খনার বচনে প্রাধান্য পেয়েছে -
খনার বচনে প্রাধান্য পেয়েছে - সঠিক উত্তর কৃষি
পুবে ধনু নিত্য ঝরাখনার বচনে প্রাধান্য পেয়েছে - কৃষি পুবে ধনু নিত্য ঝরা পচ্চিমে ধনু নিত্য খরা (খনার এ বচনে বলা হয়েছে, আষাঢ় - শ্রাবণ মাসে পুব আকাশে রংধনু দেখা দিলে বৃষ্টি হবে এবং পশ্চিমে দেখা গেলে খরা হবে।১) ‘খনা’ কি ‘খনার বচন’ নিয়ে বিদ্যমান আলাপ কি নথিতে আমরা বরাবর ছকবদ্ধ কিছু একরৈখিক ধরন ও সূত্র দেখতে পাই। যদিও খনা কি খনার বচন নিয়ে গুরুত্ব তৈরি করার মতো লেখালেখি আমাদের নাগাল কি হদিসে তেমন একটা নেই। মহামতি খনা তাঁর অমর সৃষ্টি ‘খনার বচনের’ ভেতর দিয়েই আমাদের ইতিহাসে জোরদার দৃশ্যমানতা তৈরি করেছেন। হয়তো সেই কারণেই খনাবিষয়ক আলোচনায় প্রধান হয়ে ওঠে কেবল তাঁর বচনসমূহ। বচনভিন্ন খনা বারবার আমাদের অধিপতি আলাপের ঘেরাটোপ থেকে বিচ্ছিন্ন কি অদৃশ্য হয়ে যান বা তাঁকে আড়াল করে রাখা হয়। এমনকি খনার বচন নিয়ে আলাপের সূত্রগুলো তাঁর বচনের ‘কৃষি ও আবহাওয়ার সম্বন্ধকে’ এমন কায়দায় উপস্থাপন করে বারবার, যেখান থেকে আমরা খনার বচনের বিজ্ঞান - দর্শন নয় কেবল ‘কৃষি কি আবহাওয়ার উপযোগিতামূলক পরামর্শই’ ঠাহর করতে পারি। সচরাচর খনার ‘বিদুষী’, ‘জ্যোতিষী’, ‘কৃষি বচন রচয়িতা’, ‘কিংবদন্তি’ ইত্যাদি পরিচয় নির্মাণেরই চল প্রতিষ্ঠিত। ‘খনার বচনও’ সচরাচর ‘লোকসংস্কৃতির’ এক প্রবল বলপ্রয়োগে বন্দী, যেখান থেকে নিম্নবর্গের রূপান্তরধর্মী জীবন কি আখ্যানের কোনো আন্দাজ পাওয়া যায় না। খনা কি খনার বচন নিয়ে যত ধরনের লেখালেখি হাতের নাগালে পাওয়া যায়, সেসব লেখালেখির ধরন ও কাঠামো প্রায় একই। প্রচলিত নথিগুলো পয়লা খনার জন্মবৃত্তান্ত বর্ণনা করে (যা জন্মরহস্য বলে একধরনের দক্ষিণ এশীয় ফ্যান্টাসি তৈরি করে), পরবর্তীতে তাঁর একধরনের ‘সংক্ষিপ্ত জীবনী’ তুলে ধরে। এসব জীবনীর একটা প্রধান অংশজুড়েই খনাকে পরিবারকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে টেনে টেনে সামাজিকীকরণ করা হয়। খনার শ্বশুর, স্বামী, রাক্ষসপুরীতে বড় হওয়া ও জ্যোতিষজ্ঞান লাভ, রাজদরবার সব মিলিয়ে খনাকে ‘প্রকাশ’ করা হয়। রয়েছে খনার জন্মস্থান বিতর্ক এবং বচনের ভাষিক বাহাস। তারপর খনার বচনগুলোর একটা সংকলন তুলে দেওয়া হয়। ছন্দোবদ্ধ বচনটির পর একটি বর্ণনামূলক মানে দেওয়া হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বচনগুলো শ্রেণীকরণ করে ব্যবহূত হতে দেখা যায়। যেমন, কৃষিবিষয়ক বচন, তিলতত্ত্ব, হলুদবিষয়ক, কচুবিষয়ক, বৃষ্টি গণনা, কলার চাষবিষয়ক ইত্যাদি। খনার এক বচন ছাড়া প্রচলিত অধিকাংশ রচনায় খনাকে ‘ইতিহাসের এক নিষ্ক্রিয় ও প্রতিরোধহীন’ ব্যক্তি হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে ‘খনার জিহ্বা কেটে নেওয়ার ঘটনাকে’ পুরুষতান্ত্রিক নিপীড়ন ও নারীর জ্ঞানকে প্রান্তিক করে তোলার উদাহরণ হিসেবে ব্যাখা দেওয়া হয়। কেউ কেউ খনার বচনের ‘জনমত’ ও গ্রহণযোগ্যতাকেও প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। সবকিছু মিলিয়ে অধিপতি জ্ঞানকাণ্ডের খনা - ভাবনাসমূহ খনা কি খনার বচনকে ‘লোকসংস্কৃতি ও গ্রামীণ কৃষিসমাজের বিষয়’ হিসেবে এক প্রশ্নহীন অপরত্বের২ মোড়কে সমাজ রূপান্তরের ধারাপাত থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। এর ধারাবাহিকতায় দেখা যায়, নিম্নবর্গের যাপিতজীবন ও রাষ্ট্রবিকাশের আখ্যান থেকে খনা কি খনাদের সৃষ্টি ও দর্শনকে ‘অস্বীকৃত’ ও ‘অবাঞ্ছিত’ করে রাখা হয়। যাপিতজীবনের দেনদরবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে খনাদের ‘ধরাছোঁয়ার বাইরের অচিন রূপকথা কি নাগালহীন কিংবদন্তি’ করে তোলা হয়। ক্ষমতাবানদের রচিত ইতিহাসে কেবল খনা নয়, উলগুলান বা মুণ্ডা বিদ্রোহের কারিগর বীরসা মুণ্ডা কি হুল বা সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতা ফুলমণি মুর্মুদেরও এভাবেই ‘অপর’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। নিরন্তর বিজ্ঞানমনস্কতা কি সামাজিক বোঝাপড়া দিয়ে তখন এসব চরিত্র কি তাদের চিন্তা ও দর্শন নিম্নবর্গের নাগালের বাইরে থেকে যায়। আর সেখান থেকেই আজকের আলাপখানি৩ শুরু করতে চাইছি। খনা ও খনার বচনের বিজ্ঞান - দর্শনকে আজকের আলাপে বোঝার চেষ্টা করব। আলাপের সূত্র ধরে খনার বৃত্তান্ত, প্রচলিত আখ্যান ও কাহিনিগুলো আমাদের টানতে হবে ক্ষমতার রাজনীতি ও ইতিহাসের বৈষম্যের ব্যাকরণকে স্পষ্ট করার জন্য। আলাপের ক্ষেত্রে একটা রাজনৈতিক তাত্ত্বিক পাটাতন অনেকখানি জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। নিম্নবর্গের প্রতিরোধী জ্ঞানকাণ্ডের বিজ্ঞানমনস্কতা আলাপের অলিগলি ঘুরতে আমাদের টানটান রাখবে। প্রতিবেশ - নারীবাদী৪ তত্ত্ব - তালাশের ভেতর দিয়ে চলতি আলাপ তার আসর জমানোর মানত করেছে। বাংলা ও ইংরেজিতে প্রকাশিত খনা ও খনার বচন নিয়ে লেখালেখিগুলোর প্রায় গরিষ্ঠভাগই (যা পাওয়া গেছে এ শর্তকে মেনে) চলতি আলাপে টেনে আনা হয়েছে। খনার বচনের ক্ষেত্রে নিজস্ব সংগ্রহ, রাস্তা কি মেলাতে বিক্রীত বই থেকে শুরু করে গবেষণা পুস্তক - জার্নাল - পত্রিকা - সাময়িকী এবং ওয়েবদুনিয়াতে যা পাওয়া গেছে তা - ও গুরুত্ব দিয়ে আলাপের সঙ্গী হয়েছে। খনার বচন এবং খনার বিজ্ঞান - দর্শনকে জানতে - বুঝতে দেশের নানান প্রান্তে গ্রামীণ জনপদে নিম্নবর্গের বাহাস ও দেনদরবার কাজে লেগেছে। নিম্নবর্গের এই প্রজ্ঞা ও গতিই বিজ্ঞানের সত্যকে প্রকাশ করে, খনার বচন কি খনার দর্শন জীবনব্যাপী যে সত্যের সীমানা তৈরি করেছে। চলতি আলাপ থেকে আমরা অধিপতি জ্ঞানকাণ্ডের ক্ষমতার বলপ্রয়োগ ও নিম্নবর্গের জ্ঞানদুনিয়ার প্রান্তিকীকরণ ও নিরন্তর টিকে থাকার লড়াইয়ের ধরনটিও বোঝার চেষ্টা করব। কারণ খনা ও খনার বচনকে দাবিয়ে রাখার মৌলিক সূত্র ও কারণ ক্ষমতার রাজনীতির ভেতরেই সীমাবদ্ধ।
মোঃ আরিফুল ইসলাম
Feb 20, 2025