1 Answers
বাহাই ধর্ম বা বাহাই বিশ্বাস হচ্ছে বাহাউল্লাহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একেশ্বরবাদী একটি ধর্ম বা বিশ্বাস। ঊনবিংশ শতাব্দীতে পারস্যে (বর্তমানে ইরান) এই ধর্মের উৎপত্তি। মূলত মানবজাতির আত্মিক ঐক্য হচ্ছে এই ধর্মের মূল ভিত্তি। বিশ্বে বর্তমানে ২০০-এর বেশি দেশ ও অঞ্চলে এই ধর্মের আনুমানিক প্রায় ৬০ লক্ষ অনুসারী রয়েছে। বাহাই বিশ্বাস অনুসারে ধর্মীয় ইতিহাস স্বর্গীয় দূতদের ধারাবাহিক আগমণের মাধ্যমে ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয়েছে। এইসব দূতদের প্রত্যেকে তাদের সময়কার মানুষদের সামর্থ্য ও সময় অনুসারে একটি ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই সকল স্বর্গীয় দূতদের মাঝে আছেন ইব্রাহিম, গৌতম বুদ্ধ, যীশু, মুহাম্মাদ ও অন্যান্যরা। সেই সাথে খুব সাম্প্রতিককালে বাব ও বাহাউল্লাহ। বাহাই ধর্ম মতে এসকল দূতগণ প্রত্যেকেই তাদের পরবর্তী দূত আসার ব্যাপারে, ও তাদেরকে অনুসরণ করতে বলে গেছেন। এবং বাহাউল্লার জীবন ও শিক্ষার মাধ্যমে দূতগণের এই ধারা ও পূববর্তী ধর্মগ্রন্থগুলোর অঙ্গীকার সম্পূর্ণ হয়েছে। মানবতা সমষ্টিগত বিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে ধরা হয়েছে, এবং বৈশ্বিক মাপকাঠিতে সার্বিকভাবে শান্তি, সুবিচার ও ঐক্য প্রতিষ্ঠাই হচ্ছে বর্তমান সময়ের প্রয়োজনীয়তা। ‘বাহাই’ (উচ্চারণ: bəˈhaɪ) শব্দটি একটি বিশেষণ হিসেবে বাহাই বিশ্বাস বা ধর্মকে নির্দেশ করতে বা বাহাউল্লার অনুসারীদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এটি উদ্ভূত হয়েছে আরবি বাহা’ থেকে, যার অর্থ ‘মহিমা’ বা ‘উজ্জলদীপ্তি’। ধর্মটিকে নির্দেশ করতে পূর্বে বাহাইজম বা বাহাইবাদ পরিভাষাটি ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে ধর্মটির সঠিক নাম বাহাই বিশ্বাস। বাহাই পুস্তক বলে প্রত্যেক মানুষের মধ্যে একটি ‘বিচাবুদ্ধিক্ষম সত্ত্বা’ রয়েছে, যা এই প্রজাতিকে ঈশ্বরকে চেনার এবং মানবতার সাথে এর স্রষ্টার সম্পর্ককে বোঝার একটি নিখুঁত সামর্থ্য প্রদান করেছে। প্রত্যেক মানুষের কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্বও রয়েছে। যার মধ্যে আছে ঈশ্বর কর্তৃক প্রবর্তিত দূতগণের মাধ্যমে ঈশ্বরকে চেনা ও তাঁদের প্রদত্ত শিক্ষাকে গ্রহণ করা। বাহাই পুস্তক অনুসারে, এই পরিচয় ও আনুগত্যের মাধ্যমে, এবং মানবতার জন্য কাজ করা ও নিয়মিত প্রার্থনার ফলে মানুষ ঈশ্বরের আরও নিকটবর্তী হতে থাকে। এটি বাহাই বিশ্বাসের একটি আধ্যাত্মিক লক্ষ্য। যখন কোনো মানুষ মৃত্যুবরণ করে, আত্মা পরবর্তী জগতে পদার্পণ করে। সেখানে কোনো আত্মার আত্মিক উন্নয়ন সম্ভব, যা নির্ভর করে পার্থিব জীবনের কৃত কর্মকাণ্ডের ওপর। পার্থিব জীবনের কর্মকাণ্ডকে ভিত্তি করেই পরবর্তী আধ্যাত্মিক জীবনের বিচার নির্ধারিত হয়। স্বর্গলোক ও মর্তলোককে আধ্যাত্মিকভাবে যথাক্রমে ঈশ্বরের নিকটবর্তী ও দূরবর্তী একটি অবস্থান হিসেবে ধরা হয়। এর মাধ্যমে পার্থিব ও পরবর্তী জীবনের মধ্যে সম্পর্ক সাধিত হয়। বাহাই বিশ্বাস অনুসারে মৃত্যুর পর কোনো পুরস্কার বা শাস্তি প্রদানের বিধান নেই। বাহাই ধর্ম বিশ্বের প্রায় সকল ধর্মের বৈধতায় বিশ্বাস করে, এবং সকল ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা ও কেন্দ্রীয় ব্যক্তিবর্গ হচ্ছে ঈশ্বরের প্রতিনিধি। ধর্মীয় ইতিহাস হচ্ছে ধর্মগুলোর ধারাবাহিক বণ্টন। এখানে প্রত্যেকে ধর্মের প্রত্যেক প্রতিনিধি ঐ সময় ও স্থানের জন্য আরও ব্যাপক ও প্রাগ্রসর ধারণার প্রবর্তন করেন। সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় সামাজিক শিক্ষাগুলো (যেমন: প্রার্থনার নিয়ম, মৃত্যুপরবর্তী নিয়মকানুন ইত্যাদি) বর্তমান বা পরবর্তী দূতের মাধ্যমে পরবর্তিত হতে পারে। এভাবে পরবর্তী সময় ও স্থানের জন্য প্রযোজ্য আরও সঠিক একটি নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয়। অবশ্য, সুনির্দিষ্ট কিছু সাধারণ নীতি (যেমন: প্রতিবেশীর প্রতি আচরণ, দাতব্য কর্মকাণ্ড ইত্যাদি) রয়েছে যেগুলো সর্বজনীন ও স্থায়ী। বাহাই বিশ্বাস অনুসারে সদা অগ্রসরমানতার এই প্রক্রিয়া কখনও শেষ হবে না, যদিও বিশ্বাস করা হয় এটি চক্রাকারে ফিরে আসে। এছাড়া বাহাইরা তাঁদের বর্তমান দূত বাহাউল্লাহ’র আবির্ভাবের ১০০০ বছরের মধ্যে ঈশ্বরের আর কোনো দূতের আবির্ভাবে বিশ্বাস করে না।