ওয়া লাকাদ খালাকনা-ফাওকাকুম ছাব‘আ তারইকা ওয়ামা-কুন্না-‘আনিল খালকিগা-ফিলীন।উচ্চারণ
আর তোমাদের ওপর আমি সাতটি পথ নির্মাণ করেছি, ১৫ সৃষ্টিকর্ম আমার মোটেই অজানা ছিল না। ১৬ তাফহীমুল কুরআন
আমি তোমাদের উপর সৃষ্টি করেছি সাত স্তরবিশিষ্ট পথ। আর সৃষ্টি সম্বন্ধে আমি উদাসীন নই। #%১৪%# মুফতী তাকী উসমানী
আমিতো তোমাদের উর্ধ্বে সৃষ্টি করেছি সপ্ত স্তর এবং আমি সৃষ্টি বিষয়ে অসতর্ক নই।মুজিবুর রহমান
আমি তোমাদের উপর সুপ্তপথ সৃষ্টি করেছি এবং আমি সৃষ্টি সম্বন্ধে অনবধান নই।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
আমি তো তোমাদের ঊর্ধ্বে সৃষ্টি করেছি সপ্তস্তর এবং আমি সৃষ্টি বিষয়ে অসতর্ক নই, ইসলামিক ফাউন্ডেশন
আর অবশ্যই আমি তোমাদের উপর সাতটি স্তর সৃষ্টি করেছি। আর আমি সৃষ্টি সম্পর্কে উদাসীন ছিলাম না।আল-বায়ান
আমি তোমাদের উপরে সপ্ত স্তর সৃষ্টি করেছি, আমি (আমার) সৃষ্টির ব্যাপারে অমনোযোগী নই।তাইসিরুল
আর আমরা নিশ্চয়ই তোমাদের উপরে সৃষ্টি করেছি সাতটি পথ, আর সৃষ্টি সন্বন্ধে আমরা কখনও উদাসীন নই।মাওলানা জহুরুল হক
১৫
মূলে طَرَائِقَ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর মানে পথও হয় আবার স্তরও হয়। যদি প্রথম অর্থটি গ্রহণ করা হয় তাহলে সম্ভবত এর অর্থ হবে সাতটি গ্রহের আবর্তন পথ। আর যেহেতু সে যুগে মানুষ সাতটি গ্রহ সম্পর্কেই জানতো তাই সাতটি পথের কথা বলা হয়েছে। এর মানে অবশ্যই এ নয় যে এগুলো ছাড়া আর কোন পথ নেই। আর যদি দ্বিতীয় অর্থটি গ্রহণ করা হয় তাহলে سَبْعَ طَرَائِقَ এর অর্থ তাই হবে যা سَبْعَ سَمَاوَاتٍ طِبَاقًا (সাতটি আকাশ স্তরে স্তরে) এর অর্থ হয়। আর এই সঙ্গে যে বলা হয়েছে “তোমাদের ওপর” আমি সাতটি পথ নির্মাণ করেছি, এর একটি সহজ-সরল অর্থ হবে তাই যা এর বাহ্যিক শব্দগুলো থেকে বুঝা যায়। আর দ্বিতীয় অর্থটি হবে, তোমাদের চাইতে বড় জিনিস আমি নির্মাণ করেছি এ আকাশ। যেমন অন্যত্র বলা হয়েছেঃ
لَخَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَكْبَرُ مِنْ خَلْقِ النَّاسِ
“আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করা মানুষ সৃষ্টি করার চাইতে অনেক বড় কাজ।”
(আল মু’মিন, ৫৭ আয়াত)
১৬
অন্য একটি অনুবাদ এভাবে করা যেতে পারে, “আর সৃষ্টিকূলের পক্ষ থেকে আমি গাফিল ছিলাম না অথবা নই।” মূল বাক্যে যে গ্রহণ করা হয়েছে তার প্রেক্ষিতে আয়াতের অর্থ হয়ঃ এসব কিছু যা আমি বানিয়েছি এগুলো এমনি হঠাৎ কোন আনাড়ির হাত দিয়ে আন্দাজে তৈরী হয়ে যায়নি। বরং একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা অনুযায়ী পূর্ণ জ্ঞান সহকারে প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আইন সক্রিয় রয়েছে। সমগ্র বিশ্বজাহানের ছোট থেকে নিয়ে বড় পর্যন্ত সবকিছুর মধ্যে একটি পূর্ণ সামঞ্জস্য রয়েছে। এ বিশাল কর্ম জগতে ও বিশ্ব-জগতের এ সুবিশাল কারখানায় সব দিকেই একটি উদ্দেশ্যমুখিতা দেখা যাচ্ছে। এসব স্রষ্টার জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রমাণ পেশ করছে। দ্বিতীয় অনুবাদটি গ্রহণ করলে এর অর্থ হবেঃ এ বিশ্ব-জাহানে আমি যা কিছুই সৃষ্টি করেছি তাদের কারোর কোন প্রয়োজন থেকে আমি কখনো গাফিল এবং কোন অবস্থা থেকে কখনো বেখবর থাকিনি। কোন জিনিসকে আমি নিজের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে তৈরী হতে ও চলতে দেইনি। কোন জিনিসের প্রাকৃতিক প্রয়োজন সরবরাহ করতে আমি কখনো কুন্ঠিত হইনি। প্রত্যেকটি বিন্দু, বালুকণা ও পত্র-পল্লবের অবস্থা আমি অবগত থেকেছি।
‘অন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তুলি’ অর্থাৎ তারপর তার মধ্যে রূহ ফুকে দেই। ফলে সে এক জ্যান্ত-জাগ্রত মানুষে পরিণত হয়। ছিল জড়, হয়ে গেল প্রাণবন্ত, ছিল মূক হয়ে গেল সবাক, এমনিভাবে হয়ে গেল দ্রষ্টা, শ্রোতা এবং আরও কত কি! তারপর তার মধ্যে শৈশব, কৈশোর , যৌবন, বার্ধক্যের নানাবিধ অবস্থান্তর ঘটে। -অনুবাদক
১৭. আর অবশ্যই আমরা তোমাদের ঊর্ধ্বে সৃষ্টি করেছি সাতটি আসমান(১) এবং আমরা সৃষ্টি বিষয়ে মোটেই উদাসীন নই(২),
(১) মানুষ সৃষ্টির কথা আলোচনা করার পর সাত আসমান সৃষ্টি করার আলোচনা করা হচ্ছে। সাধারণত: যখনই আল্লাহ আসমান যমীনের সৃষ্টির কথা আলোচনা করেন, তখনই মানুষ সৃষ্টির কথা আলোচনা করেন। যেমন, আল্লাহ বলেন, “মানুষ সৃষ্টি অপেক্ষা আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি অবশ্যই বড় বিষয়, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।” (সূরা গাফির: ৫৭) অনুরূপভাবে সূরা আস-সাজদাহ এর ৪–৯ আয়াতসমূহ। (ইবন কাসীর) আকাশ সৃষ্টির আলোচনায় বলা হয়েছে যে, “আমরা তো তোমাদের ঊর্ধ্বে সৃষ্টি করেছি সাতটি طرائق। এ طرائق শব্দটি طريقة শব্দের বহুবচন। এর মানে পথও হয় আবার স্তরও হয়। (কুরতুবী) যদি প্রথম অর্থটি গ্রহণ করা হয় এখানে রাস্তা বলতে ফেরেশতাদের চলাচলের পথ বুঝানো হয়েছে।
কারণ, সবগুলো আসমান বিধানাবলী নিয়ে যমীনে যাতায়াতকারী ফেরেশতাদের পথ। (বাগভী; কুরতুবী) আর যদি দ্বিতীয় অর্থাটি গ্রহণ করা হয় তাহলে طرائق এর অর্থ তাই হবে যা (سَبْعَ سَمَاوَاتٍ طِبَاقًا) বা সাতটি আকাশ স্তরে স্তরে (সূরা আল-মুলক: ৩; নূহ: ১৫) এর অর্থ হয়। অর্থাৎ স্তরে স্তরে সাত আসমান তোমাদের ঊর্ধ্বে সৃষ্টি করা হয়েছে, এর দ্বারা যেন এ কথা বলাই উদ্দেশ্য যে, তোমাদের চাইতে বড় জিনিস আমি নির্মাণ করেছি সেটা হলো, এ আকাশ। মুজাহিদ বলেন, এখানে সাত আসমানই বলা উদ্দেশ্য। যেমন অন্য আয়াতে এসেছে, “সাত আসমান ও যমীন এবং এগুলোর অন্তর্বতী সব কিছু তারই পবিত্ৰতা ও মহিমা ঘোষণা করে”। (সূরা আল-ইসরা: ৪৪) (ইবন কাসীর)
(২) এর অর্থ আমি যা কিছুই সৃষ্টি করেছি। তাদের কারোর কোন প্রয়োজন থেকে আমি কখনো গাফিল এবং কোন অবস্থা থেকে কখনো বেখবর থাকিনি। প্রত্যেকটি বিন্দু, বালুকণা ও পত্র-পল্লবের অবস্থা আমি অবগত থেকেছি। আমি মানুষকে শুধু সৃষ্টি করেই ছেড়ে দেইনি। আমি তাদের ব্যাপারে বেখবরও হতে পারি না; বরং তাদের পালন, বসবাস ও সুখের সরঞ্জামও সরবরাহ করেছি। আকাশ সৃষ্টি দ্বারা এ কাজের সূচনা হয়েছে। এরপর আকাশ থেকে বারিবর্ষণ করে মানুষের জন্যে খাদ্য ও ফল-ফুল দ্বারা সুখের সরঞ্জাম সৃষ্টি করেছি। (দেখুন, কুরতুবী)
অথবা আয়াতের অর্থ, আমি আমার সৃষ্টি সম্পর্কে কখনো গাফেল নই। আমি আমার সৃষ্টির সবকিছু জানি। যমীনে যা প্রবেশ করে, যমীন থেকে যা বের হয়, আকাশ থেকে যা নাযিল হয়, যা আকাশে উঠে, তিনি সবই জানেন। তোমরা যেখানেই থাক সেখানেই তোমরা তাঁর জ্ঞানের আওতাভুক্ত। আর তোমরা যা আমল কর আল্লাহ তা সম্যক দেখছেন। তিনি এমন এক সত্তা, কোন আসমান অপর আসমানের, কোন যমীন অপর যমীনের মধ্যে তার দৃষ্টিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। কোন পাহাড়ের কঠিন স্থানে, কোন সমুদ্রের গভীর কোণে কি আছে সবই তাঁর জানা। পাহাড়ে, টিলায়, বালু, সমুদ্রে, মরুভূমিতে, গাছে কি আছে আর পরিমাণ কত সবই তিনি জানেন। (ইবন কাসীর) আল্লাহ বলেন, “স্থল ও সমুদ্রের অন্ধকারসমূহে যা কিছু আছে তা তিনিই অবগত, তাঁর অজানায় একটি পাতাও পড়ে না। মাটির অন্ধকারে এমন কোন শস্যকণাও অংকুরিত হয় না বা রসাযুক্ত কিংবা শুস্ক এমন কোন বস্তু নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই।” (সূরা আল-আনআমঃ ৫৯)
(১৭) নিশ্চয় আমি তোমাদের ঊর্ধ্বে সৃষ্টি করেছি সপ্ত স্তর(1) এবং আমি সৃষ্টি বিষয়ে অসতর্ক নই। (2)
(1) طَرائِق শব্দটি طَرِيقَة এর বহুবচন। যার ভাবার্থঃ আকাশ। আরবের লোকেরা উপরের জিনিসকে طَرِيقَة বলে থাকে। আর আকাশ যেহেতু উপরে সেই জন্য তাকেও طَرائِق বলা হয়েছে। অথবা طَرِيقَة এর অর্থ পথ। যেহেতু আকাশ ফিরিশতাদের যাতায়াতের পথ বা গ্রহ-নক্ষত্রের গমনাগমনের পথ (ছায়াপথ)। সেই জন্য তাকে طَرائِق বলে অভিহিত করা হয়েছে।
(2) خَلق (সৃষ্টি) থেকে উদ্দেশ্য مَخلُوق (সৃষ্ট)। অর্থাৎ, আসমান সৃষ্টি করার পর পৃথিবীর সৃষ্টি বিষয়ে উদাসীন হয়ে যাইনি। বরং আমি আসমানকে যমীনের উপর ভেঙ্গে পড়া হতে সুরক্ষিত রেখেছি; যাতে সৃষ্টিজগৎ ধ্বংস হয়ে না যায়। অথবা অর্থ এই যে, আমি সৃষ্টি জগতের কল্যাণ ও প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে উদাসীন নই; বরং আমি তার ব্যবস্থা করে থাকি। (ফাতহুল কাদীর) আবার কেউ বলেন যে, এর অর্থ হল পৃথিবী হতে যা কিছু উদগত হয় বা যা কিছু তাতে প্রবেশ করে এবং এমনিভাবে আকাশ হতে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং যা কিছু উপরে চড়ে সব কিছুর জ্ঞান আল্লাহর রয়েছে। প্রতিটি জিনিস তিনি প্রত্যক্ষ করছেন এবং নিজ জ্ঞান দ্বারা সর্বত্র তোমাদের সাথে রয়েছেন। (ইবনে কাসীর)