وَهُوَ بِٱلۡأُفُقِ ٱلۡأَعۡلَىٰ

ওয়া হুওয়া বিলউফুকিল আ‘লা-।উচ্চারণ

তখন সে উঁচু দিগন্তে ছিল। তাফহীমুল কুরআন

যখন সে ছিল ঊর্ধ্ব দিগন্তে। মুফতী তাকী উসমানী

তখন সে ঊর্ধ্ব দিগন্তে।মুজিবুর রহমান

উর্ধ্ব দিগন্তে,মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তখন সে ঊর্ধ্বদিগন্তে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন

তখন সে ঊর্ধ্ব দিগন্তে।আল-বায়ান

আর সে ছিল ঊর্ধ্ব দিগন্তে,তাইসিরুল

আর তিনি রয়েছেন ঊর্ধ্ব দিগন্তে।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

দিগন্ত অর্থ আসমানের পূর্ব প্রান্ত যেখানে সূর্য উদিত হয় এবং দিনের আলো ছড়িয়ে পড়ে। সূরা তাকভীরের ২৩ আয়াতে একেই পরিষ্কার দিগন্ত বলা হয়েছে। দু’টি আয়াত থেকেই পরিষ্কার বুঝা যায় যে, নবী ﷺ প্রথমবার যখন জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে দেখেন তখন তিনি আসমানের পূর্ব প্রান্ত থেকে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। নির্ভরযোগ্য কিছুসংখ্যক রেওয়ায়াত থেকে জানা যায় আল্লাহ‌ তা’আলা তাঁকে মূল যে আকৃতিতে সৃষ্টি করেছিলেন সে সময় তিনি মূল আকৃতিতে ছিলেন। যে রেওয়ায়াতে এ বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে পরে আমরা তার সবগুলোই উদ্ধৃত করবো।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

কাফেরদের প্রশ্ন ছিল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যে ফেরেশতা ওহী নিয়ে আসেন, তিনি তো মানব আকৃতিতেই আসেন। কাজেই তিনি কী করে বুঝলেন যে, তিনি মানুষ নন, ফেরেশতা? এ আয়াতসমূহে তার উত্তর দেওয়া হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে ফেরেশতাকে অন্ততপক্ষে দু’বার তার প্রকৃতরূপে দেখেছেন। তার মধ্যে একবারের ঘটনা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনা এই যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে ফরমায়েশ করেছিলেন, তিনি যেন তাঁর আসল আকৃতিতে তাঁর সামনে আসেন। সুতরাং হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম স্ব-মূর্তিতে আকাশ-দিগন্তে আত্মপ্রকাশ করলেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা দেখলেন।

তাফসীরে জাকারিয়া

৭. আর তিনি ছিলেন ঊর্ধ্বদিগন্তে(১),

(১) এ আয়াতে জিবরীলকে আসল আকৃতিতে দেখার বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে। দিগন্ত অর্থ আসমানের পূর্ব প্রান্ত যেখানে সূর্য উদিত হয় এবং দিনের আলো ছড়িয়ে পড়ে। সূরা আত-তাকভীরের ২৩ আয়াতে একেই পরিষ্কার দিগন্ত বলা হয়েছে। দুটি আয়াত থেকেই পরিষ্কার বুঝা যায় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমবার যখন জিবরীল আলাইহিস সালামকে দেখেন তখন তিনি আসমানের পূর্ব প্রান্ত থেকে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। মূলত: মহাশক্তিশালী, সহজাত শক্তিসম্পন্ন বা প্রজ্ঞাবান, সৌন্দর্যমণ্ডিত, সোজা হওয়া, এবং নিকটবর্তী হওয়া এগুলো সব জিবরীলের বিশেষণ। এই তফসীরের পক্ষে অনেক সঙ্গত কারণ রয়েছে। ঐতিহাসিক দিক দিয়েও সূরা আন-নাজম সম্পূর্ণ প্রাথমিক সূরাসমূহের অন্যতম। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের বর্ণনা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় সর্বপ্রথম যে সূরা প্রকাশ্যে পাঠ করেন তা সূরা আন-নাজম। বাহ্যত মে'রাজের ঘটনা এরপরে সংঘটিত হয়েছে।

দ্বিতীয় কারণ এই যে, হাদীসে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসব আয়াতের যে তফসীর করেছেন, তাতে জিবরীলকে দেখার কথা উল্লেখিত আছে। ইমাম শা'বী তার উস্তাদ মাসরূক থেকে বর্ণনা করেন- তিনি একদিন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার কাছে ছিলেন এবং আল্লাহ তা'আলাকে দেখা সম্পর্কে আলোচনা চলছিল। মাসরূক বলেন, আমি বললাম, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, (وَلَقَدْ رَآهُ بِالْأُفُقِ الْمُبِينِ) এবং (وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَىٰ) আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, মুসলিমদের মধ্যে সর্বপ্রথম আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি। তিনি উত্তরে বলেছেন, আয়াতে যাকে দেখার কথা বলা হয়েছে, সে জিবরীল আলাইহিস সালাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে মাত্র দু’বার আসল আকৃতিতে দেখেছেন। আয়াতে বর্ণিত দেখার অর্থ এই যে, তিনি জিবরীলকে আকাশ থেকে ভূমির দিকে অবতরণ করতে দেখেছেন। তার দেহাকৃতি আসমান ও যমীনের মধ্যবর্তী শূন্যমণ্ডলকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছিল। (বুখারী: ৪৬১২, ৪৮৫৫, মুসলিম: ১৭৭/২৮৭, ২৮৮, ২৮৯, তিরমিযী: ৩০৬৮, মুসনাদে আহমাদ: ৬/২৪১)

অন্য বর্ণনায় আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেনঃ এই আয়াত সম্পর্কে সর্বপ্রথম আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেছি যে, আপনি আপনার পালনকর্তাকে দেখেছেন কি? তিনি বললেনঃ না, বরং আমি জিবরীলকে নিচে অবতরণ করতে দেখেছি। (মুসনাদে আহমাদ: ৬/২৩৬) অনুরূপভাবে শায়বানী বর্ণনা করেন যে, তিনি আবু যরকে এই আয়াতের অর্থ জিজ্ঞাসা করেন, তিনি জওয়াবে বলেনঃ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিবরীলকে ছয়শত ডানাবিশিষ্ট দেখেছেন। (বুখারী: ৪৮৫৬) ইবনে জারীর রাহেমাহুল্লাহ আবদুল্লাহ ইবনে-মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিবরীলকে রফরফের পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখেছেন। তাঁর অস্তিত্ব আসমান ও যমীনের মধ্যবর্তী শূন্যমণ্ডলকে ভরে রেখেছিল। (তাফসীর তাবারী: ৩২৪৭০)

এ সব বর্ণনা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সূরা নাজমের উল্লেখিত আয়াতসমূহ দেখা ও নিকটবর্তী হওয়া বলে জিবরীলকে দেখা ও নিকটবর্তী হওয়া বোঝানো হয়েছে। আয়েশা, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আবু যর গেফারী, আবু হুরায়রা প্রমুখ সাহাবীর এই উক্তি। তাই ইবনে-কাসীর আয়াতসমূহের তফসীরে বলেনঃ আয়াতসমূহে উল্লেখিত দেখা ও নিকটবর্তী হওয়ার অর্থ জিবরীলকে দেখা ও জিবরাঈলের নিকটবর্তী হওয়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে প্রথমবার আসল আকৃতিতে দেখেছিলেন এবং দ্বিতীয়বার মে'রাজের রাত্রিতে সিদরাতুল-মুন্তাহার নিকটে দেখেছিলেন। প্রথমবারে দেখা নবুওয়তের সম্পূর্ণ প্রাথমিক যমানায় হয়েছিল।

তখন জিবরীল সূরা ইকরার প্রাথমিক আয়াতসমূহের প্রত্যাদেশ নিয়ে প্রথমবার আগমন করেছিলেন। এরপর একদিন জিবরীল আলাইহিস সালাম মক্কার উন্মুক্ত ময়দানে তার আসল আকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করলেন। তার ছয়শত বাহু ছিল এবং তিনি গোটা দিগন্তকে ঘিরে রেখেছিলেন। এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট আসেন এবং তাকে ওহী পৌছান। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে জিবরাঈলের মাহাত্ম্য এবং আল্লাহ তা’আলার দরবারে তার সুউচ্চ মর্যাদার স্বরূপ ফুটে ওঠে। সারকথা এই যে, এই প্রথম দেখা এ জগতেই মক্কার দিগন্তে হয়েছিল। দ্বিতীয়বার দেখার কথা (وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَىٰ) আয়াতে ব্যক্ত হয়েছে। মে'রাজের রাত্ৰিতে এই দেখা হয়।

উল্লেখিত কারণসমূহের ভিত্তিতে সুস্পষ্টভাবে এটাই বলা যায় যে, সূরা আন-নাজমের শুরুভাগের আয়াতসমূহে আল্লাহ তা’আলাকে দেখার কথা আলোচিত হয়নি; বরং জিবরীলকে দেখার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। জিবরীলকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার নিজস্ব আকৃতিতে দু’বার দেখেছেন। প্রথমবার নবুওয়াতের প্রারম্ভে। আর দ্বিতীয়টি মি'রাজের রাত্ৰিতে, সিদরাতুল মুন্তাহার নিকটে। (দেখুন: বুখারী: ৪৮৫৫, ৪৮৫৬)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(৭) তখন সে ঊর্ধ্বদিগন্তে। (1)

(1) অর্থাৎ, জিবরীল (আঃ)। অর্থাৎ, অহী শিক্ষা দেওয়ার পর আকাশের দিগন্তে গিয়ে দাঁড়ালেন।