আল্লাহ কি সর্বত্র বিরাজিত? তার কি কোন আলাদা স্বত্বা নেই? নাকি তিনি কোথাও অবস্থান করে সবকিছু বিভিন্ন মা্ধ্যমের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ / পরিচালনা / সৃষ্টি / ধ্বংস করে চলেছেন? উত্তরের স্বপক্ষে দলিল বাধ্যতামূলক। 

2654 views

2 Answers

কথিত আহলে হাদীস সম্প্রদায় প্রচার করে থাকে, আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান নয়। তারা দলিল হিসেবে পেশ করে থাকে সূরা হাদীদের ৩ নং আয়াত। যেখানে ঘোষিত হয়েছে আল্লাহ তায়ালা আরশে সমাসিন। ওরা একটি আয়াত দিয়ে আরো অসংখ্য আয়াতকে অস্বিকার করে নাউজুবিল্লাহ। যেই সকল আয়াত দ্বারা বুঝা যায় আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান। এক আয়াতকে মানতে গিয়ে আরো ১০/১২টি আয়াত অস্বিকার করার মত দুঃসাহস আসলে কথিত আহলে হাদীস নামী ফিতনাবাজ বাতিল ফিরক্বাদেরই মানায়। অসংখ্য আয়াতে কারীমাকে অস্বিকার করে আল্লাহ তায়ালাকে কেবল আরশে সীমাবদ্ধ করার মত দুঃসাহস ওরা দেখাতে পারলেও আমরা পারি না। আমরা বিশ্বাস করি-আল্লাহ তায়ালা আরশেও আছেন, আছেন জমিনেও, আছেন পূর্বেও। আছেন পশ্চিমেও। আছেন উত্তরেও। আছেন দক্ষিণেও। উপরেও আছেন। নিচেও আছেন। আল্লাহর গোটা রাজত্বের সর্বত্র তার সত্তা বিরাজমান। কোন নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকা দেহধারী সত্তার বৈশিষ্ট। আল্লাহ তায়ালার মত নিরাকার সত্তার জন্য এটা শোভা পায় না। এই আহলে হাদীস বাতিল ফিরক্বাটি এতটাই বেয়াদব যে, আল্লাহ তায়ালার দেহ আছে বলে বিশ্বাস করে। দেহ থাকাতো সৃষ্টির বৈশিষ্ট। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী সকল সৃষ্টির স্রষ্টার জন্য দেহ সাব্যস্ত করা এক প্রকার সুষ্পষ্ট শিরক। এই শিরকী আক্বিদা প্রচার করছে ইংরেজ সৃষ্ট কথিত আহলে হাদীস সম্র্যদায়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই ভয়াবহ মারাত্মক বাতিল ফিরক্বার হাত থেকে আমাদের দেশের সরলমনা মুসলমানদের হিফাযত করুন। বক্ষমান প্রবন্ধে আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান নিয়ে একটি দলিল ভিত্তিক আলোচনা উপস্থাপন করা হল। পরবর্তী প্রবন্ধে আল্লাহ তায়ালা যে দেহ থেকে পবিত্র, আল্লাহ তায়ালার দেহ সাব্যস্ত করা সুষ্পষ্ট শিরকী, এই ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা প্রকাশ করা হবে ইনশআল্লাহ। ১- ﺛُﻢَّ ﺍﺳْﺘَﻮَﻯ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟْﻌَﺮْﺵِ অতঃপর তিনি আরশে সমাসিন হন {সূরা হাদীদ-৩} ২- ﻗﻮﻟﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ } ﻭَﺇِﺫَﺍ ﺳَﺄَﻟَﻚَ ﻋِﺒَﺎﺩِﻱ ﻋَﻨِّﻲ ﻓَﺈِﻧِّﻲ ﻗَﺮِﻳﺐٌ ﺃُﺟِﻴﺐُ ﺩَﻋْﻮَﺓَ ﺍﻟﺪَّﺍﻉِ ﺇِﺫَﺍ ﺩَﻋَﺎﻥِ } আর যখন আমার বান্দা আমাকে ডাকে, তখন নিশ্চয় আমি তার পাশেই। আমি আহবানকারীর ডাকে সাড়া দেই যখন সে ডাকে। {সূরা বাকারা-১৮৬} ৩- ﻗﻮﻟﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ } ﻭَﻧَﺤﻦُ ﺃَﻗﺮَﺏُ ﺇِﻟَﻴﻪِ ﻣِﻦ ﺣَﺒﻞِ ﺍﻟﻮَﺭِﻳﺪِ { ‏[ ﻕ 16 ] আর আমি বান্দার গলদেশের শিরার চেয়েও বেশি নিকটবর্তী। {সূরা কাফ-১৬} ৪- ﻓَﻠَﻮْﻻ ﺇِﺫَﺍ ﺑَﻠَﻐَﺖِ ﺍﻟْﺤُﻠْﻘُﻮﻡَ ‏( 83 ‏) ﻭَﺃَﻧْﺘُﻢْ ﺣِﻴﻨَﺌِﺬٍ ﺗَﻨْﻈُﺮُﻭﻥَ ‏( 84 ‏) ﻭَﻧَﺤْﻦُ ﺃَﻗْﺮَﺏُ ﺇِﻟَﻴْﻪِ ﻣِﻨْﻜُﻢْ ﻭَﻟَﻜِﻦْ ﻻ ﺗُﺒْﺼِﺮُﻭﻥَ ‏( 85 ) অতঃপর এমন কেন হয়না যে, যখন প্রাণ উষ্ঠাগত হয়। এবং তোমরা তাকিয়ে থাক। এবং তোমাদের চেয়ে আমিই তার বেশি কাছে থাকি। কিন্তু তোমরা দেখতে পাওনা {সূরা ওয়াকিয়া-৮৩,৮৪,৮৫} ৫- { ﻭَﻟﻠَّﻪِ ﺍﻟْﻤَﺸْﺮِﻕُ ﻭَﺍﻟْﻤَﻐْﺮِﺏُ ﻓَﺄَﻳْﻨَﻤَﺎ ﺗُﻮَﻟُّﻮﺍْ ﻓَﺜَﻢَّ ﻭَﺟْﻪُ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻭَﺍﺳِﻊٌ ﻋَﻠِﻴﻢٌ { ‏[ ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ 115- ] পূর্ব এবং পশ্চিম আল্লাহ তায়ালারই। সুতরাং যেদিকেই মুখ ফিরাও, সেদিকেই রয়েছেন আল্লাহ তায়ালা। নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা সর্বব্যাপী সর্বজ্ঞাত {সূরা বাকারা-১১৫} ৬- ﻗﻮﻟﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ } ﻭَﻫُﻮَ ﻣَﻌَﻜُﻢْ ﺃَﻳْﻨَﻤَﺎ ﻛُﻨﺘُﻢْ { ‏[ ﺍﻟﺤﺪﻳﺪ – 4 ] তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথে আছেন {সূরা হাদীদ-৪} ৭- ﻭﻗﺎﻝ ﺗﻌﺎﻟﻰ ﻋﻦ ﻧﺒﻴﻪ : ‏( ﺇِﺫْ ﻳَﻘُﻮﻝُ ﻟِﺼَﺎﺣِﺒِﻪِ ﻻ ﺗَﺤْﺰَﻥْ ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻣَﻌَﻨَﺎ ‏( ﺍﻟﺘﻮﺑﺔ ﻣﻦ ﺍﻵﻳﺔ 40 যখন তিনি তার সাথীকে বললেন-ভয় পেয়োনা, নিশ্চয় আমাদের সাথে আল্লাহ আছেন {সূরা হাদীদ-৪০} ৮- ﻗﻮﻟﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ ﻣَﺎ ﻳَﻜُﻮﻥُ ﻣِﻦ ﻧَّﺠْﻮَﻯ ﺛَﻼﺛَﺔٍ ﺇِﻻَّ ﻫُﻮَ ﺭَﺍﺑِﻌُﻬُﻢْ ﻭَﻻ ﺧَﻤْﺴَﺔٍ ﺇِﻻَّ ﻫُﻮَ ﺳَﺎﺩِﺳُﻬُﻢْ ﻭَﻻ ﺃَﺩْﻧَﻰ ﻣِﻦ ﺫَﻟِﻚَ ﻭَﻻ ﺃَﻛْﺜَﺮَ ﺇِﻻَّ ﻫُﻮَ ﻣَﻌَﻬُﻢْ ﺃَﻳْﻦَ ﻣَﺎ ﻛَﺎﻧُﻮﺍ ﺛُﻢَّ ﻳُﻨَﺒِّﺌُﻬُﻢ ﺑِﻤَﺎ ﻋَﻤِﻠُﻮﺍ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟْﻘِﻴَﺎﻣَﺔِ ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﺑِﻜُﻞِّ ﺷَﻲْﺀٍ ﻋَﻠِﻴﻢٌ ‏( ﺍﻟﻤﺠﺎﺩﻟﺔ – 7 ) কখনো তিন জনের মাঝে এমন কোন কথা হয়না যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি উপস্থিত না থাকেন, এবং কখনও পাঁচ জনের মধ্যে এমন কোনও গোপন কথা হয় না, যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি উপস্থিত না থাকেন। এমনিভাবে তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি, তারা যেখানেই থাকুক, আল্লাহ তাদের সঙ্গে থাকেন। অতঃপর কিয়ামতের দিন তিনি তাদেরকে অবহিত করবেন তারা যা কিছু করত। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু জানেন {সূরা মুজাদালা-৭} ৯- ﻭَﺳِﻊَ ﻛُﺮْﺳِﻴُّﻪُ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﻭَﺍﺕِ ﻭَﺍﻷَﺭْﺽَ আল্লাহ তায়ালার কুরসী আসমান জমিন ব্যাপৃত {সূরা বাকারা-২৫৫} আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান হলে আকাশের দিকে কেন হাত উঠিয়ে দুআ করা হয়? আদবের জন্য। যদিও আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান। তিনি ডান দিকেও আছেন, বাম দিকেও আছেন, উপরেও আছেন, নিচেও আছেন। সামনেও আছেন। বাম দিকেও আছেন। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার শান হল উঁচু, তাই আদব হিসেবে উপরের দিকে হাত উঠিয়ে দুআ করা হয়। যেমন কোন ক্লাশরুমে যদি লাউডস্পীকার ফিট করা হয়। চারিদিক থেকে সেই স্পীকার থেকে শিক্ষকের আওয়াজ আসে। তবুও যদি কোন ছাত্র শিক্ষকের দিকে মুখ না করে অন্যত্র মুখ করে কথা শুনে তাহলে শিক্ষক তাকে ধমক দিবেন। কারণ এটা আদবের খেলাফ। এই জন্য নয় যে, অন্য দিক থেকে আওয়াজ শুনা যায় না। তেমনি আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান থাকা সত্বেও উপরের দিকে মুখ করে দুআ করা হয় আল্লাহ তায়ালা উুঁচু, সর্বশ্রেষ্ঠ। তাই আদব হিসেবে উপরের দিকে হাত তুলে দুআ করা হয়। জিবরাঈল উপর থেকে নিচে নেমে আসেন মানে কি? এর মানে হল-যেমন পুলিশ এসে কোন অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে কারণ বলে যে, উপরের নির্দেশ। এর মানে কি পুলিশ অফিসার উপরে থাকে? না সম্মান ও ক্ষমতার দিক থেকে যিনি উপরে তার নির্দেশ তাই বলা হয় উপরের নির্দেশ? তেমনি আল্লাহ তায়ালা ফরমান নিয়ে যখন জিবরাঈল আসেন একে যদি বলা হয় উপর থেকে এসেছেন, এর মানেও সম্মানসূচক ও পরাক্রমশালীর কাছ থেকে এসেছেন। তাই বলা হয় উপর থেকে এসেছেন। এই জন্য নয় যে, আল্লাহ তায়ালা কেবল আরশেই থাকেন। আল্লাহ তায়ালা কি সকল নোংরা স্থানেও আছেন? নাউজুবিল্লাহ এই উদ্ভট যুক্তি যারা দেয় সেই আহমকদের জিজ্ঞেস করুন। তার কলবে কি দু’একটি কুরাআনের আয়াত কি সংরক্ষিত আছে? যদি বলে আছে। তাহলে বলুন তার মানে সীনায় কুরআনে কারীম বিদ্যমান আছে। কারণ সংরক্ষিত সেই বস্তুই থাকে, যেটা বিদ্যমান থাকে, অবিদ্যমান বস্তু সংরক্ষণ সম্ভব নয়। তো সীনায় যদি কুরআন বিদ্যমান থাকে, সেটা নিয়ে টয়লেটে যাওয়া কিভাবে জায়েজ? কুরআন নিয়েতো টয়লেটে যাওয়া জায়েজ নয়। তখন ওদের আকল থাকলে বলবে-কুরআন বিদ্যমান, কিন্তু দেহ থেকে পবিত্র কুরআন। তেমনি আমরা বলি আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান। কিন্তু তিনি দেহ থেকে পবিত্র। সেই হিসেবে সর্বত্র বিরাজমান। সুতরাং কুরআন যেমন সীনায় থাকায় সত্বেও টয়লেটে যেতে কোন সমস্যা নেই। কুরআনে কারীমের বেইজ্জতী হয়না, সীনায় সংরক্ষিত কুরআনের দেহ না থাকার কারণে, তেমনি আল্লাহ তায়ালার দেহ না থাকার কারণে অপবিত্র স্থানে বিদ্যমান থাকাটাও কোন বেইজ্জতীর বিষয় নয়। যেই সকল নির্বোধের দল আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমানতাকে অস্বিকার করে আল্লাহ তায়ালাকে নির্দিষ্ট স্থানে সমাসিন বলে আল্লাহ তায়ালার সত্তার বেয়াদবী করছে ওদের অপপ্রচার থেকে, বাতিল আক্বিদা থেকে আমাদের আল্লাহ তায়ালা রক্ষা করুন। আমীন।

2654 views

আল্লাহ তাঁর সৃষ্টি জীবের সাথে জমিনে আছেন তারা পথভ্রষ্ট ও কাফির হয়ে যাবে। এতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ তাদের এ আক্বীদা কুরআন, সহীহ হাদীস, সাহাবা, তাবেঈন ও ইসলামের ইমামগণের বিশ্বাসের পরিপন্থী।
এখানে একটি সংশয়ের নিরসন করা দরকার যে কারণে জাহমিয়া ও সূফীরা বিপথগামী হয়েছে। আর তা হলোঃ আল্লাহ তা’আলা কুরআনের কিছু আয়াতে বলেছেন যে তিনি সৃষ্টি জীবের সাথে আছেন যেমন বলেছেন:
”তিনি তোমাদের সাথে আছেন তোমরা যেখানেই থাক।” (সূরা হাদীদ আয়াত: ৪)
তারা এ আয়াত ও এর সমার্থ বোধক অন্যান্য আয়াত হতে বুঝেছেন যে তিনি সস্তায় সৃষ্টি জীবের সাথে আছেন। কিন্তু তাদের এ বুঝ কুরআন, সহীহ হাদীস, সাহাবী, তাবেঈ ও ইসলামের ইমামগণের বিশ্বাসের পরিপন্থী। এ আয়াতগুলোর সঠিক তাফসীর বা ব্যাখ্যা নিন্মরূপঃ
তিনি আরশের উপর সমুন্নত থেকে তাঁর সৃষ্টি জীবের সাথে আছেন- এর অর্থ হলোঃ তিনি সৃষ্টি জীবের অবস্থাসমূহ জানেন, তাদের কথাসমূহ শুনেন, তাদের কর্মসমূহ দেখেন, তাদের বিষয় সমুহ পরিচালনা করেন, দরিদ্রকে রুজি দান করেন, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ করে দেন, যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন, যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজত্ব কেড়ে নেন, যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করেন, যাকে ইচ্ছা অপমান করেন, তাঁরই হাতে সকল কল্যাণ এবং তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।
আহলুস্ সুন্নাহ ওয়াল জামা’আহ এদের আকীদা হলো আল্লাহ আরশের উপর সমুন্নত। তারা তাদের এ আকীদার উপর আল কুরআনের নিন্মের আয়াত সমূহ দ্বারা প্রমাণ গ্রহণ করেন।
১। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى
“দয়াময় আল্লাহ আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন।” (সূরা ত্বহা আয়াত: ৫)
{اسْتَوَى} ইস্তাওয়া এর অর্থ: প্রখ্যাত তাবিঈ আবুল আলিয়াহ বলেছেন: ইস্তাওয়া অর্থ ইরতাফা’য়া। অর্থাৎ তিনি উঁচু হল। ইস্তাওয়া ইলাস্ সামায়ে এর অর্থ: তিনি আকাশের উপর আরশ এর উপর সমুন্নত হলেন। প্রখ্যাত তাবিঈ মুজাহিদ বলেছেন: ইস্তাওয়া অর্থ ‘আলা। এর অর্থ সে সমুন্নত হল। ‘আলা আলাল আরশে এর অর্থঃ তিনি আরশের উপর সমুন্নত হলেন। দেখুন: সহীহ বুখারী। (বাবু ওয়া কানা আরশুহু ‘আলাল মায়ে অর্থাৎ তাঁর আরশ পানির উপর আছে।)
হে প্রিয় পাঠক ও পাঠিকাগণ! কুরআনে ব্যবহৃত সকল ইস্তাওয়া ক্রিয়ার অর্থ: তিনি আরশের উপর উঁচু হলেন বা সমুন্নত হলেন। ইস্তাওয়া ক্রিয়াটি কুরআনে মোট নয়বার ব্যবহৃত হয়েছে। আর আরশ শব্দটি মোট বিশবার ব্যবহৃত হয়েছে।
২। وَهُوَ اللَّهُ فِي السَّمَاوَاتِ وَفِي الْأَرْضِ يَعْلَمُ سِرَّكُمْ وَجَهْرَكُمْ وَيَعْلَمُ مَا تَكْسِبُونَ
“আল্লাহ তিনিই উপাস্য আসমানে এবং জমিনে। তিনি তোমাদের গোপন ও প্রকাশ্য জানেন। তিনি আরও জানেন তোমরা (ভাল- মন্দ) যা কর। এ আয়াতে في ফী على ‘আলার এর অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থ তিনিই আসমান সমূহের উপরে আছেন।” (সূরা আন’আম, ৬ আয়াত: ৩)।
৩। بَلْ رَفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا
”বরং আল্লাহ তাঁকে( ঈসা আলাইহিস্ সালামকে) উঠিয়ে নিয়েছেন তাঁর নিজের কাছে। আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞানয় (সূরা নিসা: ৪, আয়াত: ১৫৮)
৪। تَعْرُجُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ خَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ
“ফিরিশতাগণ এবং রূহ ( জিবরাঈল) তাঁর (আল্লাহ) দিকে উঠেন, এমন দিনে যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছর।” (সূরা মা’আরিজ ৭০, আয়াত: ৪)
৫। يَخَافُونَ رَبَّهُمْ مِنْ فَوْقِهِمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ
তাঁরা (ফিরিশতারা) তাঁদের উপর তাঁদের প্রভূকে ভয় করে, আর তাঁদেরকে যা আদেশ দেয়া হয় তা পালন করে। (সূরা নাহল: ১৬, আয়াত: ৫০)
৬। أَأَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ فَإِذَا هِيَ تَمُورُ
“তোমরা কি নিশ্চিত আকাশে যিনি আছেন, তিনি তোমাদেরসহ ভূমি ধসিয়ে দিবেন না। অতঃপর তা কাঁপতে থাকবে।” (সূরা মুলক: ৬৭, আয়াত: ১৬)
৭। أَمْ أَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يُرْسِلَ عَلَيْكُمْ حَاصِبًا فَسَتَعْلَمُونَ كَيْفَ نَذِيرِ
“তোমরা কি নিশ্চিত আকাশে যিনি আছেন, তিনি তোমাদের উপর কঙ্কর বর্ষণ করবেন না। অচিরেই তোমরা জানতে পারবে কেমন ছিল আমার সতর্ককারী।” (সূরা মুলক ৬৭, আয়াত: ১৭)
পূর্বের দু’আয়াতেও ফী في অব্যয়টি আলা على অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
৮। ذُو الْعَرْشِ الْمَجِيدُ
“মহান আরশের অধিকারী।” (সূরা বুরূজ, ৮৫ আয়াত: ১৫)
৯। قُلْ مَنْ رَبُّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ ( سورة المؤمنون ৮৬ )
”বলুন: সপ্তাকাশ ও মহা আরশের মালিক কে?” (সূরা মু’মিনূন ২৩, আয়াত: ৮৬)
১০। ذِي قُوَّةٍ عِنْدَ ذِي الْعَرْشِ مَكِينٍ
“যিনি শক্তিশালী, আরশের মালিকের নিকট মর্যাদা শালী।” (সূরা তাকবীর ৮১, আয়াত: ২০)
১১। اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ
“আল্লাহ ব্যতীত কোন (সত্য) উপাস্য নেই, তিনি মহা আরশের প্রভু- মালিক।” (সূরা নামল ২৭, আয়াত: ২৬)
১২। سُبْحَانَ رَبِّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبِّ الْعَرْشِ عَمَّا يَصِفُونَ (سورة
“তারা যা বর্ণনা করে, তা থেকে আসমান ও জমিনের প্রভু- মালিক, আরশের প্রভু-মালিক পবিত্র। (সূরা যুখরুফ ৪৩, আয়াত: ৮২)
১৩। فَتَعَالَى اللَّهُ الْمَلِكُ الْحَقُّ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ
“অতএব মহিমান্বিত আল্লাহ, তিনি সত্যিকার মালিক, তিনি ব্যতীত (সত্য) কোন মাবুদ নেই। তিনি সম্মানিত আরশের মালিক।” (সূরা মু’মিনূন ২৩, আয়াত: ১১৬)
১৪। قُلْ لَوْ كَانَ مَعَهُ آلِهَةٌ كَمَا يَقُولُونَ إِذًا لَابْتَغَوْا إِلَى ذِي الْعَرْشِ سَبِيلًا
“বলুন: তাদের কথামত যদি তাঁর সাথে অন্যান্য উপাস্য থাকত, তবে তারা আরশের মালিক পর্যন্ত পৌছার পথ অন্বেষণ করত।” (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭ আয়াত: ৪২)
১৫। لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا فَسُبْحَانَ اللَّهِ رَبِّ الْعَرْشِ عَمَّا يَصِفُونَ
“যদি তাতে তথা আসমান ও জমিনে আল্লাহ ব্যতীত অন্যান্য উপাস্য থাকত, তবে উভয় ধ্বংস হয়ে যেত। অতএব তারা যা বলে, তা থেকে আরশের অধিপতি আল্লাহ পবিত্র।” (সূরা আম্বিয়া ২১, আয়াত: ২২)
১৬। فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُلْ حَسْبِيَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ
“এ সত্ত্বেও যদি তারা বিমুখ হয়ে থাকে, তবে বলে দাও, আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তিনি ব্যতীত (সত্য) কোন উপাস্য নেই। আমি তাঁরই উপর ভরসা করি এবং তিনিই মহান আরশের অধিপতি।” (সূরা তাওবা ৯, আয়াত: ১২৯)
১৭। الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ الرَّحْمَنُ فَاسْأَلْ بِهِ خَبِيرًا
“(আল্লাহ) যিনি আসমান, জমিন ও এতদুভয়ের অন্তর্বর্তী সবকিছু ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আরশে সমুন্নত হয়েছেন। তিনি পরম দয়াময়। তাঁর সম্পর্কে যিনি অবগত, তাকে জিজ্ঞেস কর।” (সূরা ফুরকান ২৫, আয়াত: ৫৯)
১৮। رَفِيعُ الدَّرَجَاتِ ذُو الْعَرْشِ يُلْقِي الرُّوحَ مِنْ أَمْرِهِ عَلَى مَنْ يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ لِيُنْذِرَ يَوْمَ التَّلَاقِ
তিনিই সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী, আরশের মালিক, তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা অহী নাযিল করেন, যাতে সে সাক্ষাতের দিন সম্পর্কে সকলকে সতর্ক করে। (সূরা গফির /মু’মিন ৪০, আযাতঃ ১৫)
১৯। وَتَرَى الْمَلَائِكَةَ حَافِّينَ مِنْ حَوْلِ الْعَرْشِ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَقُضِيَ بَيْنَهُمْ بِالْحَقِّ وَقِيلَ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
“তুমি ফিরিশতাগণকে দেখবে, তারা আরশের চার পাশ ঘিরে তাদের পালনকর্তার পবিত্রতা ঘোষণা করছে। তাদের সবার মাঝে ন্যায় বিচার করা হবে। বলা হবে, সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব প্রতি পালক আল্লাহর।” (সূরা যুমার ৩৯, আয়াত: ৭৫)
২০। اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ مَا لَكُمْ مِنْ دُونِهِ مِنْ وَلِيٍّ وَلَا شَفِيعٍ أَفَلَا تَتَذَكَّرُونَ
“আল্লাহ যিনি নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি আরশে সমুন্নত হয়েছেন। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন অভিভাবক ও সুপারিশ কারী নেই। এরপরও কি তোমরা বুঝবে না?” (সূরা সাজদা ৩২, আয়াত: ৪)
২১। “তিনি নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডল সৃষ্টি করেছেন ছয়দিনে, অতঃপর আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন। তিনি জানেন যা ভূমিতে প্রবেশ করে ও যা ভূমি থেকে নির্গত হয় এবং যা আকাশ থেকে বর্ষিত হয় ও যা আকাশে উত্থিত হয়। তিনি তোমাদের সাথে আছেন তোমরা যেখানেই থাক। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন।” (সূরা হাদীদ ৫৭, আয়াত: ৪)
তিনি তোমাদের সাথে আছেন তোমরা যেখানেই থাক। এর তাফসীর বা ব্যাখ্যা এ আয়াতেরই শেষাংশ। আর তা হলোঃ তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন।
২২। إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مَا مِنْ شَفِيعٍ إِلَّا مِنْ بَعْدِ إِذْنِهِ ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ
“নিশ্চয়ই তোমাদের পালনকর্তা আল্লাহ যিনি তৈরি করেছেন আসমান ও জমিনকে ছয় দিনে, অতঃপর তিনি আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন। তিনি কার্য পরিচালনা করেন। কেউ সুপারিশ করতে পাবে না তবে তাঁর অনুমতি ছাড়া ইনিই আল্লাহ তোমাদের পালনকর্তা। অতএব, তোমরা তাঁরই এবাদত কর। তোমরা কি কিছুই চিন্তা কর না?” (সূরা ইউনুস ১০, আয়াত: ৩)
২৩।
“আল্লাহ, যিনি ঊর্ধ্বদেশে স্থাপন করেছেন আকাশ মণ্ডলীকে স্তম্ভ ব্যতীত। তোমরা সেগুলো দেখ। অতঃপর তিনি আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন। এবং সূর্য ও চন্দ্রকে কর্মে নিয়োজিত করেছেন। প্রত্যেকে নির্দিষ্ট সময় মোতাবেক আবর্তন করে। তিনি সকল বিষয় পরিচালনা করেন, নিদর্শনসমূহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা স্বীয় পালনকর্তার সাথে সাক্ষাত সম্বন্ধে নিশ্চিত বিশ্বাসী হও।” (সূরা রাদ ১৩, আয়াত: ২)
২৪।
“নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। তিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশের উপর সমুন্নত হয়েছেন। তিনি পরিয়ে দেন রাতের উপর দিনকে এমতাবস্থায় যে, দিন দৌড়ে রাতের পিছনে আসে। তিনি সৃষ্টি করেছেন সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রকে এমন ভাবে যে তা সবই তাঁর আদেশের অনুগামী। শুনে রেখ, তাঁরই কাজ সৃষ্টি করা এবং আদেশ দান করা। আল্লাহ, বরকতময় যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক।” (সূরা আরাফ ৭, আয়াত: ৫৪)

হে সম্মানিত পাঠক পাঠিকাগণ! আমি আশা করি আপনারা পূর্বের আলোচনা থেকে আল্লাহর অবস্থান সম্পর্কে আহলুস্ সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের আক্বীদা আল কুরআনের আলোকে জানতে পেরেছেন। আর তা হলো আল্লাহ আরশের উপর সমুন্নত। তবে তিনি সৃষ্টি জীবের সব কিছু জানেন, দেখেন, পরিচালনা করেন ও তার প্রতিদান দান করেন। আল্লাহ সবাইকে এ মাস’আলাটি সহ আকীদার অন্যান্য মাস’আলাসমূহ সঠিক ভাবে জানার তাওফীক দান করুন।
পরিশেষে আমি সারা বিশ্বের সকল মানুষকে জানিয়ে দিতে চাই যে কেবল সহীহ আক্বীদাই বা সঠিক বিশ্বাসই সারা বিশ্বের সকল মানুষের হৃদয়, তাদের বাণী ও তাদের কাতারকে একত্রিত করতে সক্ষম। সঠিক বিশ্বাসই এ উম্মতের প্রথম যুগের মানুষের অন্তর, বাণী ও কাতারকে একত্রিত করেছিল। তাঁরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নেতৃত্বে তাওহীদের ছায়া তলে একত্রিত হয়েছিলেন। তাঁরা এক দলভুক্ত ছিলেন। তাই তাঁদের মত একত্রিত হওয়া ও একত্রিত করার জন্যে প্রত্যেকেই কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে সঠিক আক্বীদা শিখা ও তা প্রচার ও প্রসার করার জন্যে সর্বশক্তি ব্যয় করা একান্ত কর্তব্য।
আল্লাহ সবাইকে সঠিক আক্বীদা শিখার, তার প্রতি আমল ও তা যথাযথ প্রচার ও প্রসার করার তাওফীক দান করুন আমীন।

2654 views

Related Questions