ওয়া আন আকিম ওয়াজহাকা লিদ্দীনি হানীফাওঁ ওয়ালা-তাকূনান্না মিনাল মুশরিকীন।উচ্চারণ

আমাকে মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হবার জন্য হুকুম দেয়া হয়েছে। আর আমাকে বলা হয়েছে, তুমি একনিষ্ঠ হয়ে নিজেকে ঠিকভাবে এ দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত করো। ১০৮ এবং কখখোনো মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। ১০৯ তাফহীমুল কুরআন

এবং (আমাকে) এই (বলা হয়েছে) যে, তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজ চেহারাকে এই দীনের দিকেই কায়েম রাখবে এবং কিছুতেই মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।মুফতী তাকী উসমানী

আর এটাও যে, নিজকে নিজে এই ধর্মের প্রতি এভাবে নিবিষ্ট করে রাখবে যে, অন্যান্য সকল তরীকা হতে পৃথক হয়ে যাও, আর কখনও মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়োনা।মুজিবুর রহমান

আর যেন সোজা দ্বীনের প্রতি মুখ করি সরল হয়ে এবং যেন মুশরেকদের অন্তর্ভুক্ত না হই।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

আর এর এই যে, ‘তুমি একনিষ্ঠভাবে দীনে প্রতিষ্ঠিত হও এবং কখনই মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আর (এ নির্দেশ) যে, ‘তুমি নিজেকে দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখ একনিষ্ঠভাবে এবং মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না’।আল-বায়ান

আর আমাকে এও আদেশ দেয়া হয়েছে যে, তুমি দ্বীনের দিকে তোমার মুখ প্রতিষ্ঠিত কর একনিষ্ঠভাবে, আর তুমি কক্ষনো মুশরিকদের মধ্যে শামিল হয়ো না।তাইসিরুল

আর তোমার মুখ ধর্মের প্রতি একনিষ্ঠভাবে প্রতিষ্ঠিত রাখো, আর কখনো মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

১০৮

এ দাবী কত জোরালো, তা গভীরভাবে প্রণিধানযোগ্য। বক্তব্য এভাবেও বলা যেতো, “তুমি এ দ্বীন অবলম্বন করো” অথবা “এ দ্বীনের পথে চলো” কিংবা “এ দ্বীনের অনুগত ও অনুসারী হয়ে যাও।” কিন্তু মহান আল্লাহ‌ এ বর্ণনাভঙ্গিকে ঢিলেঢালা সাব্যস্ত করেছেন। এ দ্বীন যেমন অবিচল ও তেজোদ্দীপ্ত আনুগত্য চায় এ দুর্বল শব্দসমূহের সাহায্যে তা প্রকাশ করা সম্ভব হতো না। তাই নিজের দাবী তিনি নিম্নোক্ত শব্দাবলীর মাধ্যমে পেশ করেছেনঃ أَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا

এখানে أَقِمْ وَجْهَكَ(আকিম ওয়াজহাকা) এর শাব্দিক মানে হচ্ছে, “নিজের চেহরাকে স্থির করে দাও।” এর অর্থ, তুমি একই দিকে মুখ ফিরিয়ে থাকো। নড়াচড়া করো না এবং এদিক ওদিক ফিরো না। সামনে, পেছনে, ডাইনে, বাঁয়ে মুড়ে যেয়ো না। একেবারে নাক বরাবর সোজা পথে দৃষ্টি রেখে চলো, যে পথ তোমাকে দেখানো হয়েছে। এটি বড়ই শক্ত বাঁধন ছিল। কিন্তু এখানেই ক্ষান্ত থাকা হয়নি। এর ওপর আরো একটু বাড়তি বাধন দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে حَنِيفًا(হানিফা) অর্থাৎ সবদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে শুধুমাত্র একদিকে মুখ করে থাকো। কাজেই দাবী হচ্ছে, এ দ্বীন, আল্লাহর বন্দেগীর এ পদ্ধতি এবং জীবন যাপন প্রণালীর ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহ‌ রব্বুল আলামীনের উপসনা আরাধনা, ইবাদত-বন্দেগী, দাসত্ব আনুগত্য করতে ও হুকুম মেনে চলতে হবে। এমন একনিষ্ঠভাবে করতে হবে যে, অন্য কোন পদ্ধতির দিকে সামান্যতম ঝুঁকে পড়াও যাবে না। যেসব পথ তুমি ইতিপূর্বে পরিত্যাগ করে এসেছো এ পথে এসে সেই ভুল পথগুলোর সাথে সামান্যতম সম্পর্কও রাখবে না এবং দুনিয়ার মানুষ যেসব বাঁকা পথে চলেছে সেসব পথের দিকে একবার ভুল করেও তাকাবে না।

১০৯

অর্থাৎ যারা আল্লাহর সত্তা, তার গুণাবলী, অধিকার ও ক্ষমতা-ইখতিয়ারে কোনভাবে অন্য কাউকে শরীক করে কখখোনো তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। এ অন্য কেউ তারা নিজেরাও হতে পারে আবার অন্য কোন মানুষ, মানব গোষ্ঠী, কোন আত্মা, জিন, ফেরেশতা অথবা কোন বস্তুগত, কাল্পনিক বা আনুমানিক সত্তাও হতে পারে। কাজেই পূর্ণ অবিচলতা সহকারে নির্ভেজাল তাওহীদের পথ অনুসরণ করার মত ইতিবাচক পদ্ধতির মধ্যেই শুধু দাবীকে আটকে রাখা হয়নি। বরং নেতিবাচক অবস্থায় ক্ষেত্রে এমনসব লোকের থেকে আলাদা হয়ে যাবার দাবী জানানো হয়েছে যারা কোন না কোন প্রকারে শিরক করে থাকে। শুধু আকীদা বিশ্বাসের ক্ষেত্রেই নয় কাজে কর্মে ও ব্যক্তি জীবন ধারায়ই নয় সামষ্টিক জীবন বিধানের ক্ষেত্রেও, ইবাদতগাহ ও উপাসনালয়েই নয় শিক্ষায়তনেও, আদালত গৃহে, আইন প্রণয়ন পরিষদে, রাজনৈতিক, মঞ্চে, অর্থনৈতিক বাজারে সর্বত্রই যারা নিজেদের চিন্তা ও কর্মের সমগ্র ব্যবস্থাই আল্লাহর আনুগত্য ও গায়রুল্লাহর আনুগত্যের মিশ্রণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে। সব জায়গাই তাদের পদ্ধতি থেকে নিজেদের পদ্ধতি আলাদা করে নাও। তাওহীদের অনুসারীরা জীবনের কোন ক্ষেত্রে ও বিভাগেও শিরকের অনুসারীদের অনুসৃত পথে পায়ের সাথে পা মিলিয়ে চলতে পারে না। এক্ষেত্রে তাদের শিরকের অনুসারীদের পেছনে চলার তো প্রশ্নই ওঠে না এবং এভাবে পেছনে চলার পরও তাদের তাওহীদবাদের দাবী ও চাহিদা নিশ্চিন্ত পূরণ হতে থাকবে একথা কল্পনাই করা যায় না।

তারপর শুধুমাত্র সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন শিরক (শিরকে জলী) থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়নি বরং অস্পষ্ট শিরক (শিরকে খফী) থেকেও পুরোপুরি ও কঠোরভাবে দূরে থাকারও আদেশ দেয়া হয়েছে। বরং অস্পষ্ট শিরক আরো বেশী বিপজ্জনক এবং তার ব্যাপারে সতর্ক থাকার প্রয়োজন আরো অনেক বেশী। কোন কোন অজ্ঞ ব্যক্তি অস্পষ্ট শিরককে হালকা শিরক মনে করে থাকেন। তারা ধারণা করেন, এ ধরনের শিরকের ব্যাপারটা সুস্পষ্ট শিরকের মত অতোটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। অথচ অস্পষ্ট (খফী) মানে হালকা নয় বরং গুপ্ত ও গোপনে লুকিয়ে থাকা। এখন চিন্তা করার ব্যাপার হচ্ছে, যে শত্রু দিন-দুপুরে চেহারা উন্মুক্ত করে সামনে এসে যায় সেই বেশী বিপজ্জনক, না যে কাপড়ের মধ্যে লুকিয়ে বা বন্ধু ছদ্মাবরণে এসে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করছে সেই বেশী বিপজ্জনক? যে রোগের আলামত একেবারে পরিষ্কার দেখা যায় সেটি বেশী ধ্বংসকারক, না যেটি দীর্ঘকাল সুস্থতার ছদ্মাবরণে ভেতরে ভেতরে স্বাস্থ্যকে কুরে কুরে খেয়ে ফেলে সেই বেশী ধ্বংসকর? যে শিরককে প্রত্যেক ব্যক্তি এক নজর দেখেই বলে দেয় এটি শিরক তার সাথে তাওহীদ দ্বীনের সংঘাত একেবারে মুখোমুখি। কিন্তু যে শিরককে বুঝাতে হলে গভীর দৃষ্টি ও তাওহীদের দাবীসমূহের নিবিড় ও অতলস্পর্শী উপলব্ধি প্রয়োজন, সে তার অদৃশ্য শিকড়গুলো দ্বীনের ব্যবস্থার মধ্যে এমনভাবে ছড়িয়ে দেয় যে, সাধারণ তাওহীদবাদীরা তা ঘুণাক্ষরেও টের পায় না তারপর ধীরে ধীরে অবচেতন পদ্ধতিতে সে দ্বীনের সার পদার্থসমূহ এমনভাবে খেয়ে ফেলে যে, কোথাও কোন বিপদ-ঘন্টা বাজাবার সুযোগই আসে না।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

তাফসীরে জাকারিয়া

১০৫. আর এটাও যে, আপনি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে দ্বীনে প্রতিষ্ঠিত রাখুন(১) এবং কখনই মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না(২),

(১) অর্থাৎ “নিজের চেহারাকে স্থির করে নিন।” এর অর্থ, আপনি এদিক ওদিক, সামনে, পেছনে, ডানে, বাঁয়ে মুড়ে যাবেন না। একেবারে বরাবর সোজা পথে দৃষ্টি রেখে চলুন, যেপথ আপনাকে দেখানো হয়েছে। তারপর বলা হয়েছে - অর্থাৎ সব দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে শুধুমাত্র একদিকে মুখ করে থাকুন। কাজেই দাবী হচ্ছে, এ দ্বীন, আল্লাহর বন্দেগীর এ পদ্ধতি এবং জীবন যাপন প্রণালীর ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইবাদত-বন্দেগী, দাসত্ব, আনুগত্য করতে ও হুকুম মেনে চলতে হবে। এমন একনিষ্ঠভাবে করতে হবে যে, অন্য কোন পদ্ধতির দিকে সামান্যতম ঝুঁকে পড়াও যাবে না। অন্য আয়াতেও সে নির্দেশ এসেছে, যেমন, “কাজেই আপনি একনিষ্ঠ হয়ে নিজ চেহারাকে দ্বীনে প্রতিষ্ঠিত রাখুন। আল্লাহর ফিতরাত (স্বাভাবিক রীতি বা দ্বীন ইসলাম), এর উপর (চলার যোগ্য করে) তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটাই প্রতিষ্ঠিত দ্বীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না (সূরা আর-রুম: ৩০)

(২) অর্থাৎ যারা আল্লাহর সত্তা, তাঁর গুণাবলী, অধিকার ও ক্ষমতা-ইখতিয়ারে কোনভাবে অন্য কাউকে শরীক করে কখনো তাদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “আমি তোমাদের উপর দাজ্জালের চেয়েও যা বেশী ভয় করছি তা কি বলে দিবনা? আমরা বললামঃ হ্যাঁ, তিনি বললেনঃ ‘শির্কে খফী’। আর তা হলোঃ কোন মানুষ অপরের সন্তুষ্টি লাভের জন্য কোন নেক আমল করা। (মুসনাদে আহমাদ ৩/৩০)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(১০৫) (আর আল্লাহ আমাকে এও আদেশ করেছেন যে), তুমি নিজেকে ধর্মের উপর একনিষ্ঠভাবে প্রতিষ্ঠিত রাখ(1) এবং কখনই অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।

(1) حنيف শব্দের অর্থ হল, একনিষ্ঠ। অর্থাৎ, সকল ধর্ম ত্যাগ করে একমাত্র ইসলাম ধর্ম অবলম্বন করা এবং সব কিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে একনিষ্ঠভাবে একমাত্র আল্লাহর অভিমুখী হওয়া।