ইন্নাল্লাযী ফারদা ‘আলাইকাল কুরআ-না লারদ্দুকা ইলা-মা‘আ-দিন কুররববীআ‘লামুমান জাআ বিলহুদা-ওয়া মান হুওয়া ফী দালা-উচ্চারণ
হে নবী! নিশ্চিত জেনো, যিনি এ কুরআন তোমার ওপর ন্যস্ত করেছেন ১০৭ তিনি তোমাকে একটি উত্তম পরিণতিতে পৌঁছিয়ে দেবেন। ১০৮ তাদেরকে বলে দাও, “আমার রব ভালো করেই জানেন কে হিদায়াত নিয়ে এসেছে এবং কে প্রকাশ্য গোমরাহীতে লিপ্ত রয়েছে।” তাফহীমুল কুরআন
(হে নবী!) যেই সত্তা তোমার প্রতি এই কুরআনের দায়িত্বভার অর্পণ করেছেন, তিনি তোমাকে অবশ্যই ফিরিয়ে আনবেন (তোমার) প্রিয়ভূমিতে। #%৫৭%# বল, আমার প্রতিপালক ভালো জানেন কে হেদায়াত নিয়ে এসেছে এবং কে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে লিপ্ত।মুফতী তাকী উসমানী
যিনি তোমার জন্য কুরআনকে করেছেন বিধান তিনি তোমাকে অবশ্যই ফিরিয়ে আনবেন প্রত্যাবর্তন স্থানে। বলঃ আমার রাব্ব ভাল জানেন কে সৎ পথের নির্দেশ এনেছে এবং কে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছে।মুজিবুর রহমান
যিনি আপনার প্রতি কোরআনের বিধান পাঠিয়েছেন, তিনি অবশ্যই আপনাকে স্বদেশে ফিরিয়ে আনবেন। বলুন আমার পালনকর্তা ভাল জানেন কে হেদায়েত নিয়ে এসেছে এবং কে প্রকাশ্য বিভ্রান্তিতে আছে।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
যিনি তোমার জন্যে কুরআনকে করেছেন বিধান তিনি তোমাকে অবশ্যই ফিরিয়ে আনবেন জন্মভ‚মিতে। বল, ‘আমার প্রতিপালক ভাল জানেন কে সৎপথের নির্দেশ এনেছে এবং কে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছে।’ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
নিশ্চয় যিনি তোমার প্রতি কুরআনকে বিধানস্বরূপ দিয়েছেন, অবশ্যই তিনি তোমাকে প্রত্যাবর্তনস্থলে* ফিরিয়ে নেবেন। বল, ‘আমার রব বেশী জানেন, কে হিদায়াত নিয়ে এসেছে, আর কে রয়েছে স্পষ্ট পথভ্রষ্টতায়’।আল-বায়ান
যিনি তোমার প্রতি কুরআন বিধিবদ্ধ করেছেন তিনি অবশ্যই তোমাকে মূলভূমিতে (মাক্কায়) ফিরিয়ে আনবেন। বল, আমার প্রতিপালক ভাল করেই জানেন কে সৎপথের নির্দেশ নিয়ে এসেছে আর কে আছে সুস্পষ্ট গুমরাহীতে।তাইসিরুল
নিঃসন্দেহ যিনি তোমার উপরে কুরআন বিধান করেছেন তিনি আলবৎ তোমাকে ফিরিয়ে আনবেন প্রত্যাবর্তনস্থলে। বলো -- "আমার প্রভু ভাল জানেন কে পথনির্দেশ নিয়ে এসেছে আর কে হচ্ছে স্বয়ং সুস্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে।"মাওলানা জহুরুল হক
১০৭
অর্থাৎ এই কুরআনকে আল্লাহর বান্দাদের কাছে পৌঁছাবার, তাদেরকে এর শিক্ষা দান করার এবং এর পথনির্দেশনা অনুযায়ী বিশ্ব সংস্কার করার দায়িত্ব তোমার প্রতি অর্পণ করেছেন।
১০৮
আসল শব্দ لَرَادُّكَ إِلَى مَعَادٍ অর্থাৎ তোমাকে একটি মা’আদের দিকে পৌঁছিয়ে দেবেন। মা’আদ এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে এমন স্থান যেদিকে মানুষকে ফিরে যেতে হবে। এ শব্দটিকে অনির্দিষ্টবাচক হিসেবে ব্যবহার করার কারণে এর দ্বারা আপনা আপনি এ অর্থ বুঝানো হয় যে, এ স্থানটি বড়ই মহিমান্বিত ও মর্যাদা সম্পন্ন। কোন কোন মুফাসসির এর অর্থ করেছেন জান্নাত। কিন্তু একে শুধুমাত্র জান্নাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেয়ার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। আল্লাহ শব্দটিকে যেমন ব্যাপক অর্থে বর্ণনা করেছেন তেমনি ব্যাপক অর্থে একে ব্যবহার করাই বাঞ্ছনীয়। এর ফলে এ প্রতিশ্রুতি দুনিয়া ও আখেরাত উভয়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট হয়ে যাবে। আয়াতের পূর্ববর্তী আলোচনাও এ কথাই দাবী করে যে, একে কেবলমাত্র আখেরাতেই নয় বরং দুনিয়াতেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বিরাট শান-শওকত এবং মাহাত্ন্য ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করার প্রতিশ্রুতি মনে করা হোক। মক্কার কাফেরদের যে উক্তি নিয়ে ৫৭ আয়াত থেকে এ পর্যন্ত লাগাতার আলোচনা চলছে তাতে তারা বলেছিল, হে মুহাম্মাদ! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তুমি নিজের সাথে আমাদেরকেও নিয়ে ডুবাতে চাও। যদি আমরা তোমার সাথে সহযোগিতা করি এবং এ ধর্ম গ্রহণ করে নিই, তাহলে আরবের সরযমীনে আমাদের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। এর জবাবে আল্লাহ তাঁর নবীকে বললেন, হে নবী! যে আল্লাহ এ কুরআনের পতাকা বহন করার দায়িত্ব তোমার ওপর অর্পণ করেছেন তিনি তোমাকে ধ্বংস করে দেবেন না। বরং তিনি তোমাকে এমন উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে চান যার কল্পনাও আজ এরা করতে পারে না। আর প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ মাত্র কয়েক বছর পর নবী করীম ﷺ কে এ দুনিয়ায় এদেরই চোখের সামনে সমগ্র আরব দেশে এমন নিরংকুশ কর্তৃত্ব দান করলেন যে, তাঁকে বাঁধাদানকারী কোন শক্তিই সেখানে টিকতে পারলো না এবং তাঁর দ্বীন ছাড়া অন্য কোন দ্বীনের জন্য সেখানে কোন অবকাশই থাকলো না। আরবের ইতিহাসে এর আগে সমগ্র আরব উপদ্বীপে কোন এক ব্যক্তির একচ্ছত্র আধিপত্যের এ ধরণের কোন নজীর সৃষ্টি হয়নি, যার ফলে সারা দেশে তার কোন প্রতিদ্বন্দী থাকেনি, তার হুকুমের বিরুদ্ধে টু শব্দটি করার ক্ষমতা কেউ রাখেনি এবং লোকেরা কেবল রাজনৈতিকভাবেই তার দলভূক্ত হয়নি বরং সমস্ত দ্বীনকে বিলুপ্ত করে দিয়ে সেই এক ব্যক্তি সবাইকে তার দ্বীনের অনুসারীও করে নিয়েছে।
কোন কোন মুফাসসির এ অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, সূরা কাসাসের এ আয়াতটি মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করার সময় পথে নাযিল হয়েছিল। তাঁদের মতে এতে আল্লাহ তাঁর নবীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি আবার তাঁকে মক্কায় ফিরিয়ে আনবেন। কিন্তু প্রথমত এর শব্দাবলীর মধ্যে “মা’আদ” কে “মক্কা” অর্থে গ্রহণ করার কোন সুযোগ নেই। দ্বিতীয়ত, বিষয়বস্তু ও আভ্যন্তরীন সাক্ষ্য-প্রমাণের দিক দিয়ে বিচার করলে এ সূরাটি হচ্ছে হাব্শায় হিজরাতের নিকটবর্তী সময়ের এবং এ কথা বুঝা যাচ্ছে না যে, কয়েক বছর পর মদীনায় হিজরাতের সময় পথে যদি এ আয়াতটি নাযিল হয়ে থাকে তাহলে কোন্ সম্পর্কের ভিত্তিতে এখানে এ ধারাবাহিক আলোচনার মধ্যে একে এনে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। তৃতীয়ত, এ প্রেক্ষাপটে মক্কার দিকে নবী করীমের ﷺ ফিরে যাবার আলোচনা একেবারেই বেমানান ঠেকে। আয়াতের এ অর্থ গ্রহণ করা হলে এটা মক্কার কাফেরদের কথার জবাব হবে না বরং তাদের ওজরকে শক্তিশালী করা হবে। এর অর্থ হবে, অবশ্যই হে মক্কাবাসীরা! তোমরা ঠিকই বলছো, মুহাম্মাদ ﷺ কে এ শহর থেকে বের করে দেয়া হবে কিন্তু তিনি স্থায়ীভাবে নির্বাসিত হবেন না বরং শেষ পর্যন্ত আমি তাঁকে আবার এখানে ফিরিয়ে আনবো। এ হাদীসটি যদিও বুখারী, নাসাঈ, ইবনে জারীর ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে উদ্ধৃত করেছেন কিন্তু আসলে এটি ইবনে আব্বাসের নিজস্ব অভিমত। এটি সরাসরি রসূল ﷺ এর বক্তব্য সম্বলিত কোন মারফূ হাদীস নয় যে, একে মেনে নিতেই হবে।
কুরআন মাজীদে এ স্থলে শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে مَعَادْ যা কোন কোন মুফাসসিরের মতে عَادَةٌ থেকে নির্গত। عَادَةٌ অর্থ অভ্যাস। সে হিসেবে مَعَادْ এর অর্থ হবে এমন ভূমি, মানুষ যেখানে বসবাস করে অভ্যস্ত হয়ে গেছে ফলে তা তার প্রিয়ভূমিতে পরিণত হয়েছে। আবার অনেকের মতে এর অর্থ প্রত্যাবর্তনস্থল। উভয় অবস্থায়ই এর দ্বারা মক্কা-মুকাররমাকে বোঝানো উদ্দেশ্য। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা মুকাররমা থেকে হিজরত করে মদীনা মুনাওয়ারার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যান এবং জুহফার কাছাকাছি যেখান থেকে মক্কা মুকাররমার পথ আলাদা হয়ে গেছে সেই মোড়ে গিয়ে পৌঁছান, তখন দেশ ছেড়ে যাওয়ার বেদনা তাঁর অনুভূতিতে বড় বাজছিল। তাই আল্লাহ তাআলা তাঁকে সান্তনা দানের জন্য এ আয়াত নাযিল করেন এবং এতে ওয়াদা করেন যে, এ ভূমিতে আপনাকে একদিন বিজয়ী হিসেবে ফিরিয়ে আনা হবে। পরিশেষে আট বছরের মাথায় এ ওয়াদা পূরণ করা হয়েছিল। ঠিকই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় মাতৃভূমিতে বিজেতারূপে ফিরে আসেন। কোন কোন মুফাসসির مَعَادْ (প্রিয়ভূমি বা প্রত্যাবর্তনস্থল)-এর ব্যাখ্যা করেছেন জান্নাত। অর্থাৎ, এ দুনিয়ায় যদিও আপনাকে নানা রকম দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন হতে হচ্ছে, কিন্তু আপনার শেষ ঠিকানা তো জান্নাত। এক সময় ক্ষণস্থায়ী এ কষ্টের অবসান হবে এবং চির সুখের সেই ঠিকানায় আপনি পৌঁছে যাবেন।
৮৫. যিনি আপনার জন্য কুরআনকে করেছেন বিধান, তিনি আপনাকে অবশ্যই ফিরিয়ে নেবেন প্রত্যাবর্তনস্থলে।(১) বলুন, আমার রব ভাল জানেন কে সৎপথের নির্দেশ এনেছে আর কে স্পষ্ট বিভ্ৰান্তিতে আছে।
(১) বলা হয়েছে, যে পবিত্র সত্তা আপনার প্রতি কুরআন ফরয করেছেন, বিধান হিসেবে দিয়েছেন তথা তিলাওয়াত, প্রচার ও মেনে চলা ফরয করেছেন, তিনি পুনরায় আপনাকে ‘মা’আদে’ ফিরিয়ে নিবেন। কোন কোন মুফাসসিরের মতে, এখানে ‘মা’আদ’ বলে আখেরাতের জান্নাত বোঝানো হয়েছে। কারণ, যিনি আপনার প্রতি বিধান নাযিল করেছেন, হালাল ও হারামের ব্যাখ্যা স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন তিনি আপনাকে ও আপনার অনুসরণ যারা করবে, তাদেরকে তাদের কর্মকাণ্ডের সঠিক প্রতিফল জান্নাত অবশ্যই প্ৰদান করবেন। (সা'দী) কোন কোন মুফাসসিরের মতে, এখানে ‘মা'আদ’ বলে মক্কা নগরীকে বোঝানো হয়েছে। (জালালাইন)
উদ্দেশ্য এই যে, কিছু দিনের জন্যে আপনাকে প্রিয় জন্মভূমি হারাম ও বায়তুল্লাহকে ত্যাগ করতে হয়েছে, কিন্তু যিনি কুরআন নাযিল করেছেন এবং তা মেনে চলা ফরয করেছেন তিনি অবশেষে আপনাকে আবার মক্কায় ফিরিয়ে আনবেন। মূলতঃ এটা ছিল মক্কা বিজয়ের সুসংবাদ। মক্কার কাফেররা তাকে বিব্রত করেছে, তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছে এবং মক্কায় মুসলিমদের জীবন দুঃসহ করেছে, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁর চিরন্তন রীতি অনুযায়ী তাঁর রাসূলকে সবার উপর বিজয় ও প্রাধান্য দান করেছেন এবং যে মক্কা হতে কাফেররা তাকে বহিষ্কার করেছিল, সেই মক্কায় পুনরায় তাঁর পুরোপুরি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
(৮৫) যিনি তোমার জন্য কুরআন (অবতীর্ণ) অপরিহার্য করেছেন(1) তিনি তোমাকে অবশ্যই স্বদেশে ফিরিয়ে আনবেন।(2) বল, ‘আমার প্রতিপালক ভাল জানেন কে সৎপথের নির্দেশ এনেছে এবং কে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছে।’ (3)
(1) অথবা তার তিলাঅত ও প্রচার তোমার উপর আবশ্যিক করেছেন।
(2) অর্থাৎ, তোমার জন্মস্থান মক্কায় ফিরিয়ে আনবেন, যেখান হতে তুমি বের হতে বাধ্য হয়েছিলে। সহীহ বুখারীতে ইবনে আববাস (রাঃ) হতে এই ব্যাখ্যাই বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং হিজরতের আট বছর পর আল্লাহর উক্ত প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়েছিল। তিনি অষ্টম হিজরীতে বিজয়ীর বেশে মক্কায় দ্বিতীয়বার প্রবেশ করেন। কেউ কেউ مَعَاد এর অর্থ কিয়ামত নিয়েছেন। অর্থাৎ, কিয়ামত দিবসে তিনি তাঁর নিকটে তোমাকে ফিরিয়ে আনবেন এবং রিসালাত ও কুরআন প্রচারের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন।
(3) মুশরিকরা নবী (সাঃ)-কে পূর্ব-পুরুষদের ধর্ম ত্যাগ করার জন্য পথভ্রষ্ট মনে করত। তারই উত্তর এই বাক্যে দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, আমার প্রভু খুব ভাল জানেন যে, পথভ্রষ্ট আমি, যে আল্লাহর নিকট হতে সুপথ নিয়ে এসেছে, নাকি তোমরা, যারা আল্লাহ প্রদত্ত সুপথ গ্রহণ কর না।