إِلَّا مَن رَّحِمَ رَبُّكَۚ وَلِذَٰلِكَ خَلَقَهُمۡۗ وَتَمَّتۡ كَلِمَةُ رَبِّكَ لَأَمۡلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنَ ٱلۡجِنَّةِ وَٱلنَّاسِ أَجۡمَعِينَ

ইল্লা-মার রহিমা রব্বুকা ওয়া লিযা-লিকা খালাকাহুম ওয়া তাম্মাত কালিমাতু রব্বিকা লাআমলাআন্না জাহান্নামা মিনাল জিন্নাতি ওয়ান্না-ছি আজমা‘ঈন।উচ্চারণ

এবং বিপথে যাওয়া থেকে একমাত্র তারাই বাঁচবে যাদের ওপর তোমার রব অনুগ্রহ করেন। এ (নির্বাচন ও ইখতিয়ারের স্বাধীনতার) জন্যই তো তিনি তাদের পয়দা করেছিলেন। ১১৬ আর তোমার রবের একথা পূর্ণ হয়ে গেছে যা তিনি বলেছিলেন--- “আমি জাহান্নামকে জিন ও মানুষ উভয়কে দিয়ে ভরে দেবো।” তাফহীমুল কুরআন

অবশ্য তোমার প্রতিপালক যাদের প্রতি দয়া করবেন, তাদের কথা ভিন্ন (আল্লাহ তাদেরকে সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত রাখবেন)। আর এরই (অর্থাৎ এই পরীক্ষারই) জন্য তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। #%৭৬%# তোমার প্রতিপালকের এই কথা পূর্ণ হবেই, যা তিনি বলেছিলেন যে, আমি জিন ও ইনসান উভয়ের দ্বারা জাহান্নাম ভরে ফেলব।মুফতী তাকী উসমানী

কিন্তু যার প্রতি তোমার রবের অনুগ্রহ হয়। আর এ জন্যই তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন; এবং তোমার রবের এই বাণীও পূর্ণ হবে যে, আমি জিন ও মানব সকলের দ্বারা জাহান্নামকে পূর্ণ করবই।মুজিবুর রহমান

তোমার পালনকর্তা যাদের উপর রহমত করেছেন, তারা ব্যতীত সবাই চিরদিন মতভেদ করতেই থাকবে এবং এজন্যই তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। আর তোমার আল্লাহর কথাই পূর্ণ হল যে, অবশ্যই আমি জাহান্নামকে জ্বিন ও মানুষ দ্বারা একযোগে ভর্তি করব।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তবে এরা নয়, যাদেরকে তোমার প্রতিপালক দয়া করেন এবং তিনি এদেরকে এইজন্যেই সৃষ্টি করেছেন। ‘আমি জিন ও মানুষ উভয় দিয়ে জাহান্নাম পূর্ণ করবই’, তোমার প্রতিপালকের এই কথা পূর্ণ হবেই। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

তবে যাদেরকে তোমার রব দয়া করেছেন, তারা ছাড়া। আর এজন্যই তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমার রবের কথা চূড়ান্ত হয়েছে যে, ‘নিশ্চয়ই আমি জাহান্নাম ভরে দেব জিন ও মানুষ দ্বারা একত্রে’।আল-বায়ান

তবে তোমার প্রতিপালক যাদের প্রতি দয়া করেন তারা (মতবিরোধ করবে) না। এই উদ্দেশ্যেই তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, আর তোমার প্রতিপালকের এ বাণী পূর্ণ হবেই যে, আমি জাহান্নামকে জ্বিন আর মানুষ দিয়ে অবশ্য অবশ্যই ভরে দেব।তাইসিরুল

সে ব্যতীত যাকে তোমার প্রভু করুণা করেছেন, আর এর জন্যেই তিনি তাদের সৃষ্টি করেছেন। আর সম্পূর্ণ হয়েছে তোমার প্রভুর বাণী -- "আমি আলবৎ একই সঙ্গে জিনদের ও মানুষদের দ্বারা জাহান্নাম ভর্তি করব।"মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

১১৬

সাধারণত এ ধরনের অবস্থায় তকদীরের নামে যে অবতারণা করা হয়ে থাকে এটি তার জবাব। ওপরে অতীতের জাতিদের ধ্বংসের যে কারণ বর্ণনা করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে আপত্তি উত্থাপন করা যেতে পারতো যে, তাদের মধ্যে সৎলোক না থাকা বা অতি অল্প সংখ্যা থাকাও আল্লাহর ইচ্ছার মধ্যে শামিল ছিল, এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট জাতিদেরকে এজন্য দায়ী করা হচ্ছে কেন? তাদের মধ্যে আল্লাহ বিপুল সংখ্যক সৎলোক সৃষ্টি করে দিলেন না কেন? এর জবাবে মানুষের ব্যাপারে আল্লাহর ইচ্ছা সম্পর্কিত বাস্তব সত্যটি পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করে দেয়া হয়েছে। পশু, উদ্ভিদ ও অন্যান্য সৃষ্টির মতো মানুষকেও প্রকৃতিগতভাবে একটি নির্দিষ্ট ও গতানুগতিক পথে পাড়ি জমাতে বাধ্য করা হবে এবং এ পথ থেকে সরে গিয়ে অন্য কোন পথে সে চলতে পারবে না, মানুষের ব্যাপারে আল্লাহ এটা কখনোই চান না। যদি এটাই তাঁর ইচ্ছা হতো তাহলে ঈমানের দাওয়াত, নবী প্রেরণ ও কিতাব নাযিলের কি প্রয়োজন ছিল? সমস্ত মানুষ মু’মিন ও মুসলমান হিসেবে পয়দা হতো এবং কুফরী ও গুণাহগারীর কোন সম্ভাবনাই থাকতো না। কিন্তু মানুষের ব্যাপারে আল্লাহ তাঁর যে ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন তা আসলে হচ্ছে এই যে, তাকে নির্বাচন ও গ্রহণ করার স্বাধীনতা দেয়া হবে। তাকে নিজের পছন্দ মাফিক বিভিন্ন পথে চলার ক্ষমতা দেয়া হবে। তার সামনে জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়ের পথ খুলে দেয়া হবে। তারপর প্রত্যেকটি মানুষকে ও মানুষের প্রত্যেকটি দলকে এর মধ্য থেকে যে কোন একটি পথ নিজের জন্য পছন্দ করে নিয়ে তার ওপর চলার সুযোগ দেয়া হবে। এর ফলে প্রত্যেকে নিজের প্রচেষ্টা ও উপার্জনের ফল হিসেবেই সবকিছু লাভ করবে। কাজেই যে পরিকল্পনার ভিত্তিতে মানুষকে পয়দা করা হয়েছে তা যখন নির্বাচনের স্বাধীনতা এবং কুফরী ও ঈমানের নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত তখন যে জাতি নিজে অসৎ পথে এগিয়ে যেতে চায় আল্লাহ তাকে জোর করে সৎ পথে নিয়ে যাবেন এটা কেমন করে হতে পারে? কোন জাতি যখন নিজের নির্বাচনের ভিত্তিতে মানুষ তৈরীর এমন এক কারখানা বানিয়েছে যার ছাঁচ থেকে সবচেয়ে বড় অসৎ, ব্যভিচারী, জালেম ও ফাসেক লোক তৈরী হয়ে বেরিয়ে আসবে, তখন আল্লাহ কেন সরাসরি হস্তক্ষেপ করে সেখানে এমন সব জন্মগত সৎলোক সরবরাহ করবেন যারা তার বিকৃত ছাঁচগুলোকে ঠিক করে দেবে? এ ধরনের হস্তক্ষেপ আল্লাহর রীতি বিরোধী। সৎ ও অসৎ উভয় ধরনের লোক প্রত্যেক জাতি নিজেই সরবরাহ করবে। যে জাতি সমষ্টিগতভাবে অসৎ পথ পছন্দ করবে, যার মধ্য থেকে সততার ঝাণ্ডা বুলন্দ করার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ লোক এগিয়ে আসবে না এবং যে তার সমাজ ব্যবস্থায় সংস্কার প্রচেষ্টার বিকশিত হওয়া ও সমৃদ্ধি লাভ করার কোন অবকাশই রাখবে না, আল্লাহ তাকে জোর করে সৎ বানাতে যাবেন কেন? তিনি তো তাকে সেই পরিণতির দিকে এগিয়ে দেবেন যা সে নিজের জন্য নির্বাচন করে নিয়েছে। তবে আল্লাহর রহমতের অধিকারী যদি কোন জাতি হতে পারে তাহলে সে হবে একমাত্র সেই জাতি যার মধ্যে এমন বহু লোকের জন্ম হবে যারা নিজেরা সৎকর্মশীলতা, কল্যাণ ও ন্যায়ের দাওয়াতে সাড়া দেবে এবং এ সঙ্গে নিজেদের সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে সংস্কার সাধনকারীদের কাজ করতে পারার মতো পরিবেশ ও যোগ্যতা টিকিয়ে রাখবে। (আরো বেশী ব্যাখ্যার জন্য দেখুন আনআম ২৪ টীকা)

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

কুরআন মাজীদে এ বিষয়টা বার বার স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা ইচ্ছা করলে সমস্ত মানুষকে জোরপূর্বক একই দীনের অনুসারী বানাতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি এ কারণে যে, বিশ্ব-জগত সৃষ্টি ও তাতে মানুষকে পাঠানোর মূল উদ্দেশ্য মানুষকে পরীক্ষা করা। অর্থাৎ, তাকে ভালো-মন্দের পার্থক্য শিখিয়ে এই সুযোগ দিয়ে দেওয়া, যাতে সে নিজ এখতিয়ার ও পছন্দ মত দুই পথের মধ্যে যে কোনওটি অবলম্বন করতে পারে। এর দ্বারা তার পরীক্ষা হয়ে যায় যে, সে নিজ ইচ্ছা ও পছন্দের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে জান্নাত অর্জন করে, না তার ভুল ব্যবহারের পরিণতিতে জাহান্নামের উপযুক্ত হয়ে যায়। এই পরীক্ষার লক্ষ্যেই আল্লাহ তাআলা কাউকে তার বিনা ইচ্ছায় বিশেষ কোনও পথে চলতে বাধ্য করেননি।

তাফসীরে জাকারিয়া

১১৯. তবে তারা নয়, যাদেরকে আপনার রব দয়া করেছেন এবং তিনি তাদেরকে এজন্যেই সৃষ্টি করেছেন। আর আমি জিন ও মানুষ উভয় দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করবই, আপনার রবের এ কথ পূর্ণ হয়েছে।(১)

(১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জান্নাত ও জাহান্নাম তাদের প্রভুর দরবারে বিবাদ করবে। জান্নাত বলবেঃ হে রব! আমার কাছে শুধু দূর্বল ও পতিত লোকজনই প্রবেশ করছে। আর জাহান্নাম বলবে, হে রব! আমাকে অহংকারীদের দ্বারা প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। তখন আল্লাহ্ তা'আলা জান্নাতকে বলবেনঃ “তুমি আমার রহমত, আর জাহান্নামকে বলবেনঃ তুমি আমার আযাব। যাকে ইচ্ছা সেখানে পৌছাব। তবে তোমাদের উভয়কে পূর্ণ করার দায়িত্ব আমারই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ “তবে জান্নাতে যাওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের কাউকে সামান্যতম যুলুমও করবেন না। আর জাহান্নামের জন্য তিনি কিছু সৃষ্টি করবেন যা দ্বারা তিনি তা পুরা করবেন। তারপরও সে বলতে থাকবেঃ আর বেশী আছে কি? তিন বার বলবে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ জাহান্নামে তাঁর পবিত্র পা রাখবেন ফলে তা পূর্ণ হয়ে যাবে। তার একাংশ অপরাংশের সাথে মিলিত হয়ে যাবে। এবং বলবেঃ কাত্ব, কাত্ব, কাত্ব। (অর্থাৎ পূর্ণ হয়ে যাওয়ার শব্দ)। (বুখারীঃ ৭৪৪৯)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(১১৯) তবে যাদের প্রতি তোমার প্রতিপালক দয়া করেন তারা নয়, আর এ জন্যেই তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন(1) এবং ‘আমি জীন ও মানুষ উভয় দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করবই’ তোমার প্রতিপালকের এই বাণী পূর্ণ হবেই। (2)

(1) ولذلك (এই জন্যই) শব্দে ‘এই’ বলতে কি বুঝানো হয়েছে? অনেকে ‘মতভেদ’ এবং অনেকে ‘দয়া’ বুঝিয়েছেন। উভয় অবস্থাতেই উদ্দেশ্য এই যে, আমি মানুষ জাতিকে পরীক্ষার জন্য সৃষ্টি করেছি। যে ব্যক্তি সত্য দ্বীনের বিপরীত পথ অবলম্বন করবে, সে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হবে। আর যে তা বরণ ও গ্রহণ করে নেবে, সে কৃতকার্য এবং আল্লাহর রহমতের অধিকারী হবে।

(2) অর্থাৎ, আল্লাহর লিখিত তকদীরে ও ফায়সালাতে এ কথা নির্ধারিত হয়ে আছে যে, কিছু মানুষ জান্নাত ও কিছু মানুষ জাহান্নামের অধিকারী হবে এবং জান্নাত ও জাহান্নামকে মানুষ ও জীন দ্বারা পরিপূর্ণ করা হবে। যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, নবী (সাঃ) বলেছেন, ‘‘জান্নাত ও জাহান্নাম একদা আপোসে ঝগড়া আরম্ভ করল; জান্নাত বলল, কি ব্যাপার আমার মাঝে কেবল তারাই আসবে, যারা দুর্বল ও সমাজের নিম্নস্তরের লোক? জাহান্নাম বলল, আমার ভিতরে তো বড় বড় পরাক্রমশালী ও অহংকারী মানুষরা থাকবে।’’ আল্লাহ তাআলা জান্নাতকে বললেন, ‘তুমি আমার রহমত, তোমার দ্বারা আমি যাকে চাইব, রহম করব।’ আর জাহান্নামকে বললেন, ‘তুমি আমার শাস্তি, তোমার দ্বারা আমি যাকে চাইব, শাস্তি দেব।’ আল্লাহ তাআলা জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়কে পরিপূর্ণ করবেন। জান্নাতে সর্বদা তাঁর অনুগ্রহ ও দয়া থাকবে। জান্নাত খালি থাকলে পরিশেষে আল্লাহ তাআলা এমন সৃষ্টি সৃজন করবেন যারা জান্নাতের অবশিষ্ট স্থানে বসবাস করবে। আর জাহান্নাম, জাহান্নামীদের সংখ্যাধিক্য সত্ত্বেও যখন আল্লাহ জিজ্ঞাসা করবেন, ‘তুমি পরিপূর্ণ হয়েছ কি?’ তখন সে ‘আরো আছে কি?’ বলে আওয়াজ দেবে। পরিশেষে আল্লাহ তাআলা তাতে নিজ পা রেখে দেবেন, যার ফলে জাহান্নাম ‘বাস! বাস! তোমার মর্যাদার কসম!’ বলে আওয়াজ দেবে।’’ (বুখারী)