1 Answers

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে এবং হচ্ছে, তবে তা বিস্ময়কর কিনা সেটা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। বাংলাদেশের মত অধিক জনসংখ্যা এবং সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের দেশে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিয়ে আসা খুব কঠিন। সীমাহিন দুর্নীতি এই পুরো ব্যাপারটাকে আরো কঠিন করে তুলেছে। যাইহোক, আমার মতে, বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক যে প্রবৃদ্ধি লাভ করেছে তার পিছনে চারটি প্রধান কারন রয়েছে- ১. প্রচুর পরিমানে কর্মোক্ষম, সহজলভ্য এবং সল্প বেতনভুক্ত শ্রমিকঃ এই কারনে বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্প প্রসার লাভ করেছে। সস্তা শ্রম সহজলভ্য বলে এখানে উৎপাদন খরচ কম। বাংলাদেশে তৈরী গার্মেন্টস পণ্য তাই বহির্বিশ্বে কম মূল্যে পাওয়া যায়। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দায় যখন সারা পৃথিবী ভুগেছে, বাংলাদেশ তখন লাভ করেছে। কারন মন্দায় পড়া মানুষ কম দামি পণ্যে বেশি ঝুঁকেছে, বাংলাদেশে তৈরী পোশাক তাই বিক্রয় হয়েছে বেশি। সাম্প্রতিক কালের যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের বাণিজ্য যুদ্ধেও বাংলাদেশ ব্যবসায়িক ভাবে লাভবান হয়েছে। এর পাশাপাশি চামড়া এবং সিরামিক শিল্পেও বাংলাদেশ বেশ ভাল করেছে। মূলত গার্মেন্টস ব্যবসা খুব ভাল যাওয়ায় দেশের অভ্যন্তরে সম্পূরক অন্যান্য ব্যবসার ও প্রসার ঘটেছে। যেমন ব্যাংক এবং পরিবহন খাত। অর্থনীতি আসলে তুষারের গোল্লার মত। বাইরে থেকে যখন টাকা আসা শুরু করেছে, তখন মানুষ অন্যান্য খাতেও বিনিয়োগ করেছে এবং সামগ্রিক ভাবে দেশের অর্থনীতি সামনে এগিয়েছে। ২. কৃষিক্ষেত্রে অগ্রগতিঃ এই ব্যাপারটা অনেকেই এড়িয়ে যান, তবে বাংলাদেশের কৃষি এবং জিন বিজ্ঞানীরা গত কয়েক দশকে খুব ভাল কাজ করেছেন। যে জমিতে বছরে একবার ধান হত, সেখানে তারা বছরে কয়েকবার চাষ করার ব্যবস্থা করেছেন, জিন প্রযুক্তির মাধ্যমে ফলন বাড়িয়েছেন কয়েক গুন, রোগবালাই দূর করতেও তারা প্রশংসনিয় ভূমিকা রেখেছেন। বিভিন্ন দেশি বিদেশি ফলের চাষে বাংলাদেশ এখন সাবলম্বী এবং বাইরেও রপ্তানি হচ্ছে। দেশের মানুষের পুষ্টির চাহিদা মিটছে এবং দেশের বাইরেও বাংলাদেশের ব্রান্ড তৈরী হচ্ছে। মাছের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যেসব মাছে প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছিল, সেগুলোর চাষের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কৃষি ক্ষেত্রে প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। বাংলাদেশে খুব বড় জনসংখ্যার খুব ছোট দেশ। কৃষিক্ষেত্রে এই বিপ্লব না ঘটলে আজ বাংলাদেশের সামগ্রিক অবস্থা খুব খারাপ হত। ৩. কর্মক্ষেত্রে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণঃ গার্মেন্টস শিল্পের বেশিরভাগ শ্রমিকই নারী। নারীরা ক্ষুদ্রঋণের সুবিধা খুব ভাল ভাবে নিয়েছে। আমার নিজের গ্রামেই দেখেছি, এই ঋণ নিয়ে মহিলারা বাজে কাজে খরচ করেননি। হয়ত প্রথমে হাঁস মুরগীর খামার দিয়েছেন। যে টাকা এসেছে সেটা বাচ্চাদের লেখাপড়ায় ব্যয় করেছেন, আবার অন্যান্য ব্যবসায় লাগিয়েছেন। গ্রামগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা যেমন ভাল হয়েছে, শিক্ষার হারও বেড়েছে। ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে অনেক সমালোচনা থাকতে পারে তবে আমার পরিচিত অনেক পরিবারই এতে লাভবান হয়েছে। এখন যদি আপনি গ্রামে যান দেখবেন প্রায় প্রতি বাড়িতেই এইরকম খামার কেন্দ্রিক ব্যবসা হচ্ছে। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থা গত ২০ বছরে খুব ভাল গতিতে সামনে এগিয়েছে। ৪. প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রাঃ যখন বাংলাদেশের পাট রপ্তানি ছাড়া কিছুই ছিলনা। তখন থেকেই লক্ষ লক্ষ প্রবাসী দেশে তাঁদের কষ্টার্জিত উপার্জন পাঠিয়ে দেশ গড়ায় অনদান রেখেছেন। যে প্রবাসীর সংখ্যা এখন এক কোটি এর বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত উপাত্ত অনুসারে ২০১৮ সালে তাঁদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রার পরিমান ছিল ১৫.৫৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। 

5473 views