1 Answers
কেউ মারা গেলে মৃতের বাড়িতে প্রথা পালন করে তিনদিনের দিন বা সাতদিনের দিন অথবা চল্লিশ দিনের দিন দাওয়াতের আয়োজন করা--যাকে যথাক্রমে তিনদিনা, সাতদিনা ও চল্লিশা বলে, শরীয়তের দৃষ্টিতে এ প্রথা পালন করা নাজায়েজ ও বিদ‘আত। এসব পালন করার কোন অবকাশ নেই। এ কাজে মহানবী (সাঃ) এবং তা পরে তাঁর সাহাবাগণ, তাবেঈনগণও করেননি।
আর আল্লাহ্র রাসুল (সঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীন বিষয়ে অভিনব কিছু রচনা করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয় তা প্রত্যাখ্যাত।” -[ বুখারী ২৬৯৭, মুসলিম ১৭১৮ নং]
মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি এমন কোন কর্ম করে, যাতে আমাদের কোন নির্দেশ নেই তা প্রত্যাখ্যাত।” -[ মুসলিম ১৭১৮ নং]
.
সাহাবায়ে কিরাম (রা.)-এর যুগে একে নিষিদ্ধ ও মন্দ কাজ গণ্য করা হত। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে;
হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, “আমরা মৃতের দাফন কার্য শেষ হওয়ার পর তার বাড়িতে একত্রিত হওয়া এবং (দাফনে শরীক লোকজন ও আত্মীয়-স্বজনদের জন্য) খাবারের আয়োজন করাকে নিয়াহা (নিষিদ্ধ পন্থায় শোক পালন)-এর অন্তর্ভুক্ত গণ্য করতাম।”
[মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ৬৯০৫]
বস্তুত দাওয়াতের আয়োজন তো করা হয় কোনো আনন্দ-উৎসবের সময়; কোনো বেদনা বা শোকের মুহূর্তে নয়। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নত হল, মৃতের পরিবার-পরিজনদের জন্য প্রতিবেশীর পক্ষ থেকে খাবারের ব্যবস্থা করা, যেন তাদেরকে মৃতের জন্য ব্যস্ততা ও শোকাহত থাকার কারণে অনাহারে থাকতে না হয়। অথচ উল্লিখিত কাজটি এর সম্পূর্ণ উল্টো ও বিপরীত। তাই এর থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।
এছাড়া একটি কথা প্রচলিত আছে, যা হাদিস হিসেবে বলে ভুল করে থাকেন।
এটা আসলে হাদীস নয় : طعام الميت يميت القلوب
অর্থাৎ "মৃতদেরকে কেন্দ্র করে যে খানা খাওয়ানো হয় তা অন্তরকে মৃত বানিয়ে দেয়।"
এটা একটা উক্তি,
যার অর্থ হচ্ছে, মৃতদের ঈসালে ছওয়াবের উদ্দেশ্যে খতমে কুরআন বা খতমে তাহলীল করা হয় এবং উপস্থিত লোকদের জন্য খাবার-দাবারের আয়োজন করা হয় যেহেতু ঈসালে ছওয়াবের উদ্দেশ্যে কোনো আমল করে তার বিনিময়ে খানা খাওয়া বা খাওয়ানো জায়েয নয় এজন্য এই খাবারের দিকে আগ্রহ লোভ-লালসার পরিচায়ক, যা অন্তরকে প্রাণহীন করে দিতে পারে। একই কথা কারো মৃত্যুর সময় জিয়াফতের খাবার প্রসঙ্গেও। জিয়াফত আনন্দের সময় করা হয়ে থাকে, দুঃখ-মুসীবতের সময় নয়। এই সময় জিয়াফতের কোনো বৈধতা শরীয়তে নেই। এজন্য এ ধরনের খানা নূরহীন ও বরকতহীন হয়ে থাকে। বলাবাহুল্য, এ ধরনের খাবার অন্তরকে ক্লেদাক্ত করা খুবই স্বাভাবিক। এজন্য বুযুর্গরা বলেছেন, "মৃতের খাবার অন্তরকে মৃত বানিয়ে দেয়।"
এটা বুযুর্গদের উক্তি, হাদীস নয়। কেউ কেউ একে হাদীস মনে করে থাকেন। তাদের ধারণা ঠিক নয়। [ফাতাওয়া আযীযিয়্যাহ, শাহ আবদুল আযীয দেহলভী পৃ. ২০২]
.
উল্লেখ্য, গরীব-মিসকীনকে আহার করানো অনেক বড় ছওয়াবের কাজ এবং তা ঈসালে ছওয়াবের উদ্দেশ্যেও হতে পারে। আর যদি মৃত ব্যক্তির জন্য ছাওয়াব রেসানী হিসেবে খাওয়ানো হয়, তাহলে তিনদিন বা সাতদিন কিংবা চল্লিশ দিনের নিয়ম করা যাবে না, অর্থাৎ প্রচলিত তারিখগুলো (তৃতীয়, দশম, চল্লিশতম দিনে, শবে বরাত ইত্যাদিতে) ব্যতীত হতে হবে। বরং ঈসালে ছাওয়াবের জন্য সেভাবে প্রথাগত নির্দিষ্ট দিনের নিয়ম পালন না করে যে কোন দিন তা করা যায়। আর যেহেতু তখন তা মৃত ব্যক্তির রুহে ছাওয়াবের পৌঁছানোর জন্য সদকার হুকুমে হবে, তবে শর্ত এই যে, হালাল পয়সায় হতে হবে, নিজের সম্পদ দ্বারা হতে হবে, অবন্টিত মীরাছের সম্পদ থেকে হলে হবে না।
.
এতব্যতীত মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদ যাতে কোন নাবালগ শরীক আছে বা ওয়ারিসদের সবার অনুমতি নেয়া হয়নি সেখান থেকে খরচ করা যাবে না। বরং তার আত্মীয়গণ নিজেদের অর্থ-সম্পদ দ্বারা তার জন্য গরীব-মিসকীনদের খাওয়ানো বা দান করার মাধ্যম ঈসালে ছাওয়াব করা যাবে ।
.
সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয় এই যে, কাউকে খানা খাওয়ালে ওই সময় খতম পড়াবে না, আর যদি খতম পড়ানো হয় তাহলে খানা খাওয়াবে না এবং কোনো হাদিয়াও দিবে না। এরপর অন্যের মাধ্যমেই ঈসালে ছওয়াব করাতে হবে।
এরই বা কী অপরিহার্যতা? প্রত্যেকে নিজেই ঈসালে ছওয়াব করতে পারে। কিছু দান-সদকা করা হল, নফল নামায পড়া হল, সূরা ইখলাস তিনবার পড়া হল, আল্লাহর দরবারে তাদের ক্ষমার জন্য দুআ করা হল- এই সবগুলোই ঈসালে ছওয়াব হিসেবে গণ্য হতে পারে।
#তথ্যসূত্র ;
১. সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১৬১২;
২. ফাতহুল কাদীর, ২য় খণ্ড, ১০২ পৃষ্ঠা;
৩. রদ্দুল মুহতার, ২য় খণ্ড, ২৪০ পৃষ্ঠা/ ইলাউস সুনান, ৮ম খণ্ড, ৩২৯ পৃষ্ঠা