আবূ দাউদঃ ক্রয়-বিক্রয় অধ্যায়, ইবনে মাজাহ) ইমাম ইবনে কাসীর এই মতটিকেই বেশী পছন্দ করেছেন।