وَقَلِيلٞ مِّنَ ٱلۡأٓخِرِينَ

ওয়া কালীলুম মিনাল আ-খিরীন।উচ্চারণ

এবং পরবর্তীদের মধ্য থেকে হবে কম। ৮ তাফহীমুল কুরআন

এবং অল্প সংখ্যক পরবর্তীদের মধ্য হতে।মুফতী তাকী উসমানী

এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে,মুজিবুর রহমান

এবং অল্পসংখ্যক পরবর্তীদের মধ্যে থেকে।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

এবং অল্পসংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আর অল্পসংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য থেকে।আল-বায়ান

আর পরবর্তীদের মধ্য হতে কম সংখ্যক।তাইসিরুল

আর পরবর্তীকালীনদের থেকে অল্প সংখ্যায়।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

৮

‘আওয়ালীন’ ও আখেরীন’ অর্থাৎ অগ্রবর্তী ও পরবর্তী বলতে কাদের বুঝানো হয়েছে সে ব্যাপারে তাফসীরকারদের মধ্যে মতানৈক্য আছে। এক দলের মতে আদম আলাইহিস সালাম থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত প্রাপ্তি পর্যন্ত যত উম্মত অতিক্রান্ত হয়েছে তারা ‘আওয়ালীন’ আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত লাভের পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষের আগমন ঘটবে তারা সবাই আখেরীন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে আয়াতের অর্থ হবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতের পূর্ববর্তী হাজার হাজার বছরে যত মানুষ চলে গিয়েছে তাদের মধ্যে থেকে ‘সাবেকীন’দের সংখ্যা বেশী হবে। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতের পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী মানুষদের মধ্যে যারা ‘সাবেকীন’দের মর্যাদা লাভ করবে তাদের সংখ্যা হবে কম। দ্বিতীয় দল বলেন, এখানে ‘আওয়ালীন’ ও ‘আখেরীন’ অর্থ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মতের ‘আওয়ালীন’ ও ‘আখেরীন’। অর্থাৎ তাঁর উম্মতের প্রাথমিক যুগের লোকেরা হচ্ছে ‘আওয়ালীন’। তাদের মধ্যে ‘সাবেকীন’দের সংখ্যা হবে বেশী। পরবর্তী যুগের লোকেরা হচ্ছে ‘আখেরীন’। তাদের মধ্যে সাবেকীনদের সংখ্যা হবে কম। তৃতীয় দল বলেন, এর অর্থ প্রত্যেক নবীর উম্মতের ‘আওয়ালীন’ ও ‘আখেরীন’। অর্থাৎ প্রত্যেক নবীর প্রাথমিক যুগের অনুসারীদের মধ্যে আওয়ালীনদের সংখ্যা বেশী হবে এবং পরবর্তীকালের অনুসারীদের মধ্যে তাদের সংখ্যা কম হবে। আয়াতের শব্দাবলী এ তিনটি অর্থ ধারণ করেছে। এখানে এ তিনটি অর্থই প্রযোজ্য হওয়া বিচিত্র নয়। প্রকৃতপক্ষে এসব অর্থের মধ্যে কোন বৈপরীত্য নেই। এছাড়াও এসব শব্দ থেকে আরো একটি অর্থ পাওয়া যায়। সেটিও নির্ভুল অর্থ। অর্থাৎ প্রতিটি প্রাথমিক যুগে মানব গোষ্ঠীর মধ্যে ‘সাবেকীন’দের অনুপাত থাকবে বেশী এবং পরবর্তী যুগে সে অনুপাত থাকবে কম। তাই মানুষের সংখ্যা যত দ্রুত বৃদ্ধি পায় নেক কাজে অগ্রগামী মানুষের সংখ্যা সে গতিতে বৃদ্ধি পায় না। গণনার দিক দিয়ে তাদের সংখ্যা প্রথম যুগের সাবেকীনদের চেয়ে অধিক হলেও পৃথিবীর সমস্ত জনবসতির বিচারে তাদের অনুপাত ক্রমন্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

অর্থাৎ সর্বোচ্চ স্তরের লোকদের অধিকাংশই হবে প্রাচীন কালের নবী-রাসূল ও মুত্তাকীগণ। পরবর্তীকালের লোকদের মধ্যেও সেই স্তরের লোক থাকবে বটে, কিন্তু তাদের সংখ্যা হবে কম। [পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বলে ঠিক কাদের বোঝানো হয়েছে, সে সম্পর্কে দু’টি মত আছে। (ক) পূর্ববর্তী হল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্বের উম্মতগণ আর পরবর্তী হচ্ছে তাঁর উম্মত। এ হিসেবে অর্থ দাঁড়ায়, পূর্ববর্তী উম্মতসমূহের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরের মুত্তাকীর সংখ্যা বেশি ছিল। তাদের সংখ্যা এই উম্মতের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম। (খ) পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উভয়ই এই উম্মতের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ এই উম্মতের প্রথম দিকের লোকদের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরের মুত্তাকীর সংখ্যা পরবর্তীকালের লোকদের চেয়ে বেশি। ইবনে কাছীর (রহ.) এই সম্ভাবনাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। রূহুল মাআনীতে তাবারানীর বরাতে হযরত আবু বাকরা (রাযি.) বর্ণিত একটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াত সম্পর্কে বলেন, তারা উভয়ই এ উম্মতের অন্তর্ভুক্ত’। তাছাড়া এক প্রসিদ্ধ হাদীসে আছে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সর্বশ্রেষ্ঠ যুগ আমার যুগ, তারপর তাদের পরবর্তী যুগ এবং তারপর তাদের পরবর্তী যুগ। ইতিহাসও প্রমাণ করে, সাহাবায়ে কেরাম তো সকলেই এবং তাদের পরে তাবেয়ীন ও তাবে তাবেয়ীনের যুগে এত বেশি সংখ্যক মানুষ তাকওয়া-পরহেজগারীর সর্বোচ্চ স্তরে অধিষ্ঠিত ছিলেন, যেমনটা তাদের পরে দেখা যায়নি এবং সে সংখ্যা ক্রমশ কমেই আসছে। সুতরাং এটাই বেশি সঠিক মনে হয় যে, আয়াতে এ উম্মতেরই প্রথম দিকের ও শেষের দিকের মানুষকে বোঝানো হয়েছে (-অনুবাদক, তাফসীরে রূহুল মাআনী ও তাফসীরে উছমানী অবলম্বনে)।

তাফসীরে জাকারিয়া

১৪. এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য থেকে।(১)

(১) ثلة শব্দের অর্থ দল অথবা বড় দল। আলোচ্য আয়াতসমূহে দু জায়গায় পূর্ববর্তীও পরবর্তীর বিভাগ উল্লেখিত হয়েছে - নৈকট্যশীলদের বর্ণনায় এবং সাধারণ মুমিনদের বর্ণনায়। নৈকট্যশীলদের বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, অগ্রবতী নৈকট্যশীলদের একটি বড় দল পূর্ববর্তীদের মধ্য থেকে হবে এবং অল্প সংখ্যক পরবর্তীদের মধ্য থেকে হবে। সাধারণ মুমিনদের বর্ণনায় পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উভয় জায়গায় ثلة শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর অর্থ এই যে, সাধারণ মুমিনদের একটি বড় দল পূর্ববর্তীদের মধ্য থেকে হবে এবং একটি বড় দল পরবর্তীদের মধ্য থেকেও হবে। এখন চিন্তা সাপেক্ষ বিষয় এই যে, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বলে কাদেরকে বোঝানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তফসীরবিদগণ দুরকম উক্তি করেছেন।

(এক) আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পূর্ব পর্যন্ত সব মানুষ পূর্ববর্তী এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুরু করে কেয়ামত পর্যন্ত সব মানুষ পরবর্তী।

(দুই) তফসীরবিদগণের দ্বিতীয় উক্তি এই যে, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বলে এই উম্মতেরই দুটি স্তর বোঝানো হয়েছে। পূর্ববর্তী বলে কুরুনে-উলা তথা সাহাবী, তাবেয়ী প্রমুখদের যুগকে এবং পরবর্তী বলে তাদের পরবর্তী কেয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী মুসলিম সম্প্রদায়কে বোঝানো হয়েছে। অধিকাংশ মুফাসসির এই দ্বিতীয় উক্তিকেই অগ্ৰাধিকার দিয়েছেন। (ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর)

এ পক্ষের যুক্তির সমর্থনে বলা যায় যে, পবিত্র কুরআন থেকে সুস্পষ্টরূপে বোঝা যায়, উম্মতে মুহাম্মদী পূর্ববর্তী সকল উম্মতের চাইতে শ্রেষ্ঠ। (সা’দী) বলাবাহুল্য কোন উম্মতের শ্রেষ্ঠত্ব তার ভিতরকার উচ্চস্তরের লোকদের সংখ্যাধিক্য দ্বারাই হয়ে থাকে। তাই শ্রেষ্ঠতম উম্মতের মধ্যে অগ্রবর্তী নৈকট্যশীলদের সংখ্যা কম হবে – এটা সুদূর পরাহত। যেসব আয়াত দ্বারা উম্মতে মুহাম্মদীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়, সেগুলো এইঃ (كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ) (সূরা আলে ইমরান: ১১০) এবং (وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ) (সূরা আল বাকারাহ: ১৪৩) তাছাড়া এক হাদীসে বলা হয়েছে, “তোমরা সত্তরটি উম্মতের পরিশিষ্ট হবে। তোমরা সর্বশেষে এবং আল্লাহ তা’আলার কাছে সর্বাধিক সম্মানিত ও শ্রেষ্ঠ হবে।” (তিরমিযী: ৩০০১)

অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, “তোমরা জান্নাতীদের এক চতুর্থাংশ হবে - এতে তোমরা সন্তুষ্ট আছ কি? আমরা বললামঃ নিশ্চয় আমরা এতে সন্তুষ্ট। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ, সেই সত্তার কসম, আমি আশা করি তোমরা জান্নাতের অর্ধেক হবে।” (বুখারী: ৩৩৪৮, মুসলিম: ২২২) অন্য হাদীসে এসেছে, জান্নাতীগণ মোট একশ বিশ কাতারে থাকবে তন্মধ্যে আশি কাতার এই উম্মতের মধ্য থেকে হবে এবং অবশিষ্ট চল্লিশ কাতারে সমগ্র উম্মত শরীক হবে। (তিরমিযী: ২৫৪৬, ইবনে মাজাহঃ ৪২৮৯, মুসনাদে আহমাদ: ১/৪৫৩, ৫/৩৪৭, ৫/৩৫৫)

উপরোক্ত বর্ণনাসমূহে অন্যান্য উম্মতের তুলনায় এই উম্মতের জান্নাতীদের পরিমাণ কোথাও এক চতুর্থাংশ, কোথাও অর্ধেক এবং শেষ বর্ণনায় দুই তৃতীয়াংশ বলা হয়েছে। এতে বুঝা গেল যে, এ নৈকট্যপ্রাপ্তদের সংখ্যা এ উম্মতের মধ্যে কম হবার নয়।

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(১৪) এবং অল্প সংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে(1)

(1) ثُلَّةٌ এমন বড় দলকে বলা হয়, যার গণনা সম্ভব নয়। বলা হয় যে, أوَّلِين (পূববর্তীগণ) থেকে উদ্দেশ্য হল, আদম (আঃ) থেকে নিয়ে নবী করীম (সাঃ) পর্যন্ত উম্মতের লোক। আর آخِرِين (পরবর্তীগণ) থেকে উদ্দেশ্য হল, মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর উম্মতের ব্যক্তিবর্গ। অর্থ হল এই যে, পূর্ববর্তীদের মধ্য থেকে অগ্রবর্তী একটি বড় দল হবে। কেননা, তাদের যুগ সুদীর্ঘ, যাতে হাজার হাজার নবীদের অগ্রবর্তীগণ শামিল আছেন। এঁদের তুলনায় মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর উম্মতের যুগ কিয়ামত পর্যন্ত অল্পই। তাই এদের মধ্যে অগ্রবর্তীদের সংখ্যা তুলনামূলক পূর্ববর্তীদের চাইতে কম হবে। কিন্তু একটি হাদীসে এসেছে, নবী করীম (সাঃ) বলেছেন যে, ‘‘আমি আশা করি যে, তোমরা জান্নাতীদের অর্ধেক হবে।’’ (মুসলিম ২০০নং) তবে এটা আয়াতে উল্লিখিত অর্থের পরিপন্থী নয়। কারণ, মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর উম্মতের অগ্রবর্তীদেরকে এবং সাধারণ মু’মিনদেরকে মিলিয়ে জান্নাতে প্রবেশকারীদের সংখ্যা অন্যান্য সমস্ত উম্মতের অর্ধেক হয়ে যাবে। অতএব পূর্ববর্তী উম্মতের কেবল অগ্রবর্তীদের সংখ্যা বেশী হয়ে যাওয়া হাদীসে বর্ণিত সংখ্যার বিপরীত নয়। তবে এই উক্তি (সঠিক কি না তা) যাচাই সাপেক্ষ। পক্ষান্তরে কেউ কেউ أوَّلِين এবং آخِرِين থেকে মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর উম্মতের লোকদেরই বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ, এই উম্মতের পূর্ববর্তীদের মধ্যে অগ্রবর্তীদের সংখ্যা বেশী এবং পরবর্তীদের মধ্যে অগ্রবর্তীদের সংখ্যা কম হবে। ইমাম ইবনে কাসীর এই দ্বিতীয় উক্তিটাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। আর এটাকেই সর্বাধিক সঠিক মনে হচ্ছে। এই বাক্যটি فِيْ جَنَّاتِ النَّعِيْمِ এবং عَلَى سُرُرٍ مَّوْضُوْنَةٍ এর মধ্যস্থলে একটি ‘মু’তারিযাহ’ (পূর্বাপরের সাথে সম্পর্কহীন বিচ্ছিন্ন) বাক্য।