1 Answers
রাতের বেলায় দেখার জন্য যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় সেগুলোকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়ঃ
(১) স্কোপঃ এগুলো হাতে রেখে অথবা কোনো অস্ত্রের সামনে লাগিয়ে দূরবর্তী কিছু পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত মনোকুলার (Monocular) অর্থাৎ একটি আই-পিস (Eye-piece)। যেহেতু এগুলো মাথায় না পড়ে শুধু হাতে রেখেও ব্যবহার করা যায় তাই রাতের অন্ধকারে কোনো কিছু দেখে দ্রুত স্বাভাবিক দৃষ্টির অবস্থায় ফিরে আসতে এগুলো বেশ কার্যকর।
(২) গগলসঃ গগলস সাধারণত মাথায় লাগিয়ে ব্যবহার করা হয়। এগুলো বাইনোকুলার (Binocular) অর্থাৎ আই-পিস দুটি। অন্ধকারে হাঁটাচলার জন্য এই নাইট ভিশন গগলসের জুড়ি নেই।
(৩) ক্যামেরাঃ যেসব ক্যামেরায় নাইট ভিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো তাদের ধারণ করা ছবি কোনো মনিটরে দেখাতে পারে। এছাড়া সেই ছবি রেকর্ড করার ব্যবস্থা তো আছেই। যখন কোনো জায়গায় স্থায়ীভাবে রাতের বেলায় দেখাশোনার ব্যবস্থা করা লাগে সেখানেই সাধারণত এই ক্যামেরাগুলো ব্যবহার করা হয়।
নাইট ভিশনের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রটি যদি ঠিক হয় তবে তা দিয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন কোনো রাতেও প্রায় ২০০ গজ দূরে দাঁড়ানো কাউকে দেখা সম্ভব! আর এজন্য রয়েছে দু’ধরণের কৌশল- ১) ইমেজ ইনহেন্সমেন্ট (Image Enhancement) এবং ২) থার্মাল ইমেজিং (Thermal Imaging)
থার্মাল ইমেজিং
থার্মাল ইমেজিং নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই আমাদেরকে আলো নিয়ে সামান্য কিছু পুরনো জ্ঞান ঝালাই করে নিতে হবে।
আমরা জানি, আলোর শক্তি নির্ভর করে তার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের উপর। তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত কম অর্থাৎ কম্পাঙ্ক যত বেশি, আলোর শক্তিও তত বেশি। আমাদের দৃশ্যমান আলোর মাঝে বেগুনী আলোর শক্তি সবচেয়ে বেশি এবং লাল আলোর শক্তি সবচেয়ে কম। আমাদের এই দৃশ্যমান আলোর বর্ণালীর ঠিক পরেই তাই আছে অবলোহিত (Infrared) আলোর বর্ণালী।
নিচে তড়িৎচৌম্বক বর্ণালীর বিভিন্ন অংশের তরঙ্গদৈর্ঘ্য, কম্পাঙ্ক এবং শক্তি উল্লেখ করে একটি টেবিল দেয়া হলোঃ
উপরের টেবিলকে যদি একটি চিত্রের সাহায্যে প্রকাশ করা হয় তাহলে তা অনেকটা নিচের মতোই দেখাবেঃ
এর মাঝে দৃশ্যমান আলোর বর্ণালীর অবস্থা এমনইঃ
যা-ই হোক, এই অবলোহিত আলোর বর্ণালীকে আবার তিনটি অংশে ভাগ করা হয়েছেঃ
(১) Near-infrared: এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য .৭ থেকে ১.৩ মাইক্রনের মতো (১ মাইক্রন = ০.০০০০০১ মিটার)।
(২) Mid-infrared: এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রায় ১.৩ থেকে ৩ মাইক্রন।
(৩) Thermal-infrared: অবলোহিত আলোর তিনটি অংশের মাঝে এই অংশটিই সবচেয়ে বেশি অংশ জুড়ে বিস্তৃত। এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রায় ৩ থেকে ৩০ মাইক্রনের মতো।
আমরা জানি, পরমাণু গঠিত হয় ইলেকট্রন ও নিউক্লিয়াসের (প্রোটন ও নিউট্রন) সমন্বয়ে। ইলেকট্রনগুলো নিউক্লিয়াসের চারদিকে অবিরাম ঘুরতে থাকে। এখন যদি বাইরে থেকে কোনোভাবে শক্তি সরবরাহ করা হয় তাহলে সেই শক্তি শোষণ করে ইলেকট্রন তার স্বাভাবিক অবস্থা ছেড়ে উপরের কোনো স্তরে চলে যায়। কিন্তু এখানে সে বেশিক্ষণ থাকে না। আবার সেই শক্তি বিকিরণ করে ইলেকট্রন তার পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে। এই শক্তির বিকিরণ হয় ফোটন হিসেবে। এই ফোটনের একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্য থাকে যা দুই স্তরের শক্তির পার্থক্যের উপর নির্ভরশীল।
শক্তি শোষণের ফলে যেকোনো বস্তু উত্তপ্ত হয়। এই উত্তাপ সঞ্চালিত হয় তার পরমাণুতে। তখন উপরে বর্ণিত প্রক্রিয়ায় নির্গত হয় ফোটন। বস্তুটি যত উত্তপ্ত হয়, তার থেকে নির্গত অবলোহিত ফোটনের তরঙ্গদৈর্ঘ্যও তত কমতে থাকে। আর থার্মাল ইমেজিং প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে বানানো নাইট ভিশন গগলসগুলোও এই ধরণের ফোটনের বিকিরণের উপর নির্ভরশীল।
নিচের চিত্রের সাহায্যে পুরো প্রক্রিয়াটির তুলে ধরছিঃ
(১) অন্ধকারে আমরা যে বস্তুটি দেখতে চাই প্রথমে একটি বিশেষ লেন্সের সাহায্যে সেখান থেকে নির্গত অবলোহিত আলোকে ফোকাস করা হয়।
(২) এই ফোকাস করা আলোকে এবার ইনফ্রারেড ডিটেক্টরের সাহায্যে স্ক্যান করা হয়। এই স্ক্যানিংয়ের ফলে বস্তুটির একটি থার্মাল প্যাটার্ন পাওয়া যায় যাকে বলে থার্মোগ্রাম (Thermogram)। নিচে উদাহরণ হিসেবে একটি বিড়ালের থার্মোগ্রাম দেখানো হলোঃ
(৩) থার্মোগ্রামকে পরবর্তীতে ইলেকট্রিক সিগন্যালে রুপান্তর করা হয়।
(৪) থার্মোগ্রাম থেকে প্রাপ্ত সিগন্যালকে পাঠানো হয় সিগন্যাল প্রসেসিং ইউনিটে। এখান থেকে শেষ পর্যন্ত ভিডিও সিগন্যাল পাওয়া যায়।
(৫) এই ভিডিও সিগন্যালকে শেষে পাঠানো হয় মনিটরে। অবলোহিত বিকিরণের তীব্রতার তারতম্য অনুযায়ী মনিটরে দেখতে পাওয়া ছবিটির উজ্জ্বলতায় তারতম্য হয়।
এভাবেই থার্মাল ইমেজিং প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে কাজ করে নাইট ভিশন গগলস।
ইমেজ ইনহেন্সমেন্ট
নাইট ভিশন গগলসের কথা বললে আমাদের চোখে প্রথমেই যে সবুজ, ভৌতিক ছবিটি ভেসে ওঠে সেটি আসলে এই ইমেজ ইনহেন্সমেন্ট প্রযুক্তির সাথেই সঙ্গতিপূর্ণ। অধিকাংশ নাইট ভিশন গগলস এই প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করেই বানানো। এই সিস্টেমকে বলা হয় Night Vision Device (NVD)। NVD-র প্রাণ বলা যায় যে অংশকে সেটি হলো Image Intensifier Tube।
নিচে এই পদ্ধতি কীভাবে কাজ করে সেটি ধাপে ধাপে সচিত্র বর্ণনা দিয়ে বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা করলামঃ
(১) আমরা যে বস্তু দেখতে চাই প্রথমেই একটি অবজেক্টিভ লেন্সের সাহায্যে তার আশেপাশের পরিবেশের আলো এবং সেই সাথে অবলোহিত আলো ধারণ করা হয়।
(২) এই আলোকে এরপর ইমেজ ইন্টেন্সিফায়ার টিউবে পাঠানো হয়। টিউবটির শক্তির উৎস হিসেবে থাকে দুটি ‘AA’ সাইজের ব্যাটারি।
(৩) ইমেজ ইন্টেন্সিফায়ার টিউবের ভেতর থাকে একটি ফটোক্যাথোড। এখানে বস্তু থেকে নির্গত ফোটনকে ইলেকট্রনে রূপান্তর করা হয়।
(৪) এই ইলেকট্রনগুলো এরপর মুখোমুখি হয় মাইক্রোচ্যানেল প্লেটের (Microchannel Plate - MCP)। MCP হলো কাঁচের তৈরি ছোট একটি ডিস্ক। ফাইবার অপটিক টেকনোলজির সাহায্যে এতে লক্ষাধিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র (মাইক্রোচ্যানেল) করা হয়। ডিস্কটিকে বায়ুশূণ্য স্থানে রাখা হয়। এর উভয় পাশেই রয়েছে ধাতব ইলেকট্রোড। প্রতিটি চ্যানেল তার দৈর্ঘ্যের তুলনায় প্রায় ৪৫ গুণ বড়। এরা ইলেকট্রনের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। চ্যানেলগুলো কিন্তু সরলরৈখিকভাবে না বানিয়ে ৫-৮ ডিগ্রি বাঁকা করে বানানো হয়। ইলেকট্রনগুলোর সংঘর্ষের পরিমাণ বৃদ্ধি করতেই এমনটা করা হয়।
ফটোক্যাথোড থেকে আসা ইলেকট্রন যখন MCP-র ইলেকট্রোডে আঘাত করে তখন উচ্চ বিভব পার্থক্যের সাহায্যে ইলেকট্রনগুলোর ত্বরণ বৃদ্ধি করে এদের মাইক্রোচ্যানেলের ভেতর দিয়ে চালনা করা হয়। উচ্চ গতিশক্তি সম্পন্ন এই ইলেকট্রনগুলো চ্যানেলের দেয়ালে আঘাত করতে করতে সামনে এগিয়ে চলে। তাদের আঘাতের ফলে সংশ্লিষ্ট পরমাণুগুলো উত্তেজিত হয়ে তারাও ইলেকট্রন নির্গত করে। সেই ইলেকট্রনগুলো আরো অন্যান্য ইলেকট্রন নির্গমনে সাহায্য করে। এভাবে ইলেকট্রনের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে মাইক্রোচ্যানেল প্লেট।
(৫) ইলেকট্রনগুলো এরপর ফসফরের আস্তরণ দেওয়া একটি স্ক্রিনে গিয়ে আঘাত হানে। ফলে আঘাতের স্থান থেকে ফোটন নির্গত হয়। এই ফসফর একটি সবুজ ছবি গঠন করে যা আসলে আমরা অন্ধকারে দেখতে চেয়েছিলাম।
(৬) এই সবুজ ফসফরের ছবিটিকে দেখা হচ্ছে আরেকটি লেন্সের ভেতর দিয়ে যার নাম অক্যুলার লেন্স (Ocular Lens)। এই লেন্সের সাহায্যে ছবির বিবর্ধন এবং ফোকাসিংয়ের কাজটি সারা হয়।
নাইট ভিশন প্রযুক্তির উদ্ভব হয়েছিলো মূলত রাতের বেলায় শত্রুর উপস্থিতি শনাক্তকরণের জন্য। এর পাশাপাশি রাতে সঠিক দিক-নির্দেশনা প্রদান, কোনো কিছু পাহারা দেওয়া এবং লক্ষ্য স্থির করার কাজেও এটি সমানভাবে ব্যবহৃত হয়। শিকারি এবং প্রকৃতিপ্রেমীরা রাতের বেলায় বনের ভেতর দিয়ে চলাচলের জন্যও এই প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে থাকেন। এছাড়া বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং লুকোনো কোনো বস্তুর সন্ধান পেতেও আজকাল আমাদের এই প্রযুক্তির দ্বারস্থ হতে হয়।