1 Answers
আধুনিক হাঁস পালন কৌশল কৃষিবিদ ফরহাদ আহাম্মেদ হাঁস পালন করা লাভ জনক। হাঁস পালন করে অনেকেই স্বাবলম্বি হয়েছেন। নিচে পাঁতিহাস পালনের পদ্ধতি বর্ণনা করা হলো: আবাস্থল: সাধারণত চার পদ্ধতিতে হাঁস পালন করা যায়। যেমনÑ ১. উন্মুক্ত পদ্ধতি : এ পদ্ধতিতে সকালে বাসা থেকে ছেড়ে দেয়া হয় এবং রাতে ঘরে আবদ্ধ থাকে। বাংলাদেশের অধিকাংশই এ পদ্ধতিতে হাঁস পালন করে। এ পদ্ধতিতে শ্রমিক কম লাগে, খাদ্য খরচ কম ও বাসস্থান খরচ কম। ২. আবদ্ধ পদ্ধতি : এ পদ্ধতিতে হাঁসকে সব সময় আবদ্ধ অবস্থায় রাখা হয়। মেঝেতে হাঁসের বাচ্চা পালন করা এ পদ্ধতিতে সুবিধাজনক। খাঁচায়ও হাঁসের বাচ্চা পালন করা যায়। প্রতিটি বাচ্চার জন্য ০.০৭ বর্গমিটার জায়গার প্রয়োজন হয়। ৩. অর্ধ-আবদ্ধ পদ্ধতি : এ পদ্ধতিতে হাঁস রাতে ঘরে রাখা হয় এবং দিনের বেলায় ঘর সংলগ্ন একটি নির্দিষ্ট জলাধার বা জায়গার মধ্যে বিচরণের জন্য ছেড়ে দেয়া হয়। এখানে প্রতিটি হাঁসের জন্য ০.৯৩ বর্গমিটার (প্রায় ১০ বর্গফুট) জায়গা প্রয়োজন। হাঁস সাঁতার কাটার সুযোগ পায়। ৪. ভাসমান পদ্ধতি : এ পদ্ধতিতে হাঁসের জন্য ভাসমান ঘর তৈরি করা হয়। বড় পুকুর, দিঘি বা নদীর কিনারায় পানির উপর হাঁসের সংখ্যা বিবেচনায় রেখে ঘর নির্মাণ করা হয়। সমন্বিত মাছ ও হাঁস পালনের ক্ষেত্রে এটি উপযোগী। হাঁসের বাসস্থানের কাছাকাছি জলাভূমি থাকা প্রয়োজন। জলাভূমি ছাড়াও হাঁস পালন সম্ভব তবে খাদ্য খরচ বেশি। স্বল্প খরচে বাঁশ, ছন অথবা টিনের উন্মুক্ত ঘর তৈরি করা যায়। মেঝে ঘরের উচ্চতা ৭ ফুট হতে হবে। ঘরের চারদিকে এক ইঞ্চি ফাঁক বিশিষ্ট তারের নেট দিতে হবে। ঘরের দুই তৃতীয়াংশে হাঁস থাকবার জন্য লিটারের ব্যবস্থা করতে হবে এবং এক তৃতীয়াংশ খাদ্য ও পানির ব্যবস্থা থাকবে। একই ঘরে বাচ্চা পালন করলে প্রথম ৩-৪ সপ্তাহ নেটের নিচের তিন ফুট মোটা পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। এরপর পলিথিন খুলে মুক্ত ঘর বড় হাঁসের উপযোগী করতে হবে। প্রতিটি পূর্ণ বয়স্ক হাঁসের জন্য ২৭০০ বর্গসেমি জায়গা দরকার। বাচ্চা পালন : হাঁসের বাচ্চা পালন মুরগির বাচ্চা পালনের মত। হাঁসের বাচ্চার জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা হচ্ছে- ১ম সপ্তাহে ৩২ সে., ২য় সপ্তাহে ২৯ সে., ৩য় সপ্তাহে ২৬ সে., ৪র্থ সপ্তাহে ২৩ সে., ও ৫ম সপ্তাহে ২১ সে. তাপমাত্রা প্রয়োজন। বাচ্চা ছাড়ার ৬ ঘণ্টা আগে ব্রুডারের তাপমাত্রা ঠিক করতে হবে। গরমকালে ৪ সপ্তাহ এবং শীতকালে ৫ সপ্তাহ পর্যন্ত হাঁসের বাচ্চাকে তাপ দিতে হয়। বাচ্চাদের ২-৩ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত- প্রারম্ভিক খাদ্য, ৪-১৯ সপ্তাহ পর্যন্ত- বাড়ন্ত- এবং ২০ সপ্তাহের পর লেয়ার খাদ্য দিতে হয়। প্রতিটি বাচ্চা হাঁসকে ১ম সপ্তাহে ১০-২০ গ্রাম, ২য় সপ্তাহে ২১-৩১ গ্রাম, ৩য় সপ্তাহে ৩১-৪১ গ্রাম, ৪র্থ সপ্তাহে ৪১-৫৫ গ্রাম ও ৫ম সপ্তাহে ৫৫-৬৫ গ্রাম খাদ্য দিতে হয়। খাদ্য উপাদান ও পরিমাণ খাদ্য তালিকায় দেয়া হয়েছে। খাদ্য হাঁস প্রধানত দুই রকমের খাদ্য খায়। যেমনÑ প্রাকৃতিক খাদ্য ও সম্পূরক খাদ্য। প্রাকৃতিক খাদ্য : হাঁস প্রাকৃতিক ও সম্পূরক খাদ্যের মাধ্যমে খাদ্যের চাহিদা পূরণ করে। জলাশয়ের আগাছা, ক্ষুদেপানা, পোকামাকড়, কচি ঘাস পাতা, ঝিনুক, শামুক ও ছোট মাছ ইত্যাদি খেয়ে অর্ধেক খাদ্যের প্রয়োজন মেটায়। সম্পূরক খাদ্য : হাঁস ভিজা খাবার পছন্দ করে। এজন্য হাঁসের খাদ্যে সবসময় পানি মিশিয়ে দিতে হয়। সাধারণত ১-৮ সপ্তাহ বয়সের হাঁসকে দিনে ৪-৫ বার, ৮ সপ্তাহ বয়স থেকে দিনে ২-৩ বার এবং বাড়ন্ত- হাঁসকে দিনে ২ বার খাওয়াতে হয়। সকালে ও বিকালে হাঁসকে খাবার দিতে হয়। রাতের জন্য ঘরে খাবার দিয়ে রাখতে হবে। হাঁসের দৈনিক খাদ্য গ্রহণের পরিমাণÑহাঁসের জাত, বয়স, খাদ্যের মান, বাসস্থান খাদ্যের আকার ও পরিবেশনের উপর নির্ভর করে। দৈনিক জন্মের প্রথম সপ্তাহে ১৫ গ্রাম, দ্বিতীয় সপ্তাহে ২৫ গ্রাম, তৃতীয় সপ্তাহে ৩০ গ্রাম, চতুর্থ সপ্তাহে ৩৫ গ্রাম, পঞ্চম সপ্তাহে ৪০ গ্রাম, ষষ্ঠ সপ্তাহে ৪৫ গ্রাম, সপ্তম সপ্তাহে ৫০ গ্রাম, অষ্টম সপ্তাহে ৫৫ গ্রাম, বাড়ন্ত- বয়সে ৮৫ গ্রাম ও বয়স্ক হাঁসে ১২৫ গ্রাম খাদ্য দিতে হয়। নিচে হাঁসের সুষম খাদ্য তৈরির খাদ্য উপাদান উল্লেখ করা হলো : খাদ্য উপাদান বাচ্চার খাদ্য (গ্রাম) পূর্ণবয়স্কের খাদ্য (গ্রাম) ভাঙা গম ৪৫০ ৪৫০ চালের কুঁড়া ২৭০ ৩০০ তিলের খৈল ১৪০ ১২০ মাছের গুঁড়া ১২০ ১০০ ঝিনুক চূণ ১৫ ২৫ লবণ ৫ ৫ মোট ১০০০ ১০০০ ভিটামিন মিনারেল ১.৫ গ্রাম/ কেজি ২.০ গ্রাম/কেজি খাবারের পাত্র কাঠের, টিনের এ্যলুমিনিয়ামের হতে পারে। রোগ ব্যবস্থাপনা : হাঁসের বিভিন্ন রোগের কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার বর্ণনা করা হলো: প্লেগ রোগ কারণÑ ভাইরাস সংক্রমণে হয়। লক্ষণ ১. হাঁস আলো দেখলে ভয় পায়। ২. হাঁস সাঁতার কাটতে চায় না। ৩. পানি পিপাসা বৃদ্ধি পায়। খাদ্য গ্রহণে অনীহা হয়। ৪. নাক দিয়ে তরল পদার্থ বের হয়। ৫. সবুজ ও হলুদ রঙের পাতলা মলত্যাগ করে। ৬. পালক এলোমেলো হয়ে পড়ে। ৭. পা ও পাখা অবশ হয়। পাখা ঝুলে পড়ে। ৮. ঠোঁট নীল বর্ণ হয়। ৯. ঘাড় মাথা বাঁকা করে উপরের দিকে তাকিয়ে থাকে। কাঁপুনি হয়। ১০. চোখ ফুলে চোখের পাতা আটকে যায়। ১১. খুঁড়িয়ে হাঁটে। ১২. ডিম পাড়া হাঁস ডিম পাড়া কমিয়ে দেয়। ১৩. হাঁস হঠাৎ মারা যায়। প্রতিরোধ ও প্রতিকার ১. জৈব নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা। ২. আক্রান্ত- হাঁস অন্যত্র সরিয়ে ফেলা। ৩. মৃত হাঁস মাটিতে পুঁতে ফেলা। ৪. সবকিছু জীবাণুমুক্ত রাখা। ৫. টিকা দেয়া। ১৫-২০ দিন বয়সের বাচ্চাকে প্রথমবার এবং পরে এক মাস বয়সে এবং ৬ মাস পরপর প্রতিটি হাঁসের রানের বা বুকের মাংসে ১ মি.লি. করে ইনজেকশন দিতে হয়। হাঁসের কলেরা কারণÑ ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণে হয়। লক্ষণ ১. আক্রান্ত- হাঁস সবুজ বা হলুদ বর্ণের পাতলা মলত্যাগ করে। ২. মুখমণ্ডল, ঝুঁটি, গলকম্বল ও কানের লতি নীলাভ হয়। ৩. মাথা ও হাঁটু ফুলে যায়। ৪. ক্ষুদা মন্দা হয়। দেহ দুর্বল হয়। ৫. চোখের পাতা ফুলে যায়। ৬. নাক, মুখ ও চোখ দিয়ে তরল পদার্থ বের হয়। ৭. ডিম উৎপাদন কমে যায়। ৮. পালক উসকো খুসকো হয়। পালক ঝুলে পড়ে। ৯. মুরগি হঠাৎ মারা যায়। প্রতিরোধ ও প্রতিকার ১. জৈব নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা। ২. আক্রান্ত- হাঁস অন্যত্র সরিয়ে ফেলা। ৩. মৃত হাঁস মাটিতে পুঁতে ফেলা। ৪. সবকিছু জীবাণুমুক্ত রাখা। ৫. এ রোগের টিকা প্রতিটি হাঁসের ২ সপ্তাহ বয়সে রানের মাংসে ১ সিসি করে ইনজেকশন দিতে হয়। ৫. টেট্রাসাইকিন গ্রুপের ওষুধ পানির সাথে মিশিয়ে খাওয়াতে হয়। এছাড়াও হাঁস বার্ড ফু দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। লক্ষণ, প্রতিরোধ ও প্রতিকার ব্যবস্থা মুরগির বার্ড ফু এর মত।