ফামা-ওয়াজাদনা-ফীহা-গাইর বাইতিম মিনাল মুছলিমীন।উচ্চারণ
আমি সেখানে একটি পরিবার ছাড়া আর কোন মুসলিম পরিবার পাইনি। ৩৪ তাফহীমুল কুরআন
এবং সেখানে একটি পরিবার #%১৩%# ছাড়া আর কোন মুসলিম পাইনি।মুফতী তাকী উসমানী
এবং সেখানে একটি পরিবার ব্যতীত কোন আত্মসমর্পনকারী (মুসলিম) আমি পাইনি –মুজিবুর রহমান
এবং সেখানে একটি গৃহ ব্যতীত কোন মুসলমান আমি পাইনি।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
আর সেখানে আমি একটি পরিবার ব্যতীত কোন আত্মসমর্পণকারী পাই নাই। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
তবে আমি সেখানে একটি বাড়ী ছাড়া কোন মুসলমান পাইনি।আল-বায়ান
আমি সেখানে মুসলিমদের একটি পরিবার ছাড়া আর পাইনি।তাইসিরুল
কিন্ত আমরা সেখানে মুসলিমদের একটি পরিবার ব্যতীত আর কাউকে পাইনি।মাওলানা জহুরুল হক
৩৪
অর্থাৎ গোটা জাতি ও এলাকায় একটি মাত্র পরিবার ছিল যেখানে ইসলামের আলো বিদ্যমান ছিল। আর সেটা ছিল হযরত লূত আলাইহিস সালামের পরিবার। এছাড়া গোটা জাতি অশ্লীলতা ও পাপাচারে ডুবে ছিল এবং তাদের গোটা দেশ পঙ্কিলতায় ভরে উঠেছিলো। তাই আল্লাহ তা’আলা সেই একটি পরিবারের লোকজনকে রক্ষা করে বের করে নিলেন এবং তারপর সেই দেশে এমন প্রলয়ঙ্কারী আযাব নাযিল করলেন যে, এ দুশ্চরিত্র জাতির একটি লোকও রক্ষা পায়নি। এ আয়াতটিতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বর্ণিত হয়েছেঃ
একঃ আল্লাহর প্রতিফল বিধান কোন জাতিকে ততদিন পরিপূর্ণরূপে ধ্বংস করার ফায়সালা করে না যতদিন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোন ভালো গুণ বিদ্যমান থাকে। খারাপ লোকদের সংখ্যাধিক্যের মধ্যে নগণ্য সংখ্যক কিছু লোকও যদি অকল্যাণকে প্রতিরোধ করার এবং কল্যাণের পথের দিকে ডাকার জন্য তৎপর থাকে এবং তাদের কল্যাণকারিতা এখনো নিঃশেষ হয়ে না থাকে তাহলে তাদেরকে আরো কিছুকাল কাজ করার সুযোগ দেন এবং তাদের অবকাশকাল বাড়িয়ে দিতে থাকেন। কিন্তু অবস্থা যদিও এই দাঁড়ায় যে, কোন জাতির মধ্যে যৎসামান্য সদগুণও অবশিষ্ট না থাকে সেক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান হচ্ছে, উক্ত জনপদে যে দু’চারজন লোক অকল্যাণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে নেতিয়ে পড়েছে, তিনি তার মহা ক্ষমতাধীনে কোন না কোনভাবে রক্ষা করে নিরাপদে বের করেন এবং অবশিষ্ট লোকদের সাথে ঠিক তেমনি আচরণ করেন, যে আচরণ একজন সুস্থ বিবেক-বুদ্ধি সম্পন্ন লোক পঁচা ফলের সাথে করে থাকে।
দুইঃ ‘মুসলমান’ কেবল হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মতের নাম নয়। তাঁর পূর্বের সমস্ত নবী-রসূল ও তাঁদের উম্মতও মুসলমান ছিলেন। তাঁদের দ্বীনও ভিন্ন ভিন্ন ছিল না যে, কোনটা ইবরাহীমের দ্বীন, কোনটা মূসার দ্বীন আবার কোনটা ঈসার দ্বীন বলে আখ্যায়িত হতে পারে। তারা সবাই ছিলেন মুসলমান এবং তাদের দ্বীনও ছিল এ ইসলাম। কুরআন মজীদের বিভিন্ন জায়গায় এ সত্যটি এমন সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, তাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। উদাহরণস্বরূপ নিম্নবর্ণিত আয়াতগুলো দেখুনঃ আল বাকারা, ১২৮, ১৩১, ১৩২ ও ১৩৩; আলে ইমরান, ৬৭; আল মায়েদা, ৪৪ ও ১১১; ইউনুস, ৭২ ও ৮৪ ; ইউসূফ, ১০১; আল আ’রাফ, ১২৬ ও আল নাহল, ৩১, ৪২ ও ৪৪।
তিনঃ ‘মু’মিন’ ও ‘মুসলিম’ শব্দ দু’টি এ আয়াতে সম্পূর্ণ সমার্থক শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এ আয়াতটি যদি সূরা হুজুরাতের ১৪ আয়াতের সাথে মিলিয়ে পড়া যায় তাহলে সেসব লোকদের ধারণার ভ্রান্তি পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যারা মু’মিন ও ‘মুসলিম’ শব্দকে কুরআন মজীদের এমন দু’টি স্বতন্ত্র পরিভাষা বলে মনে করে যা সবখানে একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে এবং এও মনে করে যে, ঈমান ছাড়াই যে ব্যক্তি বাহ্যত ইসলামের গণ্ডির মধ্যে প্রবেশ করেছে সে-ই নিশ্চিত মুসলিম। (অধিক ব্যাখ্যার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, সূরা হুজুরাতের ব্যাখ্যা, টীকা ৩১)।
ইশারা হযরত লূত আলাইহিস সালামের পরিবারের প্রতি। তিনি ও তার দুই কন্যা ছাড়া আর কোনো মুসলিম সে জনপদে ছিল না।
৩৬. তবে আমরা সেখানে একটি পরিবার ছাড়া আর কোন মুসলিম পাইনি।
(৩৬) আর সেখানে একটি (লূতের) ঘর ব্যতীত কোন আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) আমি পাইনি। (1)
(1) আর এই ঘরটি ছিল আল্লাহর নবী লূত (আঃ)-এর ঘর। যেখানে তাঁর দুই কন্যা এবং তাঁর উপর ঈমান আনয়নকারী কিছু লোক ছিল। বলা হয় যে, এরা মোট তের জন ছিল। এদের মধ্যে লূত (আঃ)-এর স্ত্রী শামিল ছিল না। বরং সে তার ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতির অন্তর্ভুক্ত ছিল। (আয়সারুত তাফাসীর) ইসলামের অর্থ, আত্মসমর্পণ করা, আনুগত্য করা ও মেনে নেওয়া। আল্লাহর নির্দেশাবলীর সামনে আনুগত্যের মাথা নতকারীকে মুসলিম বলা হয়। এই দিক দিয়ে প্রত্যেক মু’মিনই মুসলিম। তাই প্রথমে তাদের জন্যে মু’মিন শব্দ ব্যবহার করা হয় এবং পরে আবার তাদেরই জন্য মুসলিম শব্দ ব্যবহার করা হয়। এ থেকে প্রমাণ করা হয়েছে যে, লক্ষ্যার্থে উভয় শব্দের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই; যেমন অনেকে পার্থক্য করে থাকেন।
কুরআনে যে কোথাও মু’মিন ও কোথাও মুসলিম শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, তো সেটা আরবী অভিধানে যে অর্থগুলো বলা হয়েছে সেই দিক দিয়ে। কাজেই আভিধানিক প্রয়োগের তুলনায় শরীয়তের পরিভাষার গণ্যতা বেশী। আর শরয়ী পরিভাষার দিক দিয়ে এই উভয় শব্দের মধ্যে পার্থক্য কেবল ততটুকুই, যতটুক হাদীসে জিবরীল দ্বারা প্রমাণিত। যখন নবী করীম (সাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হল, ইসলাম কি? তখন তিনি (সাঃ) বললেন, ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ---’র সাক্ষ্য দেওয়া, নামায কায়েম করা, যাকাত দেওয়া এবং হজ্জ করা ও রোযা রাখা।’’ আর যখন ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল, তখন বললেন, ‘‘আল্লাহর উপর, তাঁর ফিরিশতাদের উপর, তাঁর অবতীর্ণ করা কিতাবগুলোর উপর, তাঁর রসূলদের উপর, আখেরাতের উপর এবং ভাগ্যের (ভাল-মন্দের) উপর ঈমান আনা।’’ অর্থাৎ, অন্তর থেকে এই জিনিসগুলোর প্রতি বিশ্বাস রাখার নাম হল ঈমান এবং বিধি-বিধান ও ফরয কার্যাদি পালন করার নাম হল ইসলাম। এই দিক দিয়ে প্রত্যেক মু’মিনই হল মুসলিম এবং প্রত্যেক মুসলিমই হল মু’মিন। (ফাতহুল ক্বাদীর) আর যাঁরা মু’মিন ও মুসলিমের মধ্যে পার্থক্য করেন, তাঁরা বলেন যে, এ কথা ঠিকই যে, এখানে কুরআন একই দলের জন্য মু’মিন ও মুসলিম শব্দ ব্যবহার করেছে, তবে এর মধ্যে যে পার্থক্য আছে সেই দিক দিয়ে প্রত্যেক মু’মিন হল মুসলিম কিন্তু প্রত্যেক মুসলিমের মু’মিন হওয়া জরুরী নয়। (ইবনে কাসীর) যাই হোক এটা একটি ইলমী মতভেদ। আর প্রত্যেক দলের কাছে সব সব মতের পক্ষে দলীলও আছে।