1 Answers
“তৈরি পোশাক শিল্পঃ অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাতিয়ার”
বাংলাদেশের মসলিন ও জামদানি পৃথিবী বিখ্যাত ছিল। বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনে বাংলার শিল্প ধ্বংস হয়ে যায়। পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় পরে বাংলাদেশে আবার পোশাক শিল্পের প্রসার ঘটছে। বেসরকারি উদ্যোগে ১৯৭৬ খ্রীষ্টাব্দে যাত্রা করা তৈরি পোশাক শিল্প ১৯৭৮ সালে রপ্তানি করতে শুরু করে। আশির দশক থেকে পোশাক শিল্প বিষ্ময়কর উন্নতি করতে থাকে।
রপ্তানি বাণিজ্যঃ বর্তমানে পোশাক শিল্প বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য। রপ্তানিখাতে আয়ের শতকরা ৭২.৫% আসে পোশাক শিল্প থেকে (অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৭)। বাংলাদেশ বিশ্বের ২০টির বেশি দেশে পোশাক রপ্তানি করে। বাংলাদেশ থেকে প্রথম তৈরি পোশাক রপ্তানি করা হয় ফ্রান্সে। বাংলাদেশের পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এরপর ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বর্তমানে মোট রপ্তানি আয়ের শতকরা ৭৫ভাগ পোশাক শিল্পের অবদান। বাংলাদেশ ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে প্রায় ২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে। আর এ বৈদেশিক মুদ্রা একদিকে যেমন অর্থনীতিকে সচল রাখছে অন্যদিকে গ্রামীণ আর্থ-সামাজিক পরিবেশ উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে ।
কর্মসংস্থানঃ বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পোশাকশিল্পের সাথে জড়িত। প্রায় ১৫ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে পোশাক শিল্পে যাদের অধিকাংশই নারী। গ্রামের হত দরিদ্র এসব নারীরা তাদের পরিশ্রমে দেশের অর্থনীতি ও নিজেদের ভাগ্য এদুটোতেই পরিবর্তন এনেছে। পোশাক শিল্পের কারণে দারিদ্র্যের হার কমছে।
উদ্যোক্তা সৃষ্টিঃ কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের মাধ্যমে কয়েক হাজার শিল্প উদ্যোক্তা সৃষ্টি হয়েছে। এসব উদ্যোক্তা যেমন ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রে দক্ষ, তেমনি তাদের রয়েছে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি।
বস্ত্রশিল্পঃ পোশাক শিল্প বাংলাদেশে বিভিন্ন স্পিনিং, উইভিং, নিটিং, ডাইং, ফিনিশিং এবং প্রিন্টিং শিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে । এতে দেশে বহু বস্ত্রশিল্প গড়ে উঠেছে।
প্রসাধন শিল্পঃ পোশাক শিল্পের প্রভাবে বাংলাদেশের প্রসাধন শিল্প প্রসারিত হয়েছে। কারণ পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের মধ্যে প্রসাধন চর্চার হার অধিক।
পরিবহণ ও বন্দর ব্যবহারঃ পোশাক শিল্পের সামগ্রী আমদানি এবং রপ্তানির ফলে বন্দর থেকে কারখানা পর্যন্ত পরিবহণ শিল্পের অগ্রগতি এবং বন্দরের অধিক ব্যবহারের ফলে আয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্যাকিজিং শিল্পের প্রসারঃ পোশাক শিল্পের প্রভাবে প্যাকেজিং, গার্মেন্টস, জিপার, বোতাম এবং বহু প্রকার প্যাকেজিং শিল্পের প্রসার ঘটেছে।
ক্যাটাগরিঃ সারা বিশ্বের ১১৫ প্রকারের পোশাকের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ইইউ'র দেশসমূহের চাহিদা রয়েছে ৮৫ রকম পোশাকের। বাংলাদেশ ৩৬ রকমের পোশাক উৎপাদন করে, যার মধ্যে ১৮টি ক্যাটাগরি কোটভূক্ত এবং বাকি ১৮টি কোটা বহির্ভূত। এছাড়া হংকং ৬৫ রকমের, চীন ৯০ রকমের, ভারত ৬০ রকমের পোশাক রপ্তানি করে থাকে ।
অন্যান্য অবদানঃ এছাড়া পোশাক শিল্পে বিনিয়োগ করে ব্যাংক লাভবান হচ্ছে, বীমা কোম্পানির প্রিমিয়ামের পরিমাণ বাড়ছে। বাংলাদেশে নতুন নতুন প্রযুক্তির আগমন ঘটছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পরিচিত ও অবস্থান পাকা হচ্ছে। বাইরের দেশের কোম্পানি বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করে ব্যবসা পরিচালনা করছে, যেমন দক্ষিণ কোরিয়া ও শ্রীলংকার কোম্পানি। ১৯৯৪-৯৫ থেকে শুরু করে এখাতে গড়ে প্রতি বছর ২১.৫৩% হারে প্রবৃদ্ধি লাভ করে চলেছে। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে পোশাক শিল্পের রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা (প্রায়) ৩২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ধরা হয়েছে। এভাবে পোশাক শিল্পের প্রবৃদ্ধি হলে তা অর্থনৈতিক উন্নয়নকে আরো ত্বরান্বিত করবে।
পোশাক শিল্পের সমস্যাঃ
- উচ্চ সুদের হার ও স্বার্থন্বেষী চক্র।
- নির্দিষ্ট সময়ে রপ্তানি করতে না পারা।
- সরকার পোশাক শিল্পের অনুকূলে প্রায়ই মুদ্রার অবমূল্যায়ন করে যাচ্ছে। প্রতিযোগী অন্যান্য দেশ আরো বেশি করে মুদ্রা অবমূল্যায়ন করে চলেছে । ফলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছে।
- চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কাঁচামাল ঢাকার কারখানায় পৌঁছাতে যেখানে সাতদিন সময় লাগার কথা সেখানে বর্তমানে প্রায় ২১ দিন লেগে যায় ।
- অসুবিধাসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বিভিন্ন ধরণের অস্পষ্ট খরচ। ফাইল মুভমেন্ট, এলসি খোলা, মাল খালাস প্রভৃতি ক্ষেত্রে নানা ধরণের অস্পষ্ট ব্যয় ঘটছে যা এ শিল্পকে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।
আরও কতিপয় সমস্যাঃ
- শ্রমিক অসন্তোষ ।
- রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ।
- আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ।
- ব্যাংকিং খাতের অব্যবস্থাপনা ৷
- পশ্চাৎশিল্প থেকে অপর্যাপ্ত কাপড় সরবরাহ।
- প্রশাসনিক জটিলতা ।
- বৈদেশিক বিনিয়োগে স্বল্পতা ।
- অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ।
- কোটা আরোহণ ।
- স্বল্পমাত্রার ঋণপত্ৰ ।
- দুর্বল শ্রমনীতি ।
- কাঁচামালের স্বল্পতা।
- দক্ষ শ্রমিক ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাব। পোশাক শিল্প উন্নয়নে কতিপয় সুপারিশঃ
- উৎপাদন ও বাজার বহুমুখীকরণ
- বিকল্প আর্থিক সুবিধা প্রদান ব্যবস্থা ।
- গার্মেন্টস পল্লী নির্মাণ ।
- শুল্ক পদ্ধতির কম্পিউটারাইজেশন।
- আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন।
- ব্যাংকিং খাতের সংস্কার সাধন ।
- বন্দর সুবিধা ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তরকরণ।
- গার্মেন্টসের পশ্চাৎ শিল্পের উন্নয়ন সাধন।
- বিদেশে লবিস্ট নিয়োগ করা ।
- সড়ক ও রেল যোগাযোগ উন্নয়ন করা।
- শ্রমিকদের দক্ষতা ও উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ।
- মূল্য সংযোজন কর হ্রাস করা।
- দ্রুত রপ্তানির জন্য কার্গো বিমান চার্টার করার অনুমতি প্রদান । রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পে EPZ এর মতো সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা।
- কোটানীতি সংক্রান্ত দুর্নীতির অবস্থান করা।
- উদ্যোক্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।