1 Answers
“অভাবে স্বভাব নষ্ট”, এ কটূক্তির পেছনে বৈষম্যমূলক মনোভাব লুকিয়ে থাকলেও আমরা অনেকেই এ কথাটিকে একটু হলেও সত্যি মনে করি। এবার সাধারণ ধারণার গণ্ডি পেরিয়ে এই বিষয়টি নিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে গবেষণা করা হল।
ফলাফলে যা বেরিয়ে আসলো তাতে বলা যায় স্বভাব নষ্ট না করলেও মস্তিষ্কের ওপর যথেষ্টই খারাপ প্রভাব ফেলে দারিদ্র্য।
মানব মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা অসীম নয়। কাজ করতে করতে আপনিও হয়তো খেয়াল করেছেন যে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে মনোযোগ দিতে গিয়ে লাঞ্চ করতে ভুলে গেলেন বা মিটিং এ যাবার কথাই ভুলে গেছেন! এবং এ কারনেই গাড়ি চালানোর সময়ে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে মানা করা হয় কারণ এক মুহূর্তের অন্যমনস্কতায় ঘটে যেতে পারে অনেক বড় দুর্যোগ। ব্যবহার করার মত মনোযোগ আমাদের পরিমিত। সবচাইতে প্রয়োজনীয় দুএকটি বিষয়ে মনোযোগ দেবার পর বাকিগুলোর দিকে আমরা যথেষ্ট মনোযোগ দিতে পারি না। আর এখানেই চলে আসছে দারিদ্র্যের ভূমিকা।
Science জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণার তথ্য থেকে দেখা যায়, দারিদ্র্যের দুশ্চিন্তা মানুষের মনের ওপর এত বেশি চাপ ফেলে যে তারা স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করতে পারেন না। যেসব কাজ করলে তাদের দারিদ্র্য দূরীভূত হবার সম্ভাবনা থাকে, যেমন নৈশবিদ্যালয়ে অংশগ্রহণ, চাকরির খোঁজ করা এমনকি বাসা ভাড়া চুকিয়ে দেওয়া, এসব কাজও তারা যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে করতে পারেন না। দেখা গেছে, দারিদ্র্যের কারণে সৃষ্ট মানসিক চাপের ফলে ১৩ পয়েন্ট আই.কিউ সমান বুদ্ধিমত্তার ক্ষয় হতে পারে।
প্রিন্সটন, হার্ভার্ড এবং ওয়ারউইক ইউনিভার্সিটির গবেষকরা ক্রমানুসারে বেশ কয়েকটি পরীক্ষা চালান কম আয়ের মানুষের ওপরে। দারিদ্র্য নিয়ে চিন্তিত থাকার ফলে তাদের চিন্তাশক্তি কম হতে দেখা যায়। এক রাত না ঘুমিয়ে কাটালে মস্তিষ্ক যেমন চাপে থাকে, এই রকম দুশ্চিন্তা থাকার ফলে একই রকম মানসিক চাপ তৈরি হয় এবং ১৩ পয়েন্টের মত আইকিউ কমে যায়। মদ্যপ ব্যক্তি এবং সাধারণ ব্যক্তিদের মাঝে তুলনাতেও দেখা যায় এমন ফলাফল।
এছাড়া এই গবেষণা থেকে আরও একটি ধারণায় উপনীত হওয়া যায় যে, দরিদ্র ব্যক্তিদের নিজেদের মাঝেই লুকিয়ে আছে দুর্বলতা যার ফলে তারা নিজেরাই নিজেদের দরিদ্র দশার জন্যে দায়ী। নিজেদের চেষ্টার পরিমাণ বৃদ্ধি করলেই তাদের দারিদ্র্য অনেকাংশে লাঘব হওয়া সম্ভব। এ গবেষণার লেখকদের মতে, দরিদ্র হওয়া মানে, “শুধু অর্থের অভাব নয় বরং মানসিক কার্যক্ষমতার অভাবের মাঝে বসবাস করা”।
এর উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অভাবগ্রস্ত মানুষদেরকে সাধারণত ভালো অভিভাবক হতে দেখা যায় না। দারিদ্র্যের দুশ্চিন্তায় তাদের মন এতটাই ভরপুর থাকে যে তারা বাচ্চাদের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দিতে পারেন না এবং তাদের ধৈর্য ও কম হয়। ফলে এ দুটি সমস্যা সম্পর্কহীন নয়।
এই গবেষণাটি পরিচালনা করেন এল্ডার শাফির, আনান্দি মানি, সেন্দহিল মুলাইনাথান এবং জিয়াইং ঝাও। দারিদ্র্যের ফলে বুদ্ধিমত্তা ক্ষয় করা নিয়ামকটিকে আসলে মানসিক চাপ বলা যায় না। চাপের ফলে শরীরে যেসব উপসর্গ দেখা যায় তা এক্ষেত্রে অনুপস্থিত। কিছু পরিমাণ চাপ আমাদের জন্যে উপকারী কিন্তু এটা যখন অতিরিক্ত বেড়ে যায় তখনই হয়ে ওঠে ক্ষতিকর। এই পরীক্ষার অধীনস্ত অভাবগ্রস্ত মানুষদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, শুধুমাত্র আর্থিক বিষয়ে চিন্তা করতে হলেই তাদের মানসিক ক্ষমতা অনেকটা কমে আসে এবং এর পরবর্তীতে করা চিন্তাশক্তির পরীক্ষাগুলোতে তারা খারাপ ফলাফল করেন।
“এমন নয় যে এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা তেমন শোচনীয়ভাবে দরিদ্র”, বলেন শাফির। “এরা বেশ সাধারণ মানুষ যারা সেদিন শপিং করতে যাচ্ছিলেন”, এ পরীক্ষায় যেসব মানুষের আয় বেশি ছিল তাদের এমন কোনো সমস্যা হয় নি।
তেমন অসাধারণ বা চটকদার কোন পরিকল্পনা ব্যবহার করা হয়নি এ পরীক্ষাগুলোতে। কিন্তু এর মাধ্যমে চিন্তাশক্তি এবং দারিদ্র্যের মাঝে যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া গেছে যা আগে কখনো চিন্তা করা হয়নি। ফলে এই গবেষণাটি হয়ে উঠেছে অনন্য।
“এই প্রজেক্টটির মাঝে নতুনত্ব নেই, নতুন কোন প্রযুক্তি নেই। এই গবেষণাটি করা যেত আরও অনেক বছর আগেই,” বলেন শাফির। কিন্তু Behavioral Economics বা আচরণগত অর্থনীতির নতুন ক্ষেত্রটিতে এ বিষয়ে গবেষণায় এর আগে আগ্রহী হননি কোন গবেষক।
এ গবেষণা থেকে বোঝা যায় অভাবগ্রস্ত মানুষের সার্বিক উন্নতির ক্ষেত্রে শুধু আর্থিক অবস্থার উন্নতিই নয় বরং তাদের মানসিক অবস্থার উন্নতি করতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মাসের শেষে বেতন না দিয়ে যদি প্রতি সপ্তাহের শেষে তাকে বেতন দিয়ে দেওয়া হয় তবে তার আর্থিক দুশ্চিন্তা অনেকাংশে কমে আসবে।
“এ কাজটি করলে তাদের চিন্তাশক্তির অনেকটাই ভারমুক্ত হয়ে যাবে,” বলেন শাফির। এর ফলে সেই ব্যক্তির জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। আর্থিক দুশ্চিন্তা লাঘব হলে জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে তারা প্রয়োজনীয় মনোযোগ দিতে পারবেন। এছাড়াও, ভারমুক্ত মস্তিষ্কে তারা কর্মক্ষেত্রেও বেশি অবদান রাখতে পারবেন। ফলে ব্যক্তিগত এবং পেশাদারী জীবন উভয় ক্ষেত্রে তাদের উন্নতি আসবে।