وَعَلَّمۡنَٰهُ صَنۡعَةَ لَبُوسٖ لَّكُمۡ لِتُحۡصِنَكُم مِّنۢ بَأۡسِكُمۡۖ فَهَلۡ أَنتُمۡ شَٰكِرُونَ

ওয়া ‘আল্লামনা-হু সান‘আতা লাবূছিল লাকুম লিতুহছিনাকুম মিম বা’ছিকুম ফাহাল আনতুম শা-কিরূন।উচ্চারণ

আর আমি তাঁকে তোমাদের উপকারার্থে বর্ম নির্মাণ শিল্প শিখিয়েছিলাম, যাতে তোমাদেরকে পরস্পরের আঘাত থেকে রক্ষা করে, ৭২ তাহলে কি তোমরা কৃতজ্ঞ হবে? ৭৩ তাফহীমুল কুরআন

তোমাদের কল্যাণার্থে তাকে শিক্ষা দিয়েছিলাম সামরিক পোশাক (বর্ম) তৈরির কারিগরি, যাতে যুদ্ধকালে তা তোমাদেরকে পারস্পরিক আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। #%৩৮%# এবার বল, তোমরা কৃতজ্ঞ হবে কি?মুফতী তাকী উসমানী

আমি তাকে তোমাদের জন্য বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম যাতে ওটা তোমাদের যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে; সুতরাং তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবেনা?মুজিবুর রহমান

আমি তাঁকে তোমাদের জন্যে বর্ম নির্মান শিক্ষা দিয়েছিলাম, যাতে তা যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে। অতএব তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে?মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

আর আমি তাকে তোমাদের জন্যে বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম, যাতে তা তোমাদের যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে ; সুতরাং তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে না? ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আর আমিই তাকে তোমাদের জন্য বর্ম বানানো শিক্ষা দিয়েছিলাম। যাতে তা যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করতে পারে। সুতরাং তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে?আল-বায়ান

আমিই তাকে বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম তোমাদের উপকারে তোমাদের পারস্পরিক যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করার জন্য, কাজেই তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে?তাইসিরুল

আর আমরা তাঁকে শিখিয়েছিলাম তোমাদের জন্য বর্ম তৈরি করতে যেন তা তোমাদের রক্ষা করতে পারে তো মাদের যুদ্ধবিগ্রহে। তোমরা কি তবে কৃতজ্ঞ হবে না?মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

৭২

সূরা সাবায় এর ওপর আরো বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছেঃ

وَأَلَنَّا لَهُ الْحَدِيدَ - أَنِ اعْمَلْ سَابِغَاتٍ وَقَدِّرْ فِي السَّرْدِ

“আর আমি তার জন্য লোহা নরম করে দিয়েছি (এবং তাকে নির্দেশ দিয়েছি) যে, পূর্ণমাপের বর্ম তৈরী করো এবং বুনন করার ক্ষেত্রে যথাযথ পরিমাণ রক্ষা করো।”

এ থেকে জানা যায়, আল্লাহ হযরত দাউদকে লোহা ব্যবহার করার ক্ষমতা দান করেছিলেন। বিশেষ করে যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য বর্ম নির্মাণের কায়দা-কৌশল শিখিয়ে দিয়েছিলেন। বর্তমান যুগের ঐতিহাসিক ও প্রত্মতাত্বিক গবেষণা ও অনুসন্ধান থেকে এ আয়াতের অর্থের ওপর যে আলোকপাত হয় তা হচ্ছে এই যে, পৃথিবীতে লৌহ যুগ (Iron age) শুরু হয় খৃস্টপূর্ব ১২০০ ও ১০০০ অব্দের মাঝামাঝি সময়ে। আর এটিই ছিল হযরত দাউদ আলাইহিস সালামের যুগ। প্রথম দিকে সিরিয়া ও এশিয়া মাইনরের হিত্তী (Hittites) জাতি লোহা ব্যবহার করে। ২০০০ থেকে ১২০০ খৃস্ট পূবাব্দ পর্যন্ত এ জাতির উত্থান দেখা যায়। তারা লোহা গলাবার ও নির্মাণের একটা জটিল পদ্ধতি জানতো। সারা দুনিয়ার দৃষ্টি থেকে তারা একে কঠোরভাবে গোপন রাখে। কিন্তু এ পদ্ধতিতে যে লোহা তৈরী করা হতো তা সোনা রূপার মতো এত বেশী মূল্যবান হতো যে, তা সাধারণ কাজে ব্যবহার করা যেতো না। পরে ফিলিস্তিনীরা এ পদ্ধতি জেনে নেয় এবং তারাও আকে গোপন রাখে। তালূতের রাজত্বের পূর্বে হিত্তী ও ফিলিস্তিনীরা বনী ইসরাঈলকে যেভাবে উপর্যুপরি পরাজিত করে ফিলিস্তীন থেকে প্রায় বেদখল করে দিয়েছিল বাইবেলের বর্ণনা মতে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল এই যে, তারা লোহার রথ ব্যবহার করতো এবং তাদের কাছে লোহার তৈরী অন্যান্য অস্ত্রও থাকতো। (যিহোশূয় ১৭: ১৬ বিচারকর্তৃগণ ১: ১৯, ৪: ২-৩) খৃস্টপূর্ব ১০২০ অব্দে তালূত যখন আল্লাহর হুকুমে বনী ইসরাঈলদের শাসক পদে অধিষ্ঠিত হন তখন তিনি তাদেরকে পরপর কয়েকবার পরাজিত করে ফিলিস্তীনের বেশীর ভাগ অংশ তাদের কাছ থেকে ফিরিয়ে নেন। তারপর হযরত দাউদ (১০০৪-৯৬৫ খৃঃ পূঃ) শুধুমাত্র ফিলিস্তীন ও ট্রান্স জর্দানই নয় বরং সিরিয়ারও বড় অংশে ইসরাঈলী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এ সময় লৌহ নির্মাণ শিল্পের যে গোপন কলাকৌশল হিত্তী ও ফিলিস্তীনদের নিয়ন্ত্রণে ছিল তা উন্মোচিত হয়ে যায় এবং কেবলমাত্র উন্মোচিত হয়েই থেমে যায়নি বরং লৌহ নির্মাণের এমন পদ্ধতিও উদ্ভাবিত হয় যার ফলে সাধারণ ব্যবহারের জন্য লোহার কম দামের জিনিসপত্রও তৈরী হতে থাকে। ফিলিস্তীনের দক্ষিণে আদূম এলাকা আকরিক লোহায় (Iron Ore) সমৃদ্ধ ছিল। সম্প্রতি এ এলাকায় যে প্রত্মতাত্বিক খননকার্য চালানো হয় তার ফলে এমন অনেক জায়গার প্রত্মতাত্বিক নিদর্শনসমূহ পাওয়া গেছে যেখানে লোহা গলাবার চুল্লী বসানো ছিল। আকাবা ও আইলার সাথে সংযুক্ত হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালামের জামানার বন্দর ইসয়ুন জাবেরের প্রাচীন নিদর্শনগুলোর মধ্যে যে চুল্লী পাওয়া গেছে তা পর্যবেক্ষণের পরে অনুমান করা হয়েছে যে, তার মধ্যে এমনসব পদ্ধতি প্রয়োগ করা হতো যা আজকের অত্যাধুনিক যুগের Blast Furnace এ প্রয়োগ করা হয়। এখন স্বাভাবিকভাবেই হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম সবার আগে ও সবচেয়ে বেশী করে এ নতুন আবিষ্কারকে যুদ্ধের প্রয়োজনে ব্যবহার করে থাকবেন। কারণ কিছুকাল আগেই আশপাশের শত্রু জাতিরা এ লোহার অস্ত্র ব্যবহার করে তাঁর জাতির জীবন ধারণ কঠিন করে দিয়েছিল।

৭৩

হযরত দাউদ সম্পর্কে আরো বেশী জানার জন্য দেখুন সূরা আল-বাকারাহ ২৫১ আয়াত ও বনী ইসরাঈল ৭, ৬৩ টীকা)

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

সূরা সাবায় আছে (৩৪ : ১০) আল্লাহ তাআলা তাঁর হাতে লোহাকে নমনীয় করে দিয়েছিলেন। এটা ছিল হযরত দাঊদ আলাইহিস সালামের একটি মুজিযা। তিনি লোহাকে যেভাবে চাইতেন ঘুরাতে-বাঁকাতে পারতেন। তিনি লোহা দ্বারা এমন নিখুঁত ও পরিমাপ মত বর্ম তৈরি করতে পারতেন, যার অংশসমূহ পরস্পর সুসমঞ্জস হত। উলামায়ে কেরাম এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন, এর দ্বারা ইশারা পাওয়া যায়, মানুষের উপকারে আসে এমন যে-কোন শিল্প ও কারিগরি বিদ্যা ইসলামে প্রশংসনীয়।

তাফসীরে জাকারিয়া

৮০. আর আমরা তাকে তোমাদের জন্য বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম(১), যাতে তা তোমাদের যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে; কাজেই তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে?

(১) এখানে লৌহবর্ম বোঝানো হয়েছে, যা যুদ্ধে হেফাযতের জন্যে ব্যবহৃত হয়। অন্য এক আয়াতে আছেঃ “আমরা দাউদের জন্যে লোহা নরম করে দিয়েছিলাম।” (সূরা সাবাঃ ১০) আলোচ্য আয়াতে বর্ম নির্মাণ শিল্প দাউদ আলাইহিস সালামকে শেখানোর কথা উল্লেখ করার সাথে সাথে এর রহস্যও বলে দেয়া হয়েছে যে, “যাতে এই বর্ম তোমাদেরকে যুদ্ধে (সুতীক্ষ তরবারির আঘাত থেকে) হেফাযত করে।” এই প্রয়োজন থেকে দ্বীনদার হোক কিংবা দুনিয়াদার কেউই মুক্ত নয়। তাই এই শিল্প শিক্ষা দেয়াকে আল্লাহ তা'আলা নেয়ামত আখ্যা দিয়েছেন। এ থেকে জানা গেল যে, যে শিল্পের মাধ্যমে মানুষের প্রয়োজন সম্পন্ন হয়, তা শিক্ষা দেয়া সওয়াবের কাজ; তবে জনসেবার নিয়ত থাকা এবং শুধু উপার্জন লক্ষ্য না হওয়া শর্ত। নবী-রাসূলগণ বিভিন্ন প্রকার শিল্পকর্ম নিজেরা সম্পন্ন করেছেন বলে কুরআন ও বিভিন্ন সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে। (দেখুন: কুরতুবী)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(৮০) আমি তাকে তোমাদের জন্য বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম, যাতে ওটা তোমাদের যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে;(1) সুতরাং তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে না?

(1) অর্থাৎ, আমি লোহাকে দাঊদের জন্য নরম বানিয়ে দিয়েছিলাম; যা দিয়ে সে যুদ্ধের পোশাক লৌহবর্ম তৈরী করত, যা তোমাদেরকে যুদ্ধে আঘাত থেকে সুরক্ষা ও নিরাপত্তা দান করে থাকে। কাতাদা (রঃ) বলেন, দাঊদ (আঃ)-এর আগে বর্ম তৈরী হত; কিন্তু তা হত স্বাভাবিক পাতের, কড়া ও শিকলহীন। দাঊদ (আঃ) সর্বপ্রথম কড়া ও শিকলবিশিষ্ট বর্ম তৈরী করেন। (ইবনে কাসীর)