আমার দুটি সন্তান এখনও স্কুলে ভর্তি করাইনি ইনশাল্লাহ এই বছর ভর্তি করাব।তাই একজন জ্ঞানী মানুষের পরামর্শ চাচ্ছি।আমার সন্তানের ব্রেনশক্তি/স্মৃতিশক্তি বিকাশ এর জন্য আমারা কি করা উচিত।মানে তাদেরকে কি ধরনের খাবার, বিশ্রাম বা অন্যান্য কি কি যত্ন নিতে পারি।আমি চাই আমার সন্তানরা লেখা পড়ায় ভালো করুক এবং তাদের কে doctor বানানোর জন্য আমাদের পরিবারের সবার আশা। এটা আমার প্রথম প্রশ্ন। প্লীজ এই ব্যাপারে আমাকে কেউ ভালো পরামর্শ দিলে আমি কৃতজ্ঞ হব।please help me.
3074 views

1 Answers

বুদ্ধি নিতান্ত কম ছিল বলেই না কালিদাস যে ডালে বসেছিলেন সেই ডালই কাটছিলেন! কিংবা আইনস্টাইন কলেজের এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন! অথবা রবীন্দ্রনাথ স্কুলের গণ্ডিই পেরোতে পারলেন না! এরা সবাই মনীষী বলে এখন দিব্যি লুটছেন, কিন্তু আমাদের ছেলেমেয়েদের বেলায় এরকম ঘটলে যে আমরা কী করতাম ভেবে দেখেছেন? হয় বলব তারা বোকা কিংবা তাদের বোধবুদ্ধি এক্কেবারেই নেই, তাই তো? ঠিক তাই! তবে মন্তব্যটা হবে আংশিক সত্যি। কারণ বুদ্ধি কোনো একটা নিদিষ্ট বিষয় নয় যা কিনা কয়েকটি বিশেষ আচরণে গণ্ডিবদ্ধ করা যায়। যেমন কালিদাসের বাস্তব বুদ্ধি ছিল না বলেই তিনি যে ডালে বসেছিলেন সেই ডালই কাটছিলেন! কে জানে তখন হয়তো তিনি গাছের ওপর বসে মেঘের কাছাকাছি গিয়ে সে দিকে তাকিয়ে তার আগামী কাব্যের ভাবনা কুড়োচ্ছিলেন। যে মানুষটা থিওরি অব রেলেটিভিটি আবিষকার করেছিলেন, তার মগজ হয়তো প্রাত্যহিক পড়াশোনার জন্য তৈরি ছিল না! অন্যদিকে বেঙ্গল রেনেসাঁসের ফার্স্ট ফ্যামিলি ঠাকুর পরিবারের কনিষ্ঠতম সদস্যটি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে নিজেকে মেলাতে না পারলেও তার মনীষার স্ফূরণ বিচ্ছুরিত হতে শুরু করেছিল নেহাতই ছোটবেলা থেকে নানা সৃষ্টিতেই। এরা প্রচলিত পথে এগোননি বলেই এদের বুদ্ধি কম তা অবশ্যই বলা যাবে না। আসলে বুদ্ধি মগজের কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকায় নিহিত থাকলেও তার প্রকাশ ঘটে নানা স্তরে, নানাভাবে। বুদ্ধির মানে বুদ্ধি কেবল জন্মসূত্রে পাওয়া যায়-এই ধারণাটা ঠিক নয়। বুদ্ধির একটা অংশ পরিবেশ, শেখার মাধ্যমে এবং ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। বুদ্ধি কোথায় থাকে বুদ্ধির আধার হলো মস্তিষক বা মগজ। আরো সঠিকভাবে বলতে গেলে মগজের ওপর ছড়ানো পাঁচ মিলিমিটার পুরু আর দেড় বর্গমিটার বিস্তৃত ধূসর এক টুপি যার নাম সেরিব্রাল কর্টেক্স। সেরিব্রাল কর্টেক্সের নানা অংশ আর প্রি- ফ্রন্টাল কর্টেক্সের সমন্বয়ই বোধ-বুদ্ধি- মেধা-স্মৃতি- চেতনার মূলকথা। বুদ্ধি তৈরির কারখানা পরিণত মানবমগজের যা ওজন তার প্রায় ৮০% তৈরি হয়ে যায় জীবনের প্রথম ৩ বছরে। মায়ের পেটে বা জন্মানোর পর প্রথম বছরগুলোতে পুষ্টির, বিশেষ করে খাবারে প্রোটিনের অভাব ঘটলে বুদ্ধির স্বাভাবিক বিকাশ যায় আটকে। জন্মগত কিছু সমস্যায় বা জন্মের সময় অথবা পরে মাথায় বড় কোনো আঘাত পেলেও বিপর্যয় হতে পারে মানসিক বিকাশ। একই ঘটনা ঘটে বাচ্চার বেড়ে ওঠার পরিবেশ প্রতিকূল হলেও। বুদ্ধির সবটাই জন্মগত, কোনোভাবেই বুদ্ধি বাড়ানো যায় না শিখিয়ে-পড়িয়ে-এরকম ধারণা একশভাগ ভুল। বুদ্ধি কিছুটা জেনেটিক, বাকিটা গড়ে ওঠে শেখার মাধ্যমে। জিনবাহিত বুদ্ধিও অনেক অংশে প্রভাবিত হয় পরিবেশ দিয়ে। বুদ্ধি নির্ভর করে শেখার পরিবেশ, শেখার পদ্ধতি আর শেখার আবেগ (Emotion) -এর ওপর। বুদ্ধির একই বিকাশ অনেকাংশেই নির্ভর করে চর্চার ওপরে। যেমন এর জন্য চাই যথাযথ খাবার, প্রয়োজনে ঠিকমতো আসন বা ব্যায়ামের এবং উপযুক্ত, স্বাস্থ্যকর লাইফস্টাইলও। বুদ্ধি বাড়ানোর মূলকথা বুদ্ধিতে সর্বদাই শান দিয়ে যেতে হবে, তবেই তা প্রতি পলে বাড়তে থাকবে! কারণ আমাদের মগজের যা ক্ষমতা তার অতি কিঞ্চিৎ পরিমাণই আমরা কাজে লাগাই। ছেলেবেলা থেকে শেখার ক্ষমতা বাড়তে বাড়তে ২০-২৫-এ সবচেয়ে বেশি হয়, তারপর স্থির থাকে বা কমতে থাকে। মানুষে মানুষে শেখার ক্ষমতায় কিছু তারতম্য থাকবেই। শেখার ক্ষমতা বাড়ে শরীর-মন সুস্থ-সবল হলে, কমে শরীরের শক্তির অভাব, মনে ফুর্তির অভাব থাকলে। অনুপ্রেরণা পেলে শেখা বাড়ে, বাড়ে শেখার পরিবেশ আর পদ্ধতি আনন্দময় হলে। ভয় দেখানো, চাপ তৈরি করা পরিবেশ শেখার গুণগত মান কমায়। পরিবেশে অশান্তি, উদ্বেগ বা ভয়ভীতি থাকলে কমে শেখার মান ও পরিমাণ দুটোই। আনন্দবোধ, উৎসাহ, প্রেরণা, প্রশংসা বা পুরস্কার শেখার আগ্রহ শুধু বাড়ায় না, এতে শেখার মাত্রা ও গুণমান বাড়ে। বুদ্ধির বেড়ে ওঠা আজকের স্কুল-কলেজে পড়ার বোঝা, অতিরিক্ত চাপ, দমবন্ধ করা পরিবেশ- এসবই কঠোর বাস্তব। মনোবিদরা নানা গবেষণার সূত্র ধরে শেখার যে আদর্শ পদ্ধতি পরিবেশের কথা বলছেন তা এই ইঁদুর-দৌড় বা র্যাট রেসের যুগে করা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। প্রসঙ্গত বলা দরকার, অনেক ছাত্র খুব ছোটবেলায় স্কুল ও অন্যান্য ক্ষেত্রে তেমন সাফল্য দেখাতে পারে না, কিন্তু উঁচু ক্লাসে বা কিছু সময় পর থেকে তারা ভালো করতে শুরু করে। এদের বলে লেট অ্যারাইভাল। সে ক্ষেত্রে বলা যায় এই গোত্রের মানুষরা তাদের বুদ্ধিতে শান দিয়ে তা কাজে লাগাতে শুরু করে। জেনে নিন তা কীভাবে সম্ভব। আদর্শ লেখাপড়ার ও শেখার পরিবেশ আর পদ্ধতি কেমন হওয়া দরকার- তীব্র আবেগের সঙ্গে শেখার ব্যবস্থা, একটানা বেশিক্ষণ না শিখিয়ে মধ্যে বিনোদনের ব্যবস্থা। শেখানোর ব্যবস্থা যেন যথেষ্ট উদ্দীপনা জোগা শেখা তথ্য বা পদ্ধতিকে যেন বারবার ঝালিয়ে নেয়া হয়। শেখার ওপর নজর থাকে, তবে খবরদারি বা বেশি নাক গলানো নয়। খবরদারি না থাকা স্বতঃস্ফূর্ত পরিবেশে শেখার মান ও পরিমাণ বাড়বে। একশ ভাগ ছাঁচে-ঢালা পদ্ধতি বা পরিবেশ নয়, সুচিন্তিত, বেশ খানিকটা স্বতঃস্ফূর্ত শেখার ব্যবস্থা শেখার গভীরতা ও বিস্তার বাড়ায়। শেখানোর পদ্ধতি হওয়া চাই সহজ সরল, জটিল বিষয়কে সহজ করে বোঝানোর দক্ষতা শিক্ষকের থাকা চাই। জোর করে গেলানো পদ্ধতি নয়, শেখার গুণমান ও পরিধি বাড়ে শেখার সঙ্গে ছাত্র-ছাত্রীর মগজ কাজে লাগানোর ব্যবস্থা থাকলে। পড়াশোনার যে পদ্ধতিতে মগজকে যত বেশি খাটাতে হয়, মানসিক উর্বরতা বাড়ে তত বেশি। এক কথায় আনন্দে, নিজের মতো করে, মাথা ঘামিয়ে, ছাঁচে-ঢালা নয় এমন পদ্ধতিতে প্রথাগত ও স্বাধীন লেখাপড়া ছাত্রজীবনে বুদ্ধির বিকাশ ঘটায়। বুদ্ধি বাড়ে ভালো শিক্ষকের শেখানোর মৌলিক দক্ষতার গুণে, বাড়ে একই বিষয় বারবার ঝালানোয়, আবেগযুক্ত শেখার ব্যবস্থায়।

3074 views

Related Questions