2 Answers
আপনি যদি স্মৃতি করে রাখার মানসে ছবি উঠান, তাহলে সর্বাবস্থায় তা হারাম। তবে যদি প্রয়োজনে উঠান, তাহলে রোজা সহ যেকোন অবস্থায় তা জায়েজ।
সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। ছবি তোলা ও তার প্রচার-প্রসার কোন অবস্থাতেই জায়েজ নয়। শুধুমাত্র সরকার বা কোন প্রতিষ্ঠান যদি প্রয়োজনীয় কাজের জন্য ছবি তুলতে বাধ্য করে সেক্ষেত্রে জায়েজ। অন্যথায় শুধুমাত্র মনের খুশি বা আনন্দের জন্য অহেতুক কোনপ্রকার ছবি তোলা, বাধাই, সংরক্ষণ অথবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার প্রচার-প্রসার কোন অবস্থাতেই জায়েজ নয়। ইসমাঈল (রহঃ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণী . আয়শা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একটি বালিশ বা গদি কিনে এনেছিলাম, যার মধ্যে ছবি ছিল। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই ছবিটি দেখেলেন, তিনি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে গেলেন; ভিতরে প্রবেশ করলেন না। আমি বুঝতে পারলাম যে, তাঁর চোখে এটা অত্যন্ত অপছন্দনীয় ব্যাপার। আমি বললাম, ইয়া বাসূলাল্লাহ! আমি আল্লাহর কাছে তওবা করছি এবং তাঁর রাসূল) -এর কাছে ফিরে আসছি। আমি কী অন্যায় করেছি? তখন বাসূলুল্লাহ বললেন এই বালিশ কিসের জন্য? আমি বললাম, এটা আপনার জন্য খরিদ করে এনেছি, যাতে আপনি বসতে পারেন এবং হেলান দিতে পারেন। তখন বাসূলুল্লাহ বললেন, এই ছবি নির্মাতাকে কিয়ামতের দিন শাস্তি প্রদান করা হবে এবং বলা হবে, যা তুমি সৃষ্টি করেছ তার প্রাণ দাও এবং তিনি আরও বলেন, যে ঘরে প্রাণীর ছবি থাকে, সেই ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না। [সহীহ বুখারী (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ বিয়ে-শাদী -৪৮০৩] আমর ইবনু আলী (রহঃ) আবূল হায়য়াজ (রহঃ) থেকে বর্ণিত যে, আলী (রাঃ) বলেছিলেন, আমি কি তোমাকে সে কাজে পাঠাব না যে কাজে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে পাঠিয়েছিলেন। তুমি উচু কবরকে সমতল না করে ছাড়বে না এবং ঘরের কোন (প্রানীর) ছবিকে বিনষ্ট না করে ছাড়বেনা। [সুনানে নাসাঈ (ইফাঃ), অধ্যায়ঃ জানাজা -২০৩৫] ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা বিষয়ে তুলে ধরা হল সংক্ষিপ্তভাবে। “তাছবীর” (আরবী শব্দ) বা ফটোগ্রাফি মানে হল জীবন্ত, নড়াচড়া করতে পারে এমন কিছুর ছবি তোলা যেমন মানুষ, পশু, পাখি ইত্যাদি। কয়েকটি বর্ণনার ভিত্তিতে এর হুকুম হল, এটা হারাম, যেমনঃ আব্দুল্লাহ ইবনে মাস’ঊদ রদিয়াল্লাহু’আনহু বর্ণনা করেছেন যে, নবী ছল্লাল্লাহু’আলাইহিওয়াছাল্লাম বলেছেনঃ “ যাদেরকে শেষ বিচারের দিন আল্লাহ সবচাইতে কঠিন শাস্তি দিবেন তারা হল চিত্রকর” (বর্ণনায় বুখারী, দেখুন ফাতহুল বারী, ১০/৩৮২)। আবু হুরায়রা রদিয়াল্লাহু’আনহু থেকে বর্ণিত রসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু’আলাইহিওয়াছাল্লাম বলেনঃ “আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ ‘তার চাইতে আর কে অধিক অন্যায় করতে পারে যে আমার সৃষ্টির মত সৃষ্টি করতে উদ্যত হয়? সে পারলে গমের একটা দানা অথবা বীজের একটা দানা তৈরি করুক” (বর্ণনায় বুখারী, দেখুন ফাতহুল বারী ১০/৩৮৫)। ইবনে ‘আব্বাস রদিয়াল্লাহু’আনহু বর্ণনা করেছেন, নবী ছল্লাল্লাহু’আলাইহিওয়াছাল্লাম বলেনঃ “প্রত্যেক চিত্রকর জাহান্নামে যাবে, এবং প্রত্যেক চিত্রের জন্য যা সে তৈরি করেছে একটা করে আত্মা তৈরি করা হবে যাকে জাহান্নামের আগুনে শাস্তি দেওয়া হবে।” ইবনে আব্বাস বলেনঃ “যদি তোমাদের তা করতেই হয় তাহলে বৃক্ষ এবং অন্যান্য প্রাণহীন জিনিষের চিত্র তৈরি করো" ( বর্ণনায় মুসলিম, ৩/১৮৭১)। এই সকল হাদিস ইঙ্গিত করে প্রাণবিশিষ্ট ছবি হারাম, চাই তা মানুষ হোক বা অন্য সৃষ্ট প্রাণী হোক, তা থ্রি-ডিমেনশন হোক বা টু-ডিমেনশন হোক, এবংতা প্রিন্ট করে হোক, হাত দিয়ে অঙ্কন করে হোক, খোদাই করে হোক, ছাপ দিয়ে হোক, ক্ষোদিত করে তৈরি করে হোক, ছাঁচে তৈরি করে হোক, ইত্যাদি। উপরিউক্ত হাদিসগুলো উল্লিখিত সকল ধরণের ছবিকেই শামিল করে। একজন মুসলিমের উচিত ইসলামের শিক্ষার কাছে আত্নসমর্পণ করা এবং এই বলে তর্ক না করা যে, “কিন্তু আমিতো এসব ছবি বা চিত্রের ইবাদত করি না অথবা এগুলোকে সেজদা করিনা।” আমরা যদি বর্তমান সময়ের ফটোগ্রাফ ও চিত্রের যে ব্যাপকতা তার একটিমাত্র খারাপ দিক নিয়ে চিন্তা করি তাহলে আমরা এর নিষিদ্ধতার পেছনে যে হিকমতগুলো রয়েছে সে সম্পর্কে বুঝতে পারবোঃ এই দিকটি হল নৈতিক অবক্ষয় যা ঘটে শারীরিক উত্তেজনা সৃষ্টির মাধ্যমে এবং অনৈতিকতা বিস্তারের মাধ্যমে যার কারণ হল এই ছবিগুলো। একজন মুসলিমের তার বাড়িতে প্রাণবিশিষ্ট কোনোকিছুরই ছবি রাখা উচিত নয় কারণ তা ফেরেশতাদের প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে। নবী ছল্লাল্লাহু’আলাইহিওয়াছাল্লাম বলেছেনঃ “সেই বাড়িতে ফেরেশতারা প্রবেশ করেনা যে বাড়িতে কুকুর অথবা ছবি থাকে" (বর্ণনায় মুসলিম, দেখুন ফাতহুল বারী, ১০/৩৮০)। ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা হল মানুষের অ্যাকশনের অন্তর্ভুক্ত যেমন রশ্মির প্রতিফলন ঘটানো, শাঁটারে চাপ দেওয়া, প্রিন্টিং ইত্যাদি। আমরা এটাকে “তাছবীর” (আরবী শব্দ) বা “ছবি তৈরি করা” ছাড়া আর কিছুই বলতে পারিনা যে শব্দটি আরবী ভাষা-ভাষীরা এই কাজকেই বুঝানোর জন্য ব্যবহার করে থাকে। “আল-ই’লাম বি নাকব কিতাব আল-হালাল ওয়াল-হারাম” নামক কিতাবে লেখক বলেছেনঃ “হাতে আঁকা ছবি বা খোদাই করা ছবির চেয়ে ফটোগ্রাফি হল আল্লাহর সৃষ্টির আরো বেশী সাদৃশ, কাজেই ফটোগ্রাফি হারাম হওয়ার আরো বেশী যোগ্যতা রাখে… এমন কিছুই উল্লেখ হয়নি যা সেসব হাদিসের বর্ণনায় অর্থের দিক দিয়ে ফটোগ্রাফের বিষয়কে উহ্য রাখে (পৃষ্ঠা ৪২, আরও দেখুন ফতোয়ায়ে ইসলামিয়া ৪/৩৫৫)।” ওলামায়ে কেরামদের যারা ফটোগ্রাফের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন তাদের একজন হলেন শাইখ নাসিরউদ্দিন আল-আলবানী, যিনি বলেছেনঃ “কেউ কেউ হাতে আঁকা ছবি এবং ফটোগ্রাফের ছবির মধ্যে এভাবে পার্থক্য করেছেন যে, আধুনিকতা মানুষের কষ্টে গড়া কোনো সৃষ্ট বস্তু নয় এবং এটা ছবিকে ধারণ করার চেয়ে বেশী কিছু নয়। এটাই তারা দাবি করেন। তাদের মতে সেই ব্যাক্তিটিই সবচেয়ে বেশী কষ্ট করেছেন যিনি এই যন্ত্রটি আবিষ্কার করেছেন যা সেকেন্ডের ভেতরেই কাজ করে, তা না হলে এটা ঘণ্টার ভেতরেও করা সম্ভব হত না যেটি মূলত মানুষের বল প্রয়োগের বা কষ্টের কিছু বলে বিবেচিত নয়। ক্যামেরায় পয়েন্ট করা, ফোকাস করা, এবং ছবি তোলা যা সবই ফিল্মের ধারণকৃত কাজ এবং উন্নয়নের অগ্রগতি এবং আরো কিছু যা আমি হয়ত আর জানিনা…তাদের মতে এগুলোর কোনো কিছুই মানুষের কষ্টের ফল নয়। কিভাবে ফটোগ্রাফি করা হয় সে বিষয়ে কেউ কেউ বর্ণনা করেছেন এবং সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন যেটি হল, ছবি তোলার কাজে অন্তর্ভুক্ত ধাপগুলো ১১টির চেয়ে কম নয়। তা সত্ত্বেও তারা বলেন ক্যামেরায় তোলা ছবি মানুষের কোনো কর্মশক্তির প্রয়োগে হয় না। তাহলে মানুষের কোন ছবি ওয়ালে ঝুলানো কি জায়েজ হবে, যেমন উদাহরণস্বরূপ হাত দিয়ে না একে যদি ফটোগ্রাফের মাধ্যমে তোলা হয়? যারা ফটোগ্রাফিকে জায়েজ বলেছেন তারা “তাছবীর” শব্দটাকে এক্ষেত্রে উহ্য রেখেছেন এবং ওটা রসূল ছল্লাল্লাহু’আলাইহিওয়াছাল্লামের সময়ে যা ছিলো শুধুমাত্র সেক্ষেত্রেই প্রয়োগ করেছেন এবং প্রতিটি অর্থগত দিক দিয়ে যেমন ভাষাগত দিক দিয়ে, আইনগত দিক দিয়ে, এর ক্ষতিকর প্রভাবের দিক দিয়ে, এবং উপরে পরিষ্কারভাবে বর্ণিত বিষয়ের দিক দিয়ে তারা এই “তাছবীর” বা “ছবি তৈরি করা” শব্দটি প্রয়োগ করেননি। কয়েক বছর আগে আমি একজনকে বলেছিলাম যে, (ফটোগ্রাফের) এই একই নীতিমালা থেকে তুমি প্রতিমা/মূর্তিকে হালাল হিসেবে ধরতে পারো যা হাত দিয়ে গড়া হয়নি কিন্তু মেশিনের সাহায্যে স্যুইচ টিপে সহজেই তৈরি করা হয়। এক্ষেত্রে তুমি কি বলবে? (আদাব আল- জাফাফ, লেখকঃ আল আলবানী, পৃষ্ঠা ৩৮)।” কিছু কিছু ওলামাদের এই মতটাও বেশ সুপরিচিত যারা ফটোগ্রাফকে জায়েজ বলেছেন কিন্তু তারা এও বলেছেন যে ছবি সংরক্ষণের জন্য রেখে দেওয়া যাবেনা। তারা বলেনঃ “সেই ঘরে ফেরেশতা আসেনা যে ঘরে কুকুর বা ছবি থাকে (দেখুনঃ আল-শরহে আল-মুমতি, ২/১৯৮)।” ছবি তোলার মধ্যে অনেক খারাপ দিক নিহিত রয়েছে। আল্লাহর সৃষ্টির সাদৃশ্যতার পাশাপাশি অনেক খারাপ দিক আছে যা তাদের অনেকেই (যারা ছবি তৈরি করে) প্রত্যাখ্যান করে যা বাস্তবতাই সাক্ষ্য দেয় যা হল এসব ছবি ও ছবি তৈরির মাধ্যমে আজকালকার নৈতিকতার চরম অবক্ষয় ঘটছে ও মনের কুবাসনা চরিতার্থ করছে। আমাদের অবশ্যই সকল ছবি মুছে ফেলা উচিত বা নষ্ট করে ফেলা উচিত যা আমাদের সাধ্যের মধ্যে আছে এবং আমাদের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সতর্ক থাকতে হবে উত্তেজনা বা প্ররোচনা মূলক ছবিগুলোর ব্যাপারে যা যেখানেই পাওয়া যাবে। কাজেই, আল্লাহর দেওয়া দায়িত্ব পালন করো এবং যথাসাধ্য তাকে ভয় করো…(সুরা আল-তাগাবুন ৬৪ঃ ১৬)। যেসব ক্ষেত্রে ফটোগ্রাফ অতি প্রয়োজনীয় সেগুলো জায়েজ যেমন পরিচয়পত্রের জন্য (identity document) অথবা ক্রিমিনাল ধরার জন্য পোস্টারে ছাপানো অথবা শিক্ষাগত উদ্দেশ্যে যদি তা একেবারে বাধ্যতামূলক করা হয়, ইত্যাদি। শরীয়তের একটি মূলনীতি হল যা অতি জরুরী বিষয় তা নিয়ে বাড়াবাড়ি করা ঠিক নয়। হে আল্লহ উত্তরদাতাকে ক্ষমা করুন, তার দ্বীন ও দুনিয়ার উপকারী ইলমকে বৃদ্ধি করে দিন। আমিন।