يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَ مِنَ ٱلسَّمَآءِ إِلَى ٱلۡأَرۡضِ ثُمَّ يَعۡرُجُ إِلَيۡهِ فِي يَوۡمٖ كَانَ مِقۡدَارُهُۥٓ أَلۡفَ سَنَةٖ مِّمَّا تَعُدُّونَ

ইউদাব্বিরুল আমর মিনাছছামাইইলালআরদিছু ম্মা ইয়া‘রুজুইলাইহি ফী ইয়াওমিন কানা মিকদা-রুহূআলফা ছানাতিম মিম্মা-তা‘উদ্দূন।উচ্চারণ

তিনি আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত দুনিয়ার যাবতীয় বিষয় পরিচালনা করেন এবং এ পরিচালনার বৃত্তান্ত ওপরে তার কাছে যায় এমন একদিনে যার পরিমাপ তোমাদের গণনায় এক হাজার বছর। তাফহীমুল কুরআন

আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত প্রতিটি কাজের ব্যবস্থাপনা তিনি নিজেই করেন। তারপর সে কাজ এমন এক দিনে তার কাছে উপরে পৌঁছে, তোমাদের গণনা অনুযায়ী যার পরিমাণ হাজার বছর। মুফতী তাকী উসমানী

তিনি আকাশ হতে পৃথিবী পর্যন্ত সমুদয় বিষয় পরিচালনা করেন, অতঃপর একদিন সব কিছুই তাঁর সমীপে সমুত্থিত হবে, যে দিনের পরিমাপ হবে তোমাদের হিসাবে হাজার বছরের সমান।মুজিবুর রহমান

তিনি আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত সমস্ত কর্ম পরিচালনা করেন, অতঃপর তা তাঁর কাছে পৌছবে এমন এক দিনে, যার পরিমাণ তোমাদের গণনায় হাজার বছরের সমান।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তিনি আকাশ হতে পৃথিবী পর্যন্ত সমুদয় বিষয় পরিচালনা করেন, এরপর একদিন সমস্ত কিছুই তাঁর সমীপে সমুত্থিত হবে- যে দিনের পরিমাপ হবে তোমাদের হিসেবে সহস্র বৎসর। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত সকল কার্য পরিচালনা করেন। তারপর তা একদিন তাঁর কাছেই উঠবে। যেদিনের পরিমাণ হবে তোমাদের গণনায় হাজার বছর।আল-বায়ান

তিনি আকাশ হতে পৃথিবী পর্যন্ত কার্য পরিচালনা করেন, অতঃপর সকল বিষয়াদি তাঁরই কাছে একদিন উত্থিত হবে যার পরিমাপ তোমাদের গণনা অনুযায়ী হাজার বছর।তাইসিরুল

মহাকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত বিষয়-কর্ম তিনি পরিচালনা করেন, তারপর এটি তাঁর দিকে উঠে আসবে একদিন যার পরিমাপ হচ্ছে তোমরা যা গণনা কর তার এক হাজার বছর।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

অর্থাৎ তোমাদের কাছে যেটা এক হাজার বছরের ইতিহাস আল্লাহর কাছে যেন সেটা মাত্র একদিনের কাজ। আল্লাহর ইচ্ছা পূরণকারীদের হাতে আজ এর পরিকল্পনা পেশ করা হয় এবং কালই তারা এ বিবরণ তার কাছে পেশ করে যাতে তাদেরকে আবার পরদিনের (অর্থাৎ তোমাদের হিসেবে এক হাজার বছর) কাজ দেয়া হয় এ প্রসঙ্গটি কুরআনের আরো দু’জায়গায় এসেছে। সেগুলোও সামনে রাখলে এর অর্থ ভালোভাবে অনুধাবন করা যেতে পারে। আরবের কাফেররা বলতোঃ মুহাম্মাদ ﷺ নবুয়তের দাবী নিয়ে সামনে এসেছেন আজ কয়েক বছর হয়ে গেল। তিনি বারবার আমাদের বলছেন, যদি আমার এ দাওয়াত তোমরা গ্রহণ না করো এবং আমাকে প্রত্যাখ্যান করো তাহলে তোমাদের ওপর আল্লাহর আযাব নেমে আসবে। কয়েক বছর থেকে তিনি নিজের এ দাবীর পুনরাবৃত্তি করে চলছেন কিন্তু আজও আযাব আসেনি। অথচ আমরা একবার নয় হাজার বার তাকে পরিষ্কারভাবে প্রত্যাখ্যান করেছি। তার এ হুমকি যদি যথার্থই হতো তাহলে এতদিন কবে না জানি আমাদের ওপর আযাব এসে যেতো। এর জবাবে আল্লাহ‌ সূরা হাজ্জে বলেন-

وَيَسْتَعْجِلُونَكَ بِالْعَذَابِ وَلَنْ يُخْلِفَ اللَّهُ وَعْدَهُ وَإِنَّ يَوْمًا عِنْدَ رَبِّكَ كَأَلْفِ سَنَةٍ مِمَّا تَعُدُّونَ

“এরা শীঘ্রই আযাব চাচ্ছে। আল্লাহ‌ কখনো ওয়াদার বরখেলাফ করবেন না। কিন্তু তোমার রবের কাছে একদিন তোমাদের গণনায় এক হাজার বছরের সমান হয়ে থাকে।” (৪৭ আয়াত)

অন্য এক জায়গায় একথার জবাব এভাবে দেয়া হয়েছেঃ

سَأَلَ سَائِلٌ بِعَذَابٍ وَاقِعٍ - لِلْكَافِرِينَ لَيْسَ لَهُ دَافِعٌ - مِنَ اللَّهِ ذِي الْمَعَارِجِ - تَعْرُجُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ - فَاصْبِرْ صَبْرًا جَمِيلًا - إِنَّهُمْ يَرَوْنَهُ بَعِيدًا - وَنَرَاهُ قَرِيبًا

“প্রশ্নকারী প্রশ্ন করছে সেই আযাব সম্পর্কে, যা কাফেরদের ওপর আপতিত হবে, যার প্রতিরোধকারী কেউ নেই, সেই আল্লাহর পক্ষ থেকে যিনি সমুচ্চ স্তরসম্পন্ন (অর্থাৎ পর্যায়ক্রমে কাজ করেন)। ফেরেশতা ও রূহ তার দিকে উঠতে থাকে এমন একদিনে যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর। কাজেই হে নবী! সুন্দর সবর অবলম্বন করুন। এরা তাকে দূরবর্তী মনে করে এবং আমি তাকে দেখছি নিকটে। (আল মা’আরিজ, ১-৭ আয়াত)

এসব উক্তি থেকে যে কথা বুঝানো হয়েছে তা হচ্ছে এই যে, মানুষের ইতিহাসে আল্লাহর ফায়সালা দুনিয়ার সময় ও পঞ্জিকা অনুসারে হয় না কোন জাতিকে যদি বলা হয়, অমুক নীতি অবলম্বন করলে তোমাদের এ ধরনের পরিণামের সম্মুখীন হতে হবে, তাহলে যে জাতি একথার এ অর্থ গ্রহণ করবে যে, আজই সে নীতি অবলম্ব করলে কালই তার অশুভ পরিণাম সামনে এসে যাবে, সে হবে বড়ই নির্বোধ। পরিণামফল প্রকাশের জন্য দিন, মাস, বছর এমনকি শত শত বছর ও কোন বড় মেয়াদ নয়।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

আল্লাহ তাআলার কাছে এক দিন মানুষের গণনা অনুযায়ী হাজার বছর হয় এ কথার অর্থ কী? এর প্রকৃত ব্যাখ্যা তো আল্লাহ তাআলাই জানেন এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযি.) একে মুতাশাবিহাত (অর্থাৎ এমন সব দ্ব্যর্থবোধক বিষয়, যার প্রকৃত অর্থ আল্লাহ তাআলা ছাড়া কেউ জানে না)-এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন; কিন্তু মুফাসসিরগণ এর বিভিন্ন ব্যাখ্যাও প্রদান করেছেন। যেমন এর এক ব্যাখ্যা হল, এ দিন দ্বারা কিয়ামত দিবসকে বোঝানো হয়েছে, যা এক হাজার বছরের সমপরিমাণ হবে। এ হিসেবে আয়াতের মর্ম হল, বর্তমানে আল্লাহ তাআলা যত সৃষ্টির ব্যবস্থাপনা করছেন, শেষ পর্যন্ত কিয়ামতের দিন তাদের সকলকে আল্লাহ তাআলারই কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। এর আরেক ব্যাখ্যা হল, আল্লাহ তাআলা যেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং তা কার্যকর করার জন্য যে সময় স্থির করেন, সেই স্থিরীকৃত সময়েই তা কার্যকর করা হয়ে থাকে। সুতরাং কোন কোন বিষয় কার্যকর করতে মানুষের গণনা অনুযায়ী এক হাজার বছরও লেগে যায়, কিন্তু আল্লাহ তাআলার কাছে সেই এক হাজার বছরও দীর্ঘ কিছু সময় নয়; বরং এক দিনের সমতুল্য। সূরা হাজ্জে (২৩ : ৪৭) বলা হয়েছে, কাফেরদেরকে যখন বলা হত, কুফরের কারণে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তাদের উপর দুনিয়া বা আখেরাতে অবশ্যই কোন আযাব আসবে, তখন তারা একথা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করত এবং বলত এত দিন চলে গেল, কই কোন আযাব তো আসল না। সত্যিই যদি কোন আযাব আসার হয়, তবে এখনই কেন তা আসছে না? তার উত্তরে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাআলা যে ওয়াদা করেছেন তা অবশ্যই পূরণ হবে। বাকি সেটা কখন পূরণ হবে, তা নির্ধারিত হবে আল্লাহ তাআলার নিজ হেকমত অনুযায়ী। তোমরা যে মনে করছ তার আগমন অনেক বিলম্বিত হয়ে গেছে, আসলে বিষয়টা তা নয়। তোমরা যাকে এক হাজার বছর গণ্য কর, আল্লাহ তাআলার কাছে তা এক দিনের সমান। এ আয়াত সম্পর্কে কিছুটা বিশদ আলোচনা সূরা মাআরিজ (৭০ : ৩)-এ আসবে।

তাফসীরে জাকারিয়া

৫. তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত সমুদয় বিষয় পরিচালনা করেন, তারপর সব কিছুই তাঁর সমীপে উত্থিত হবে এমন এক দিনে যার পরিমাণ হবে তোমাদের গণনা অনুসারে হাজার বছর।(১)

(১) অর্থাৎ সেদিনের পরিমাণ তোমাদের গণনানুসারে এক হাজার বছর হবে। কাতাদাহ বলেন, দুনিয়ার দিনের হিসেবে সে সময়টি হচ্ছে, এক হাজার বছর। তন্মধ্যে পাঁচশত বছর হচ্ছে নাযিল হওয়ার জন্য, আর পাঁচ শত বছর হচ্ছে উপরে উঠার জন্য। মোট: এক হাজার বছর। (তাবারী) অন্যত্র বলা হয়েছে, “সেদিনের পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর হবে।” (সূরা আল-মা'আরিজ: ৪) এর এক সহজ উত্তর তো এই যে, সেদিনটি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর হবে বিধায় মানুষের নিকট অতিশয় দীর্ঘ বলে মনে হবে। এরূপ দীর্ঘানুভূতি নিজ নিজ ঈমান ও আমলানুপাতে হবে। যারা বড় অপরাধী তাদের নিকট সুদীর্ঘ এবং যারা কম অপরাধী তাদের নিকট কম দীর্ঘ বলে বোধ হবে। এমনকি সেদিন কিছু লোকের নিকট এক হাজার বছর বলে মনে হবে, আবার কারো কারো নিকট পাঁচশত বছর বলে মনে হবে। আবার কারো কারো নিকট পঞ্চাশ হাজার বছর বলে মনে হবে। (তাবারী, বাগভী; ফাতহুল কাদীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(৫) তিনি আকাশ হতে পৃথিবী পর্যন্ত সকল বিষয় পরিচালনা করেন,(1) অতঃপর সমস্ত কিছুই তাঁর দিকে ঊর্ধ্বগামী হয় এমন এক দিনে -- যা তোমাদের গণনায় হাজার বছরের সমান।(2)

(1) ‘আকাশ হতে’ যেখানে আল্লাহর আরশ ও ‘লাওহে মাহফূয’ আছে। আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে নির্দেশাবলী অবতীর্ণ করেন; অর্থাৎ বিশ্ব পরিচালনা করেন এবং পৃথিবীতে তাঁর হুকুম বাস্তবায়িত হয়। যেমন জীবন-মৃত্যু, সুস্থতা-অসুস্থতা, চাওয়া-পাওয়া, ধনবত্তা-দরিদ্রতা, যুদ্ধ-সন্ধি, সম্মান-অসম্মান ইত্যাদি। আল্লাহ তাআলা আরশের উপর থেকে তাঁর লিখিত ভাগ্য অনুযায়ী এ সব কিছুর তদবীর ও ব্যবস্থাপনা করে থাকেন।

(2) অর্থাৎ, তাঁর ঐ সকল ব্যবস্থাপনা ও নির্দেশাবলী তাঁর নিকট একই দিনে ফিরে আসে যা ফিরিশতাগণ নিয়ে অবতীর্ণ হন। তাঁর দিকে ঊর্ধ্বগামী হতে যে সময় লাগে তা ফিরিশতা ছাড়া অন্যদের জন্য এক হাজার বছর হবে। অথবা এর অর্থ হল, ‘‘অতঃপর একদিন সমস্ত কিছুই (বিচারের জন্য) প্রত্যাবর্তিত হবে-- যে দিনের দৈর্ঘ্য হবে তোমাদের গণনায় হাজার বছরের সমান।’’ উদ্দেশ্য হল কিয়ামতের দিন; যেদিন মানুষের সকল আমল আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করা হবে। উক্ত ‘দিন’ কোন্ দিন তা নির্দিষ্ট করে বলতে ও ব্যাখ্যা করতে মুফাসসিরগণের মাঝে অনেক মতভেদ রয়েছে। ইমাম শাওকানী (রঃ) এই বিষয়ে ১৫/১৬ টি মত উল্লেখ করেছেন। ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই বিষয়ে কোন মন্তব্য না করে নীরব থাকতে পছন্দ করেছেন এবং তার প্রকৃত উদ্দেশ্য আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়েছেন। আয়সারুত তাফাসীরের লেখক বলেন, এ কথা কুরআন মাজীদের তিন জায়গায় এসেছে এবং তিন জায়গাতেই আলাদা আলাদা দিনের অর্থে ব্যবহার হয়েছে। সূরা হজ্জের ৪৭নং আয়াতে ‘দিন’ বলতে আল্লাহর নিকট যে সময় তা বুঝানো হয়েছে এবং সূরা মাআরিজের ৪নং আয়াতে দিনের দৈর্ঘ্য পঞ্চাশ হাজার বছর বলা হয়েছে। তার উদ্দেশ্য কিয়ামত দিবস। আর এখানে ‘দিন’ বলতে উদ্দেশ্য হল, দুনিয়ার শেষ দিন; যখন দুনিয়ার সকল ব্যাপার নিঃশেষ হয়ে আল্লাহর নিকট ফিরে যাবে। (অল্লাহু আ’লাম)