1 Answers
"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" এর সঠিক অর্থ কি আপনার জানা আছে? আপনি যে অর্থটি জানেন সেটা কি সঠিক? মৃত্যুর পূর্বে একটু যাচাই করে দেখুন।
আমরা যারা বাঙ্গালি তথা অনারব তাদের অধিকাংশ মুসলিম ভালো করে কালেমায়ে- "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" এর অর্থ কি, তা জানে না।
অনারব অধিকাংশ মুসলিম যারা সজ্ঞানে এ কথার সাক্ষ্য দেয়, "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ", তারা প্রকৃত পক্ষে এই বাক্যটির সত্যিকার অর্থ কি তা জানে না। বরং অনেক সময় দেখা যায়, তারা সম্পূর্ণ উল্টা ও বিপরীত অর্থই জানে।
যেমন কাউকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-র অর্থ কি?
সে জবাব দেয়- "আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহা নেই" অথবা "আল্লাহ্ ছাড়া কোন মাবূদ নেই"।
কিন্তু "ইলাহা" এবং "মাবূদ" দুটোই আরবী শব্দ। এখানে তারা পুরো বাক্যটার অনুবাদ কিন্তু করা হয়নি। "ইলাহা" এবং "মাবূদ" দুটোই শব্দই আরবী শব্দ এবং এই শব্দটার-ই অনুবাদ করা হয় না। তাহলে এই "ইলাহ" শব্দটির আসল অর্থ কি?
কেউ কেউ বলে- আল্লাহ্ ছাড়া কোন সৃষ্টিকর্তা নেই। এটাও লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-র আসল অর্থ নয়। কেননা "সৃষ্টিকর্তা" এর আরবী "খালিক"। তাই এখানে সৃষ্টিকর্তা- "ইলাহ" শব্দটির সঠিক অনুবাদ নয়।
"ইলাহ" শব্দটির অনুবাদকে অনেকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে ধরে বলে যে- আমি তো আল্লাহ্-কেই সৃষ্টিকর্তা হিসেবে বিশ্বাস করেছি। তাহলে আমার তো ঈমান আছে, আমি তো ঈমানদার।
যদি আল্লাহ্-কে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে বিশ্বাস করলেই ঈমানদার হওয়া যেত তাহলে নাবী (সাঃ) এর যুগের আরবের মুশরিকরা আপনার চাইতে বেশি ঈমানদার ছিল। কিন্তু তারপরে আল্লাহ্ তাদের জন্য জাহান্নাম ওয়াজিব করেছেন।
আপনার কি বিশ্বাস হচ্ছে না যে- আরবের মুশরিকরা আপনার চাইতে বেশি ঈমানদার ছিল!
কুরআন নিজেই তার প্রমান-
" যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তবে অবশ্যই তারা বলবে, আল্লাহ, অতঃপর তারা কোথায় ফিরে যাচ্ছে ? (সুরা যুখরুফঃ ৮৭)
"যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে নভোমন্ডল ও ভূ-মন্ডল সৃষ্টি করেছে, চন্দ্র ও সূর্যকে কর্মে নিয়োজিত করেছে? তবে তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ। (সুরা আনকাবুতঃ ৬১)
"যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, কে আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করে, অতঃপর তা দ্বারা মৃত্তিকাকে উহার মৃত হওয়ার পর সঞ্জীবিত করে? তবে তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। বলুন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই। কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা বোঝে না। (সুরা আনকাবুতঃ ৬৩)
"বলুন পৃথিবী এবং পৃথিবীতে যারা আছে, তারা কার? যদি তোমরা জান, তবে বল। এখন তারা বলবেঃ সবই আল্লাহর। বলুন, তবুও কি তোমরা চিন্তা কর না? বলুনঃ সপ্তাকাশ ও মহা-আরশের মালিক কে? এখন তারা বলবেঃ আল্লাহ। বলুন, তবুও কি তোমরা ভয় করবে না? বলুনঃ তোমাদের জানা থাকলে বল, কার হাতে সব বস্তুর কর্তৃত্ব, যিনি রক্ষা করেন এবং যার কবল থেকে কেউ রক্ষা করতে পারে না ? এখন তারা বলবেঃ আল্লাহর। (সুরা মু'মিনুনঃ ৮৪-৮৯)
" তুমি জিজ্ঞেস কর, কে রুযী দান করে তোমাদেরকে আসমান থেকে ও যমীন থেকে, কিংবা কে তোমাদের কান ও চোখের মালিক? তাছাড়া কে জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করেন এবং কেইবা মৃতকে জীবিতের মধ্য থেকে বের করেন? কে করেন কর্ম সম্পাদনের ব্যবস্থাপনা? তখন তারা বলে উঠবে, আল্লাহ! তখন তুমি বলো তারপরেও ভয় করছ না? (সুরা ইউনুসঃ ৩১)
"আর যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর, কে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। (সূরা লোকমান, আয়াত: ২৫)
এমন আরো বহু আয়াত প্রমান করে যে- সেই সময়ের মুশরিকরা আল্লাহ্কে শুধু "সৃষ্টিকর্তা" হিসেবেই মান্য করত না বরং আরো অনেক কিছুর মালিক হিসেবে-ই বিশ্বাস করত।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে ঐ মুশরিকরা আল্লাহ্কে "সৃষ্টিকর্তা" এবং আরো অনেক কিছুর মালিক হিসেবে-ই বিশ্বাস করার পরও আল্লাহ্ কেন তাদেরকে ধ্বংস করলেন? আল্লাহ্ কেন তাদেরকে চিরকাল জাহান্নামে শাস্তি দিবেন?
*** এর উত্তর হচ্ছে তারা আল্লাহ্কে "ইলাহ" হিসেবে মানত না। আল্লাহর প্রতিমা আকার চেষ্টা করতো মূর্তি পূজাও করতো ***
এবার আসুন "ইলাহ" শব্দটির সঠিক অর্থটি বোঝার চেষ্টা করি।
"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" অর্থ "আল্লাহ্ ছাড়া কোন মাবূদ নেই"। এখানে মাবূদ শব্দটিও আরবী, এই শব্দটি এসেছে "ইবাদাহ" শব্দ থেকে যার অর্থ হচ্ছে গোলামী করা।
অর্থাৎ আমাদেরকে একমাত্র আল্লাহ্র ইবাদাত করতে হবে। আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো ইবাদাত করা যাবে না। আসলে ইবাদাত শব্দটি আমরা সচারচর ব্যাবহার করলেও শব্দটিও কিন্তু আরবী।
ইবাদাত শব্দের অর্থ হচ্ছে "গোলামী করা"। ইবাদাত শব্দের আরেকটি অর্থ হয় উপাসনা করা, আরাধনা করা ইত্যাদি।
তাহলে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে = আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো গোলামী করা যাবে না।
অর্থাৎ আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো হুকুম মানা যাবে না। আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো কথা শোনা যাবে না।
আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো কথা মানা যাবে না, অর্থাৎ বাবা-মায়ের কথা মানা যাবে না, নেতার কথা মানা যাবে না, শাসকের কথা মানা যাবে না, Totally কারো কথা মানা যাবে না। এমন কি নিজের কথাও মানা যাবে না।
একমাত্র আল্লাহ্ যেটা বলবেন সেটা-ই মানতে হবে। আল্লাহ্ বলেছেন- বাবা,মা কে শ্রদ্ধা করতে তাই আমরা বাবা, মা কে শ্রদ্ধা করি, আল্লাহ্ বলেছেন- রাসুলের আনুগত্য করতে তাই আমরা রাসুলের আনুগত্য করি, আল্লাহ্ বলেছেন- সত্য কথা বলতে তাই আমরা সত্য কথা বলি। আল্লাহ্ বলছেন সালাত কায়েম করতে তাই আমরা সালাত কায়েম করি।
অথচ ইব্রাহীম (আঃ) তার পিতার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন।
-কেন?
-কারন আল্লাহ্ বলেছেন। তাহলে বুঝা গেল, আল্লাহ্ বললে- বাবা,মা কে শ্রদ্ধা করতে হবে, আবার আল্লাহ্ বললে- পিতা মাতার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে। অর্থাৎ আল্লাহ্ কথাকেই প্রাধান্য দিতে হবে। আল্লাহ্র কথার উপরে কারো মায়া-মুহাব্বত চলে না। এটাই হচ্ছে "ইলাহ" এর বাস্তবতা।
মহান আল্লাহ্ বলেন-
"তুমি কি তাকে দেখ না, যে তারা প্রবৃত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? তবুও কি তুমি তার যিম্মাদার হবে? তুমি কি মনে কর যে, তাদের অধিকাংশ শোনে অথবা বোঝে ? তারা তো চতুস্পদ জন্তুর মত; বরং আরও পথভ্রান্ত (সুরা ফুরকানঃ ৪৩-৪৪)
তাহলে আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো কথা মানা যাবে না, আল্লাহ্র আদেশের সামনে মাথা নত করে দেয়ার নাম-ই হচ্ছে মুলত আল্লাহ্-কে "ইলাহ" হিসেবে মেনে নেয়া।
অর্থাৎ আল্লাহ্ ছাড়া হুকুম-আহকাম দেয়ার ক্ষমতা কারো নেই। কেউ হুকুম-আহকাম দিলেও আমি তা মানবো না। আমি তো শুধু একমাত্র আল্লাহ্র-ই গোলামী করি। আল্লাহ্ ছাড়া আর কারো গোলামী আমি করতে পারি না, করলে সেটা শির্ক হবে।
এভাবে কোন একজন মানুষ আল্লাহ্-কে ইলাহ হিসেবে ভালভাবে বুঝে- সজ্ঞানে আল্লাহ্কে "ইলাহ" হিসেবে মনে প্রানে মেনে নিয়ে অতঃপর মুখে সাক্ষ্য দিলে তবেই সে হবে ঈমানদার।
আর এই বিষয়টাই আরবের লোকেরা বুঝত, কারন তাদের ভাষাই তো আরবী। ফলে তারা আল্লাহ্র গোলামী মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না তাই তারা মুখে মুখে সাক্ষ্যও দিত না। কিন্তু আমরা তো ছোটবেলা থেকে না বুঝে-ই তোতা পাখির মত আল্লাহ্-কে "ইলাহ" হিসেবে মেনে নেয়ার সাক্ষ্য দিই। অথচ আল্লাহ্ ব্যাতিত অন্য কারো হুকুম-আহকাম, বিধি-বিধানও মেনে নিই।
তাই আজ আপনাদের কাছে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" এর সঠিক অর্থ বুঝিয়ে দেয়ার পর চিন্তা করে দেখুন আপনি কি একমাত্র আল্লাহ্র গোলামী করতে প্রস্তুত আছেন? আপনি কি মনে প্রানে বিশ্বাস করেন যে- আল্লাহ্ ছাড়া হুকুম-আহকাম, বিধি-বিধান দেয়ার ক্ষমতা কারো নেই। আল্লাহ্ ছাড়া হুকুম-আহকাম, বিধি-বিধানের সামনে মাথা নত করে দেয়ার মত ইচ্ছা কি আপনার আছে?
তাহলে মন থেকে কালেমায়ে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" এর সাক্ষ্য দিন ।।
#Shifat
1699 views
Answered