1 Answers

বৌদ্ধরা মনে করে যে মৃত্যুর পরে তাদের পুনর্জন্ম লাভ হবে যেখানে তাদের আত্মা এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় গমন করবে। পুনর্জন্মের ধরন কী হবে তা ব্যক্তির কৃতকার্যের (কম্ম বা কর্ম) উপর নির্ভর করবে। যেমন ব্যক্তি যদি দেহ, বাক্য ও মনের দ্বারা লোভ, ঘৃণা ও বিভ্রমের কারণে ক্ষতিকর কাজ করে, তাহলে তারা নিম্ন জগতে বা নরক জগতে থাকবেন যার অর্থ হল একটি পশু বা ভূত হয়ে জন্মানো। অন্যদিকে যদি ব্যক্তি উদারতা, ভালবাসা, দয়া, সহানুভূতি ও জ্ঞানের দ্বারা ভাল কাজ করেন তাহলে তিনি সুখের জগতে বা স্বর্গীয় জগতে জন্মাবেন যার অর্থ হল মানুষ হয়ে জন্মানো। পুনর্জন্মের পদ্ধতি পুর্ব থেকেই ঠিক করা নয়। এটা বিভিন্ন মাত্রার কম্মের উপর নির্ভর করে। ব্যক্তি কোন অবস্থায় পুনর্জন্ম লাভ করবে তা ঠিক হবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হল শেষ চিন্তার সময়। এই সময়ের অনুযায়ী ভারী কম্ম ফলবে (heavy kamma), সেটা না হলে মৃত্যু নিকট কম্ম (near death kamma) কাজ করবে, যদি তা না হয় তাহলে অভ্যাসগত কম্ম (habitual kamma) কাজ করবে, আর শেষে তাও যদি না হয় তাহলে অবশিষ্ট কম্ম (residual kamma) কাজ করবে যা এর পূর্বের কৃতকার্যের উপর নির্ভর করে। থেরবাদ বৌদ্ধধর্ম অনুসারে একজন মানুষ পুনর্জন্ম লাভ করতে পারে এমন ৩১টি অস্তিত্বের জগতের কথা বলা হয়েছে। মহাযান বিশ্বাসের পিওর ল্যান্ড বৌদ্ধধর্ম এই ৩১টি জগৎ ছাড়াও আরেকটি বিশেষ স্থানের কথায় বিশ্বাস করে যাকে পিওর ল্যান্ড বা পবিত্র ভূমি বলা হয়। এটা বিশ্বাস করা হয় যে, প্রত্যেক বুদ্ধেরই তাদের নিজস্ব পবিত্র ভূমি থাকে যা তাদের যোগ্যতা বা সদগুণ দিয়ে সচেতন ব্যক্তির হিতার্থে তৈরি হয়েছে। সচেতন ব্যক্তি সমনোযোগে বুদ্ধদেরকে স্মরণ করলে এই পবিত্র ভূমিতে পুনর্জন্ম লাভ করেন এবং একজন বুদ্ধ হবার জন্য প্রশিক্ষিত হন। তাই পিওর ল্যান্ড বৌদ্ধধর্মের প্রধান চর্চা হল বুদ্ধের নাম ভজন করা। তিব্বতীয় বৌদ্ধধর্মের টিবেটান বুক অব ডেড -এ মৃত্যু এবং পুনর্জন্মের মধ্যে একটি মধ্যবর্তী অবস্থার কথা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মৃতব্যক্তিগণ জ্ঞানের উজ্জ্বল আলো খুঁজে পাবেন যা ঊর্ধ্বে যাবার একটি সোজা রাস্তা দেখাবে এবং এর সাহায্যে ব্যক্তি পুনর্জন্মের চক্র ত্যাগ করতে সক্ষম হবেন। অনেক কারণেই মৃত ব্যক্তি সেই আলো অনুসরণ করে না, অনেকে জীবদ্দশায় কখনও এই মধ্যবর্তী অবস্থা ও আলোর ব্যাপারে শোনেও নি, অনেকে পশুদের মত কেবল মৌলিক প্রবৃত্তিরই অনুসরণ করে, আবার অনেকের ভয়ও থাকতে পারে যা জীবদ্দশায় থাকা খারাপ কাজ অথবা অহংকারের কারণে তাদের মাঝে সৃষ্টি হতে পারে। এই মধ্যবর্তী অবস্থায় সচেতনতা খুবই নমনীয়, তাই ধার্মিক হওয়া, ইতিবাচক মনোভাব ধারণ করা এবং নেতিবাচক ধারণাগুলো এড়িয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে অবচেতন থেকে আসা ধারণাগুলো প্রচণ্ড মেজাজ এবং ভীতিকর দৃশ্যের সৃষ্টি করতে পারে। এই অবস্থায় মৃতকে বুঝতে হবে যে, এই প্রদর্শনগুলো কেবলই মনের ভেতরের চিন্তার প্রতিফলন। কেউই তাদেরকে আঘাত করতে বা ক্ষতি করতে পারবে না, কারণ তাদের কোন বস্তুগত শরীর নেই। মৃত ব্যক্তি বিভিন্ন বুদ্ধের কাছ থেকে সাহায্য লাভ করে যারা তাদেরকে উজ্জ্বল আলোর পথ দেখান। যারা শেষ পর্যন্ত এই পথ অনুসরণ করেন না, তারা উন্নততর পুনর্জন্ম লাভের জন্য সংকেত পান। গত জন্মের যেসব ব্যক্তি ও বস্তুর মায়া তিনি এখনও বয়ে চলেছেন সেগুলোকে তাকে ত্যাগ করতে হয়। তাদেরকে প্রস্তাব করা হয় যাতে তারা একটি পরিবার গ্রহণ করেন যেখানে পিতামাতা ধর্মে বিশ্বাসী হবেন, যাতে তিনি সকল জীবের প্রতি ভালবাসার ইচ্ছা নিয়ে পুনর্জন্ম লাভ করতে পারেন। বৌদ্ধধর্ম অনুসারে, জীবন হল মহাবিশ্বের একটি মহাজাগতিক শক্তি এবং মৃত্যুর পর এটা মহাবিশ্বের সাথে আবার জুড়ে যায়। আর যখন সেই জীবনের জন্য উপযুক্ত স্থান খুঁজে পাওয়ার সময় হয় তখন এটি জন্ম লাভ করে। যেকোন জীবনের দশটি জীবনাবস্থা রয়েছে, এগুলো হল: নরক, ক্ষুধা, রাগ, পশুবৃত্তি, পরমানন্দ, মানবিকতা, শিক্ষণ, বোধগম্যতা, বোধিসত্ত্ব এবং বুদ্ধত্ব। এগুলোর মধ্যে জীবন যে অবস্থায় মৃত্যু বরণ করে, জীবন পুনরায় সেই অবস্থাতেই আবার জন্মলাভ করে।

5818 views