ছু ম্মা বা‘আছনা-মিম বা‘দিহিম মূছা-বিআ-য়া-তিনাইলা-ফির‘আওনা ওয়া মালাইহী ফাজালামূবিহা- ফানজু র কাইফা ক-না ‘আ-কিবাতুল মুফছিদীন।উচ্চারণ
তারপর এ জাতিগুলোর পর (যাদের কথা ওপরে বলা হয়েছে) আমার নিদর্শনসমূহ সহকারে মূসাকে পাঠাই ফেরাউন ও তার জাতির প্রধানদের কাছে। ৮৩ কিন্তু তারাও আমার নিদর্শনসমূহের ওপর জুলুম করে। ৮৪ ফলতঃ এ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কি হয়েছিল একবার দেখো। তাফহীমুল কুরআন
অতঃপর আমি তাদের সকলের পর মূসাকে আমার নিদর্শনাবলীসহ ফির‘আউন ও তার পারিষদবর্গের কাছে পাঠালাম। #%৫৯%# তারাও এর (অর্থাৎ নিদর্শনাবলীর) প্রতি অবিচার করল। সুতরাং দেখ, বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কেমন হয়েছে।মুফতী তাকী উসমানী
অতঃপর আমি মূসাকে আমার আয়াত ও নিদর্শনসহ ফির‘আউন ও তার পরিষদবর্গের নিকট পাঠালাম, কিন্তু তারা যুলম করল। সুতরাং এই বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কি হয়েছিল তা তুমি লক্ষ্য কর।মুজিবুর রহমান
অতঃপর আমি তাদের পরে মূসাকে পাঠিয়েছি নিদর্শনাবলী দিয়ে ফেরাউন ও তার সভাসদদের নিকট। বস্তুতঃ ওরা তাঁর মোকাবেলায় কুফরী করেছে। সুতরাং চেয়ে দেখ, কি পরিণতি হয়েছে অনাচারীদের।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
তাদের পর মূসাকে আমার নিদর্শনসহ ফির‘আওন ও তার পারিষদবর্গের নিকট পাঠাই ; কিন্তু তারা তা অস্বীকার করে। বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কি হয়েছিল তা লক্ষ্য কর। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
অতঃপর তাদের পরে আমি মূসাকে আমার আয়াতসমূহ সহকারে ফির‘আউন ও তার সভাসদদের কাছে পাঠিয়েছি। অতঃপর তারা এর সাথে যুলম করেছে। সুতরাং লক্ষ্য কর, ফাসাদকারীদের পরিণাম কীরূপ হয়েছিল।আল-বায়ান
তাদের পরে আমি মূসাকে আমার নিদর্শনাবলী সহকারে ফির‘আওন ও তার প্রধানদের কাছে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু সে সবের প্রতি তারা অন্যায় আচরণ প্রদর্শন করে। লক্ষ্য কর, তারপর বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণতি কেমন হয়েছিল!তাইসিরুল
অবশেষে তাদের পরে আমরা মূসাকে নিযুক্ত করেছিলাম ফিরআউন ও তার পরিষদবর্গের কাছে আমাদের নির্দেশাবলী সঙ্গে দিয়ে, কিন্তু তারা এগুলোর প্রতি অবিচার করেছিল, অতএব দেখো কেমন হয়েছিল বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম!মাওলানা জহুরুল হক
৮৩
ওপরের বর্ণিত ঘটনাগুলোর উদ্দেশ্যে হচ্ছে একথা ভালভাবে মানসপটে গেঁথে দেয়া যে, যে জাতি আল্লাহর পয়গাম পাওয়ার পর তা প্রত্যাখ্যান করে, ধ্বংসই তার অনিবার্য পরিণতি। এরপর এখন মূসা, ফেরাউন ও বনী ইসরাঈলের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে ধারাবাহিকভাবে কয়েক রুকূ' পর্যন্ত। এর মধ্যে কুরাইশ বংশীয় কাফের, ইহুদী ও মু’মিনদের কে উপরোক্ত বিষয়বস্তুটি ছাড়াও আরো কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়া হয়েছে।
এ কাহিনীর মাধ্যমে কুরাইশ বংশোদ্ভুত কাফেরদেরকে একথা বুঝাবার চেষ্টা করা হয়েছে যে, সত্যের দাওয়াতের প্রাথমিক স্তরে সত্য ও মিথ্যার শক্তির যে অনুপাত ব্যাহ্যত দেখা যায় তাতে প্রতারিত না হওয়া উচিত। সত্যের সমগ্র ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয় যে, সূচনা বিন্দুতে তার সংখ্যা এত কম থাকে যে, শুরুতে সারা দুনিয়ার মোকাবিলায় মাত্র এক ব্যক্তি সত্যের অনুসারী এবং কোন প্রকার সাজ-সরঞ্জাম ছাড়াই সে মিথ্যার বিরুদ্ধে একাকী যুদ্ধ শুরু করে দেয়। এমন এক মিথ্যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে দেয় যার পেছনে রয়েছে বড় বড় জাতি ও রাষ্ট্রের বিপুল শক্তি। তারপরও শেষ পর্যন্ত সত্যই বিজয় লাভ করে। এছাড়াও এ কাহিনীতে তাদের একথাও জানানো হয়েছে যে, সত্যের আহবায়কের মোকাবেলায় যেসব কৌশল অবলম্বন করা হয় এবং যেসব পন্থায় তার দাওয়াতকে দাবিয়ে দেবার চেষ্টা করা হয় তা কিভাবে বুমোরাং হয়ে যায়। এ সঙ্গে তাদেরকে একথাও জানানো হয় যে, সত্যের দাওয়াত প্রত্যাখ্যানকারীদের ধ্বংসের শেষ সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাদের সংশোধিত হবার ও সঠিক পথ অবলম্বন করার জন্য কত দীর্ঘ সময় দিয়ে থাকেন এবং এরপরও যখন কোন প্রকার সতর্ক বাণী, কোন শিক্ষণীয় ঘটনা এবং কোন উজ্জ্বল নিদর্শন থেকে তারা শিক্ষা গ্রহণ করে না ও প্রভাবিত হয় না তখন তিনি তাদেরকে কেমন দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দান করেন।
যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ঈমান এনেছিল এ কাহিনীর মাধ্যমে তাদেরকে দ্বিবিধ শিক্ষা দেয়া হয়েছে। এক, নিজেদের সংখ্যাল্পতা ও দুর্বলতা এবং সত্য বিরোধীদের বিপুল সংখ্যা ও শক্তি যেন তাদেরকে হিম্মতহারা না করে এবং আল্লাহর সাহায্য বিলম্বিত হতে দেখে যেন তাদের মনোবল ভেঙ্গে না পড়ে। দুই, ঈমান আনার পর যে দলই ইহুদিদের মত আচরণ করে, তারা অবশ্যি ইহুদিদের মতই আল্লাহর লানতের শিকার হয়।
বনী ইসরাঈলের সামনে তাদের শিক্ষণীয় ইতিহাস পেশ করে তাদেরকে মিথ্যার পূজারী সাজার ক্ষতিকর পরিণাম থেকে সাবধান করা হয়েছে। তাদেরকে এমন এক নবীর প্রতি ঈমান আনার দাওয়াত দেয়া হয়েছে। যিনি পূর্বের নবীগণের প্রচলিত দ্বীনকে নব রকমের মিশ্রণ মুক্ত করে আবার তার আসল আকৃতিতে পেশ করেছিলেন।
৮৪
“নিদর্শনসমূহের সাথে জুলুম করে।” অর্থাৎ সেগুলো মানে না এবং যাদুকরের কারসাজি গণ্য করে সেগুলো এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করে। যেমন কোন উচ্চাঙ্গের কবিতাকে কবিতাই নয় বরং তাকে দুর্বল বাক্য বিন্যাস গণ্য করা এবং তা নিয়ে বিদ্রূপ করা কেবল সেই কবিতাটির প্রতিই নয় বরং সমগ্র কাব্যজগত ও কাব্যচিন্তার প্রতিই জুলুমের নামান্তর। অনুরূপভাবে যেসব নিদর্শন নিজেই আল্লাহর পক্ষ থেকে হবার ব্যাপারে সুস্পষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ পেশ করে এবং যেগুলোর ব্যাপারে যাদুর সাহায্যে এমনি ধরনের নিদর্শনের প্রকাশ ঘটতে পারে বলে কোন বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি ধারণাও করতে পারে না বরং যাদুবিদ্যা বিশারদগণ যেগুলো সম্পর্কে তাদের বিদ্যার সীমানার আওতায় অনেক উর্ধ্বের বলে সাক্ষ্য দেয় সেগুলোকেও যাদু গণ্য করা কেবল ঐ নিদর্শনগুলোর প্রতিই নয় বরং সুস্থ বিবেক বুদ্ধি ও প্রকৃত সত্যের প্রতিও বিরাট জুলুম।
এখান থেকে ১৬২ নং আয়াত পর্যন্ত হযরত মূসা আলাইহিস সালামের ঘটনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। এতে ফির‘আউনের সাথে তার কথোপকথন ও উভয়ের পারস্পরিক মুকাবিলা, ফির‘আউনের নিমজ্জন ও হযরত মূসা আলাইহিস সালামের প্রতি তাওরাত নাযিলের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ছিলেন হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের চতুর্থ অধঃস্তন পুরুষ। সূরা ইউসুফে আছে, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে যখন মিসরের অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়, তখন তিনি নিজ পিতা-মাতা ও ভাইদেরকে ফিলিস্তিন থেকে মিসরে আনিয়ে নিয়েছিলেন। ইসরাঈলী বর্ণনা দ্বারা জানা যায়, হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের বংশধরগণ, যারা বনী ইসরাঈল নামে পরিচিত, মিসরেরই বাসিন্দা হয়ে যায়। মিসরের বাদশাহ তাদের জন্য নগরের বাইরে পৃথক একটি জায়গা ছেড়ে দিয়েছিল। মিসরের প্রত্যেক বাদশাকে ফির‘আউন বলা হত। হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ইন্তিকালের পর মিসরের বাদশাহের কাছে বনী ইসরাঈল নিজেদের মর্যাদা হারাতে শুরু করে, এমনকি এক পর্যায়ে বাদশাহগণ তাদেরকে নিজেদের দাস বানিয়ে নেয়। অপর দিকে তাদের মধ্যকার এক ফির‘আউন (আধুনিক গবেষণা অনুযায়ী যার নাম মিনিফ্তাহ) ক্ষমতার মদমত্ততায় নিজেকে খোদা দাবী করে বসে। এহেন পরিস্থিতিতে আল্লাহ তাআলা হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে তার কাছে নবী বানিয়ে পাঠালেন। তাঁর জন্ম, মাদয়ান অভিমুখে হিজরত, অতঃপর নবুওয়াত লাভ ইত্যাদি ঘটনাবলী ইনশাআল্লাহ সূরা তোয়াহা (সূরা নং ২০) সূরা কাসাসে (সূরা নং ২৮) আসবে। এছাড়া আরও ৩৫টি সূরায় তার ঘটনার বিভিন্ন দিক বর্ণিত হয়েছে। ফির‘আউনের সাথে তাঁর যেসব ঘটনা ঘটেছিল, এস্থলে তা বিবৃত হচ্ছে।
১০৩. তারপর আমরা তাদের পরে মূসাকে আমাদের নিদর্শনসহ ফিরআউন ও তার পরিষদবর্গের কাছে প্রেরণ করেছি; কিন্তু তারা সেগুলোর সাথে অত্যাচার করেছে।(১) সুতরাং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কি হয়েছিল তা লক্ষ্য করুন।
(১) আল্লাহর আয়াত বা নিদর্শনের প্রতি যুলুম করার অর্থ হল এই যে, আল্লাহ্ তা'আলার আয়াত বা নিদর্শনের কোন মর্যাদা বুঝেনি। সেগুলোর শুকরিয়া আদায় করার পরিবর্তে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছে এবং ঈমানের পরিবর্তে কুফরী অবলম্বন করেছে। কারণ যুলুমের প্রকৃত সংজ্ঞা হচ্ছে- কোন বস্তু বা বিষয়কে তার সঠিক স্থান কিংবা সঠিক সময়ের বিপরীতে ব্যবহার করা। সে হিসেবে ফিরআউন মূসা আলাইহিস সালাম যে সমস্ত নিদর্শন নিয়ে এসেছিলেন সেগুলোর সাথে যুলুম করেছিল। অন্য আয়াতে সে যুলুমের ব্যাখ্যা এসেছে, “আর তারা অন্যায় ও উদ্ধতভাবে নিদর্শনগুলো প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলোকে নিশ্চিত সত্য বলে গ্রহণ করেছিল।” (সূরা আন-নামল: ১৪) সুতরাং তারা সত্য জেনেও সেগুলোকে যুলুমবশতঃ অস্বীকার করেছিল। (আদওয়াউল বায়ান)
(১০৩) অতঃপর তাদের পর মূসাকে আমার নিদর্শনাবলীসহ ফিরআউন ও তার পারিষদবর্গের নিকট পাঠাই,(1) কিন্তু তারা তা অস্বীকার করে। সুতরাং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কি হয়েছিল, তা লক্ষ্য কর। (2)
(1) এখান হতে মূসা (আঃ)-এর বর্ণনা শুরু হচ্ছে। যিনি উল্লিখিত নবীদের পর এসেছিলেন এবং যিনি ছিলেন একজন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন নবী। যাঁকে মিসরের ফিরআউন ও তার জাতির নিকট মু’জিযা ও দলীল-প্রমাণ দিয়ে পাঠানো হয়েছিল।
(2) অর্থাৎ, তাদেরকে ডুবিয়ে মারা হয়েছিল। যেমন, পরবর্তীতে (১৩৬ নং আয়াতে) সে কথা আসছে।