ওয়ামা- কুনতা তারজূআইঁ ইউলকাইলাইকাল কিতা-বুইল্লা-রহমাতাম মির রব্বিকা ফালা-তাকূনান্না জাহীরল লিলক-ফিরীন।উচ্চারণ
তুমি মোটেই আশা করোনি যে, তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করা হবে। এতো নিছক তোমার রবের মেহেরবানী (তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে) ১০৯ কাজেই তুমি কাফেরদের সাহায্যকারী হয়ো না। ১১০ তাফহীমুল কুরআন
(হে রাসূল!) পূর্ব থেকে তোমার এ আশা ছিল না যে, তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করা হবে। কিন্তু এটা তোমার প্রতিপালকের রহমত। #%৫৮%# সুতরাং তুমি কখনও কাফেরদের সাহায্যকারী হয়ো না।মুফতী তাকী উসমানী
তুমি আশা করনি যে, তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ হবে। এটাতো শুধু তোমার রবের অনুগ্রহ। সুতরাং তুমি কখনও কাফিরদের সাহায্যকারী হয়োনা।মুজিবুর রহমান
আপনি আশা করতেন না যে, আপনার প্রতি কিতাব অবর্তীর্ণ হবে। এটা কেবল আপনার পালনকর্তার রহমত। অতএব আপনি কাফেরদের সাহায্যকারী হবেন না।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
তুমি আশা কর নাই যে, তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ হবে। এটা তো কেবল তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ। সুতরাং তুমি কখনও কাফিরদের সহায় হয়ো না। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
আর তুমি আশা করছিলে না যে, তোমার প্রতি কিতাব (কুরআন) নাযিল করা হবে, বরং তা তোমার রবের পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ। অতএব, তুমি কখনো কাফিরদের জন্য সাহায্যকারী হয়ো না।আল-বায়ান
তুমি তো প্রত্যাশা করনি যে, তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করা হবে। এটা তোমার প্রতিপালকের রহমত বিশেষ। কাজেই তুমি কক্ষনো কাফিরদের সমর্থনকারী হয়ো না।তাইসিরুল
আর তুমি তো আশা কর নি যে তোমার সঙ্গে গ্রন্থখানার পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে, কিন্তু এটি তোমার প্রভুর কাছ থেকে একটি করুণা, সুতরাং তুমি কখনো অবিশ্বাসীদের পৃষ্ঠপোষক হয়ো না।মাওলানা জহুরুল হক
১০৯
একথাটি মুহাম্মাদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতের প্রমাণ স্বরূপ পেশ করা হচ্ছে। মূসা আলাইহিস সালাম এ কথা মোটেই জানতেন না যে, তাঁকে নবী করা হচ্ছে এবং বিরাট দায়িত্ব সম্পাদনে নিযুক্ত করা হচ্ছে। তিনি কখনো কল্পনায়ও এ ইচ্ছা বা আশা পোষণ করা তো দূরের কথা কখনো এ বিষয়টি কামনাও করেননি। হঠাৎ পথ চলার সময় তাঁকে ডেকে নেয়া হয় এবং নবীর দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে তাঁর থেকে বিস্ময়কর কাজ নেয়া হয়, যার সাথে তার পূর্ববর্তী জীবনের কাজের কোন সাদৃশ্যই ছিল না। ঠিক একই ঘটনা ঘটে মুহাম্মাদ সল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথেও। মক্কার লোকেরা নিজেরাই জানতো, হেরা গিরিগুহা থেকে যেদিন তিনি নবুওয়াতের পয়গাম নিয়ে নেমে আসেন তার মাত্র একদিন আগে পর্যন্ত তাঁর জীবন কি ছিল, তিনি কি কাজ করতেন, কেমন কথাবার্তা বলতেন, তাঁর কথাবার্তার বিষয়বস্তু কি হতো, কোন্ বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল এবং তাঁর তৎপরতা ছিলো কোন্ ধরণের। তাঁর এ সমগ্র জীবন অবশ্যই সত্যতা, বিশ্বস্ততা, আমানতদারী ও পবিত্রতা পরিচ্ছন্নতায় পরিপূর্ণ ছিল। সেখানে পরিপূর্ণ ভদ্রতা, শালীনতা, শান্তিপ্রিয়তা, প্রতিশ্রুতি পালন, অধিকার প্রদান ও জনসেবার ভাবধারা অসাধারণ উজ্জ্বল্যে দেদীপ্যমান ছিল। কিন্তু সেখানে এমন কোন জিনিস ছিল না যার ভিত্তিতে কেউ এ কথা কল্পনাও করতে পারে যে, এ সদাচারী লোকটি আগামীকাল নবুওয়াতের দাবী নিয়ে এগিয়ে আসবেন। তাঁর সাথে যারা নিকটতম সম্পর্ক রাখতো এবং তাঁর আত্নীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশি ও বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে একজনও একথা বলতে পারেনি যে, তিনি পূর্ব থেকেই নবী হবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। হেরা গিরিগূহার সেই বৈপ্লবিক মূহুর্তের পরে অকস্মাৎ যেসব বিষয়বস্তু, সমস্যাবলী ও প্রসঙ্গ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য বিবৃতি ও ভাষণ দান শুরু হয়ে যায় ইতিপূর্বে কেউ তাঁর কন্ঠ থেকে কখনো তার একটি বর্ণও শোনেনি। কুরআনের আকারে অকস্মাৎ তাঁর মুখ থেকে যে বিশেষ ভাষা, শব্দ ও পরিভাষা লোকেরা শুনতে থাকে ইতিপূর্বে কখনো তারা তা শোনেনি। ইতিপূর্বে কখনো তিনি কোথাও বক্তৃতা ও ওয়াজ-নসিহত করতে দাঁড়াননি। কখনো দাওয়াত দিতে ও আন্দোলনের বাণী নিয়ে এগিয়ে আসেননি। বরং কখনো তাঁর কোন কর্মতৎপরতা থেকে এ ধারণাই জন্মাতে পারেনি যে, তিনি সামাজিক সমস্যা সমাধান অথবা ধর্মীয় সংশোধন কিংবা নৈতিক ও চারিত্রিক সংস্কার সাধনের জন্য কোন কাজ শুরু করার চিন্তা-ভাবনা করছেন। এ বৈপ্লবিক মুহূর্ত সমাগত হবার একদিন আগেও তাঁর জীবন ছিল একজন ব্যবসায়ীর জীবন। সাদামাটা ও বৈধ পথে রুজি-রোজগার করা, নিজের সন্তান-পরিজনদের সাথে হাসিখুশির জীবন-যাপন করা, অতিথি আপ্যায়ন করা, দুঃখী-দরিদ্রদের সাহায্য সেবা করা এবং আত্নীয়-স্বজনদের সাথে সদ্ব্যবহার আর কখনো কখনো ইবাদাত করার জন্য একান্তে বসে যাওয়া--- এই ছিল তাঁর স্বাভাবিক জীবন। এ ধরণের একজন লোকের হঠাৎ একদিন বিশ্ব কাঁপানো বাগ্মীতা নিয়ে ময়দানে নেমে আসা, একটি বিপ্লবাত্মক দাওয়াতের কাজ শুরু করে দেয়া, একটি অভিনব সাহিত্য সৃষ্টি করা এবং একটি স্বতন্ত্র জীবন দর্শন, চিন্তাধারা, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিধান নিয়ে সামনে এগিয়ে আসা, এতবড় একটি পরিবর্তন, যা মানবিক মনস্তত্বের দৃষ্টিতে কোন প্রকার কৃত্রিমতা, প্রস্তুতি ও ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টার মাধ্যমে কখনোই আত্নপ্রকাশ করতে পারে না। কারণ এ ধরণের প্রত্যেকটি প্রচেষ্টা ও প্রস্তুতি অবশ্যই পর্যায়ক্রমিক ক্রমোন্নতির স্তর অতিক্রম করে এবং যাদের মধ্যে মানুষ রাত্রি-দিন জীবন-যাপন করে এ পর্যায় ও স্তর কখনো তাদের চোখের আড়ালে থাকতে পারে না। নবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জীবন যদি এ পর্যায়গুলো অতিক্রম করে থাকতো তাহলে মক্কার হাজার হাজার লোক বলতো, আমরা না আগেই বলেছিলাম এ ব্যক্তি একদিন কোন বড় আকারের দাবী করে বসবে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, মক্কার কাফেররা তাঁর বিরুদ্ধে সব ধরণের অভিযোগ আনলেও এ অভিযোগটি তাদের একজনও উত্থাপন করেননি।
তারপর তিনি নিজেও নবুওয়াতের প্রত্যাশী ছিলেন না। অথবা তা কামনা করতেন না এবং সেজন্য অপেক্ষাও করছিলেন না। বরং সম্পূর্ণ অজ্ঞাতসারে অকস্মাত তিনি এ বিষয়টির মুখোমুখি হলেন। বিভিন্ন হাদীসে অহীর সূত্রপাতের অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে যে ঘটনা উদ্ধৃত হয়েছে তা থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। জিব্রীলের সাথে প্রথম সাক্ষাত এবং সূরা আলাকের প্রাথমিক আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার পর তিনি হেরা গূহা থেকে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে গৃহে পৌঁছেছিলেন। গৃহের লোকদের বলেছিলেন, “আমাকে ঢেকে দাও, আমাকে ঢেকে দাও।” কিছুক্ষণ পরে ভীতির অবস্থা কিছুটা দূর হয়ে গেলে নিজের জীবন সঙ্গীনিকে সব অবস্থা খুলে বললেন। এ প্রসঙ্গে তাঁকে বললেন, “আমি নিজের প্রাণের ভয় করছি।” স্ত্রী সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিলেন, “মোটেই না, আল্লাহ আপনাকে কখনো কষ্ট দেবেন না। আপনি আত্নীয়দের হক আদায় করেন। অসহায়কে সাহায্য করেন। অভাবী দরিদ্রকে সহায়তা দেন। অতিথি আপ্যায়ন করেন। প্রত্যেক ভালো কাজে সাহায্য করতে প্রস্তুত থাকেন।” তারপর তিনি তাঁকে নিয়ে নিজের চাচাতো ভাই ও আহলে কিতাবদের একজন অভিজ্ঞ আলেম ও সদাচারী ব্যক্তি ওয়ারাকাহ ইবনে নওফালের কাছে গেলেন। তাঁর কাছ থেকে পুরো ঘটনা শোনার পর ওয়ারাকাহ বললেন, “আপনার কাছে যিনি এসেছিলেন তিনি ছিলেন সেই একই আসমানী দূত বা নামূস (বিশেষ কাজে নিযুক্ত নির্দিষ্ট ফেরেশতা) যিনি মূসার (আ) কাছে এসেছিলেন। হায়! যদি আমি যুবক হতাম এবং সে সময় পর্যন্ত জীবিত থাকতাম যখন আপনার সম্প্রদায় আপনাকে বহিস্কার করবে।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “এরা কি আমাকে বের করে দেবে?” জবাব দিলেন, “হ্যাঁ আজ পর্যন্ত এক ব্যক্তিও এমন অতিক্রান্ত হননি, যিনি এ ধরণের বাণী বহন করে এনেছেন এবং লোকেরা তাঁর দুশমনে পরিণত হয়নি।
এ সমগ্র ঘটনাটি এমন একটি অবস্থার ছবি তুলে ধরে, যা একজন সরল মানুষ একটি অপ্রত্যাশিত ও চরম অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলে তার জীবনে দেখা দিতে পারে। যদি নবী ﷺ প্রথম থেকেই নবী হবার চিন্তা করতেন, নিজের সম্পর্কে চিন্তা করতেন যে, তাঁর মতো মানুষের নবী হওয়া উচিত এবং কবে কোন ফেরেশতা তাঁর কাছে পয়গাম নিয়ে আসবে তারই প্রতীক্ষায় ধ্যান সাধনা করে নিজের মনের ওপর চাপ প্রয়োগ করতেন, তাহলে হেরা গূহার ঘটনাটি সংঘটিত হবার সাথে সাথেই তিনি আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠতেন এবং বলিষ্ঠ মনোবল নিয়ে বিরাট দাবী সহকারে পাহাড় থেকে নামতেন, তারপর সোজা নিজের সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে পৌঁছে নিজের নবুওয়াতের ঘোষণা দিতেন। কিন্তু এখানে এর সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা পরিদৃষ্ট হয়। তিনি যা কিছু দেখেন তাতে বিস্মিত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে পৌঁছেন। লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েন। মনটা একটু শান্ত হলে চুপি চুপি স্ত্রীকে বলেন, আজ গুহার নিসঙ্গতায় এ ধরণের একটি ঘটনা ঘটে গেছে। জানি না কি হবে। আমার প্রাণ নিরাপদ নয় মনে হচ্ছে। নবুওয়াত প্রার্থীর অবস্থা থেকে এ অবস্থা কত ভিন্নতর।
তারপর স্বামীর জীবন, তাঁর অবস্থা ও চিন্তাধারা সম্পর্কে স্ত্রীর চেয়ে বেশি আর কে জানতে পারে? যদি তিনি পূর্বাহ্ণেই এ অভিজ্ঞতা লাভ করে থাকতেন যে, তাঁর স্বামী হচ্ছেন নবুওয়াতের প্রার্থী, তিনি সর্বক্ষণ ফেরেশতাদের আগমনের প্রতীক্ষা করছেন, তাহলে তার জবাব কখনো হযরত খাদিজার (রা.) জবাবের অনুরূপ হতো না। বরং তিনি বলতেনঃ হে স্বামী! ভয় পাও কেন? দীর্ঘদিন থেকে যে জিনিসের প্রত্যাশী ছিলে তা পেয়ে গেছো। চলো, এবার পীর গিরির দোকান পাঠ সাজাও। আমি মানত, নাজরানা ইত্যাদি সামলানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু পনের বছরের দাম্পত্য জীবনে তিনি স্বামীর জীবনের যে চেহারা দেখেছিলেন তার ভিত্তিতে একথা বুঝতে তার এক মুহূর্তও দেরী হয়নি যে, এমন সৎ, ত্যাগী ও নির্লোভ ব্যক্তির কাছে শয়তান আসতে পারে না, আল্লাহ তাঁকে কোন বড় পরীক্ষার সম্মুখীনও করতে পারেন না বরং তিনি যা কিছু দেখেছেন তা নির্জলা সত্য ছাড়া আর কিছুই নয়।
ওয়ারকাহ ইবনে নওফালের ব্যাপারেও একই কথা। তিনি কোন বাইরের লোক ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন নবী করীম ﷺ এর ভ্রাতৃসমাজের অন্তর্ভুক্ত এবং নিকটতম আত্মীয়তার প্রেক্ষিতে তাঁর শ্যালক। তারপর একজন ঈসায়ী আলেম হবার ফলে নবুওয়াত, কিতাব ও অহীকে কৃত্রিমতা ও বানোয়াট থেকে বাছাই করার ক্ষমতা রাখতেন। বয়সে অনেক বড় হবার কারণে নবীর ﷺ শৈশব থেকে সে সময় পর্যন্ত সমগ্র জীবন তার সামনে ছিল। তিনিও তাঁর মুখ থেকে হেরা গূহার সমস্ত ঘটনা আনুপূর্বিক শোনার পর সঙ্গে সঙ্গেই বলে ওঠেন, এ আগমনকারী নিশ্চিতভাবেই সেই একই ফেরেশতা হবেন যিনি হযরত মূসার (আ) কাছে অহী নিয়ে আসতেন। কারণ হযরত মুসা (আ) সাথে যা ঘটেছিল এখানেও সেই একই ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ একজন অত্যন্ত পবিত্র-পরিচ্ছন্ন চরিত্রের অধিকারী সহজ-সরল মানুষ, মাথায় কোন প্রকার পূর্ব চিন্তা বা পরিকল্পনা নেই, নবুওয়াতের চিন্তায় ডুবে থাকা তো দূরের কথা তা অর্জন করার কল্পনাও কোনদিন তাঁর মনে জাগেনি এবং অকস্মাৎ তিনি পূর্ণ সচেতন অবস্থায় প্রকাশ্যে এ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। এ জিনিসটি তাঁকে দুই আর দু’ইয়ে চারের মতো নির্দ্ধিধায় নিশ্চতভাবেই এ সিদ্ধান্তে পৌঁছিয়ে দেয় যে, এখানে কোন প্রবৃত্তির প্ররোচনা বা শয়তানী ছল চাতুরী নেই। বরং এ সত্যাশ্রয়ী মানুষটি নিজের কোন প্রকার ইচ্ছা-আকাংখা ছাড়াই যা কিছু দেখেছেন তা আসলে প্রকৃত সত্যদর্শন ছাড়া আর কিছু নয়।
এটি মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াতের এমন একটি সুস্পষ্ট ও জাজ্জ্বল্যমান প্রমাণ যে, একজন সত্যপ্রিয় মানুষের পক্ষে তা প্রমাণ করা কঠিন। তাই কুরআনে বিভিন্ন জায়গায় এ জিনিসটিকে নবুওয়াতের প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হয়েছে। যেমন সূরা ইউনূসে বলা হয়েছেঃ
قُلْ لَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا تَلَوْتُهُ عَلَيْكُمْ وَلَا أَدْرَاكُمْ بِهِ فَقَدْ لَبِثْتُ فِيكُمْ عُمُرًا مِنْ قَبْلِهِ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
“হে নবী! তাদেরকে বলে দাও, যদি আল্লাহ এটা না চাইতেন, তাহলে আমি কখনো এ কুরআন তোমাদের শুনাতাম না বরং এর খবরও তোমাদের দিতাম না। ইতিপূর্বে আমি তোমাদের মধ্যে আমার জীবনের দীর্ঘকাল অতিবাহিত করেছি, তোমরা কি এতটুকু কথাও বোঝো না?” (ইউনূসঃ ১৬ আয়াত)
আর সূরা আশ্-শূরায় বলা হয়েছে,
مَا كُنْتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ وَلَكِنْ جَعَلْنَاهُ نُورًا نَهْدِي بِهِ مَنْ نَشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا
“হে নবী! তুমি তো জানতেও না কিতাব কি এবং ঈমান কি। কিন্তু আমি এ অহীকে একটি আলোয় পরিণত করে দিয়েছি। যার সাহায্যে আমি নিজের বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে চাই তাকে পথ দেখাই।” (আশ্-শূরাঃ ৫২ আয়াত)
[আরো বেশি ব্যাখ্যার জন্য দেখুন তাফহীমুল কুরআন সূরা ইউনূস ২১, আনকাবুত ৮৮-৯২ এবং শূরা ৮৪ টীকা।]
১১০
অর্থাৎ আল্লাহ যখন না চাইতেই তোমাদের এ নিয়ামত দান করেছেন তখন তোমাদের কর্তব্য হচ্ছে, তোমাদের সমস্ত শক্তি ও শ্রম এর পতাকা বহন করার এবং এর প্রচার ও প্রসারের কাজে ব্যয় করবে, এ কাজে ত্রুটি ও গাফলতি করার মানে হবে তোমরা সত্যের পরিবর্তে সত্য অস্বীকারকারীদেরকে সাহায্য করেছো। এর অর্থ এ নয়, নাউযুবিল্লাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ ধরণের কোন ভুলের আশঙ্কা ছিল। বরং এভাবে আল্লাহ কাফেরদেরকে শুনিয়ে শুনিয়ে নিজের নবীকে এ হিদায়াত দান করছেন যে, এদের শোরগোল ও বিরোধিতা সত্ত্বেও তুমি নিজের কাজ করে যাও এবং তোমার এ দাওয়াতের ফলে সত্যের দুশমনরা তাদের জাতীয় স্বার্থ বিঘ্নিত হবার যেসব আশঙ্কা প্রকাশ করে তার পরোয়া করার কোন প্রয়োজন নেই।
অর্থাৎ তোমাকে নবুওয়াত দান করা হবে ও তুমি নবী হবে এই আশা তোমার ছিল না এবং এ লক্ষে তুমি কোনও রকম সাধনাও করনি। তোমার অপ্রত্যাশিতভাবেই আমি তোমাকে নবী বানিয়েছি। কাজেই তোমার কাজ হল এ মহা নি‘আমতের কদর বুঝে মানুষকে শিরক ও কুফরের ক্ষতি বোঝানো ও তাদেরকে দীন ও ঈমানের দিকে ডাকা। তারা যে অধর্মের উপর আছে তাতে তাদের কোনও রকম সহযোগিতা করা বা এ ব্যাপারে তাদের সাথে কোনওরকম আপস করার বিন্দুমাত্র অবকাশ তোমার নেই। এ আয়াত প্রমাণ করে নবুওয়াত কোন সাধনালব্ধ বিষয় নয় বরং এটা আল্লাহর তাআলারই দান। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে এ মহামর্যাদায় অভিষিক্ত করে থাকেন। সেই সঙ্গে এ আয়াতের শিক্ষা হল, নবুয়তী ইলমের উত্তরাধিকার যারা লাভ করেছে, কোনও রকম বেদীনী কর্মকাণ্ডের সাথে আপস করা তাদের শান নয়। -অনুবাদক
৮৬. আর আপনি আশা করেননি যে, আপনার প্রতি কিতাব নাযিল হবে। এ তো শুধু আপনার রব-এর অনুগ্রহ। কাজেই আপনি কখনো কাফেরদের সহায় হবেন না।
(৮৬) তুমি আশা করনি যে, তোমার প্রতি গ্রন্থ অবতীর্ণ করা হবে।(1) এ তো কেবল তোমার প্রতিপালকের করুণা।(2) সুতরাং তুমি কখনও অবিশ্বাসীদের পৃষ্ঠপোষক হয়ো না। (3)
(1) অর্থাৎ, নবুঅত প্রাপ্তির আগে তোমার ধারণাও ছিল না যে, তোমাকে রিসালাতের জন্য নির্বাচিত করা হবে এবং তোমার উপর আল্লাহর কিতাব অবতীর্ণ হবে।
(2) অর্থাৎ, নবুঅত ও কিতাব দান আল্লাহর বিশেষ রহমতের ফল যা তোমার উপর করা হয়েছে। এখান হতে জানা গেল যে, নবুঅত কোন উপার্জন-লভ্য জিনিস নয়, যা চেষ্টা-চরিত্র ও শ্রম ব্যয়ের মাধ্যমে অর্জন করা যেতে পারে। বরং এটি সম্পূর্ণ আল্লাহ প্রদত্ত জিনিস, আল্লাহ তাআলা নিজের বান্দাদের মধ্য হতে যাকে চেয়েছেন তাকে নবুঅত ও রিসালাত দ্বারা সম্মানিত করেছেন। পরিশেষে মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে উক্ত ধারার শেষ নবী ঘোষণা করে নবুয়তের দ্বার চিরকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছেন।
(3) এখন এই নিয়ামত ও ইলাহী অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা এইভাবে আদায় কর যে, কাফেরদের সাহায্য করবে না এবং তাদের পক্ষ অবলম্বন করবে না।