2 Answers
দৈনিক আট ঘন্টা কাজের দাবিতে কর্মজীবি লোকদের ঐতিহাসিক সংগ্রাম ও আত্মত্যগ স্বরণ করার উদ্দেশ্যে বর্তমানে ১লা মে সারা বিশ্বে মে দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালন করা হয়। প্রায় সারা বিশ্বে এ দিনটা সরকারী ছুটির দিন। ১৮ ও ১৯ শতকে শিল্পবিপ্লবের পুর্বে ইউরোপ ও আমিরিকায় ১৪ ঘন্টা বা তারও বেশি সময় ধরে কাজ করানো হতো। ১৮৮৬ সালে ১লা মে ম্যাককরমিক হারভেস্টার কোম্পানির প্রায় অর্ধেক শ্রমিক আট ঘন্টা কাজের দাবিতে এই ধর্মঘটের ডাক দেয়। একটি শ্রমিক র্যালির অনুষ্ঠানে প্রায় ৬০০০ শ্রমিক অংশগ্রহণ করে। এতে শ্রমিক নেতারা বক্তৃতা দেয়। শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানায়। কিছু শ্রমিক র্যালি ত্যাগ করতে থাকে। তাদের ফিরাতে কিছু শ্রমিক পথে নামে। ঠিক তখনি ২০০ পুলিশ লাঠি ও রিভলভার চালায়। একজন তৎক্ষটণাত নিহত হয় এবং ৫ বা ৬ জন গুরুতর আহত হয়। ১৮৮৬ সালের ১লা মে এর ঘটনা মনে করিয়ে দেয় শ্রমিক শ্রেণি শোষিত হতো যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা রুখে দারাতো।
মহান মে দিবস। বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সংহতি এবং উৎসবের দিন হিসেবে উদযাপিত হয়। মে দিবসের পেছনে রয়েছে শ্রমিক-শ্রেণির আত্মদান ও বিরোচিত সংগ্রামের ইতিহাস। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে ইউরোপে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয়। সেটি ছিল পুঁজিবাদী বিকাশের প্রাথমিক যুগ। তখন শ্রমিকদের কাজের কোনো শ্রমঘণ্টা নির্ধারিত ছিল না। ছিল না ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তা।
যুক্তরাষ্ট্রে স্বতঃস্ফূর্ত ও অসংগঠিতভাবেই অনধিক ১০ ঘণ্টার শ্রমঘণ্টা নির্ধারণ ও অন্যান্য দাবিতে কয়লা খনি শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন শুরু করে। ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে পেনসেলভেনিয়ার কয়লা খনি শ্রমিকদের সংঘর্ষে ১০ শ্রমিক নিহত হন। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরে উল্লিখিত অনধিক ১০ ঘণ্টা শ্রমঘণ্টা নির্ধারণের দাবিতে শ্রমিকদের একটি মিছিল বের হয়। মিছিলটি শহরের কেন্দ্রস্থল হে মার্কেটের কাছে পৌঁছলে সৈনিকরা বাধা দেয় এবং সংঘর্ষ বেধে যায়। সৈনিকদের গুলিতে বহুসংখ্যক শ্রমিক নিহত ও আহত হন। শ্রমিকদের রক্তে ভেজা শার্ট নিয়ে মিছিল এগিয়ে চলে। আন্দোলন আরও তীব্র রূপ ধারণ করে। শ্রমিকদের রক্তে রঞ্জিত শার্ট লাল পতাকায় রূপান্তরিত হয়। ধর্মঘট ও প্রতিবাদ মিছিল চলে ৫ মে পর্যন্ত। ইতোমধ্যে ৩ মে ৬ জন এবং ৫ মে আরও ৪ জন শ্রমিক পুলিশের গুলিতে নিহত হন। গ্রেফতার হন শত শত শ্রমিক। পরবর্তীকালে যাদের অনেককেই মৃত্যুদ- দেওয়া হয়।
১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবারের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সেন্ট লুইস শ্রমিক সম্মেলনে কাজের সময় ৮ ঘণ্টা নির্ধারণের দাবিতে ‘মে দিবস’ পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নামে খ্যাত কমিউনিস্ট ও সমাজতন্ত্রীদের প্যারিস সম্মেলনে ১ মে তারিখটিকে দেশে দেশে শ্রমিক-শ্রেণির আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়।
রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত না হলেও ১৮৯০ সাল থেকে ইউরোপের দেশে দেশে শ্রমিক-শ্রেণি ১ মে, মে দিবস পালন করে আসছে। রুশ বিপ্লব, পশ্চিমা দেশগুলোতে সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সম্প্রসারণের ফলে প্রথমে গুটিকয়েক দেশ ১ মে-কে শ্রমিক দিবস হিসেবে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘ ১ মে-কে সর্বজনীন শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। অতঃপর অনেক দেশ এই দিনটিকে রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণা করে।
কিন্তু পাকিস্তানে এই দিনটিতে জাতীয় ছুটি ছিল না। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুই প্রথম মে দিবসকে ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন দুঃখী মানুষের প্রাণপ্রিয় নেতা। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ব্রত। তিনি ভুলে যাননি, ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ৬-দফা দাবিতে আহূত প্রথম হরতালে আদমজী, টঙ্গী ও তেজগাঁওয়ের সংগঠিত শ্রমিকরাই প্রথম লাল পতাকা হাতে ১৪৪ ধারা ভেঙে ঢাকার দিকে আসতে গিয়ে অকাতরে প্রাণ দিয়েছিল। বাঙালির স্বাধিকার ও মুক্তির জন্য প্রথম আত্মদান করেছিল শ্রমিক মনুমিয়াসহ অন্ততপক্ষে ১০ জন শ্রমিক। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানেও ছাত্রদের পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষই ছিলেন চালিকাশক্তি। এ কারণেই ১৯৭১-এর ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু কেবল স্বাধীনতার ডাক দেননি, মুক্তির আহ্বানও জানিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু প্রথমেই বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়েই বাংলাদেশের শ্রমিক-শ্রেণি অসহযোগ আন্দোলনে দেশের সকল কল-কারখানা বন্ধ করে দিয়েছিল। তার ডাকেই হাজার হাজার শ্রমিক, কৃষক ও মেহনতি মানুষ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝঁাঁপিয়ে পড়েছিল। সুতরাং এটা খুবই স্বাভাবিক ছিল যে, বঙ্গবন্ধুর সরকার ১ মে সরকারি ছুটি ঘোষণা করবেন।
বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাও এই মহৎ ঐতিহ্যকে সমুন্নত রেখেছেন। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ মুহূর্তের জন্যও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও মর্যাদার কথা বিস্মৃত হননি। শেখ হাসিনাই পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের নি¤œতম বেতনের হার বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়ে, মালিকপক্ষকে তা মানতে বাধ্য করেন। শিশুশ্রম বন্ধ, নারী শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটির সময় বৃদ্ধি, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তা, কৃষি শ্রমিক তথা ভূমিহীনদের বিনা জামানতে কৃষি ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা, মাত্র ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলা, শ্রমজীবী ও গরিব-দুঃখী মানুষের জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করতে সোস্যাল সেফটি নেট জোরদার করা, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা প্রভৃতি অব্যাহত রাখা, গরিব মানুষের ঘরে ঘরে বিনামূল্যে সোলার বিদ্যুৎ ল্যাম্প সরবরাহ, কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সরকারি হাসপাতালগুলোয় বিনা খরচায় চিকিৎসা ও বিনামূল্যে ওষুধের ব্যবস্থা করা এবং বিনামূল্যে বই সরবরাহ করে গরিব, শ্রমজীবী মানুষের সন্তানদের জন্য অন্তত প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ অবারিত করে দিয়েছেন।
আওয়ামী লীগ অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধিকেই উন্নয়নের একমাত্র মাপকাঠি মনে করে না। প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের সুফল দেশবাসী বিশেষত গরিব-দুখি মানুষের।
ইত্যাদি