ফাফাহহামনা-হা-ছুলাইমা-না ওয়া কুল্লান আ-তাইনা-হুকমাও ওয়া ‘ইলমাওঁ ওয়া ছাখখারনা-মা‘আ দা-ঊদাল জিবা-লা ইউছাব্বিহনা ওয়াততাইর ওয়া কুন্না-ফা‘ইলীন ।উচ্চারণ
সে সময় আমি সুলাইমানকে সঠিক ফায়সালা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম, অথচ প্রজ্ঞা ও জ্ঞান আমি উভয়কেই দান করেছিলাম। ৭০ দাউদের সাথে আমি পর্বতরাজী ও পক্ষীকূলকে অনুগত করে দিয়েছিলাম, যারা পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতো, ৭১ এ কাজের কর্তা আমিই ছিলাম। তাফহীমুল কুরআন
আমি সুলায়মানকে সে ফায়সালার বিষয়টি বুঝিয়ে দিয়েছিলাম এবং (এমনিতে তো) আমি উভয়কেই হিকমত ও ইলম দান করেছিলাম। #%৩৬%# আমি পর্বতসমূহকে দাঊদের অধীন করে দিয়েছিলাম, যাতে তারা পাখিদেরকে সাথে নিয়ে তাসবীহরত থাকে। #%৩৭%# এসব কিছুর কর্তা ছিলাম আমিই।মুফতী তাকী উসমানী
এবং আমি সুলাইমানকে এ বিষয়ের মীমাংসা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম এবং তাদের প্রত্যেককে আমি দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান। আমি পর্বত ও বিহঙ্গকূলের জন্য নিয়ম করে দিয়েছিলাম যেন ওরা দাউদের সাথে আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে; এ সমস্ত আমিই করেছিলাম।মুজিবুর রহমান
অতঃপর আমি সুলায়মানকে সে ফায়সালা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম এবং আমি উভয়কে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দিয়েছিলাম। আমি পর্বত ও পক্ষীসমূহকে দাউদের অনুগত করে দিয়েছিলাম; তারা আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করত। এই সমস্ত আমিই করেছিলাম।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
এবং আমি সুলায়মানকে এ বিষয়ের মীমাংসা বুঝাইয়া দিয়েছিলাম এবং তাদের প্রত্যেককে আমি দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান। আমি পর্বত ও বিহঙ্গকুলকে অধীন করে দিয়েছিলাম-এরা দাঊদের সঙ্গে আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করত ; আমিই ছিলাম এই সমস্তের কর্তা। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
অতঃপর আমি এ বিষয়ের ফয়সালা সুলায়মানকে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। আর আমি তাদের প্রত্যেককেই দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান। আর আমি পর্বতমালা ও পাখীদেরকে দাঊদের অধীন করে দিয়েছিলাম, তারা দাঊদের সাথে আমার তাসবীহ পাঠ করত। আর এসবকিছু আমিই করছিলাম।আল-বায়ান
আমি সুলায়মানকে এ বিষয়ের (সঠিক) বুঝ দিয়েছিলাম আর (তাদের) প্রত্যেককে আমি দিয়েছিলাম বিচারশক্তি ও জ্ঞান। আমি পর্বত ও পাখীদেরকে দাঊদের অধীন ক’রে দিয়েছিলাম, তারা দাঊদের সাথে আমার মাহাত্ম্য ও পবিত্রতা ঘোষণা করত। (এসব) আমিই করতাম।তাইসিরুল
আর আমরা সুলাইমানকে এটি বুঝতে দিয়েছিলাম। আর উভয়কেই আমরা দিয়েছিলাম বিচার-বিবেচনা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান, আর আমরা দাউদের সঙ্গে পাহাড়-পর্বতকে ও পাখিগুলোকে মহিমা ঘোষণায় অনুগত করেছিলাম। আর আমরাই কার্যকর্তা।মাওলানা জহুরুল হক
৭০
বাইবেলে এ ঘটনাটি উল্লেখ করা হয়নি। ইহুদী সাহিত্যেও আমরা এর কোন চিহ্ন দেখি না। মুসলমান তাফসীরকারগণ এর যে ব্যাখ্যা করেছেন তা হচ্ছে এই যে, এক ব্যক্তির শস্যক্ষেতে অন্য এক ব্যক্তির ছাগলগুলো রাতের বেলা ঢুকে পড়ে। সে হযরত দাউদের কাছে অভিযোগ করে। তিনি দ্বিতীয় ব্যক্তির ছাগলগুলো ছিনিয়ে নিয়ে প্রথম ব্যক্তিকে দিয়ে দেবার ফায়সালা শুনিয়ে দেন। হযরত সুলায়মান এ ব্যাপারে ভিন্ন মত প্রকাশ করেন। তিনি রায় দেন, ছাগলগুলো ততদিন পর্যন্ত ক্ষেতের মালিকের কাছে থাকবে যতদিন না সে আবার নিজের ক্ষেত শস্যে পূর্ণ করে নিতে পারে। এ সম্পর্কেই আল্লাহ বলছেন, সুলায়মানকে এ ফায়সালাটি আমিই বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু যেহেতু মোকাদ্দামার এ বিস্তারিত বিবরণ কুরআনে বর্ণিত হয়নি এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন হাদীসেও এ বিবরণ আসেনি তাই একথা বলা যেতে পারে না যে, এ ধরনের মামলায় এটিই ইসলামী শরীয়াতের প্রমাণ্য আইন। এ কারণেই হানাফী, শাফেয়ী, মালিকী ও অন্যান্য ইসলামী ফকীহগণের মধ্যে এ ব্যাপারে মতবিরোধ হয়েছে যে, যদি কারো ক্ষেত অন্যের পশু দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে তাকে কোন ক্ষতিপূরণ দিতে হবে কিনা এবং দিতে হলে কোন অবস্থায় হবে এবং কোন অবস্থায় হবে না তাছাড়া কিভাবে এ ক্ষতিপূরণ করা হবে?
এ প্রেক্ষাপটে হযরত দাউদ (আ) ও হযরত সুলায়মানের (আ) এ বিশেষ ঘটনাটি বর্ণনা করার উদ্দেশ্য হচ্ছে একথা বুঝিয়ে দেয়া যে, নবীগণ নবী হবার এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে অসাধারণ শক্তি ও যোগ্যতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও মানুষই হতেন। আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার সামান্যতম গন্ধও তাদের মধ্যে থাকতো না। এ মোকাদ্দমার ব্যাপারে অহীর মাধ্যমে হযরত দাউদকে সাহায্য করা হয়নি। ফলে তিনি ফায়সালা করার ব্যাপারে ভুলের শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে হযরত সুলায়মানকে অহীর মাধ্যমে সাহায্য করা হয়েছে, ফলে তিনি সঠিক ফায়সালা দিয়েছেন। অথচ দু’জনই নবী ছিলেন। সামনের দিকে এ উভয় নবীর যেসব দক্ষতার বর্ণনা দেয়া হয়েছে তাও একথা বুঝাবার জন্য যে, এসব আল্লাহ প্রদত্ত দক্ষতা এবং এ ধরনের দক্ষতার কারণে কেউ আল্লাহর সমকক্ষ হয়ে যায় না।
এ আয়াত থেকে পরোক্ষভাবে ন্যায়বিচারের এ মূলনীতিও জানা যায় যে, দু’জন বিচারপতি যদি একটি মোকাদ্দমার ফায়সালা করে এবং দু’জনের ফায়সালা বিভিন্ন হয়, তাহলে যদিও একজনের ফায়সালাই সঠিক হবে তবুও দু’জনেই ন্যায়বিচারক বিবেচিত হবেন। তবে এখানে শর্ত হচ্ছে বিচার করার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা উভয়ের মধ্যে থাকতে হবে। তাদের কেউ যেন অজ্ঞতা ও অনভিজ্ঞতা সহকারে বিচারকের আসনে বসে না যান। নবী ﷺ হাদীসে একথা আরো বেশী সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করে দিয়েছেন। বুখারীতে আমর ইবনুল আস (রা) বর্ণনা করেছেন, নবী ﷺ বলেছেনঃ
إِذَا اجْتَهَدَ الْحَاكِمُ فَأَصَابَ فله اجران و إِذَا اجْتَهَدَ فأَخْطَأَ فله اجر
“যদি বিচারক নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ফায়সালা করার পূর্ণ প্রচেষ্টা চালান, তাহলে সঠিক ফায়সালা করার ক্ষেত্রে তিনি দু’টি প্রতিদান পাবেন এবং ভুল ফায়সালা করলে পাবেন একটি প্রতিদান।”
আবু দাউদ ও ইবনে মাজায় বুরাইদার (রা.) রেওয়ায়াত বর্ণিত হয়েছে। সেখানে নবী (সা.) বলেছেনঃ “বিচারক তিন প্রকারের। এদের একজন জান্নাতী এবং দু’জন জাহান্নামী। জান্নাতের অধিকারী হচ্ছেন এমন বিচারক, যিনি সত্য চিহ্নিত করতে পারলে সে অনুযায়ী ফায়সালা দেন। কিন্তু যে ব্যক্তি সত্য চিহ্নিত করার পরও সত্য বিরোধী ফায়সালা দেয় সে জাহান্নামী। আর অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি জ্ঞান ছাড়াই লোকদের মোকদ্দমার ফায়সালা করতে বসে যায় সেও জাহান্নামী।
৭১
মূলে مَعَ دَاوُودَ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, لداؤد বলা হয়নি। অর্থাৎ “দাউদ আলাইহিস সালামের জন্য” নয় বরং “তাঁর সাথে” পাহাড় ও পাখীদেরকে অনুগত করা হয়েছিল এবং সে কারণে তারাও হযরত দাউদের (আ) সাথে আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করতো। একথাটিই সূরা সাদ-এ বলা হয়েছেঃ
إِنَّا سَخَّرْنَا الْجِبَالَ مَعَهُ يُسَبِّحْنَ بِالْعَشِيِّ وَالْإِشْرَاقِ - وَالطَّيْرَ مَحْشُورَةً كُلٌّ لَهُ أَوَّابٌ
“আমি তার সাথে পাহাড়গুলোকে অনুগত করে দিয়েছিলাম। সকাল-সাঁঝে তারা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতো। আর পাখিদেরকেও অনুগত করা হয়েছিল। তারা একত্র হতো, সবাই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণার পুনরাবৃত্তি করতো।”
সূরা সাবায় এর ওপর অতিরিক্ত বলা হয়েছেঃ يَا جِبَالُ أَوِّبِي مَعَهُ وَالطَّيْرَ “পাহাড়গুলোকে আমি হুকুম দিয়েছিলাম যে, তাঁর সাথে সাথে পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণার পুনরাবৃত্তি করো এবং এই একই হুকুম পাখিদেরকেও দিয়েছিলাম।” এ বক্তব্যগুলো থেকে যে কথা বুঝা যায় তা হচ্ছে এই যে, হযরত দাউদ যখন আল্লাহর প্রশংসা ও মহিমা গীতি গাইতেন তখন তাঁর উচ্চতর ও সুরেলা আওয়াজে পাহাড় গুঞ্জরিত হতো, পাখিরা থেমে যেতো এবং একটা অপূর্ব মূর্ছনার সৃষ্টি হতো। এ অর্থের সমর্থন একটি হাদীস থেকে পাওয়া যায়। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একবার হযরত আবু মূসা আশ’আরী (রা.) কুরআন তেলাওয়াত করছিলেন। তাঁর কণ্ঠ ছিল অসাধারণ সুরেলা। নবী ﷺ সেদিক দিয়ে যাচ্ছিলেন। তার আওয়াজ শুনে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং অনেকক্ষণ শুনতে থাকলেন। তার পড়া শেষ হলে তিনি বললেনঃ لَقَدْ أُوتِيَ مِزْمَارًا مِنْ مَزَامِيرِ آلِ دَاوُدَ অর্থাৎ এ ব্যক্তি দাউদের সুরেলা কণ্ঠের একটি অংশ পেয়েছে।
হযরত দাঊদ আলাইহিস সালাম যে রায় দিয়েছিলেন তা ছিল শরীয়তের আইন মোতাবেক আর হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালামের প্রস্তাবটি ছিল উভয় পক্ষের সম্মতিসাপেক্ষ একটি আপোসরফা। উভয়টিই আপন-আপন স্থানে সঠিক ছিল। তাই আল্লাহ তাআলা উভয়ের সম্পর্কে বলেছেন, আমি তাদের দু’জনকেই ইলম ও হিকমত দান করেছিলাম, কিন্তু হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালাম আপোসরফার যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, সে সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন, আমি সুলায়মানকে সে ফায়সালার বিষয়টি বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। এর দ্বারা বোঝা যায় মামলা-মোকদ্দমায় আইনগত ফায়সালা অপেক্ষা পারস্পরিক সম্মতিক্রমে আপোসরফার এমন কোন পথ খোঁজা উত্তম, যা উভয় পক্ষের জন্য মঙ্গলজনক।
৭৯. অতঃপর আমরা সুলায়মানকে এ বিষয়ের মীমাংসা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম এবং তাদের প্রত্যেককে আমরা দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান।(১) আর আমরা পর্বত ও পাখিদেরকে দাউদের অনুগত করে দিয়েছিলাম, তারা তার সাথে পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করত(২), আর আমরাই ছিলাম এ সবের কর্তা।
(১) এ আয়াত থেকে পরোক্ষভাবে ন্যায়বিচারের এ মূলনীতি জানা যায় যে, দু’জন বিচারপতি যদি একটি মোকদ্দমার ফায়সালা করে এবং দু’জনের ফায়সালা বিভিন্ন হয়, তাহলে যদিও একজনের ফায়সালাই সঠিক হবে তবুও দু'জনেই ন্যায়বিচারক বিবেচিত হবেন। তবে এখানে শর্ত হচ্ছে বিচার করার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা উভয়ের মধ্যে থাকতে হবে। তাদের কেউ যেন অজ্ঞতা ও অনভিজ্ঞতা সহকারে বিচারকের আসনে বসে না যান। (দেখুন, কুরতুবী) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীসে একথা আরো বেশী সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “যদি বিচারক নিজের সামর্থ অনুযায়ী ফায়সালা করার পূর্ণ প্রচেষ্টা চালান, তাহলে সঠিক ফায়সালা করার ক্ষেত্রে তিনি দুটি প্রতিদান পাবেন এবং ভুল ফায়সালা করলে পাবেন একটি প্রতিদান ৷” (বুখারীঃ ৬৯১৯, মুসলিমঃ ১৭১৬)
অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “বিচারক তিন প্রকারের। এদের একজন জান্নাতী এবং দু’জন জাহান্নামী। জান্নাতের অধিকারী হচ্ছেন এমন বিচারক যিনি সত্য চিহ্নিত করতে পারলে সে অনুযায়ী ফায়সালা দেন। কিন্তু যে ব্যক্তি সত্য চিহ্নিত করার পরও সত্য বিরোধী ফায়সালা দেয় সে জাহান্নামী। আর অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি জ্ঞান ছাড়াই লোকদের মোকদ্দমার ফায়সালা করতে বসে যায় সেও জাহান্নামী।” (আবু দাউদঃ ২৫৭৩, তিরমিযীঃ ১৩২২, ইবনে মাজাহঃ ২৩১৫)
(২) আয়াতে مع শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ দাউদ আলাইহিস সালামের সাথে পাহাড় ও পাখীদেরকে অনুগত করা হয়েছিল এবং সে কারণে তারাও দাউদের সাথে আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করতো। একথাটিই কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছেঃ “আমরা তার সাথে পাহাড়গুলোকে অনুগত করে দিয়েছিলাম। সকাল-সন্ধ্যা তারা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করতো। আর সমবেত পাখিদেরকেও (অনুগত করা হয়েছিল)। তারা প্রত্যেকেই ছিল অধিক আল্লাহ অভিমুখী।” (সূরা সাদঃ ১৮, ১৯) অন্য সূরায় আরও অতিরিক্ত বলা হয়েছেঃ “পাহাড়গুলোকে আমরা হুকুম দিয়েছিলাম যে, তার সাথে সাথে পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণার পুনরাবৃত্তি করো এবং এই একই হুকুম পাখিদেরকেও দিয়েছিলাম।” (সূরা সাবাঃ ১০)
এ বক্তব্যগুলো থেকে যে কথা বুঝা যায় তা হচ্ছে এই যে, দাউদ যখন আল্লাহর প্রশংসা ও মহিমা গীতি গাইতেন তখন তার উচ্চতর ও সুরেলা আওয়াজে পাহাড় ও পাখিরা গেয়ে ফেলত এবং একটা অপূর্ব মূৰ্ছনার সৃষ্টি হতো। তিনি যখন যাবুর পাঠ করতেন, তখন পক্ষীকুল শূন্যে তার সাথে তসবীহ পাঠ করতে থাকত। (ইবন কাসীর) সমধুর কণ্ঠস্বর ছিল একটি বাহ্যিক গুণ এবং পক্ষীকুল ও পর্বতসমূহের তসবীহ পাঠে শরীক হওয়া ছিল আল্লাহর কুদরতের অধীন একটি মু'জেযা। মু'জেযার জন্য পক্ষীকুল ও পর্বতসমূহের মধ্যেও বিশেষ চেতনা সৃষ্টি হতে পারে। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে আবু মূসা আশা আরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু অত্যন্ত সুমধুর কণ্ঠস্বরের অধিকারী ছিলেন।
একবার আবু মূসা আশ’আরী রাদিয়াল্লাহু আনহু কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। তার কণ্ঠ ছিল অসাধারণ সুরেলা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেদিক দিয়ে যাচ্ছিলেন। তার আওয়াজ শুনে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং অনেকক্ষণ শুনতে থাকলেন। তার পড়া শেষ হলে তিনি বললেনঃ “এ ব্যক্তি দাউদের সুরেলা কণ্ঠের একটা অংশ পেয়েছে।” (মুসনাদে আহমাদঃ ৫/৩৫৯) আবু মুসা যখন জানতে পারলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার তিলাওয়াত শুনেছেন, তখন আরয করলেনঃ আপনি শুনছেন - একথা আমার জানা থাকলে আমি আরও সুন্দরভাবে তিলাওয়াত করার চেষ্টা করতাম। (ইবনে হিব্বানঃ ৭১৯৭, অনুরূপ মুসলিমঃ ৭৯৩) এ থেকে জানা গেল যে, কুরআন তেলাওয়াতে সুন্দর স্বর ও চিত্তাকর্ষক উচ্চারণ কাম্য ও পছন্দনীয়।
(৭৯) আমি সুলাইমানকে এ বিষয়ের মীমাংসা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম(1) এবং তাদের প্রত্যেককে আমি দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান। আমি পর্বত(2) ও পক্ষীকুলকে(3) দাঊদের অনুগত করে দিয়েছিলাম, ওরা তার সাথে আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করত; আমিই ছিলাম এই সবের কর্তা।(4)
(1) ব্যাখ্যাতাগণ এ ঘটনাকে এভাবে বর্ণনা করেছেন যে, এক ব্যক্তির ছাগল অন্য ব্যক্তির ক্ষেতে রাত্রে ঢুকে ফসল নষ্ট করে দেয়। দাঊদ (আঃ) যিনি নবী হওয়ার সাথে সাথে একজন বাদশাহও ছিলেন, তিনি ফায়সালা করলেন যে, ক্ষেতের মালিক ছাগলগুলি নিয়ে নিক; যাতে তার ক্ষতিপূরণ হয়। সুলাইমান (আঃ) এই ফায়সালায় একমত হলেন না। বরং তিনি ফায়সালা করলেন যে, ছাগলগুলি ক্ষেতের মালিককে কিছু দিনের জন্য দেওয়া হোক; সে সেগুলি দ্বারা উপকৃত হবে এবং ক্ষেত ছাগলের মালিকের হাতে তুলে দেওয়া হোক, সে ক্ষেতের সেচ-যত্ন ও দেখাশুনা করে ঠিক করুক। যখন ক্ষেত পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে, তখন ক্ষেত ক্ষেতের মালিককে ও ছাগলগুলি ছাগলের মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। প্রথম ফায়সালার তুলনায় দ্বিতীয় ফায়সালা এই জন্যই ভালো যে, এতে কাউকেই নিজের মাল হতে বঞ্চিত হতে হচ্ছে না। কিন্তু প্রথম ফায়সালায় ছাগলের মালিককে ছাগল থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। এ সত্ত্বেও আল্লাহ দাঊদ (আঃ)-এরও প্রশংসা করেছেন ও বলেছেন যে, আমি দাঊদ ও সুলাইমান উভয়কেই জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেছি। কিছু লোক এখান থেকে দলীল গ্রহণ করেছেন যে, প্রত্যেক মুজতাহিদ (শরীয়তের বিধান বর্ণনা করার যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি তাঁর প্রচেষ্টায়) সঠিকতায় পৌঁছে থাকেন। ইমাম শাওকানী (রঃ) বলেন এ দাবী সঠিক নয়। কোন একটি ব্যাপারে দুই ভিন্নমুখী মীমাংসাকারী দুই মুজতাহিদ একই সময়ে সঠিকতায় উপনীত হতে পারেন না। ওঁদের মধ্যে একজন ঠিক ফায়সালাদাতা ও অপরজন ভুল ফায়সালাদাতা হিসাবে গণ্য হবেন। অবশ্য এ কথা আলাদা যে, ভুল ফায়সালাদাতা মুজতাহিদ আল্লাহর নিকট অপরাধী নন; বরং তাঁকেও একটি নেকী দান করা হবে; যেমন হাদীসে এসেছে। (ফাতহুল কাদীর)
(2) এর অর্থ এই নয় যে, পাহাড় দাঊদ (আঃ)-এর তসবীহর আওয়াজে প্রতিধ্বনিত হত। কারণ, তাতে কোন মু’জিযা (অলৌকিকতা) প্রমাণ হয় না। যেহেতু যে কেউ আওয়াজ করলেই তো পাহাড়ে প্রতিধ্বনি হয়। বরং এর অর্থ হল, দাঊদ (আঃ)-এর সাথে পাহাড়ও তসবীহ পাঠ করত এবং তা বাস্তব সত্য, রূপক অর্থে নয়।
(3) অর্থাৎ, পাখিরাও দাঊদ (আঃ)-এর তসবীহ পড়ার সাথে সাথে তসবীহ পড়তে শুরু করত। وَالطَّيرَ শব্দটির শেষে যবর কিরাআতে এর সংযোগ হবে الجِبَال এর সাথে। আর পেশ কিরাআতে ঊহ্য বিধেয়র উদ্দেশ্য হবে; অর্থাৎ, والطَّيرُ مسخَّراتٌ আর এর অর্থ হবে, পক্ষীকুলও (তার) অনুগত।
(4) অর্থাৎ, দাঊদকে ফায়সালা বুঝিয়ে দেওয়া, প্রজ্ঞা দান করা এবং পাখি ও পাহাড়কে তার অনুগত করে দেওয়া এসব কাজ আমিই করেছি। এতে কারো আশ্চর্য্য প্রকাশ করার অথবা অস্বীকার করার কিছুই নেই। কারণ আমি যা ইচ্ছা তাই করতে পারি।