ইযক-লূলাইঊছুফুওয়া আখূহু আহাব্বুইলাআবীনা-মিন্না-ওয়া নাহনু‘উসবাতুন ইন্না আবা-না-লাফী দালা-লিম মুবীন।উচ্চারণ
এ ঘটনা এভাবে শুরু হয়ঃ তাঁর ভাইয়েরা পরস্পর বলাবলি করলো, “এ ইউসুফ ও তাঁর ভাই, ৮ এরা দু’জন আমাদের পিতার কাছে আমাদের সবার চাইতে বেশী প্রিয়, অথচ আমরা একটি পূর্ণ সংঘবদ্ধ দল। সত্যি বলতে কি আমাদের পিতা একেবারেই বিভ্রান্ত হয়ে গেছেন। ৯ তাফহীমুল কুরআন
(এটা সেই সময়ের ঘটনা) যখন ইউসুফের (সৎ) ভাইগণ (পরস্পরে) বলেছিল, নিশ্চয়ই আমাদের পিতার কাছে আমাদের তুলনায় ইউসুফ ও তার (সহোদর) ভাই (বিনইয়ামীনই) বেশি প্রিয়, অথচ আমরা (তার পক্ষে) একটি সুসংহত দল। #%৪ #%আমাদের বিশ্বাস যে, আমাদের পিতা সুস্পষ্ট কোনও বিভ্রান্তিতে নিপতিত।মুফতী তাকী উসমানী
যখন তারা (ভাইয়েরা) বলেছিলঃ আমাদের পিতার নিকট ইউসুফ এবং তার ভাইই (বিন ইয়ামীন) অধিক প্রিয়, অথচ আমরা একটি সংহত দল, আমাদের পিতাতো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই রয়েছেন ।মুজিবুর রহমান
যখন তারা বললঃ অবশ্যই ইউসুফ ও তাঁর ভাই আমাদের পিতার কাছে আমাদের চাইতে অধিক প্রিয় অথচ আমরা একটা সংহত শক্তি বিশেষ। নিশ্চয় আমাদের পিতা স্পষ্ট ভ্রান্তিতে রয়েছেন।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
স্মরণ কর, এরা বলেছিল, ‘আমাদের পিতার নিকট ইউসুফ এবং তার ভাইই আমাদের অপেক্ষা অধিক প্রিয়, অথচ আমরা একটি সংহত দল; আমাদের পিতা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই আছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
যখন তারা বলেছিল, ‘নিশ্চয় ইউসুফ ও তার ভাই আমাদের পিতার নিকট আমাদের চেয়ে অধিক প্রিয়, অথচ আমরা একই দল। নিশ্চয় আমাদের পিতা সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই আছে’।আল-বায়ান
স্মরণ কর, যখন তারা (বৈমাত্রেয় ভাইগণ) বলাবলি করছিল, ‘নিশ্চয়ই ইউসুফ আর তার (সহোদর) ভাই আমাদের পিতার কাছে আমাদের চেয়ে বেশি প্রিয়, অথচ আমরা পুরো একটা দল, আমাদের পিতা স্পষ্ট ভুলের মধ্যে আছেন।তাইসিরুল
স্মরণ করো! তারা বলাবলি করলে -- "ইউসুফ ও তার ভাই তো আমাদের আব্বার কাছে আমাদের চেয়েও বেশি প্রিয়, যদিও আমরা দলে ভারী। আমাদের আব্বা নিশ্চয়ই স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছেন।"মাওলানা জহুরুল হক
৮
এখানে হযরত ইউসুফের সহোদর ভাই বিন ইয়ামীনের কথা বলা হয়েছে। এ ভাইটি তার থেকে কয়েক বছরের ছোট ছিল। তার জন্মের সময় তার মায়ের ইন্তিকাল হয়। এ কারণে হযরত ইয়াকূব এ দু’টি মাতৃহীন সন্তানের প্রতি একটু বেশী নজর দিতেন। এছাড়াও এ স্নেহের আর একটি কারণ ছিল এই যে, তাঁর সব ছেলের মধ্যে একমাত্র হযরত ইউসুফই এমন ছিলেন যার মধ্যে তিনি সৌভাগ্য ও সত্য সঠিক পথের সন্ধান লাভের লক্ষণ দেখেছিলেন। হযরত ইউসুফের স্বপ্নের কথা শুনে তিনি যা কিছু বলেছিলেন ওপরে তার যে বর্ণনা এসেছে তা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, তিনি নিজের এ ছেলেটির অসাধারণ যোগ্যতা সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই জানতেন। অন্যদিকে সামনের দিকে যেসব ঘটনার প্রকাশ ঘটেছে তা থেকে তাঁর বাকি দশ ছেলের চারিত্রিক মান সুস্পষ্ট হয়ে যায়। এক্ষেত্রে কোন সৎব্যক্তি এ ধরনের সন্তানদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবেন একথা কেমন করে আশা করা যেতে পারে? কিন্তু বাইবেলের বর্ণনায় অবাক হতে হয়। সেখানে ইউসুফের প্রতি তাঁর ভাইদের হিংসার এমন একটি কারণ বর্ণনা করা হয়েছে যার ফলে উল্টো হযরত ইউসুফই দোষী সাব্যস্ত হন। বাইবেলের বর্ণনা মতে হযরত ইউসুফ তাঁর পিতার কাছে ভাইদের বিরুদ্ধে চোগলখোরী করতেন। এ কারণে তাঁর ভাইয়েরা তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল।
৯
এ বাক্যটির মর্ম উপলব্ধি করার জন্য বেদুইনদের গোত্রীয় জীবনের অবস্থার প্রতি দৃষ্টিপাত করতে হবে। সেখানে কোন রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা থাকে না। স্বাধীন উপজাতিরা পরস্পর পাশাপাশি বসবাস করে। সেখানে কোন ব্যক্তির বিপুল সংখ্যক ছেলে, নাতি-পুতি, ভাই-ভাতিজা ইত্যাদির ওপর তার ক্ষমতা নির্ভর করে। তার ধন-প্রাণ, ইজ্জত-আবরু রক্ষার প্রয়োজনে তারা তাকে সাহায্য করে। এ ধরনের অবস্থায় মেয়েদের ও শিশুদের তুলনায় স্বাভাবিকভাবে জোয়ান ছেলেরাই মানুষের কাছে বেশী প্রিয় হয়। কারণ দুশমনের সাথে মোকাবিলায় তারা সাহায্য করতে পারে। এ কারণে ইউসুফের ভাইয়েরা বললো, বুড়ো বয়সে আমাদের বাপ দিশেহারা হয়েছে। আমাদের মতো দলবদ্ধ এ যুবক ছেলেরা, যারা খারাপ সময়ে তাঁর কাজে লাগতে পারে, তাঁর কাছে ততটা প্রিয় নয় যতোটা এ ছোট ছেলে দু’টি যারা তাঁর কোন কাজে লাগতে পারে না বরং উল্টো তাদেরকেই হেফাজত করতে হবে।
অর্থাৎ, আমাদের যেমন বয়স ও শক্তি বেশি, তেমনি আমরা সংখ্যায়ও অধিক। সে কারণে আমরা পিতার বাহুবলও বটে। তাঁর যখন কোন সাহায্যের দরকার হয়, তখন আমরাই তাঁর সাহায্য করার ক্ষমতা রাখি। সুতরাং তাঁর উচিত আমাদেরকেই বেশি মহব্বত করা।
৮. স্মরণ করুন, তারা বলেছিল, আমাদের পিতার কাছে ইউসুফ এবং তার ভাই তো আমাদের চেয়ে বেশী প্রিয়, অথচ আমরা একটি সংহত দল; আমাদের পিতা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই আছে।(১)
(১) এখানে ضلال বলে পথভ্রষ্টতা বুঝানো হয়নি। বরং কোন বিষয়ের আসল জ্ঞানের অভাব বুঝানো উদ্দেশ্য। কুরআনের অন্যত্রও এ শব্দটি এ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন ইউসুফ আলাইহিস সালামের ভ্রাতারা তার পিতাকে এ সূরার অন্যত্র বলেছিল, “আল্লাহর শপথ! আপনি তো পুরাতন জ্ঞানহীনতাতেই আছেন।” (৯৫) তাছাড়া অন্যত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ বলেছেন যে, “আর আপনাকে তিনি (আল্লাহ) পেয়েছেন (এ বিষয়ে) জ্ঞানহীন, তারপর তিনি আপনাকে পথ দেখিয়েছেন (সূরা আদ-দোহাঃ ৭) এখানে অর্থ হবে, যে সমস্ত জ্ঞান ওহী ব্যতীত পাওয়া যায় না সেগুলোতে আপনি জ্ঞানী ছিলেন না। তারপর আল্লাহ আপনাকে এ কুরআন ওহী করার মাধ্যমে সেগুলোর প্রতি দিক-নির্দেশ করেছেন এবং আপনাকে তা জানিয়েছেন। সে হিসেবে আলোচ্য আয়াতের অর্থ এ নয় যে, তারা ইয়াকুব আলাইহিস সালামকে দ্বীনীভাবে ভ্রষ্ট বলছেন, কারণ এটা বললে কাফের হয়ে যাবে। বরং তাদের উদ্দেশ্য হলো, তাদের পিতা তাদের ধারণা মতে বাস্তব অবস্থা বুঝতে অক্ষম, প্রতিটি বস্তুকে তার সঠিক স্থানে স্থান দেন নি। নতুবা কিভাবে তিনি দশজনকে ভাল না বেসে দু’জনকে ভালবাসলেন? দশজন তো দু’জনের চেয়ে বেশী উপকারী ও তার কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বেশী দক্ষ। (আদওয়াউল বায়ান)
এ আয়াত থেকে ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর কাহিনী শুরু হয়েছে। ইউসুফ 'আলাইহিস সালাম-এর ভ্রাতারা পিতা ইয়াকুব আলাইহিস সালাম-কে দেখল যে, তিনি ইউসুফের প্রতি অসাধারণ মহব্বত রাখেন। ফলে তাদের মনে হিংসা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। তারা পরস্পর বলাবলি করলঃ আমরা পিতাকে দেখি যে, তিনি আমাদের তুলনায় ইউসুফ ও তার অনুজ বিনইয়ামীনকে অধিক ভালবাসেন। অথচ আমরা দশজন এবং তাদের জ্যেষ্ঠ হওয়ার কারণে গৃহের কাজকর্ম করতে সক্ষম। তারা উভয়েই ছোট বালক বিধায় গৃহস্থালীর কাজ করার শক্তি রাখে না। আমাদের পিতার উচিত হল এ বিষয় অনুধাবন করা এবং আমাদেরকে অধিক মহব্বত করা। আমাদের পিতা আসলে প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে মোটেই ওয়াকিবহাল নন। তার উচিত আমাদেরকে প্রাধান্য দেয়া। কিন্তু তিনি প্রকাশ্যে অবিচার করে যাচ্ছেন। তাই তোমরা হয় ইউসুফকে হত্যা কর, না হয় এমন দূর দেশে নির্বাসিত কর, যেখান থেকে সে আর ফিরে আসতে না পারে।
(৮) (স্মরণ কর) যখন তারা (তার ভাইরা) বলেছিল, ‘আমাদের পিতার নিকট ইউসুফ এবং তার (সহোদর) ভাই(1) (বিনয়ামীন)ই আমাদের চেয়ে অধিক প্রিয়, অথচ আমরা একটি (সংহত) দল,(2) আমাদের পিতা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছেন। (3)
(1) ‘তার (সহোদর) ভাই’ বলে বিনয়্যামীনকে বুঝানো হয়েছে।
(2) অর্থাৎ, আমরা দশ ভাই শক্তিশালী ও সংখ্যাগরিষ্ঠ। আর ইউসুফ ও বিনয়্যামীন মাত্র দুইজন। এর পরেও তারা আমাদের পিতার চক্ষুর শীতলতা ও মনের প্রফুল্লতা!
(3) এখানে বিভ্রান্তির অর্থ হল ভুল; যা তাঁদের ধারণা অনুযায়ী তাঁদের পিতা ইউসুফ ও বিনয়্যামীনকে অধিক ভালবেসে করেছিলেন।