2 Answers

বিপদের প্রকারভেদ: আল্লাহ আমাদেরকে যে বিপদগুলি দেন সেগুলি দুই ধরনের – এক হলো শাস্তি (যেটাকে আমরা অনেক সময় ‘ গজব ’ বলি) , আর দ্বিতীয়ত: হলো পরীক্ষা । আল্লাহ মানুষের উপর তখনই গজব পাঠান যখন মানুষ পাপ কাজ করে। অন্যদিকে, আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করেন তার জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে, এই পরীক্ষা অনেক সময় সুবিধার আকারে আসে, আবার অনেক সময় আসে বিপদের আকারে । আল্লাহর গজব প্রসঙ্গে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোরআনে বলেন: তোমার যা কিছু মঙ্গল হয় তা আল্লাহর তরফ থেকে আসে, কিন্তু তোমার যা কিছু অমঙ্গল হয় তা তোমার নিজের কারণে। – (সূরা নিসা:৭৯) তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে তা তো তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল এবং তোমাদের অনেক অপরাধ তিনি ক্ষমা করে দেন (অর্থাৎ না হলে তোমাদের আরো অনেক বিপদ আসত)। – (সূরা শূরা:৩০) আল্লাহর পরীক্ষা সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: আল্লাহ যখন কাউকে ভালবাসেন, তখন তাকে পরীক্ষা করেন। যার ধৈর্য আছে সে ধৈর্য ধরবে, আর যে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হবে। (আহমাদ) গজব না পরীক্ষা কিভাবে বুঝব: যদি আপনি আল্লাহর কোনও হুকুম পালন করতে যেয়ে বিপদের সম্মুখীন হোন তো এটা পরীক্ষা। যেমন: আপনি ইসলামের কথা প্রচার করতে গেলে কেউ যদি আপনাকে হেয় করে, আপনি সততা বজায় রেখে কাজ করতে যেয়ে যদি কোনো বিপদে পড়েন, আল্লাহকে খুশী করার জন্য যদি খুব প্রিয় কোন বন্ধুকে ছেড়ে দিতে হয়, আল্লাহর হুকুম পালনের জন্য যদি সুদী ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলে নেন ইত্যাদি। এই সব বিপদে ধৈর্য ধরার জন্য আপনি অনেক সওয়াব পাবেন এবং আপনার গুনাহ মাফ হবে। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: মু’মিনের ব্যাপারটা আশ্চর্যজনক, তার সাথে যা ঘটে তা-ই তার জন্য কল্যাণকর। যখন আনন্দদায়ক কিছু ঘটে তখন সে আল্লাহকে শুকরিয়া জানায় এবং এটা তার জন্য আরো ভালো হয়। এবং যখন তার কোনো বিপদ হয় তখন সে ধৈর্য ধরে এবং এটা তার জন্য আরো ভালো হয়। আর এরকম হয় শুধুমাত্র মু’মিনের ক্ষেত্রে। – (সহীহ মুসলিম) অন্যদিকে, যদি আপনি কোনও পাপ কাজ করতে যেয়ে বিপদে পড়েন তাহলে এটা আল্লাহর গজব। যেমন আপনি যদি ঘুষ খেতে যেয়ে ধরা পড়েন, ব্যভিচার করার ফলে কোন অসুখে আক্রান্ত হন বুঝবেন আপনার উপর আল্লাহর গজব পড়েছে। আবার, একই ঘটনা একজনের জন্য গজব আর আরেকজনের জন্য পরীক্ষা হতে পারে। যেমন – রানা প্লাজার বিল্ডিং ধস দুর্নিতীবাজ মালিকের জন্য গজব, অন্যদিকে গার্মেন্টস কর্মীদের জন্য হয়তো আল্লাহর তরফ থেকে পরীক্ষা। আল্লাহ নিরপরাধ মানুষগুলোকে এত কঠিন পরীক্ষায় ফেললেন কেন? সবচেয়ে সহজ উত্তর হলো আল্লাহ তাদের মঙ্গল চান তাই। ঠিক যেমন, আপনার বাচ্চাকে যখন টিকা দিতে আপনি ডাক্তারের কাছে নেন তখন সে মনে করে যে ডাক্তার তাকে ব্যথা দিতে চাচ্ছে, তার ক্ষতি করতে চাচ্ছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ডাক্তার তার ভালো চায়। আপনি যেমন দীর্ঘমেয়াদের ভালো স্বাস্থ্য দেয়ার জন্য আপনার বাচ্চাটাকে সাময়িকভাবে এই কষ্টের মধ্যে ফেলেন, আল্লাহও ঠিক তেমনি ভাবে মু’মিন বান্দাদের এবং অনেক ক্ষেত্রে অবুঝ শিশুদেরকেও ভয়ংকর অসুখ দেন, কষ্ট দেন – এর ফলে তারা এই ক্ষয়িষ্ণু পৃথিবীতে কিছুদিনের জন্য কষ্ট করবে, কিন্তু এর বিনিময়ে হয়ত পাবে চিরস্থায়ী জান্নাত। একইভাবে, দুর্ঘটনায় পড়ে যে সব মুসলমান ভাই-বোন নিহত হয়েছেন ইনশাআল্লাহ তাঁরা শহীদের মর্যাদা পাবেন এবং পরকালে জান্নাতবাসী হবেন। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: কোনও ঈমানদারের উপর যখন কোনো ক্লান্তি, অসুখ, দু:খ, বেদনা, আঘাত, যন্ত্রণা আসে, এমনকি তার যদি একটা কাঁটার খোঁচাও লাগে – এর জন্যও আল্লাহ তার কিছু গুনাহ মাফ করে দেন। – (সহীহ বুখারী) আমরা মানুষেরা আল্লাহর অবাধ্যতা করে প্রতিদিনই অসংখ্য পাপ করছি। আল্লাহ চান আমাদেরকে পাপমুক্ত করে জান্নাত দিতে, নিজের ও অন্য মানুষের বিভিন্ন বিপদ, অসুখ-বিসুখ দেখিয়ে মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দিতে। মানব জীবনের সফলতা কোটিপতি হওয়ার মধ্যে না, বড় কোম্পানীতে চাকরি করার মধ্যে না, বা শত বছর বেঁচে থাকার মধ্যেও না। মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা হলো জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম মেনে চলা, আর এর ফলস্বরূপ পরকালে জান্নাত পাওয়া। প্রত্যেক প্রাণকেই মরণের স্বাদ নিতে হবে। কেয়ামতের দিন তোমাদের কর্মফল পুরো করে দেয়া হবে। যাকে আগুন থেকে দূরে রাখা হবে ও জান্নাতে যেতে দেওয়া হবে সে-ই সফলকাম। আর পার্থিব জীবন তো ছলনাময় ভোগ ছাড়া আর কিছুই নয়। – (সূরা আল-ই- ইমরান:১৮৫) কাজেই আপাত:দৃষ্টিতে আমাদের কাছে যদিও মনে হচ্ছে এই নিরীহ মানুষগুলির উপর কঠিন বিপদ এসে পড়েছে, কিন্তু আসলে হয়তো এর মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের এই ভাই- বোনদেরকে বাকীজীবনের কষ্ট থেকে মুক্তি দিচ্ছেন এবং জান্নাত দিচ্ছেন। আর যারা আহত হয়েছেন, মৃত্যুর সাথে লড়াই করছেন, আল্লাহ তাদের সব গুনাহ মাফ করে হয়তো তাদের নিষ্পাপ করে দিচ্ছেন। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন – যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয় সে শহীদ, যে ব্যক্তি ভবন ধ্বসে মারা যায় সে শহীদ, যে ব্যক্তি মহামারীতে মারা যায় সে শহীদ, যে ব্যক্তি পেটের পীড়ায় মারা যায় সে শহীদ, যে ব্যক্তি পানিতে ডুবে মারা যায় সে শহীদ। (মুসলিম, মিশকাতঃ ৩৮১১, সহীহুল জামেঃ ৬৪৪৯) শেষ কথা: সব কথার বড় কথা হলো আল্লাহ যা জানেন আমরা তা জানি না, তাই তিনি যা করেন তার সব কিছুর মর্মার্থ আমাদের বুঝা সম্ভব না। কিন্তু, তিনি আমাদের সৃষ্টিকর্তা, প্রতিপালক। কাজেই সর্বোপরী যেটা মানুষের জন্য কল্যানকর তিনি তা-ই করে থাকেন। আমাদের দায়িত্ব হলো যারা দুর্ঘটনাকবলিত তাদেরকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা, জীবিত ও মৃতদের জন্য দু’আ করা, দোষী ব্যক্তিদের যাতে শাস্তি হয় সেই পদক্ষেপ নেয়া । আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন হলো এই মানুষগুলোর কষ্ট, মানুষগুলোর মৃত্যু থেকে শিক্ষাগ্রহণ করা। আমি-আপনিও একদিন সকালে হয়তো ওদের মতোই কাজ করতে বের হয়ে আর বাসায় ফিরবো না, সরাসরি চলে যাবো কবরে, শুরু হয়ে যাবে জীবনের প্রতিটা কাজের বিচার, প্রতিটা অংগের বিচার, প্রতিটা মূহুর্তের বিচার। একটি হাদিস বলে লেখাটি শেষ করবো। হাদিসটা আপনাকে বলে দিবে যে, জাহান্নামের এক মূহুর্তের আযাব দুনিয়ার সারা জীবনের আনন্দ-উল্লাস ভুলিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট, আর জান্নাতের এক মূহুর্তের শান্তি দুনিয়ার সারা জীবনের দু:খ-কষ্টকে ভুলিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। আনাস ইবনে মালিক (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন যে, পুনরুত্থানের দিন এমন একজন ব্যক্তিকে আনা হবে যে পৃথিবীতে আরাম-আয়েশ এবং প্রাচুর্যতার মধ্যে জীবন কাটিয়েছিল কিন্তু এখন সে জাহান্নামের বাসিন্দা হবে। এই লোকটিকে একবার মাত্র জাহান্নামের আগুনে ডুবানো হবে এবং জিজ্ঞেস করা হবে: হে আদমসন্তান! তুমি কি (দুনিয়াতে) কোনও শান্তি বা কোনও সম্পদ পেয়েছিলে? সে উত্তর দিবে: আল্লাহর কসম! না, ও আমার রব! এবং এরপর এমন একজন ব্যক্তিকে আনা হবে যে জান্নাতের বাসিন্দা কিন্তু সে পৃথিবীতে সবচেয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটিয়েছিলো। এই লোকটিকে জান্নাতে একবার মাত্র ডুবানো হবে এবং তাকে জিজ্ঞেস করা হবে: হে আদমসন্তান! তুমি কি (দুনিয়াতে) কোনও কষ্টের মধ্যে ছিলে? সে বলবে: আল্লাহর কসম! না, ও আমার রব! আমি দুনিয়াতে কখনোই কোনো কষ্টের সম্মুখীন হইনি বা কোনো দুর্দশায় পড়িনি। – (সহীহ মুসলিম)

3288 views

আল্লাহু যে বান্দাকে যত বেশি ভালবাসেন তাকে ততো বেশী পরীক্ষা মধ্যে ফেলেন।অনেক নবী ও রাসুলগনের জীবনী পড়লে দেখা যায় যে তারা অনেক বিপদআপদে পরেছেন,হযরত আইয়ুব নবীর ১৮ বছর পোকায় খেয়েছিল তার পাপের কারনে নয় তা ছিল তার জন্য কঠিন পরীক্ষা। আবার দেখা যায় অনেক শিশু হাসপাতালে শুয়ে মিত্রুর সাথে লড়াই করছে, যে শিশু এখোনো পাপ করা শেখে নাই, সে কেন পাপের জন্য বিপদে পরেছে।সকল কিছু বিবেচনা করলে বুঝা যায় যে আল্লাহুতালা মানুষের বিপদ দেন পরীক্ষা করার জন্য।

3288 views

Related Questions