ফাকালাল মালাউল্লাযীনা কাফারূ মিন কাওমিহী মা-নার-কা ইল্লা-বাশারম মিছলানাওয়ামা-নার-কাততাবা‘আকা ইল্লাল্লাযীনা হুম আর-যিলুনা-বা-দিয়ারর’ই ওয়ামানার-লাকুম ‘আলাইনা-মিন ফাদলিম বাল নাজুন্নুকুম ক-যিবীন।উচ্চারণ
জবাবে সেই কওমের সরদাররা, যারা তার কথা মানতে অস্বীকার করেছিল, বললোঃ “আমাদের দৃষ্টিতে তুমি তো ব্যস আমাদের মতো একজন মানুষ বৈ আর কিছুই নও। ৩১ আর আমরা তো দেখছি আমাদের সমাজের মধ্যে যারা অত্যন্ত নিকৃষ্ট ও নিম্ন শ্রেণীর ছিল তারাই কোন প্রকার চিন্তা-ভাবনা না করে তোমার অনুসরণ করেছে। ৩২ আমরা এমন কোন জিনিসও দেখছি না যাতে তোমরা আমাদের চেয়ে অগ্রবর্তী আছো। ৩৩ বরং আমরা তো তোমাদের মিথ্যাবাদী মনে করি।” তাফহীমুল কুরআন
তার সম্প্রদায়ের যেই নেতৃবর্গ কুফর অবলম্বন করেছিল, তারা বলতে লাগল, আমরা তো তোমাকে আমাদের মতই মানুষ দেখছি, এর বেশি কিছু নয়। আমরা আরও দেখছি তোমার অনুসরণ করছে কেবল সেই সব লোক, যারা আমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বহীন এবং তাও ভাসা-ভাসা চিন্তার ভিত্তিতে এবং আমরা তো আমাদের উপর তোমাদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব দেখতে পাচ্ছি না; বরং আমাদের ধারণা তোমরা সকলে মিথ্যাবাদী।মুফতী তাকী উসমানী
অতঃপর তার সম্প্রদায়ের মধ্যে যে সব নেতৃস্থানীয় লোক কাফির ছিল তারা বলতে লাগলঃ আমরাতো তোমাকে আমাদেরই মত মানুষ দেখতে পাচ্ছি; আর আমরা দেখছি যে, শুধু ঐ লোকেরাই তোমার অনুসরণ করছে যারা আমাদের মধ্যে নিতান্তই হীন ও ইতর, কোন রকম চিন্তা-ভাবনা না করেই; আর আমাদের উপর তোমাদের কোন শ্রেষ্ঠত্বও আমরা দেখছিনা, বরং আমরা তোমাদেরকে মিথ্যাবাদী বলে মনে করছি।মুজিবুর রহমান
তখন তাঁর কওমের কাফের প্রধানরা বলল আমরা তো আপনাকে আমাদের মত একজন মানুষ ব্যতীত আর কিছু মনে করি না; আর আমাদের মধ্যে যারা ইতর ও স্থুল-বুদ্ধিসম্পন্ন তারা ব্যতীত কাউকে তো আপনার আনুগত্য করতে দেখি না এবং আমাদের উপর আপনাদের কেন প্রাধান্য দেখি না, বরং আপনারা সবাই মিথ্যাবাদী বলে আমারা মনে করি।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
তার সম্প্রদায়ের প্রধানেরা, যারা ছিল কাফির তারা বলল, ‘আমরা তোমাকে তো আমাদের মত মানুষ ব্যতীত কিছু দেখছি না; আমরা তো দেখছি, তোমার অনুসরণ করছে তারাই, যারা আমাদের মধ্যে বাহ্য দৃষ্টিতেই অধম এবং আমরা আমাদের ওপর তোমাদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব দেখছি না; বরং আমরা তোমাদেরকে মিথ্যাবাদী মনে করি।’ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
অতঃপর তার কওমের নেতৃস্থানীয়রা, যারা কুফরী করেছিল, তারা বলল, ‘আমরা তো তোমাকে আমাদের মত একজন মানুষ ছাড়া আর কিছু দেখছি না এবং আমরা দেখছি যে, কেবল আমাদের নীচু শ্রেণীর লোকেরাই বিবেচনাহীনভাবে তোমার অনুসরণ করেছে। আর আমাদের উপর তোমাদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব আমরা দেখছি না; বরং আমরা তোমাদেরকে মিথ্যাবাদী মনে করছি’।আল-বায়ান
জওয়াবে তার জাতির প্রধানগণ- যারা অবিশ্বাসী ছিল তারা বলল, ‘আমরা তোমাকে আমাদের মত মানুষ ছাড়া অন্য কিছু দেখছি না, আর প্রকাশ্যতঃ আমাদের হীন অধম লোকগুলো ছাড়া তোমার পথ অবলম্বন করতে দেখছি না, আমাদের উপর তোমার কোন প্রাধান্যও দেখছি না, বরং আমরা তোমাদেরক মিথ্যুক বলেই মনে করি।’তাইসিরুল
কিন্তু তাঁর সম্প্রদায়ের মধ্যের যারা অবিশ্বাস করেছিল তাদের প্রধানরা বললে -- "আমরা তো তোমাকে আমাদের মতো একজন মানুষ বই দেখছি না, আর আমরা তোমাকে দেখছি না যে তোমাকে তারা ছাড়া এমন অন্য কেউ অনুসরণ করছে যারা হচ্ছে প্রথম দৃষ্টিতেই আমাদের মধ্যে অধম, আর আমরা তোমাদের মধ্যে আমাদের চাইতে কোনো গুণপনাও দেখছি না, বরং আমরা তোমাদের মনে করি মিথ্যাবাদী।"মাওলানা জহুরুল হক
৩১
মক্কার লোকেরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে যে মূর্খ জনোচিত আপত্তি উত্থাপন করতো এখানেও সেই একই আপত্তি উত্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আমাদেরই মতো একজন মামুলি পর্যায়ের লোক, খায় দায়, চলাফেরা করে, ঘুমায় আবার জেগে থাকে, ছেলেমেয়ের বাপ হয়, তাকে আমরা কেমন করে আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী নিযুক্ত হয়ে এসেছেন বলে মেনে নিতে পারি? (দেখুন সূরা ইয়াসীন, ১১ টীকা)
৩২
মক্কার বড় বড় ও উঁচু শ্রেণীর লোকেরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে যে কথা বলতো এখানেও তারই পুনরাবৃত্তি হয়েছে। তারা বলতো, এর সাথে কারা আছে? ক’জন মাথা গরম ছোকরা, যাদের দুনিয়ার কোন অভিজ্ঞতাই নেই। অথবা কয়েকজন গোলাম এবং নিম্ন শ্রেণীর কিছু সাধারণ মানুষ, যাদের বুদ্ধিশুদ্ধি নেই এবং বিশ্বাসের দিক দিয়েও কম জোর। (দেখুন সূরা আন’আম ৩৪-৩৭ টীকা এবং সূরা ইউনূস ৭৮ টীকা)।
৩৩
অর্থাৎ তোমরা বলে থাকো, আমাদের প্রতি রয়েছে আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর রহমত এবং যারা আমাদের পথ অবলম্বন করেনি তারা আল্লাহর গযবের সম্মুখীন হয়েছে। তোমাদের এসব কথার কোন আলামত আমাদের নজরে পড়ে না। অনুগ্রহ যদি হয়ে থাকে তাহলে তা আমাদের প্রতি হয়েছে। কারণ আমরা ধন-দৌলত ও শান-শওকতের অধিকারী এবং একটি বিরাট জনগোষ্ঠী আমাদের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছে। অন্যদিকে তোমরা কপর্দক শূন্য দেউলিয়ার দল, কোন্ বিষয়ে তোমরা আমাদের চেয়ে এগিয়ে আছো? তোমাদের আল্লাহর প্রিয়পাত্র মনে করা হবে কেন?
২৭. অতঃপর তার সম্প্রদায়ের নেতারা, যারা কুফর করেছিল, তারা বলল(১), আমরা তো তোমাকে আমাদের মত একজন মানুষ ছাড়া কিছু দেখছি না; আমরা তো দেখছি, তোমার অনুসরণ করছে তারাই, যারা আমাদের মধ্যে বাহ্যিক দৃষ্টিতেই অধম এবং আমরা আমাদের উপর তোমাদের কোন শ্ৰেষ্ঠত্ব দেখছি না(২), বরং আমরা তোমাদেরকে মিথ্যাবাদী মনে করি।
(১) নূহ আলাইহিস সালাম যখন তার জাতিকে ঈমানের দাওয়াত দিলেন, তখন জাতি তার নবুওয়াত ও রেসালাতের উপর কয়েকটি আপত্তি উত্থাপন করেছিল। নুহ আলাইহিস সালাম আল্লাহর হুকুমে তাদের প্রতিটি উক্তির উপযুক্ত জবাব দান করেন। আলোচ্য আয়াতসমুহে এ ধরনের একটি কথোপকথন বর্ণিত হয়েছে।
(২) অর্থাৎ কওমের জাহেল লোকেরা সমাজের দরিদ্র ও দুর্বল শ্রেনীকে ইতর ও ছোটলোক সাব্যস্ত করেছিল- যাদের কাছে পার্থিব ধন-সম্পদ ও বিষয় বৈভব ছিল না। মূলত তা ছিল তাদের জাহেলী চিন্তাধারার ফল। প্রকৃতপক্ষে ইজ্জত কিংবা অসম্মান ধন দৌলত বিদ্যা বুদ্ধির অধীন নয়। ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, সম্পদ এবং সম্মানের মোহ একটি নেশার মত, যা অনেক সময় সত্য ন্যায়কে গ্রহন করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে, সত্য ও ন্যায় হতে বিচ্যুত করে। দরিদ্র ও দুর্বলদের সম্মুখে যেহেতু এরূপ কোন অন্তরায় থাকে না কাজেই তারাই সর্বাগ্রে সত্য ন্যায়কে বরণ করতে এগিয়ে আসে। প্রাচীনকাল হতে যুগে যুগে দরিদ্র দুর্বলরাই সমসাময়িক নবীগণের উপর সর্বপ্রথম ঈমান এনেছিল। (কুরতুবী)
অনুরূপভাবে রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস যখন ঈমানের আহ্বান সম্বলিত রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র চিঠি লাভ করল, তখন গুরুত্ব সহকারে নিজেই সেটার তদন্ত তাহকীক করতে মনস্থ করে। কেননা, সে তাওরাত ও ইঞ্জিল কিতাব পাঠ করে সত্য নবীগণের আলামত ও লক্ষণাদি সম্পর্কে পুঙ্খানুপঙ্খরূপে পারদর্শী ছিল। কাজেই তৎকালে আরব দেশের যেসব ব্যবসায়ী সিরিয়ায় উপস্থিত ছিল, তাদের একত্রিত করে উক্ত আলামত ও লক্ষণাদি সম্পর্কে কতিপয় প্রশ্ন করে। তন্মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিল যে, তার অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সমাজের দরিদ্র ও দুর্বল শ্রেণী ঈমান এনেছে নাকি ধনী শ্রেণী? তারা উত্তরে বলেছিল, বরং দরিদ্র ও দূর্বল শ্রেণী। তখন হিরাক্লিয়াস মন্তব্য করল, এটা তো সত্য রাসূল হওয়ার লক্ষণ। কেননা, যুগে যুগে দরিদ্র দুর্বল শ্রেণীই প্রথমে নবীগণের আনুগত্য স্বীকার করেছে। (দেখুন, বুখারীঃ ৭, ৫১, মুসলিমঃ ১৭৭৩)
মোদ্দাকথাঃ দরিদ্র ও দুর্বল লোকদেরকে ইতর এবং হেয় মনে করা চরম মূর্খতা ও অন্যায়। প্রকৃতপক্ষে ইতর ও ঘৃণিত তারাই যারা স্বীয় সৃষ্টিকর্তা পালনকর্তা মালিককে চিনে না, তার নির্দেশ মেনে চলে না। সুফিয়ান সাওরী রাহেমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, ইতর ও হীন কে? তিনি উত্তর দিলেন- যারা বাদশাহ ও রাজকর্মচারীদের খোশামোদ- তোষামোদে লিপ্ত হয়, তারাই হীন ও ইতর। আল্লামা ইবনুল আরাবী রাহেমাহুল্লাহ বলেন, যারা দ্বীন বিক্রি করে দুনিয়া হাসিল করে তারাই হীন। পুনরায় প্রশ্ন করা হল- সবচেয়ে হীন কে? তিনি জবাব দিলেন যে ব্যক্তি অন্যের পার্থিব স্বার্থসিদ্ধির জন্য নিজের দ্বীন ও ঈমানকে বরবাদ করে। ইমাম মালেক রাহেমাহুল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের নিন্দা-সমালোচনা করে, সে-ই ইতর ও অর্বাচীন। (কুরতুবী) কারণ, সাহাবায়ে কিরামই সমগ্র উম্মতের সর্বাপেক্ষা হিত সাধনকারী। তাদের মাধ্যমেই ঈমানের অমূল্য দৌলত ও শরীআতের আহকাম সকলের কাছে পৌছেছে।
(২৭) তার সম্প্রদায়ের মধ্যে যেসব নেতৃস্থানীয় লোক অবিশ্বাসী ছিল, তারা বলল, ‘আমরা তো তোমাকে আমাদেরই মত মানুষ দেখতে পাচ্ছি।(1) আর আমরা দেখছি যে, শুধু ঐ লোকেরাই না বুঝে(2) তোমার অনুসরণ করছে, যারা আমাদের মধ্যে নিতান্তই হীন।(3) আর আমাদের উপর তোমাদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব আমরা দেখছি না; বরং আমরা তোমাদেরকে মিথ্যাবাদী বলে মনে করছি।’
(1) এটা সেই সন্দেহ, যা এর পূর্বে কয়েক স্থানে উল্লিখিত হয়েছে, তা হল কাফেরদের নিকট কোন মানুষের নবী ও রসূল হওয়াটা বড় আশ্চর্যের বিষয় ছিল। যেমন বর্তমানে বিদআতীদেরকেও আশ্চর্য লাগে এবং তারা রসূল (সাঃ)-এর মানুষ হওয়ার কথা অস্বীকার করে।
(2) সর্বযুগে সত্যের ইতিহাসে এ কথা বিদ্যমান যে, শুরুতে দ্বীনের উপর ঈমান আনয়নকারী সর্বদা তারাই হয়ে থাকে, যাদেরকে সমাজে অসহায় ও হীন মনে করা হয় এবং সম্মানী ও সমৃদ্ধিশালী ব্যক্তিরা তা থেকে বঞ্চিত থাকে। এমনকি এটা পয়গম্বরগণের অনুসারীদের পরিচয় বলে গণ্য হয়েছে। সুতরাং যখন রোমের বাদশাহ হিরাকল আবু সুফিয়ানকে নবী (সাঃ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার সময় এ কথাটিও জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, ‘‘সমাজের সম্মানিত সবল লোকেরা তাঁর আনুগত্য করছে, না দুর্বল শ্রেণীর লোকেরা?’’ তখন আবু সুফিয়ান উত্তরে বলেছিলেন, ‘‘দুর্বল শ্রেণীর লোকেরা।’’ এ কথা শুনে হিরাকল বলেছিলেন, ‘‘রসূলদের অনুসারী এরূপ লোকেরাই হয়ে থাকে।’’ (বুখারী) কুরআন কারীমেও বর্ণনা করা হয়েছে যে, সমৃদ্ধিশালী ব্যক্তিরাই সর্বপ্রথম পয়গম্বরদেরকে মিথ্যাজ্ঞান করতে থেকেছে। (যুখরুফঃ ২৩) আর মু’মিনদের পার্থিব অবস্থা এই ছিল বলে কাফেররা তাঁদেরকে তুচ্ছ ও হেয় প্রতিপন্ন করত। তাছাড়া প্রকৃতপক্ষে সত্যের অনুসারীগণই সম্মানী ও মর্যাদাসম্পন্ন, তাতে তাঁরা ধন-সম্পদের দিক থেকে যতই দুর্বল হন। আর সত্য অস্বীকারকারীরাই হীন ও অসম্মানী; যদিও তারা পার্থিব বিষয়ে সমৃদ্ধিশালী হয়।
(3) হকপন্থী মু’মিনগণ যেহেতু আল্লাহ ও রসূলের বিধানের বিপরীত নিজের জ্ঞান ও রায় ব্যবহার করে না, সেহেতু বাতিলপন্থীরা ভাবে যে, এরা বুঝার জন্য চিন্তা-ভাবনা করে না; বরং আল্লাহর রসূল তাদেরকে যে দিকে ঘুরায় সে দিকেই ঘুরে যায়, যে বস্তু থেকে বিরত থাকতে বলে, তা থেকে বিরত থাকে। অথচ এটাও মু’মিনদের একটি বড় গুণ; বরং ঈমানের অপরিহার্য চাহিদা। কিন্তু কাফের ও বাতিলপন্থীদের নিকট উক্ত গুণও একটি ত্রুটি।