1 Answers
দাফনের পদ্ধতি: ১. মৃতের খাটিয়া কাঁধে রেখে বহণ করা মুস্তাহাব। হাদীছের নির্দেশ মোতাবেক ‘লাশ দ্রুত বহণ করা সুন্নাত’। সে সময় মানুষ লাশের সামনে, পিছনে, ডাইনে, বামে যে কোন দিক দিয়ে চলতে পারবে। (আহকামুল জানায়েয- আলবানী- পৃ:৭৩) লাশ গোরস্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ২. যে ব্যক্তি লাশের সাথে চলবে তার জন্য খাটিয়া মাটিতে রাখার আগে বসা মাকরূহ। ৩. তিনটি সময়ে ছালাত আদায় করতে এবং মুরদা দাফন করতে হাদীছে নিষেধ করা হয়েছে। ১- সূর্য উদয়ের সময়, যে পর্যন্ত তা কিছু উপরে না উঠে যায়। ২- সূর্য মাথার উপর থাকার সময়, যে পর্যন্ত তা পশ্চিমাকাশে ঢলে না যায়। ৩- সূর্য অস্ত যাওয়ার সময়, যে পর্যন্ত তা পুরাপুরি ডুবে না যায়। (মুসলিম) ৪. রাতে বা দিনে যে কোন সময় লাশ দাফন করা যায়। মহিলার লাশ কবরে প্রবেশ করানোর সময় আলাদা কাপড় দিয়ে ঢেঁকে দিবে। ৫. সুন্নাত হল কবরের পায়ের দিক থেকে লাশকে কবরে নামানো। পায়ের দিকে দিয়ে লাশ কররে রাখা হচ্ছে। সম্ভব না হলে, ক্বিবলার দিক থেকে কবরে নামাবে। কিবলার দিক থেকে লাশ কবরে রাখা হচ্ছে। ৬. লাহাদ তথা বুগলী কবর হল উত্তম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “লাহাদ (বুগলী কবর) হল আমাদের জন্য আর শাক্ব বা বাক্স কবর হল অন্যদের জন্য।” (আবূ দাঊদ) লাহাদ বা বুগলী কবর শাক্ব বা বক্স কবর৭. হিংস্র প্রাণী এবং লাশের দুর্গন্ধ বের হওয়া থেকে হেফাযত করার জন্য কবরকে বেশী গভীর করে খনন করা সুন্নাত। ৮. যারা লাশ কবরে নামাবে তাদের জন্য সুন্নাত হল, এই দু’আ পড়া: ( ِﻪﻠﻟﺍ ِﻝْﻮُﺳَﺭ ِﺔَّﻨُﺳ َﻰﻠَﻋَﻭ ِﻪﻠﻟﺍ ِﻢْﺴِﺑ) উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি ওয়া ‘আলা সুন্নাতি রাসূলিল্লাহ। অর্থ: আল্লাহর নাম নিয়ে রাসূলের সুন্নাত এর উপর। অথবা এটা পড়বে: ( ِﻪﻠﻟﺍ ِﻝْﻮُﺳَﺭ ِﺔَّﻠِﻣ َﻰﻠَﻋَﻭ ِﻪﻠﻟﺍ ِﻢْﺴِﺑ) উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি ওয়া ‘আলা মিল্লাতি রাসূলিল্লাহ অর্থ: “আল্লাহর নাম নিয়ে রাসূলের তাঁর মিল্লাতের উপর।” (আবূ দাঊদ) ৯. লাশকে কবরের মধ্যে কিবলা মুখী করে ডান কাতের উপর করে রাখা সুন্নাত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “জীবিত এবং মৃত সব অবস্থায় তোমাদের কিবলা হল কা’বা।” (বাইহাকী আহকামুল জানায়েয, আলবানী- ১৫২) ১০. লাশের মাথার নীচে কোন বালিশ বা ইট-পাথর রাখবে না এবং তার চেহারার কাপড়ও খুলবে না। ১১. তারপর কবরের মুখ ইট এবং মাটি দিয়ে বা বাঁশ/চাটাই ও মাটি দিয়ে পূর্ণ করে দিবে। ১২. উপস্থিত মুসলমানদের জন্য সুন্নাত হল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অনুসরণে প্রত্যেকে উক্ত কবরে তিন খাবল করে মাটি দিবে। (ইবনু মাজাহ্ আহকামুল জানায়েয আলবানী- ১৫৫) ১৩. সুন্নাত হল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবরের মত- কবরকে উটের চুঁড়ার মত মাত্র অর্ধ হাত পরিমাণ উঁচা করা। (বুখারী) ১৪. এরপর কবরের উপর কিছু পাথর কুচি ছড়িয়ে দিয়ে তার উপর পানি ছিটিয়ে দিবে। (আবূ দাঊদ, ইরউয়াউল গালীল ৩/২০৬) শেষে কবরের মাথার দিকে একটি পাথর রেখে দিবে যাতে করে তা চেনা যায় এবং তার অবমাননা না হয়। যেমনটি করেছিলেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঊছমান বিন মাযঊন (রা:) এর কবরে। (ছহীহ্ আবূ দাঊদ) ১৫. কবরকে পাকা করা, তার উপর ঘর উঠানো, তার নাম পরিচয় লিখা, তার উপর বসা, চলা, হেলান দিয়ে বসা সবই ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী হারাম কাজ। (মুসলিম, আবূ দাঊদ প্রভৃতি) ১৬. অধিক প্রয়োজন ছাড়া এক কবরে একের অধিক ব্যক্তিকে দাফন করা মাকরূহ। ১৭. মৃতের পরিবারের জন্য খাদ্য তৈরী করে তাদের কাছে প্রেরণ করা মুস্তাহাব। হযরত জাফর বিন আবী তালেবের শাহাদাতের সংবাদে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন: “তোমরা জাফর পরিবারের জন্য খাদ্য তৈরী কর, কেননা তারা বিপদগ্রস্থ হয়েছে।” (ছহীহ্ আবূ দাঊদ) ১৮. মৃতের পরিবারের পক্ষ থেকে মানুষের জন্য খানা প্রস্তুত করা জায়েয নয়। ‘ছাহাবায়ে কেরাম (রা:) মানুষের জন্য খানা প্রস্তুত করা এবং শোক বাণী জানানোর জন্য মৃতের বাড়ীতে একত্রিত হওয়াকে নিষিদ্ধ নিয়াহা বা মৃতের জন্য বিলাপের মধ্যে গণ্য করতেন।’ (আহমাদ) ১৯. পুরুষদের জন্য শুধু মাত্র উপদেশ গ্রহণ এবং মৃতের জন্য দু’আ করার উদ্দেশ্যে কবর যিয়ারত করা সুন্নাত। এরশাদ হচ্ছে: “পূর্বে আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম। এখন তোমরা তা যিয়ারত করতে পার। কেননা তা তোমাদেরকে আখেরাতের কথা স্মরণ করাবে।” (মুসলিম) ২০. তবে নারীরা অধিকহারে কবর যিয়ারত করবে না। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিক কবর যিয়ারতকারীনীদের লা’নত করেছেন। (সুনান গ্রন্থ) ২১. কবর যিয়ারতের সময় এই দু’আ পাঠ করবে: ْﻢُﻜِﺑ ُﻪﻠﻟﺍ َﺀَﺎﺷ ْﻥﺇ َّﺎﻧﺇﻭ َﻦْﻴِﻨِﻣْﺆُّﻣ ٍﻡْﻮَﻗ َﺭَﺍﺩ ﻢﻜﻴﻠﻋ ﻡﻼﺴﻟﺍ َﺔَﻴِﻓَﺎﻌْﻟﺍ ُﻢُﻜَﻟَﻭ َﺎﻨَﻟ َﻪﻠﻟﺍ ُﻝَﺄْﺴَﻧ َﻥْﻮُﻘِﺣَﻼَﻟ উচ্চারণ: আসসালামু আলাইকুম দারা ক্বওমিম মু’মিনীন। ওয়া ইন্না ইনশাআল্লাহু বিকুম লাহিকূন। নাসআলুল্লাহা লানা ওয়া লাকুমুল আ’ফিয়াহ। অর্থ: “হে কবরের অধিবাসী মু’মিনগণ! আপনাদের প্রতি শান্তি ধারা বর্ষিত হোক। নিশ্চয় আমরাও আপনাদের সাথে এসে মিলিত হব ইনশাআল্লাহ্। আমরা আমাদের জন্য ও আপনাদের জন্য আল্লাহ্র কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।’ (মুসলিম) ২২. মুসলিম ব্যক্তি কবর যিয়ারতে খুবই সতর্ক থাকবে। তা স্পর্শ করবে না, তাযীম করবে না, বরকত হাছিলের কারণ মনে করবে না, দু’আ চাইবে না। কেননা এগুলো শির্ক বা শির্কের মাধ্যম। ২৩. মৃতের পরিবারকে শোক বার্তা জানানোর সময় এই দু’আ করা সুন্নাত: َّﻰﻤَﺴُّﻣ ٍﻞَﺟﺄِﺑ ُﻩَﺪْﻨِﻋ ٍﺀْﻲَﺷ ُّﻞُﻛﻭ َﻰﻄْﻋﺃ َﺎﻣ ُﻪَﻟَﻭ َﺬَﺧﺃ َﺎﻣ ِﻪﻠﻟِ َّﻥﺇ ْﺐِﺴَﺘْﺣَﺍﻭ ْﺮِﺒْﺻَﺎﻓ উচ্চারণ: ইন্না লিল্লাহি মা আখাযা ওয়া লাহু মা আ’ত্বা। ওয়া কুল্লু শাইয়িন ’ইনদাহু বি আজালিম মুসাম্মা। ফাসবির ওয়াহতাসিব। অর্থ: “তিনি যা নেন এবং দান করেন তার অধিকারী একমাত্র আল্লাহ। তাঁর নিকট প্রতিটি বস্তুর একটি নির্দষ্ট সময় রয়েছে। তাই তুমি ধৈর্য ধারণ কর এবং আল্লাহর নিকট থেকে এর প্রতিদান প্রার্থনা কর।” (বুখারী ও মুসলিম) ২৪. মৃতের জন্য শুধু তিন দিন শোক পালন করা বৈধ। তবে মৃতের স্ত্রীর জন্য চার মাস দশ দিন শোক পালন করা ওয়াজিব, আর সে গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত শোক পালন করবে। ২৫. মৃতের জন্য উচ্চস্বরে ক্রন্দন করা, মাতম করা, কপোল চাপড়ানো, চুল, জামা-কাপড় ছেড়া ইত্যাদি সবই হারাম কাজ- যা থেকে বেঁচে থাকা প্রত্যেক মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য। পরিশেষে আল্লাহ তায়ালার বরগাহে দুয়া করি, হে আল্লাহ, মৃত্যু বরণ করার আগে তুমি আমাদেরকে পাথেয় সংগ্রহ করার তাওফীক দান কর। আমীন। অনুবাদঃ মুহাঃ আবদুল্লাহ্ আল্ কাফী দাঈ, জুবাইল দাওয়া এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সঊদী আরব।