1 Answers
একটি জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের অভিজ্ঞতা তার সংস্কৃতি। এই অভিজ্ঞতা বিশেষ জনগোষ্ঠী অর্জন করে তার জীবনযাপনের নানাবিধ উপাদানের মধ্য দিয়ে। এসব উপাদানের মাত্রা ব্যাপক। এই ব্যাপক মাত্রার উপাদান জনগোষ্ঠীর জীবনে সব সময় একরকম থাকে না। উপাদানের সঙ্গে নারী-পুরুষের সম্পর্কের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইতিবাচক ও নেতিবাচক ভাবনার সংমিশ্রণ ঘটে- তা বহুবিধ বঙ্কিম চেতনার জটিলতার স্রোতে প্রবাহিত হয়। ফলে তা হতে পারে দুর্বল, অসুস্থ; হতে পারে পরিশীলিত, রুচিশীল। এটি নির্ভর করে, সেই জনগোষ্ঠী কীভাবে নিজেদের গড়ে তুলেছে তার মৌল সত্যের ওপর। মানুষ যদি আপন জীবনাচরণের মৌলিক গুণাবলির পার্থক্য নির্ণয় করতে না পারে, তাহলে সেই খণ্ডিত বোধ তীব্রভাবে আঘাত করে সংস্কৃতিকে। যদি পার্থক্য নির্ণয় করা না যায় ত্যাগ ও সহিষ্ণুতার, সাহস ও সন্ত্রাসের, শক্তি ও ক্ষমতার, বিনয় ও দম্ভের, সত্য ও মিথ্যার- তাহলে মূল্যবোধের ভিত নড়ে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা থাকে। মূল্যবোধ সংস্কৃতির অনেক উপাদানের একটি। মূল্যবোধের অবক্ষয় দুর্বল করে সাংস্কৃতিক চেতনা। দুর্বল সাংস্কৃতিক চেতনা পীড়িত করে জনগোষ্ঠীর মানবিক বোধ।এক সময় বাঙালি জগগোষ্ঠীর জীবনে এমন একটি প্রবাদ প্রচলিত ছিল- গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু পুকুরভরা মাছ। এখন আর এই প্রবাদ বাক্যটি উচ্চারিত হয় না। কারণ সমাজ-কাঠামোর বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়েছে। জমির আয়তন বাড়েনি, কিন্তু জনসংখ্যা বেড়েছে, উৎপাদন কমেছে। তাই প্রয়োজনের ঘাটতি পূরণ হচ্ছে না। ফলে ধাক্কা লেগেছে সাংস্কৃতিক বোধে। নড়ে গেছে সমাজ কাঠামোর পাটাতন।সংস্কৃতি গ্রহণ-বর্জনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। এক সময় এ দেশে সতীদাহ প্রথা প্রচলিত ছিল। স্বামীর মৃত্যুর পরে জীবিত নারীকে সহমরণের জন্য চিতায় তুলে দেয়া হতো। শাস্ত্রের বিধান এমন কঠিন ছিল। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রাগ্রসর চেতনার মানুষ এই ব্যবস্থা আইন করে নিষিদ্ধ করেছেন। তাতে শাস্ত্রের কোনো ক্ষতি হয়নি। আলোকিত হয়েছে নারীর জীবন।একসময় বাঙালি মুসলমান ঠিকমতো শিক্ষার মূল্যায়ন করতে পারেনি। তাঁরা ব্রিটিশ প্রবর্তিত শিক্ষা-ব্যবস্থা বর্জন করেছিল। কিন্তু জীবনযাপনের নানা ধাক্কায় এক সময় তারা অনুভব করে এভাবে পিছিয়ে থাকলে অগ্রগতির দৌড়ে এই সমাজ পিছিয়ে থাকবে। সুতারাং শুরু হয় শিক্ষাগ্রহণ। মহীয়সী নারী রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন মেয়েদের শিক্ষার জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ঘরে ঘরে গিয়ে অভিভাবকদের মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর জন্য সম্মত করান। এভাবে বাংলার মুসলিম সমাজে শিক্ষার আলো প্রবেশ করে।বাংলা বর্ষপঞ্জিতে একসময় অগ্রাহয়ণ ছিল শুরুর মাস। এখন বাংলা বর্ষশুরুর মাস বৈশাখ। বাঙালির নববর্ষ শুধু বাংলা ক্যালেন্ডারের একটি দিন মাত্র নয়। এর নানামুখী মাত্রা আছে, আছে গভীর ব্যাপক অর্থবহ শেকড়-সন্ধানী অনুপ্রেরণা। এটাতো ঠিক বাংলাদেশের বাঙালির আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা, রাষ্ট্র পরিচালনা, শিক্ষা কার্যক্রম ইত্যাদির মতো অন্য ক্ষেত্রগুলো বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পরিচালিত হয় না। পরিচালিত হয় গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। আন্তর্জাতিক বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করতে এক ধরনের ক্যালেন্ডার মেনে চলা বিধিতে পরিণত হয়েছে। বিপরীতে নিজস্ব বর্ষপঞ্জি জাতির সামাজিক-সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের একটি বড় দিক। এই অর্থে বাংলা নববর্ষ বাঙালির এক মহান জাতীয় দিন। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সমৃদ্ধ এই দিন জাতিগত ঐক্যের দৃঢ় বন্ধন। ভবিষ্যতের শুভ সূচনা এই দিনের মধ্যে নিহিত আছে। বাঙালি এই দিনের মর্মবাণীর সাধনায় এক হতে পারলে তার আত্মশক্তির জাগরণ অটুট থাকবে। এই অর্থে বাংলা সন বাঙালির দিনযাপনের সঙ্গে যতটা না সম্পৃক্ত তারচেয়ে অনেক বেশি সম্পৃক্ত জাতিগোষ্ঠীর মানবিক বোধের সাধনা- সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দীপশিখায়। এটাই বাংলা বর্ষপঞ্জির উজ্জ্বল দিক। নববর্ষ এই দিনের মহাজাগতিক বিস্ফোরণ-উৎসবে, আনন্দে, মিলনে, বন্ধনে, ধর্মীয় আচরণের ঊর্ধ্বে মানব সত্যের জয়গানে।অগ্রহায়ণ ফসল কাটার মাস। আর বৈশাখ বীজ বপনের মাস। রবিশস্য ঘরে উঠিয়ে আবার বীজ বোনার কাজ। ফসলের গন্ধভরা স্বর্গসুখের মাস ছেড়ে খরতাপের অমলিন দিনে এসে ঠাঁই নিয়েছে নতুন বছরর সূচনা। বাংলার আদিপ্রাণ কৃষককুল কালের বিবর্তনে এই সত্যকে মেনে নিয়েছে। তারা বর্ষপঞ্জির এই পরিবর্তনের হিসাব রাখেনি। ব্যবস্থাটি মেনে নিয়ে উৎপাদনের ধারাটি বহাল রেখেছে- বিপণনের সম্পর্ক ঠিক রেখেছে। মানুষ তার আপন নিয়মে নতুন-পুরনোর মেলবন্ধন করেছে। তারা ঠিকই জানতো যে এটা না হলে এগিয়ে যাওয়ার গতি মুখ থুবড়ে পড়বে। আবহমান কালের বাঙালি এভাবে আপন শক্তিতে টিকে থেকেছে। সেজন্য বৈশাখকে এভাবে আহ্বান করে বাঙালি রবীন্দ্রনাথের ভাষায়-‘তব পিঙ্গল ছটা হানিছে দীপ্ত ছটাতব দৃষ্টির বহ্নিবৃষ্টি অন্তরে গিয়ে পশে’বৈশাখকে অন্তরে টেনে নিয়ে বাঙালির নতুন বছরের যাত্রা শুরু হয়। বাঙালি অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে জানে। রুখে দাঁড়াও। এখানেই তার ঐক্যের বিস্তার।সংস্কৃতির এই গ্রহণ-বর্জন আছে বলেই জনগোষ্ঠীর জীবনে সাংস্কৃতিক বোধ অগ্রগতি এবং কল্যাণের। মানবিক বোধের মঙ্গল-চেতনা থেকে বিকশিত হয়ে সংস্কৃতির রূপান্তর জনগোষ্ঠীর জীবনে সময়ের সঙ্গে ঘটে- সময়ের এগিয়ে যাওয়ার শুভবোধ থেকে নির্ধারিত হয়। সংস্কৃতির একটি অন্যতম দিক উৎসব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘উৎসব’ প্রবন্ধে বলেছেন : ‘উৎসবের দিনে আমরা যে সত্যের নামে বৃহত্তর লোকে সম্মিলিত হই তাহা আনন্দ, তাহা প্রেম।… উৎসবের দিন সৌন্দর্যের দিন। এই দিনকে আমরা ফুল-পাতার দ্বারা সাজাই, দীপশলার দ্বারা উজ্জ্বল করি, সঙ্গীতের দ্বারা মধুর করিয়া তুলি। এই রূপে মিলনের দ্বারা, প্রাচুর্যের দ্বারা, সৌন্দর্যের দ্বারা আমরা উৎসবের দিনকে বছরের সাধারণ দিনগুলোর মুকুটমণি স্বরূপ করিয়া তুলি।’এভাবে সাংস্কৃতিক চেতনা জনগোষ্ঠীর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের সহায়ক শক্তি। এই শক্তি ছাড়া মানুষের জীবনযাপন ¤্রয়িমাণ হয়ে পড়ে- উপলব্ধিতে, আচার-আচরণে এবং মৌলিক সত্যে।
সংস্কৃতির বিস্তার ও জনসচেতনতাসংস্কৃতি জনগোষ্ঠীর জীবনযাপনের মূলসূত্র নির্ধারণ করে। ভালোমন্দ বোধ তৈরির মাপকাঠি সংস্কৃতি। সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য ছাড়া জনগোষ্ঠী তার জীবনপ্রবাহকে সচল রাখতে পারে না। চোরাবালিতে পথ হারায় জনগোষ্ঠীর জীবনদর্শন। এর ফলে জনগোষ্ঠী যাযাবর মানুষের মতো উদ্বাস্তু শরনার্থী জাতিতে পরিণত হয়।সংস্কৃতির নানা উপাদন থাকে। এক ধরনের উপাদন আচরণগত, যেমন পরস্পরের প্রতি আচরণ কেমন হবে তার মাত্রা নির্ধারণ করা। অর্থাৎ গুরুজনদের প্রতি তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি, নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি। অন্যদিকে সংস্কৃতি সমাজ কাঠামো গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মূল্যবোধ তৈরিও সংস্কৃতি নির্ধারণ করে। রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণাগুলোও সংস্কৃতির আওতায় পড়ে। যেমন রাজনৈতিক সংস্কৃতির শক্তি গণতন্ত্র। অধিকার আদায়ের শক্তি গণআন্দোলন। অর্থনৈতিক উন্নয়নের শক্তি শক্তিশালী সরকার কাঠামো অর্থাৎ নির্বাচিত সরকার। আইন প্রণয়নের একমাত্র জায়গা জাতীয় সংসদ। পরিশীলিত সাংস্কৃতিক চর্চায় গণমাধ্যমের একটি বড় ভূমিকা থাকে। গণমাধ্যমের কাছে মানুষের প্রত্যাশার জায়গাও ব্যাপক, যদি সেই মাধ্যমটি প্রকৃত অর্থে সৎ, নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। সংস্কৃতি মানবজীবনের বেড়ে ওঠার সামগ্রিক ব্যবস্থা। এর বহুমাত্রিক দিক মানুষের বেঁচে থাকাকে অর্থবহ জায়গায় নিয়ে যেতে পারে, যদি মানুষ তার সঠিক ব্যবহার করতে পারে।তাই গণমাধ্যম সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান। একে সঠিকভাবে ব্যবহার করে মানুষ পরিবর্তনের নানা ধারা সূচিত করতে পারে। এ কারণে গণমাধ্যমকে নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করা সরকারের যেমন দায়িত্ব, ব্যক্তিমালিকানাধীন গণমাধ্যম পরিচালনা করার নৈতিক দায়িত্ব ব্যক্তি মালিকের। এই জায়গাটিকে খুশিমতো ব্যবহার করলে সংস্কৃতির অপব্যাখ্যা তৈরি হয় এবং তা জনগণের ওপর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে যে দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ নিরক্ষর সে দেশের ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের একটি বিপুল ভূমিকা জনগণকে প্রভাবিত করে। সেখানে নেতিবাচক আচরণ নেতিবাচক প্রভাবই ফেলে।আবহমান কাল থেকে দেখা যায় সমাজে লোকসংস্কৃতির প্রভাব কত ব্যাপক। মুখে মুখে প্রচলিত প্রবাদ-প্রবচন, লোকবিশ্বাস ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করেছে মূল্যবোধ। প্রবাদ-প্রবচনের নেতিবাচক নানাকিছু উঠে এসেছে লোকসংস্কৃতি থেকে, যায় প্রভাব নারীর বিরুদ্ধে প্রচলিত ধারণাগুলো তৈরিতে সহায়ক ছিল। প্রবাদ এমন : ‘ধান জব্দ শিলে/বউ জব্দ কিলে।’ অর্থাৎ নারীকে মেরেধরে জব্দ রাখার মানসিকতাকে প্রশ্রয় দেয় কিংবা সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে দেয় এই ধরনের প্রবাদ। যখন গণমাধ্যমের ভূমিকা সমাজে ব্যাপক ছিল না তখন লোকসংস্কৃতির এই ধারা গণমাধ্যমের কাজ করেছে। মুখ থেকে মুখে ছড়িয়েছে শুধু। একটি বিশেষ সময়ে ছড়ায়নি, অন্য সময়েও প্রবাহিত হয়েছে।সমাজ রূপান্তরের ধারাকে বিশেষণ করলে গণমাধ্যমের ইতি ও নেতির দিকটি নানা ব্যাখ্যায় উঠে আসে। সংস্কৃতিতে গণমাধ্যমের ভূমিকার দিকটি নিয়ে পরিষ্কার ভাবনা তৈরির বিষয়টি নানা সময়ে নানাভাবে আলোচিত হয়েছে। ব্যক্তি মানুষ এর দ্বারা যেমন সংকটকে চিহ্নিত করেছে, তেমনি সমাধানও খুঁজেছে।সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের কথা ভাবতে গিয়ে প্রবাদপ্রতিম পুরুষ কাঙাল হরিনাথের কথা উল্লেখ করা যায়। তিনি ছিলেন গ্রামীণ সাংবাদিকতার জনক। নিজ উদ্যোগ ও চেষ্টায় প্রকাশ করেছিলেন ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকা। ১৮৬৩ সালের বৈশাখ মাসে এই পত্রিকা প্রথমে কলকাতা থেকে মাসিক হিসেবে প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন পর্যায়ে বাইশ বছর ধরে একজন মানুষ তাঁর শ্রম, মেধা, প্রজ্ঞা, বিবেচনা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি অসাধারণ ভালোবাসা নিয়ে প্রত্রিকাটি প্রকাশ ও সম্পাদনা করেছিলেন। এ দেশের মুদ্রণ গণমাধ্যমের জগতে এটি ছিল একটি অসাধারণ ঘটনা। তিনি বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালীর দরিদ্র পরিবারের সন্তান ছিলেন। তাঁর কর্মক্ষেত্র ছিল কুমারখালী। তিনি হয়ে উঠেছিলেন গ্রামীণ সমাজের দরিদ্র মানুষের কণ্ঠস্বর। গ্রামবর্ত্তার প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর জনৈক গ্রামবাসী ১৮৯১ সালে ‘হিতকরী’ পত্রিকায় একটি চিঠি লিখে বলেছিলেন, ‘আজ কয়েক বছর হতে গ্রামবার্ত্তার কণ্ঠ নীরব হইয়াছে। গ্রামবার্ত্তার সতেজ লেখনী প্রভাবে এ অঞ্চলের পুলিশ, বিচারক, হাকিম, মিউনিসিপ্যাল কমিশনার, জমিদার প্রভৃতির অত্যাচার শান্তভাব ধারণ করিয়াছিল। গ্রামবার্ত্তার জীবন এই সমস্ত অত্যাচার কাহিনী প্রকাশে অনেক সময় নানা বিপদে পড়িতে হইয়াছিল যে, তাহার আর উল্লেখের প্রয়োজন নেই।… পূর্বে যখনই দুঃখ পাইতাম তখনই গরিবের দুঃখে দুঃখী, কান্নার সমভাগী গ্রামবার্ত্তার দ্বারে গিয়া কতোবার কাঁদিতাম। …কিন্তু এখন কাহার কাছে যাইব?’ একটি প্রশ্ন দিয়ে বাক্যটি শেষ হয়েছে। কারণ কোনো কোনো মানুষ নিজেকে এমন অপরিহার্য করে তোলেন যে তাঁর স্থান সহজে পূরণ হওয়ার নয়। এমন মানুষ সমাজে দুর্লভ। তাঁরা মানুষের প্রত্যাশার শীর্ষবিন্দু। এই প্রত্যাশা চিরকালীন। তাই এমন মানুষ এবং তাঁর কর্মের দিকে তাকিয়ে থাকে হাজারজন। আজকের দিনেও এটি নীবর সত্য।তিনি এমন একটি সময়ে নারীশিক্ষা প্রচলনে ব্রতী হয়েছিলেন যখন দেশের অধিকাংশ সচেতন মানুষ এর বিপক্ষে ছিল। তিনি শিলাইদহের ঠাকুর পরিবারের প্রজা-পীড়নের বিষয়ে লিখে তাঁদের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। তিনি প্রশাসনের অপশাসনের বিরুদ্ধে লিখতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করতেন না। সাহস, সততা, নৈতিকবোধে তিনি একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মতো দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর হাতিয়ার ছিল একটি পত্রিকামাত্র। ১৮৮০ সালের জুন মাসে প্রকাশিত ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ প্রত্রিকায় লিখেছিলেন, ‘যতদিন বঙ্গসন্তান মাতৃভাষা উপেক্ষা করিয়া পরভাষার পক্ষপাতী থাকিবেন, যতদিন মাতৃভাষা ঘৃণা করিয়া বৈদেশিক ভাষানুশীলনে সময় ক্ষেপণ করিবেন, ততদিন বঙ্গের উন্নতির আশা আমরা করি না, ততদিন জাতীয় উন্নতির কোনো সম্ভাবনা দেখি না। যাহাতে দেশে মাতৃভাষার চর্চা দিন দিন বৃদ্ধি পায়, যাহাতে মাতৃভাষা আদরের সামগ্রী, যতেœর ধন বলিয়া লোকের প্রতীতি জন্মে, যাহাতে সকলে বদ্ধপরিকর হইয়া মাতৃভাষার দীনবেশ ঘুচাইতে সমর্থ হয়েন, বিধি রতেœ মাতৃভাষাকে অলংকৃতা করিতে কৃতসংকল্প হয়েন, সে বিষয়ে চেষ্টা করা প্রত্যেক বঙ্গসন্তানের অবশ্য কর্তব্য কর্ম্ম।’এভাবে তিনি মাতৃভাষার পক্ষে এমন কঠিন সত্য উচ্চারণ করেছিলেন। মাতৃভাষা সংস্কৃতির একটি উপাদান। মাতৃভাষাকে বাদ দিয়ে কোনো জাতি তার গৌরবের জায়গা তৈরি করতে পারে না। সংস্কৃতি পরিশীলিত হয় ভাষার মর্যাদাকে সমুন্নত করে। ভাষা আন্দোলনে জীবন দান করেও বাংলাদেশের মানুষ মাতৃভাষাকে আজকের দিনেও কাক্সিক্ষত মর্যাদায় উন্নীত করতে পারেনি, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সংবিধানে বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের ভাষা বাংলা। কিন্তু মুদ্রণ ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের দিকে তাকালে মাতৃভাষার প্রকৃত মর্যাদা তারা বিবেচনা করে কিনা সে নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। টিভি চ্যানেলগুলো যেভাবে অনুষ্ঠানের নামকরণে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে তা অত্যন্ত লজ্জার বিষয়। ভাষাকে নানাভাবে বিকৃত করার চেষ্টা করে তারা। এই পরিপ্রেক্ষিতে গণমাধ্যমের দায়িত্বের প্রশ্নে কাঙাল হরিনাথ মজুমদার সামনে এসে দাঁড়ান। এটি সংস্কৃতির প্রতিশ্রæতির জায়গা।মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অবরুদ্ধ ঢাকা শহরে অবস্থান করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং বিবিসি শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে আপেক্ষা করতো শহরবাসী। দুটো বেতার কেন্দ্রে থেকে প্রচারিত খবরের প্রতিটি অক্ষর, এমন কি সংবাদ পাঠকের কন্ঠস্বর এবং নিঃশ্বাস পর্যন্ত মানুষের বিশ্বাসের জগতে থিতু হয়ে থাকতো।তারও আগে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলাকালে মামলার শুনানি দৈনিক পত্রিকার পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হলে প্রতিটি শব্দ খুঁটিয়ে পড়ার ব্যাকুলতা অনুভব করতো মানুষ। কারণ তখন জাতির সামনে একটি ভিন্ন সময় তৈরি হয়ে উঠছিল। সংবাদপত্র ছিল এই জায়গায় একটি সহায়ক শক্তি। সে সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নটি এত তীব্র হয়ে উঠেছিল যে রাজনৈতিক দলের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করেছিল সংবাদপত্র। এভাবে গণমাধ্যমের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংস্কৃতি বড় হয়ে উঠেছিল।এক একটি সময়ে এক একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গণমাধ্যম নিজেকে আস্থাভাজন করে তোলে সাধারণ মানুষের কাছে। কিন্তু নিজ ভূমিকা পালনে গণমাধ্যম সব সময়ে সৎ থাকতে পেরেছে এটা বোধ হয় বলা যাবে না।গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ভিত্তি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান নিশ্চিত করেছে। সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতেই বলা হয়েছে, সরকার সংবাদ-মাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার জন্য কোনো আইন প্রণয়ন করবে না। কোনো সরকাই এটা লঙ্ঘন করেনি। শোনা যায় যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ওই অংশের বিভিন্ন ব্যাখ্যা আছে, আইনি ব্যাখ্যাও আছে। এটুকুই রক্ষা। নইলে স্বাধীনতা স্বেচ্ছাচারে রূপান্তরিত হতে সময় লাগে না। ফলে গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতা এবং নিরপেক্ষতা অলীক ভাবনায় পর্যবসিত হয়। অথচ বস্তুনিষ্ঠতা এবং সংবাদ নিরপেক্ষতা সংবাদপত্র প্রকাশের অন্যতম শর্ত। কিন্তু বিশ্বজুড়ে হলুদ সাংবাদিকতা যেভাবে অলিখিত শর্তে নৈতিক মাত্রা লাভ করেছে তাতে স্বাধীনতার প্রশ্নটি হুমকির মুখে পড়ে। জনগণের অবিশ্বাস মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। জনগণ গণমাধ্যমের প্রতি আস্থা হারায়।বর্তমান বিশ্বে চলছে অবাধ তথ্যপ্রবাহের প্রতিযোগিতা। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মানুষের দূরত্বের পরিমাপ ঘুচে গেছে ব্যাপকভাবে। দেশের দূরবর্তী গ্রামগুলো এই নেটওয়ার্কের আওতায় চলে এসেছে। শহরের ঘরে ঘরে এবং সাইবার ক্যাফেগুলোতে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগে পৃথিবী হাতের মুঠোয় এসে গেছে। উপগ্রেেহর মাধ্যমে টেলিভিশনের সংখ্যা চ্যানেল এবং বেতারের অবাধ তরঙ্গের ঢেউ যে কোনো জায়গায় মানুষকে করে দিচ্ছে প্রতিদিনের খবর সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকার সুযোগ। গণমানুষের সচেতনতা এই ভিত্তিতে সংস্কৃতির শক্তি।গণমাধ্যম মানুষের প্রত্যাশার জায়গা। প্রত্যাশা পূরণ হবে কি হবে না সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু মানুষ প্রতিকারের আশায় ছুটছে সেখানে। নিজের বিরুদ্ধে সংঘটিত অন্যায়ের কথা বলতে যায় সংবাদপত্র অফিসে, অধিকারের কথা বলতে যায় প্রেসক্লাবে, প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে নানা দাবিতে, এমনকি অসুখ হলে জীবন বাঁচানোর আবেদন জানায় পত্রিকার মাধ্যমে, কখনো কখনো দেশবাসী সাড়া দেয় সে আবেদনে। কখনো প্রাণ খুলে কথা বলতে চায় ব্যক্তি মালিকানাধীন টিভি চ্যানেলের কাছে। এদের আশা দেশবাসী তাদের কথা জানুক। প্রতিকারের জন্য এগিয়ে আসুক। মানুষের আস্থা প্রশ্নাতীত হয়ে ওঠে। মানবিক মূল্যবোধের নানা ব্যর্থতার ভেতরেও এই সামজিক পুঁজির ক্ষেত্রটিকে ধরে রাখার যে নিরলস চেষ্টা করছে গণমাধ্যম, তা নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শত প্রতিক‚লতার ভেতরে এটি যদি টিকে থাকে তাহলে বুঝতে হবে দাঁড়ানোর সব ক্ষেত্রগুলো তলিয়ে যায়নি। খানিকটুকু মাটি এখনো টিকে আছে।গণমাধ্যম সংস্কৃতির একটি উপাদন হিসেবে নানা পরিপ্রেক্ষিতে শুভ সূচনা ঘটাতে পারে। গণমাধ্যম রাজনৈতিক সংস্কৃতি মানুষের মাঝে ধরে রাখার জন্য কাজ করতে পারে। যেন মানুষকে রাজনীতিবিমুখ না করে রাজনীতি সচেতন করে, রাজনীতির দুষ্টচক্রে থেকে বেরিয়ে আসার জন্য অনুপ্রাণিত করে।ইতিহাসের বিভিন্ন সন্ধিক্ষণে সময় ও জীবনের প্রয়োজনে রূখে দাঁড়িয়েছিল গণমাধ্যম। এ কাজে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলো মুদ্রণ-মাধ্যম। সময়ের অগ্রগতিতে সাংস্কৃতিক জগতে গণমাধ্যমের নানা মাধ্যম সংযুক্ত হয়েছে। প্রয়োজন সংস্কৃতিকে জাতিসত্তার সঙ্গে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করে রাখার দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা।
জেন্ডার : সংস্কৃতিতে নতুন ধারণাসংস্কৃতির গ্রহণ-বর্জন সংস্কৃতির মাত্রাকে পরিশীলিত করে। বাঙালি সংস্কৃতিতে জেন্ডার ধারণার আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট একটি নতুন বিবেচনা হিসেবে গৃহীত হয়েছে। জেন্ডার এবং নারীর ক্ষমতায়ন শব্দ দুটি সমাজ পরিবর্তনে একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনার স্মারক। এর দ্বারা সংস্কৃতির নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছে। এ কথা তো সত্যি যে, ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার সংস্কৃতির স্থায়ী শক্তি, আর সংস্কৃতির নতুন দিগবলয় সংস্কৃতিকে সৃষ্টিশীল করে। এক সময় থেকে অন্য সময়ে প্রবাহিত হয়। সংস্কৃতিকে বেগবান রাখে।বর্তমান বিশ্বজুড়ে জেন্ডার প্রত্যায়টি একটি উন্নয়ন ইস্যু। প্রমাণিত হয়েছে যে নারী-পুরুষের সমান অংশীদারিত্ব ব্যতীত টেকসই উন্নয়ন করা কঠিন। কারণ নারী-পুরুষের জেন্ডার ভূমিকা নির্ধারিত হয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক আলোকে। সেক্স নারী-পুরুষের লিঙ্গ নির্ধারণ করে। আর জেন্ডার নারী-পুরুষের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্ধারণ করে। তাই সমাজের অর্ধেক জনশক্তি নারীকে পাশ কাটিয়ে উন্নয়ন ধারণা নির্ণয় করা যে সঠিক নয় তা গবেষণা এবং বাস্তব ভূমিকায় উঠে এসেছে। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার পরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার স্বীকৃত হয়েছিল। কিন্তু বিষয়টি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঠিকভাবে বিবেচিত হয়নি। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নারীর অবস্থান কি হবে এটিও নির্দিষ্ট হতে অনেক সময় লেগেছে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন ধারণা প্রচলিত ছিল যে সমাজের একটি অংশ অর্থাৎ পুরুষ উপকৃত হলে নারীও তার সুফলভোগী হবে।সময়ের বিবর্তনে পুরুষ রচিত ইতিহাস উন্নয়নে নারীর অবদানকে মূল্যায়ন না করে অদৃশ্য করে রেখেছিল। ১৯৫০-৬০-এর দশকে উন্নয়নে নারীর ইস্যুকে মানবাধিকার ইস্যু হিসেবে চিন্তা করা হতো। উন্নয়নের প্রত্যক্ষ কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী হিসেবে না দেখে পরোক্ষ উপকারভোগী হিসেবে দেখা হতো। সেজন্য নারী বিষয়ক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নীতি-নির্ধারণী আলোচনায় নারীদের ডাকা হোতা না।উন্নয়ন ধারায় নারীর অবদান স্বীকৃতি পেতে শুরু করে সত্তর দশকের শুরু থেকে। এ সময়ে প্রকাশিত হয় ইসথার বোসপার রচিত গবেষণা গ্রন্থ ডড়সবহ’ং জড়ষব রহ ঊপড়হড়সরপ উবাবষড়ঢ়সবহঃ. তাঁর এই গবেষণা উন্নয়ন চিন্তাবিদদের মনোযোগ কাড়ে। তিনি ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছিলেন যে কীভাবে নারীর ওপর অর্থনৈতিক উন্নয়নের অসম প্রভাব পড়ে। ধীরে ধীরে পরিবর্তন সূচিত হতে থাকে। সত্তর দশকেই উইমেন ইন ডেভেলপমেন্ট (ডওউ) তত্ত্ব বিস্তার লাভ করে। পরে দেখা যায় এই ধারণায় নারীর সার্বিক অবস্থার যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। পরে অশির দশকের সূচনায় জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এঅউ) ধারণার উদ্ভব ঘটে। এই ধারণায় নারী জীবনের সামগ্রিক দিকগুলো প্রতিফলিত করার চেষ্টা হয়।সত্তর দশকে জনসংখ্যা ও খাদ্য বিষয়ক ইস্যুতে উন্নয়ন ধারণার নারীর অবস্থান প্রবলভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ইসথার বোসপার তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছিলেন, আফ্রিকার ঔপনিবেশিক শাসকরা কীভাবে নারীকে খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। শাসকদের হস্তক্ষেপের আগে সেসব অঞ্চলের নারীরা ছিল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সক্রিয় কৃষক, আর হস্তক্ষেপের ফলে নারী হয়ে যায় পুরুষের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্য বা সহায়ক। নারীকে এভাবে অবদমিত না করে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যথাযথভাবে যুক্ত করাই টেকসই উন্নয়নের অন্যতম শর্ত। একই সঙ্গে অর্জিত হবে জেন্ডার সমতার জায়গা। নারীবাদী লেখক ঐবষার ঝঢ়রষধ বলেন, ‘এরাই হচ্ছে সেই নারী (৫০০ মিলিয়নের বেশি নিরক্ষর) যাদের উপর আমাদের জনসংখ্যা নীতি, খাদ্য কর্মসূচি এবং সার্বিক উন্নয়ন-উদ্যোগের সাফল্য নির্ভরশীল। এইসব নীতি সম্পর্কে যারা কম জানে তাদের ওপরই এইসব নীতির সাফল্য নির্ভর করে।’ (ঞযব ঞরসবং, ২৩.০৪.১৯৭৫) ক্ষমতায়ন নারী-পুরুষের পূর্ণাঙ্গ জীবনমান অর্জনের ব্যাখ্যা। অর্থাৎ ব্যক্তির নিজ জীবন ব্যক্তি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে তা ঠিক করা ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করা। ক্ষমতায়ন ব্যক্তির ভেতরে আত্মবিশ্বাস দৃঢ় করে, যার দ্বারা সে সমস্যা সমাধান করতে শেখে। পরমুখাপেক্ষী না হয়ে, স্বনির্ভর হয়। এভাবে একজন নারী বা পুরুষ যখন জীবন জিজ্ঞাসার মতামত গ্রহণে ক্ষমতার অধিকারী হয় তখন মনে করা হয় তার ক্ষমতায়ন হয়েছে।ক্ষমতায়ন কার্যকারী কারার জন্য তিনটি পর্যায়কে বিবেচনা করা হয়। যেমন ব্যক্তিগত। এই পর্যায়ে বিবেচিত হয় ব্যক্তির আত্মবিশ্বাস ও সামর্থের ধারণা। অপরটি সম্পর্ক। এই পর্যায়ে দেখা হয় ব্যক্তির সম্পর্কযুক্ত ক্ষমতার সামর্থ্য। অর্থাৎ ব্যক্তি কতটা মধ্যস্ততাকারী ও অন্যের ওপর প্রভাব বিস্তারে কতটা সমর্থ। তৃতীয়টি সামষ্টিক। এই পর্যায়ে বিবেচিত হয় এক সঙ্গে কাজ করার দক্ষতা। অর্থাৎ বড় আকারে প্রভাব বিস্তার ও তার ফললাভের জন্য একসঙ্গে সক্রিয় থাকার সামর্থ্য। এই ক্ষেত্রগুলো বিবেচনা করে নির্ধারিত করা যায় ক্ষমতায়নের মাত্রা।এই ক্ষমতা অর্জন পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর সঙ্গে বেঁচে থাকার নানা ব্যবস্থা গভীরভাবে জড়িত। বিশেষ করে নারীর ক্ষেত্রে বিষয়টি আরো জটিল। নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে কিনা তা বুঝতে হলে দেখতে হয় সম্পদের ওপর নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিনা। বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফল নারী ভোগ করতে পারছে কিনা। অর্থাৎ নারী সরাসরিভাবে উন্নয়নের সুফলভোগী কিনা।নারীর ক্ষমতায়নকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন : অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, সামাজিক ক্ষমতায়ন ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বলতে বোঝায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল ধারায় নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণ। এর পূর্ণ ব্যাখ্যায় বলা যায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে, বাস্তবায়নে, অভিগম্যতায়, নিয়ন্ত্রণে এবং সমতার ভিত্তিতে সুফল ভোগে নারীর পূর্ণ মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হওয়া। সামাজিক ক্ষমতায়ন বলতে নারীর অধিকার ভোগের বিষয়টি প্রথমে আসে। সমাজে নারী কী ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে এবং সে ভূমিকা পালনে তার ক্ষমতার চর্চা কতটা গুরুত্বপূর্ণ সে বিয়য়টি বোঝায়। রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন হলো রাজনীতি চর্চায় নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণ। ভোট প্রদান, নির্বাচনে অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক দলে সমতার জায়গা অর্জন কতটুকু নিশ্চিত তা বোঝায়। এসব জায়গায় নারী বৈষম্যের শিকার বলে পুরুষের পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়ন একই অর্থে ব্যাখ্যা করা যায় না। সে জন্য ক্ষমতায়নের ধারণা পুরুষের জন্য এক রকম, নারীর জন্য অন্য রকম। নারীর ক্ষমতায়ন সমতাভিত্তিক সমাজব্যবস্থার প্রধান দিক।এভাবেই বাঙালির সংস্কৃতি জেন্ডার ধারণায় পিছিয়ে থাকা নারীদের এগিয়ে দিয়ে সমাজ-কাঠামোর পরিবর্তনকে সক্রিয় রাখে। বিশ্বাস করা যায় যে আগামী প্রজন্ম এ ধারায় সাংস্কৃতিক বিবেচনার নেতিবাচক ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। তৈরি হবে সংস্কৃতির নতুন বিন্যাস।সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ সময় একাত্তর : ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদের রক্তে স্নাত হয়েছিল দেশ। সে সময়ে জীবন ও রক্ত দিয়েছিল লাখ লাখ মানুষ- সেই জীবন ও রক্তদান ছিল স্বাধীনতার মতো বড় অর্জনের জন্য। গৌরব ও মর্যাদায় নিজেদের জাতিসত্তাকে সমুন্নত করার জন্য। উপমহাদেশের মানচিত্রে ভিন্ন একটি মানচিত্র আঁকার গৌরবে উজ্জ্বল হয়ে ওঠার জন্য। সে কাজটি করার জন্য সমবেত ঐক্য প্রচেষ্টা একটি বিন্দুতে শক্তি সঞ্চয় করেছিল। পাকিস্তানের আধুনিক সামরিক বাহিনী এবং কিছু সংখ্যক রাজাকার-আলবদর সেই শক্তির সামনে তোপের মুখে উড়ে গিয়েছিল। তাই বিজয় অর্জন হয়েছিল। জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত, সংবিধান, সংসদ- সব নিয়ে জনগোষ্ঠী নিজ ভূখণ্ডে অভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। সেই শক্তি থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সেই শক্তির ঐক্য আজ জাতির জীবনে পুনঃস্থাপন না হলে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটবে এতে ভুল নেই। আজ যারা একটি বিশেষ ধর্মের রাজনীতি প্রতিষ্ঠায় শক্তি এবং অস্ত্রের বল প্রয়োগ করতে চেষ্টা করছে তারা কি একবারও ভেবে দেখেছেন এদেশকে কোনোভাবেই একটি ধর্মের মতাবলম্বীদের জন্য নির্দিষ্ট করা যাবে না। এ দেশে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান একসঙ্গে বাস করবে। দেশের লাখ লাখ আদিবাসী মানুষ এ দেশের সব মানুষের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড়িয়ে আছে। তারাও সবার মতো সমান মর্যাদায় বাস করবে। এ দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রেই ঘোষিত হয়েছিল যে দেশটি হবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। কোনোভাবেই কোনো ধর্মের লেবাস আঁকা দেশ নয়। স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সংবিধানকে অস্বীকার করে যারা বিশেষ একটি ধর্মের শাসন এ দেশে চালাতে চায় তারা ভুলে গেছেন ৩০ লাখ শহীদের অত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশটি স্বাধীন হয়েছে। কোনো কারণ কি ঘটেছে যে দেশের সংবিধানকে অস্বীকার করে বিশেষ একটি ধর্মের প্রতি মানুষের আনুগত্য প্রকাশ করা, পক্ষপাতিত্ব করার? নিশ্চয়ই না, কোনো কারণ ঘটেনি।একদিন এই দেশে পাখি ছিল, ঘাস ছিল, নদী ছিল, ভোরের শিশির এবং কুয়াশা ছিল, ছেঁড়া মেঘের উড়ে যাওয়া ছিল, কালো মেঘের বর্ষণ ছিল- ঝড়, জলোচ্ছ¡াস, ভূমিকম্প ছিল- দারিদ্র্য, ক্ষুধা, মঙ্গা ছিল- তারপরও মানুষের জীবনের স্বপ্ন নিয়ে গড়ে ওঠা ভূখণ্ডে সামাজিক সম্প্রীতি ছিল। এখন নেই কেন?দূষিত রাজনীতি, ক্ষমতার লোভ, দ্ব›দ্ব, কালো টাকা, শোষণ-বঞ্চনার পাহাড় মানুষের জীবনকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধর্মের নামে জঙ্গি হয়ে ওঠার ষড়যন্ত্র। মুছে দিতে চায় মানবিক বোধ, অসম্প্রদায়িক চেতনা। ঐক্যের সাধনায় সামাজিক সম্প্রীতির বন্ধনকে দৃঢ় করে শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সময় এখন। নইলে বারবারই রক্তস্নাত হবে প্রিয় স্বদেশ।একাত্তরে কেন আমাদের অনেক বুদ্ধিজীবীকে চোখ বেঁধে বধ্যভূমিতে নিয়ে গিয়েছিল ঘাতকরা? ওরা কি ভেবেছিল মৃত্যুর আগে তাঁদের প্রিয় স্বদেশকে দেখতে দেবে না দুচোখ ভরে? যে স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁরা জীবন বাজি রেখেছিলেন? কিন্তু চোখ বেঁধে রেখে ঘাতকরা কী পেরেছিল তাঁদের হৃদয়ের চোখ থেকে স্বদেশকে আড়াল করে ফেলতে? যদি পারতোই তাহলে তাঁরা আমাদের স্বাধীনতার চেতনা হয়ে যেতেন না। তাঁরা আমাদের ঐতিহ্যের অংশ- তাঁদের মৃত্যুর ঋণ অপ্রতিশোধ্য। মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌবরগাথায় তাঁদের কথা বলে যেতে হবে অবিরাম। তাঁরা আছেন আমাদের অনুভবে, স্বদেশপ্রেমে, চেতনায়, সংগ্রামে-প্রতিরোধে- তাঁরা আছেন আমাদের মানচিত্র, পতাকা এবং জাতীয় সঙ্গীতে।একাত্তরের দিকেতো আমাদের এভাবেই তাকাতে হবে। সে সময়ের গ্রন্থিল মানববন্ধন একটি গিটঠুতে পরিণত হয়েছিল। গেরিলা যোদ্ধাদের বোমার শব্দ শোনার জন্য কান পেতে রাখতো অবরুদ্ধ শহরের মানুষরা। গেরিলা যোদ্ধারা প্রকম্পিত করেছিল শহরের রাস্তা, দোকানপাট, অফিস, পাঁচতারা হোটেলের প্রাঙ্গণ। প্রকম্পিত করেছিল শত্রু সেনার হৃৎপিণ্ড। মানুষের প্রিয় সঙ্গ ছিল বোমার বিস্ফোরণ, প্রিয় তরঙ্গ ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, প্রিয় স্থান ছিল রণক্ষেত্র, জড়িয়ে ধরার জন্য ছিল প্রিয় রিকোয়েললেস রাইফেল। যোদ্ধা মানুষেরা ভুলে ছিল ঘরের উষ্ণতা, প্রিয় খাবারের স্বাদ, পরিবার-পরিজনের হাসি-গান, শিশুর কলধ্বনি।গ্রামেগঞ্জে, শহরে গৃহবন্দি নারী-পুরুষ কান পেতে রাখতো মুক্তিযোদ্ধার পায়ের শব্দ শোনার জন্য, দরজায় টুকটুক ধ্বনি হলে চুলোয় উঠে যেতো ভাতের হাঁড়ি। একটুখানি বিশ্রাম, একটুখানি অন্নের দরকার হতো যুদ্ধরত মানুষদের। সে সময়ে এ কথা কে না বুঝতো- কাউকে বুঝিয়ে বলার জন্য চাঁদনি রাতে উঠোনে গোল হয়ে বসার দরকার হতো না তাদের। মুক্তিযোদ্ধার আগমনকে ঘিরে প্রতীক্ষার অবসান ঘটতো নারীর। শত্রু সেনার ভয় উপেক্ষা করে রাতের অন্ধকারে কিংবা দিনের আলোয় ঘরের দরজা খুলে দিত নারী। যোদ্ধা ছেলেরা যদি বলতো, মা ভাত দাও, তখন প্রবল দখিনা বাতাসে উড়ে যেতো নারীর ভয়। স্বপ্ন ফুটে উঠতো ঘরের চালে, যেন পূর্ণিমার আলোতে স্নান করার অলৌকিক কাজ সম্পন্ন হতো নারীর জীবনে। শুধু খাবার নয়, শুধু ক্ষুধা মেটানো নয়- আহত যোদ্ধাদের চিকিৎসা দরকার- মেটানো হতো তা। খবর সংগ্রহের দরকার- মেটানো হতো তা। গোলাবারুদ বহন করা দরকার- মেটানো হতো তা। এক আশ্চর্য সময়ের বিশাল ব্যাপ্তি ছিল জীবনে। সংস্কৃতি হয়ে উঠেছিল পরিশীলিত। অবিনাশী জীবনের বাতিঘর। একাত্তরে এ দেশের মানুষের স্বাধীনতার জন্য এমনই ছিল আয়োজন। জনযুদ্ধের একটি পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র বুকের ভেতরে টাঙিয়েছিল নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই। সেজন্য সফল হয়েছিল জনযুদ্ধের বিজয়।স্বাধীন বাংলাদেশের একটি পর্যায়ে মৌলবাদী গোষ্ঠী ধর্মীয় উন্মাদনায় জীবনের বিপরীত স্রোতে দাঁড়িয়েছে। ধ্বংস করছে স্বাধীন দেশের মানুষর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ঘরের ভেতর ঠেলে দিতে চেয়েছে মানুষকে। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে মুছে দিতে চায় জীবনবোধের মুক্ত চেতনার যাবতীয় উপকরণ। বোমা হামলা এবং আত্মঘাতী বোমা হামলায় মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রিয় স্বদেশ। আজ জঙ্গিদের মাঝে স্বাধীনতার স্বপ্ন নেই। তাঁরা আত্মঘাতী পথে জীবন উৎসর্গ করে বেহেশতে যেতে চায়। জনবিচ্ছিন্ন কার্যক্রমের সেতু দিয়ে গড়ে তুলতে চায় অর্থহীন অন্ধকারের জগৎ।এরপরও বলতে হবে এখনও মানুষ আছে মানুষকে জাগিয়ে তোলার জন্য। এখনও সঙ্গীত-নাটক-সাহিত্য-শিল্প আছে মানুষকে উজ্জীবিত রাখার জন্য। এখনো বাংলা নববর্ষ, নবান্ন উৎসব আছে মানুষকে ঐক্যের ডাক দেয়ার জন্য। এখনো অমর একুশের চেতনা আছে পথ নির্ধারণ করে দেয়ার জন্য। এখনো শহীদ মিনার আছে মানুষকে সংগ্রামের পথে ডেকে তোলার জন্য। এবং একাত্তরের গৌরব আছে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য। প্রয়োজন ঐক্য। ঐক্যের পথে ব্যক্তির স্বার্থকে বাদ নিয়ে বৃহত??
Related Questions
Next steps
- Find a doctor for in-person or online consultation
- Browse medical tests patients often ask about
- Check medicine information (uses, dosage, brands in Bangladesh)
- More health Q&A on Bissoy