وَإِنَّ إِلۡيَاسَ لَمِنَ ٱلۡمُرۡسَلِينَ

ওয়া ইন্না ইলইয়াছা লামিনাল মুরছালীন।উচ্চারণ

আর ইলিয়াসও অবশ্যই রসূলদের একজন ছিল। ৭০ তাফহীমুল কুরআন

নিশ্চয়ই ইলিয়াসও রাসূলগণের অন্তর্ভুক্ত ছিল। #%২৪%#মুফতী তাকী উসমানী

ইলিয়াসও ছিল রাসূলদের একজন।মুজিবুর রহমান

নিশ্চয়ই ইলিয়াস ছিল রসূল।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

ইল্ইয়াসও ছিল রাসূলদের একজন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আর ইলইয়াসও ছিল রাসূলদের একজন।আল-বায়ান

ইলিয়াসও ছিল অবশ্যই রসূলদের একজন।তাইসিরুল

আর নিশ্চয়ই ইল্‌য়াস রসূলগণের মধ্যেকার ছিলেন।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

৭০

হযরত ইলিয়াস আলাইহিস সালাম বনী ইসরাঈলের নবীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কুরআন মজীদে মাত্র দু’জায়গায় তাঁর আলোচনা এসেছে। এ জায়গায় এবং সূরা আল আন’আমের ৮৫ আয়াতে। আধুনিক গবেষকগণ খৃষ্টপূর্ব ৮৭৫ থেকে ৮৫০ এর মধ্যবর্তী সময়টাকে তাঁর সময় হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি ছিলেন জিল’আদ-এর অধিবাসী (প্রাচীন যুগে জিল’আদ বলা হতো বর্তমান জর্দান রাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলীয় জিলাগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ইয়ারমুক নদীর দক্ষিণে অবস্থিত এলাকাকে।) বাইবেলে তাঁকে এলিয় তিশবী (Elijah the Tishbite) নামে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবন কাহিনী নিচে দেয়া হলোঃ

হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের ইন্তেকালের পরে তাঁর পুত্র রহুব’আম এর অযোগ্যতার ফলে বনী ইসরাঈল রাজ্যে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একভাগে ছিল বাইতুল মাকদিস ও দক্ষিণ ফিলিস্তীন। এটি ছিল দাউদের পরিবারের অধিকারভুক্ত। আর উত্তরে ফিলিস্তীন সমন্বয়ে গঠিত দ্বিতীয় ভাগটিতে ইসরাঈল নামে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। পরে সামেরীয়া তার কেন্দ্রীয় স্থান হিসেবে গণ্য হয়। যদিও উভয় রাষ্ট্রের অবস্থাই ছিল দোদুল্যমান কিন্তু ইসরাঈল রাষ্ট্র প্রথম থেকেই এমন মারাত্মক বিকৃতির পথে এগিয়ে চলছিল যার ফলে তার মধ্যে শিরক, মূর্তিপূজা, জুলুম, নিপীড়ন, ফাসেকী ও চরিত্রহীনতা বেড়ে চলছিল। এমনকি শেষ পর্যন্ত যখন ইসরাঈলের বাদশাহ আখিয়াব (Ahab) সাইদা (বর্তমান লেবানন) এর রাজকন্যা ইজবেলকে বিয়ে করে তখন এ বিকৃতি ও বিপর্যয় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এ মুশরিক রাজকন্যার সংম্পর্শে এসে আখিয়াব নিজেও মুশরিক হয়ে যায়। সে সামেরীয়ায় বা’আল--এর মন্দির ও যজ্ঞবেদী নির্মাণ চালায় এবং ইসরাঈলের শহরগুলোতে প্রকাশ্যে বা’আলের নামে বলিদানের প্রচলন করে।

এহেন সময় হযরত ইলিয়াস আলাইহিস সালাম অকস্মাক জনসম্মুখে হাজির হন। তিনি জালআদ থেকে এসে আখিয়াবকে এ মর্মে নোটিস দেন যে, তোমার পাপের কারণে এখন ইসরাঈল রাজ্যে এক বিন্দুও বৃষ্টি হবে না, এমনকি কুয়াসা ও শিশিরও পড়বে না। আল্লাহর নবীর এ উক্তি অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হলো এবং সাড়ে তিন বছর পর্যন্ত বৃষ্টি একদম বন্ধ থাকলো। শেষ পর্যন্ত আখিয়াবের হুঁশ হলো। সে হযরত ইলিয়াসের সন্ধানে করে তাঁকে ডেকে পাঠালো। তিনি বৃষ্টির জন্য দোয়া করার আগে ইসরাঈলের অধিবাসীদেরকে আল্লাহ‌ রব্বুল আলামীন ও বা’আলের মধ্যকার পার্থক্য সম্পর্কে ভালোভাবে জানিয়ে দেয়া প্রয়োজন মনে করলেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি হুকুম দিলেন, একটি সাধারণ সমাবেশে বা’আলের পূজারীও এসে তার উপাস্য দেবতার নামে বলিদান করবে এবং আমিও আল্লাহ‌ রব্বুল আলামীনের নামে কুরবানী করবো। দু’টি কুরবানীর মধ্য থেকে মানুষের হাতে লাগানো আগুন ছাড়াই অদৃশ্য আগুন দ্বারা যেটিই ভস্মীভূত হবে তার উপাস্যের সত্যতা প্রমাণিত হয়ে যাবে। আখিয়াব একথা মেনে নিল। ফলে কারমাল(Carmel) পর্বতে বা’আলের সাড়ে আটশো পূজারী একত্র হলো। ইসরাঈলীদের সাধারণ সমাবেশে তাদের সাথে হযরত ইলিয়াস আলাইহিস সালামের মোকাবিলা হলো। এ মোকাবিলায় বা’আল পূজকরা পরাজিত হলো। হযরত ইলিয়াস সবার সামনে একথা প্রমাণ করে দিলেন যে, বা’আলা একটি মিথ্যা খোদা এবং আসল খোদা হচ্ছে সেই এক ও একক খোদা যাঁর পক্ষ থেকে তিনি নবী নিযুক্ত হয়ে এসেছেন। এরপর হযরত ইলিয়াস সেই জনসমাবেশে বা’আলের পূজারীদের হত্যা করান এবং তারপর বৃষ্টির জন্য দোয়া করেন। তাঁর দোয়া সঙ্গে সঙ্গেই কবুল হয়ে যায় এবং সমগ্র ইসরাঈল রাজ্যে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়।

কিন্তু এসব মু’জিযা দেখেও স্ত্রৈণ আখিয়াব তার মূর্তিপূজক স্ত্রীর গোলামী থেকে বের হয়ে আসেনি। তার স্ত্রী ইজবেল হযরত ইলিয়াসের দুশমন হয়ে গেলো এবং সে কসম খেয়ে বসলো, যেভাবে বা’আলের পূজারীদের হত্যা করা হয়েছে ঠিক অনুরূপভাবেই হযরত ইলিয়াস আলাইহিস সালামকেও হত্যা করা হবে। এ অবস্থায় ইলিয়াসকে দেশত্যাগ করতে হলো। কয়েক বছর তিনি সিনাই পাহাড়ের পাদদেশে আশ্রয় নিলেন। এ সবময় তিনি আল্লাহর কাছে যে ফরিয়াদ করেছিলেন বাইবেল তাকে এভাবে উদ্ধৃত করছেঃ

“আমি বাহিনীগণের ঈশ্বর সদাপ্রভূর পক্ষে অতিশয় উদ্যোগী হইয়াছি ; কেননা, ইস্রায়েল সন্তানগণ তোমার নিয়ম ত্যাগ করিয়াছে, তোমার যজ্ঞবেদি সকল উৎপাটিন করিয়াছে ও তোমার ভাববাদিগণকে খড়গ দ্বারা বধ করিয়াছে ; আর আমি কেবল একা আমিই অবশিষ্ট রহিলাম, আর তাহারা আমার প্রাণ লইতে চেষ্টা করিতেছে।” [ ১---রাজাবলি ১৯: ১০ ]

এ সময় বায়তুল মাকদিসের ইহুদী শাসক ইয়াহুরাম (Jehoram) ইসরাঈলের বাদশাহ আখিয়াবের মেয়েকে বিয়ে করলো এবং ইতিপূর্বে ইসরাঈলে যেসব বিকৃতি বিস্তার লাভ করেছিল এ মুশরিক শাহজাদীর প্রভাবে ইয়াহুদীয়া রাষ্ট্রেও তা ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। হযরত ইলিয়াস এখানেও নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করলেন এবং ইয়াহুরামকে একটি পত্র লিখলেন। বাইবেলে এ পত্র এভাবে উদ্ধৃত হয়েছেঃ

“তোমার পিতা দাউদের ঈশ্বর সদাপ্রভূ এইভাবে এই কথা কহেন, তুমি আপন পিতা যিহোশাফটের পথে ও যিহূদা-রাজ আসার পথে গমন কর নাই; কিন্তু ইস্রায়েলের রাজাদের পথে গমন করিয়াছ এবং আহাব-কুলের ক্রিয়ানুসারে যিহূদাকে ও যিরূশালেম নিবাসীদিগকে ব্যভিচার করাইয়াছ; আর তোমা হইতে উত্তম যে তোমার পিতৃকুলজাত ভ্রাতৃগণ, তাহাদিগকে বধ করিয়াছ ; এই কারণ দেখ, সদাপ্রভূ তোমার প্রজাদিগকে, তোমার সন্তানদিগকে, তোমার ভার্য্যাদিগকে ও তোমার সমস্ত সম্পত্তি মহা আঘাতে আহত করিবেন। আর তুমি অন্ত্রের পীড়ায় অতিশয় পীড়িত হইবে, শেষে সেই পীড়ায় তোমার অন্ত্র দিন দিন বাহির হইয়া পড়িবে।” [ ২---রাজাবলি ২১: ১২-১৫ ]

এ পত্রে হযরত ইলিয়াস যা কিছু বলেছিলেন তা পূর্ণ হলো। প্রথমে ইয়াহুরামের রাজ্য বহিরাগত আক্রমণকারীদের দ্বারা বিধ্বস্ত হলো এবং তার স্ত্রীদেরকে পর্যন্ত শত্রুরা পাকড়াও করে নিয়ে গেলো। তারপর সে নিজে অন্ত্ররোগে মারা গেলো। কয়েক বছর পর হযরত ইলিয়াস আবার ইসরাঈলে পৌঁছে গেলেন। তিনি আখিয়াব ও তার পুত্র আখযিয়াহকে সত্য সঠিক পথে আনার জন্য লাগাতার প্রচেষ্টা চালালেন। কিন্তু সামেরীয়ার রাজ পরিবারে যে পাপ একবার জেঁকে বসেছিল তা আর কোনভাবেই বের হলো না। শেষে হযরত ইলিয়াসের বদদোয়ায় আখিয়াবের পরিবার ধ্বংস হয়ে গেলো এবং তারপর আল্লাহ‌ তাঁর নবীকে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিলেন। এ ঘটনাবলী সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য বাইবেলের নিম্নোক্ত অধ্যায়গুলো দেখুনঃ [ ১--রাজাবলি, অধ্যায় ১৭, ১৮, ১৯, ২১ ; ২--রাজাবলি অধ্যায় ১ ও ২ এবং ২--বংশাবলি, অধ্যায় ২১ ]

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

কুরআন মাজীদ হযরত ইলিয়াস আলাইহিস সালামের বৃত্তান্ত সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা দেয়নি। ঐতিহাসিক ও ইসরাঈলী বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের পর বনী ইসরাঈল ব্যাপকভাবে কুফর ও শিরকে লিপ্ত হয়ে পড়লে তাদের হেদায়াতের জন্য হযরত ইলিয়াস আলাইহিস সালামকে পাঠানো হয়। বাইবেলের ‘রাজাবলী’ পুস্তকে আছে, রাজা আখিআবের পত্নী ‘ইযাবীল’ ‘বাল’ নামক এক প্রতিমার পূজা শুরু করেছিল। হযরত ইলিয়াস আলাইহিস সালাম তাকে প্রতিমা পূজা করতে নিষেধ করলেন এবং মুজিযাও দেখালেন। কিন্তু অবাধ্য কওম তাঁর কথা গ্রাহ্য তো করলই না, উপরন্তু তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র আঁটল। আল্লাহ তাআলা তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিয়ে উল্টো তাদের উপর বালা-মুসিবত চাপিয়ে দিলেন। আর হযরত ইলিয়াস আলাইহিস সালামকে নিজের কাছে ডেকে নিলেন। ইসরাঈলী বর্ণনায় আরও আছে, তাকে আসমানে জীবিত তুলে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ভরযোগ্য কোন বর্ণনা দ্বারা এটা সমর্থিত নয়। বিস্তারিত দ্র. মাআরিফুল কুরআন।

তাফসীরে জাকারিয়া

১২৩. আর নিশ্চয় ইলইয়াস ছিলেন রাসূলদের একজন।(১)

(১) কাতাদা বলেন, ইল্‌ইয়াস ও ইদ্‌রীস একই ব্যক্তি। (তাবারী) অন্যদের নিকট তাদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। (ইবন কাসীর) সে মতে তিনি ছিলেন, ইলইয়াস ইবনে ফিনহাস ইবনে আইযার ইবনে হারূন ইবনে ইমরান। তারা বা’ল নামীয় এক মূর্তির পূজা করত। তিনি তাদেরকে তা থেকে নিষেধ করেন। কিন্তু তারা তা থেকে বিরত হয়। না। (ইবন কাসীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(১২৩) নিশ্চয় ইল্‌য়্যাসও ছিল রসূলদের একজন; (1)

(1) ইলিয়াস (আঃ) হারূন (আঃ)-এর বংশোদ্ভূত বনী ইস্রাঈলের প্রতি প্রেরিত একজন নবী ছিলেন। তাঁকে বা’লাবাক্ক্ নামক এলাকায় প্রেরণ করা হয়েছিল। অনেকে সে জায়গার নাম সামেরা বলেছেন, যা ফিলিস্তীনের মধ্য পশ্চিমে অবস্থিত। সেখানের মানুষ বা’ল নামক এক মূর্তির উপাসনা করত। অনেকে বলেন, এটা একটি দেবী ছিল।