إِلَّا مَنِ ٱسۡتَرَقَ ٱلسَّمۡعَ فَأَتۡبَعَهُۥ شِهَابٞ مُّبِينٞ

ইল্লা-মানিছ তারকাছ ছাম‘আ ফাআতবা‘আহূশিহা-বুম মুবীন।উচ্চারণ

তবে আড়ি পেতে বা চুরি করে কিছু শুনতে পারে। ১১ আর যখন সে চুরি করে শোনার চেষ্টা করে তখন একটি জ্বলন্ত অগ্নিশিখা তাকে ধাওয়া করে। ১২ তাফহীমুল কুরআন

তবে কেউ চুরি করে কিছু শোনার চেষ্টা করলে এক উজ্জ্বল শিখা তাকে ধাওয়া করে। মুফতী তাকী উসমানী

আর কেহ চুরি করে সংবাদ শুনতে চাইলে ওর পশ্চাদ্ধাবন করে প্রদীপ্ত শিখা।মুজিবুর রহমান

কিন্তু যে চুরি করে শুনে পালায়, তার পশ্চাদ্ধাবন করে উজ্জ্বল উল্কাপিন্ড।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

কিন্তু কেউ চুরি করে সংবাদ শুনতে চাইলে এর পশ্চাদ্ধাবন করে প্রদীপ্ত শিখা। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

তবে যে গোপনে শোনে, তৎক্ষণাৎ সুস্পষ্ট জ্বলন্ত অগ্নিশিখা তার পিছু নেয়।আল-বায়ান

কিন্তু কেউ চুরি করে (খবর) শুনতে চাইলে উজ্জ্বল অগ্নিশিখা তার পশ্চাদ্ধাবণ করে।তাইসিরুল

সে ব্যতীত যে লুকিয়ে শোনে, ফলে তার পশ্চাদ্ধাবন করে প্রখর অগ্নিশিখা।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

১১

অর্থাৎ যেসব শয়তান তাদের বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষকদেরকে গায়েবের খবর এনে দেবার চেষ্টা করে থাকে, যাদের সাহায্যে অনেক জ্যোতিষী, গণক ও ফকির--- বেশী বহুরূপী অদৃশ্য জ্ঞানের ভড়ং দেখিয়ে থাকে, গায়েবের খবর জানার কোন একটি উপায়-উপকরণও আসলে তাদের আয়ত্বে নেই। তারা চুরি-চামারি করে কিছু শুনে নেবার চেষ্টা অবশ্যি করে থাকে। কারণ তাদের গঠনাকৃতি মানুষের তুলনায় ফেরেশতাদের কিছুটা কাছাকাছি কিন্তু আসলে তাদের কপালে শিকে ছেঁড়ে না।

১২

شِهَابٌ مُبِينٌ এর আভিধানিক অর্থ উজ্জ্বল আগুনের শিখা। কুরআনের অন্য জায়গায় এজন্য شِهَابٌ ثَاقِبٌ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, অন্ধকার বিদীর্ণকারী অগ্নি-স্ফুলিংগ। এর মানে যে, আকাশ থেকে নিক্ষিপ্ত জ্বলন্ত নক্ষত্র হতে হবে, যাকে আমাদের পরিভাষায় “উল্কাপিণ্ড” বলা হয়, তেমন কোন কথা নেই। এটা হয়তো অন্য কোন ধরনের রশ্মি হতে পারে। যেমন মহাজাগতিক রশ্মি (Cosmic Rays) অথবা এর চেয়েও তীব্র ধরনের অন্য কিছু, যা এখনো আমাদের জ্ঞানের আওতার বাইরে রয়ে গেছে। আবার এ উল্কাপিণ্ডও হতে পারে, যাকে আমরা মাঝে মধ্যে আকাশ থেকে পৃথিবীর দিকে ছুটে আসতে দেখি। বর্তমানকালের পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায়, দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে মহাশূন্য থেকে পৃথিবীর দিকে যেসব উল্কা ছুটে আসতে দেখা যায় তার সংখ্যা হবে প্রতিদিন এক লক্ষ কোটি। এর মধ্যে থেকে প্রায় ২ কোটি প্রতিদিন পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ এলাকার মধ্যে প্রবেশ করে পৃথিবীর দিকে ধাবিত হয়। তার মধ্য থেকে কোন রকমে একটা ভু-পৃষ্ঠে পৌঁছে। মহাশূন্যে এদের গতি হয় কমবেশী প্রতি সেকেণ্ডে ২৬ মাইল এবং কখনো তা প্রতি সেকেণ্ডে ৫০ মাইলেও পৌঁছে যায়। অনেক সময় খালি চোখেও অস্বাভাবিক উল্কা বৃষ্টি দেখা যায়। পুরাতন রেকর্ড থেকে জানা যায়, ১৮৩৩ খৃস্টাব্দের ১৩ নভেম্বর উত্তর আমেরিকার পূর্ব এলাকায় শুধুমাত্র একটি স্থানে মধ্য রাত্র থেকে প্রভাত পর্যন্ত ২ লক্ষ উল্কাপিণ্ড নিক্ষিপ্ত হতে দেখা গিয়েছিল। (ইনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা ১৯৪৬, ১৫ খণ্ড, ৩৩৭-৩৯ পৃঃ) হয়তো এই উল্কা বৃষ্টিই উর্ধ্বজগতের দিকে শয়তানদের উড্ডয়নের পথে বাধার সৃষ্টি করে। কারণ পৃথিবীর উর্ধ্ব সীমানা পার হয়ে মহাশূন্যে প্রতিদিন এক লক্ষ কোটি উল্কাপাত তাদের জন্য মহাশূন্যের ঐ এলাকাকে সম্পূর্ণরূপে অনতিক্রম্য বানিয়ে দিয়ে থাকবে।

এখানে উপরে যে সংরক্ষিত দূর্গগুলোর কথা বলা হয়েছে সেগুলোর ধরন সম্পর্কে কিছুটা অনুমান করা যেতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে মহাশূন্য একেবারে পরিষ্কার। এর মধ্যে কোথাও কোন দেয়াল বা ছাদ দেখা যায় না। কিন্তু আল্লাহ এ মহাশূন্যের বিভিন্ন অংশকে এমন কিছু অদৃশ্য দেয়াল দিয়ে ঘিরে রেখেছেন যা এক অংশের বিপদ ও ক্ষতিকর প্রভাব থেকে অন্য অংশকে সংরক্ষিত করে রাখে। এ দেয়ালগুলোর বদৌলতেই প্রতিদিন গড়ে যে এক লক্ষ কোটি উল্কাপিণ্ড পৃথিবীর দিকে ছুটে আসে তা সব পথেই জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যায় এবং মাত্র একটি এসে পৃথিবী পৃষ্ঠে পড়তে সক্ষম হয়। পৃথিবীতে উল্কা পিণ্ডের যেসব নমুনা দুনিয়ার বিভিন্ন যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে তার মধ্যে সবচেয়ে বড়টির ওজন ৬৪৫ পাউণ্ড। এ পাথরটি ওপর থেকে পড়ে মাটির মধ্যে ১১ ফুট গভীরে প্রোথিত হয়ে গিয়েছিল। এছাড়াও এক জায়গায় ৩৬.৫ টনের একটি লোহার স্তূপ পাওয়া গেছে। বৈজ্ঞানিকদের মতে আকাশ থেকে এ লোহা নিক্ষিপ্ত হয়েছে। এছাড়া সেখানে এর স্তূপাকার অস্তিত্বের কোন কারণই তারা খুঁজে পাননি। চিন্তা করুন, পৃথিবীর উর্ধ্ব সীমানাকে যদি মজবুত দেয়ালের মাধ্যমে সংরক্ষিত না করা হতো তাহলে এসব উল্কাপাতে পৃথিবীর কী অবস্থা হতো! এ দেয়ালগুলোকেই কুরআনে বুরুজ (সংরক্ষিত দূর্গ) বলা হয়েছে।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

কুরআন মাজীদে কয়েক জায়গায় বলা হয়েছে, শয়তান আকাশে গিয়ে ঊর্ধ্বজগতের খবরাখবর সংগ্রহ করতে চায়। উদ্দেশ্য সেসব খবর অতীন্দ্রিয়বাদী ও জ্যোতিষীদেরকে সরবরাহ করা, যাতে তারা তার মাধ্যমে মানুষকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয় যে, তারা গায়েবী খবর জানতে পারে। কিন্তু আকাশে প্রবেশের দুয়ার তাদের জন্য পূর্ব থেকেই বন্ধ রয়েছে। তবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শুভাগমনের আগে শয়তানেরা আকাশের কাছাকাছি পৌঁছতে পারত এবং সেখান থেকে চুরি করে ফেরেশতাদের কথাবার্তা শোনার চেষ্টা করত। ঘটনাক্রমে কোনও একটু কথা কানে পড়ে গেলে তার সাথে অসংখ্য মিথ্যা মিলিয়ে অতীন্দ্রিয়বাদীদের কাছে পৌঁছাত। এভাবে অতীন্দ্রিয়বাদীদের দু’-একটি কথা ফলেও যেত। কিন্তু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শুভাগমনের পর তাদের আকাশের কাছে যাওয়াও বন্ধ করে দেওয়া হল। এখন তারা সে রকম চেষ্টা করলে জ্বলন্ত উল্কা ছুঁড়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। আকাশে আমরা যে নক্ষত্র পতনের দৃশ্য দেখতে পাই, অনেক সময় তা এই শয়তান বিতাড়নেরই ব্যাপার হয়ে থাকে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা ইনশাআল্লাহ তাআলা সূরা জীনে আসবে।

তাফসীরে জাকারিয়া

১৮. কিন্তু কেউ চুরি করে(১) শুনতে চাইলে(২) প্রদীপ্ত শিখা(৩) তার পশ্চাদ্ধাবন করে।

(১) অর্থাৎ যেসব শয়তান তাদের বন্ধু ও পৃষ্ঠপোষকদেরকে গায়েবের খবর এনে দেবার চেষ্টা করে থাকে, যাদের সাহায্যে অনেক জ্যোতিষী, গণক ও ফকির বেশধারী বহুরূপী অদৃশ্য জ্ঞানের ভড়ং দেখিয়ে থাকে, গায়েবের খবর জানার কোন একটি উপায়-উপকরণও আসলে তাদের আয়ত্বে নেই। তারা চুরি-চামারি করে কিছু শুনে নেবার চেষ্টা অবশ্যি করে থাকে।

(২) হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “মাঝে মাঝে ফিরিশতারা আকাশের নীচে মেঘমালার স্তর পর্যন্ত অবতরণ করত এবং আসমানের সংবাদাদী নিয়ে পরস্পর আলোচনা করত। শয়তানরা শূন্যে আত্মগোপন করে এসব সংবাদ শুনত এবং গণকদের কাছে তা গোপনে পৌছিয়ে দিত। গণকরা এগুলোর সাথে শত মিথ্যা নিজেদের পক্ষ থেকে জুড়ে দিয়ে তা বলে বেড়ায়।” (বুখারীঃ ৩২১০, ২২২৮) পরে উল্কাপাতের মাধ্যমে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। অন্য এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ যখন আসমানে কোন বিষয়ের ফয়সালা করেন তখন ফেরেশতাগণ তার নির্দেশের আনুগত্য স্বরূপ তাদের ডানাগুলোকে মারতে থাকে তাতে পাথরের উপর জিঞ্জির পড়ার মত শব্দ অনুভূত হয়। তারপর যখন তাদের অন্তর থেকে ভয়ভীতি দূর হয় তখন তারা বলতে থাকেঃ তোমাদের প্রভু কি বলেছেন? তারাই আবার বলেঃ হক্ক বলেছেন, তিনি বড়, মহান। কান লাগিয়ে কথাচোরগণ এ কথোপকথন শুনতে পায়।

আর এসব কান লাগিয়ে শ্রবণকারীগণ একটির উপর একটি থাকে। বর্ণনাকারী সুফিয়ান তার হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে দেখিয়ে দিলেন। তিনি তার ডান হাতের আঙ্গুলগুলোকে ফাঁক করলেন এবং একটির উপর আর একটি স্থাপন করলেন। তারপর কখনো কখনো উজ্জল আলোর শিখা সে কান লাগিয়ে শ্রবণকারীকে তার সাথীর কাছে কথা পৌছানোর পূর্বেই আঘাতে করে জালিয়ে দেয়। আবার কখনো কখনো আলোর শিখা তার কাছে পৌঁছার আগেই সে তার নীচের সাথীকে তা পৌঁছিয়ে দেয়। এভাবে পৌছাতে পৌছাতে যমীন পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। তারপর যাদুকর বা গণকের মুখে রেখে দেয়। তখন সে যাদুকর তথা গণক সে সংবাদের সাথে শতটি মিথ্যা মিশ্রিত করে বর্ণনা করে। আর এভাবেই তার কোন কোন কথা সত্যে পরিণত হয়। তারপর লোকেরা বলতে থাকেঃ সে কি আমাদেরকে বলেনি যে, অমুক অমুক দিন এই সেই হবে, তারপর আমরা কি সঠিক পাইনি? আসলে সেটা ছিল ঐ বাক্য যা আসমান থেকে শোনা গিয়েছিল। (বুখারীঃ ৪৭০১)

(৩) شهاب এর আভিধানিক অর্থ উজ্জ্বল আগুনের শিখা। এখানে বলা হয়েছে, (شِهَابٌ مُبِينٌ) কুরআনের অন্য জায়গায় এজন্য (شِهَابٌ ثَاقِبٌ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। (সূরা আস-সাফফাতঃ ১০) আবার কোথায়ও বলা হয়েছে, (شِهَابًا رَصَدًا) (সূরা আলজিনঃ ৯) আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের এক সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। ইতিমধ্যে আকাশে তারকা খসে পড়ল। তিনি সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করলেনঃ জাহেলিয়াত যুগে অর্থাৎ ইসলাম-পূর্বকালে তোমরা তারকা খসে যাওয়াকে কি মনে করতে? তারা বললেনঃ আমরা মনে করতাম যে, বিশ্বে কোন ধরণের অঘটন ঘটবে অথবা কোন মহান ব্যক্তি মৃত্যুবরণ কিংবা জন্মগ্রহণ করবেন। তিনি বললেনঃ এটা অর্থহীন ধারণা। কারো জন্ম-মৃত্যুর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। এসব জ্বলন্ত অঙ্গার শয়তানদেরকে বিতাড়নের জন্য নিক্ষেপ করা হয়। (মুসলিমঃ ২২২৯)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(১৮) আর কেউ চুরি করে সংবাদ শুনতে চাইলে ওর পশ্চাদ্ধাবন করে প্রদীপ্ত উল্কা। (1)

(1) এর অর্থ এই যে, শয়তানেরা আকাশে কথা শোনার জন্য যাওয়ার চেষ্টা করে। যার ফলে তাদের উপর জলন্ত উল্কা এসে পড়ে। যার কারণে কেউ মারা যায়, কেউ পালাতে সক্ষম হয়, আবার কেউ কিছু শুনে ফেলে। এর ব্যাখ্যা হাদীসে এভাবে এসেছে; নবী (সাঃ) বলেছেন, যখন মহান আল্লাহ আকাশে কোন কিছুর ফায়সালা করেন, তখন তা শুনে ফিরিশতাগণ অক্ষমতা ও দুর্বলতা প্রকাশ স্বরূপ ডানা নাড়তে শুরু করেন, যেন তা লোহার শিকল দ্বারা কোন পাথরের উপর মারার শব্দ। অতপর যখন তাদের মন থেকে আল্লাহর ভয় কিছুটা কমে আসে তখন তারা একে অপরকে জিজ্ঞাসা করে যে, তোমাদের প্রভু কি বললেন? তাঁরা বলেন, তিনি যা বলেছেন সত্য বলেছেন এবং তিনি সুমহান ও সুউচ্চ। তারপর সেই ফায়সালার কথা ঊর্ধ্ব থেকে নিম্ন আসমান পর্যন্ত ফিরিশতাবর্গ পরস্পর শোনাশুনি করেন। এই সময় শয়তানরাও তা শোনার জন্য চুপি চুপি গিয়ে কান পাতে এবং তারাও এক অপরের একটু দূরে থেকে তা শোনার চেষ্টা করে এবং কেউ কেউ এক আধটি শব্দ শুনে ফেলে ও পরে তা কোন গণকের কানে পৌঁছে দেয়। গণক সেই কথার সাথে আরও একশত মিথ্যা কথা মিলিয়ে মানুষের কাছে বর্ণনা করে। (সংক্ষেপে সহীহ বুখারী, তাফসীর সূরা হিজর)