ওয়া জা‘আলূ লিল্লা-হি মিম্মা-যারআ মিনাল হারছিওয়াল আন‘আ-মি নাসীবান ফাক-লূ হা-যা-লিল্লা-হি বিঝা‘মিহিম ওয়া হা-যা-লিশুরকাইনা- ফামা-ক-না লিশুরকাইহিম ফালা-ইয়াসিলুইলাল্লা-হি ওয়া মা-ক-না লিল্লা-হি ফাহুওয়া ইয়াসিলু ইলা-শুরকাইহিম ছাআ মা-ইয়াহকুমূন।উচ্চারণ
এ লোকেরা ১০৪ আল্লাহর জন্য তাঁরই সৃষ্ট ক্ষেত-খামার ও গবাদি পশুর মধ্য থেকে একটি অংশ নির্দিষ্ট করেছে আর নিজেদের ধারণা অনুযায়ী বলছে, এটি আল্লাহর জন্য এবং এটি আমাদের বানানো আল্লাহর শরীকদের জন্য। ১০৫ তারপর যে অংশ তাদের বানানো শরীকদের জন্য, তা তো আল্লাহর কাছে পৌঁছে না কিন্তু যে অংশ আল্লাহর জন্য তা তাদের বানানো শরীকদের কাছে পৌঁছে যায়। ১০৬ কতই না খারাপ ফায়সালা করে এরা! তাফহীমুল কুরআন
আল্লাহ যে শস্য ও গবাদি পশু সৃষ্টি করেছেন, তারা তার মধ্যে আল্লাহর জন্য একটি অংশ নির্দিষ্ট করেছে। #%৭৫%# সুতরাং তারা নিজ ধারণা অনুযায়ী বলে, এ অংশ আল্লাহর এবং এটা আমাদের শরীকদের (অর্থাৎ দেব-দেবীদের)। অতঃপর যে অংশ তাদের শরীকদের জন্য, তা (কখনও) আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, আর যে অংশ আল্লাহর জন্য, তা তাদের শরীকদের কাছে পৌঁছে। তারা যা স্থির করে নিয়েছে তা কতই না নিকৃষ্ট!মুফতী তাকী উসমানী
আর আল্লাহ যে সব শস্য ও পশু সৃষ্টি করেছেন, তারা (মুশরিকরা) ওর একটি অংশ আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করে থাকে। অতঃপর নিজেদের ধারণা মতে তারা বলে যে, এই অংশ আল্লাহর জন্য এবং এই অংশ আমাদের শরীকদের জন্য। কিন্তু যা তাদের শরীকদের জন্য নির্ধারিত হয়ে থাকে, তাতো আল্লাহর দিকে পৌঁছেনা, পক্ষান্তরে যা আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল তা তাদের শরীকদের কাছে পৌঁছে থাকে। এই লোকদের ফাইসালা ও বন্টন নীতি কতই না নিকৃষ্ট!মুজিবুর রহমান
আল্লাহ যেসব শস্যক্ষেত্র ও জীবজন্তু সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো থেকে তারা এক অংশ আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করে অতঃপর নিজ ধারণা অনুসারে বলে এটা আল্লাহর এবং এটা আমাদের অংশীদারদের। অতঃপর যে অংশ তাদের অংশীদারদের, তা তো আল্লাহর দিকে পৌঁছে না এবং যা আল্লাহর তা তাদের উপাস্যদের দিকে পৌছে যায়। তাদের বিচার কতই না মন্দ।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
আল্লাহ্ যে শস্য ও গবাদিপশু সৃষ্টি করেছেন তার মধ্য হতে তারা আল্লাহ্ র জন্যে এক অংশ নির্দিষ্ট করে ও নিজেদের ধারণা অনুযায়ী বলে, ‘এটা আল্লাহ্ র জন্যে আর এটা আমাদের দেবতাদের জন্যে।’ যা তাদের দেবতাদের অংশ তা আল্লাহ্ র কাছে পৌঁছায় না এবং যা আল্লাহ্ র অংশ তা তাদের দেবতাদের কাছে পৌঁছায়, তারা যা মীমাংসা করে তা নিকৃষ্ট! ইসলামিক ফাউন্ডেশন
আর আল্লাহ যে শস্য ও চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন, সেখান থেকে তারা আল্লাহর জন্য একটি অংশ নির্ধারণ করে। অতঃপর তাদের ধারণা অনুসারে তারা বলে, ‘এটি আল্লাহর জন্য এবং এটি আমাদের শরীকদের জন্য।’ অতঃপর যা তাদের শরীকদের জন্য, তা আল্লাহর নিকট পৌঁছে না, আর যা আল্লাহর জন্য তা তাদের শরীকদের নিকট পৌঁছে যায়। তারা যে ফয়সালা করে, তা কতই না মন্দ !আল-বায়ান
আল্লাহ যে শস্য ও গবাদি পশু সৃষ্টি করেছেন তাত্থেকে তারা আল্লাহর জন্য একটা অংশ নির্দিষ্ট করে আর তারা তাদের ধারণামত বলে এ অংশ আল্লাহর জন্য, আর এ অংশ আমাদের দেবদেবীদের জন্য। যে অংশ তাদের দেবদেবীদের জন্য তা আল্লাহর নিকট পৌঁছে না, কিন্তু যে অংশ আল্লাহর তা তাদের দেবদেবীদের নিকট পৌঁছে। কতই না নিকৃষ্ট এই লোকদের ফায়সালা!তাইসিরুল
আর তারা আল্লাহ্র জন্য নির্দিষ্ট করে শস্যক্ষেত্র ও পশুপালন থেকে যা তিনি উৎপাদন করেছেন তার এক অংশ, এবং বলে -- "এই হচ্ছে আল্লাহ্র জন্য" -- তাদের ধারণানুযায়ী, -- "আর এই হচ্ছে আমাদের অংশীদেবতাদের জন্য।" তারপর যা তাদের অংশীদেবতাদের জন্য তা আল্লাহ্র কাছে পৌঁছে না, আর যা আল্লাহ্র জন্য তা পেছে যাঁয় তাদের অংশীদেবতাদের কাছে। কি নিকৃষ্ট যা তারা সিদ্ধান্ত করে!মাওলানা জহুরুল হক
১০৪
ওপরের ভাষণটি এ বলে শেষ করা হয়েছিল যে, এরা যদি উপদেশ গ্রহণ করতে প্রস্তুত না হয় এবং নিজেদের মূর্খতার ওপর জিদ চালিয়ে যেতেই থাকে, তাহলে তাদেরকে বলে দাওঃ ঠিক আছে, তোমরা তোমাদের পথে চলো এবং আমি আমার পথে চলি, তারপর একদিন কিয়ামত অবশ্যি আসবে, সে সময় এ কর্মনীতির ফল তোমরা অবশ্যি জানতে পারবে, তবে একথা ভালভাবে জেনে রাখো, সেখানে জালেমদের ভাগ্যে কোন সফলতা লেখা নেই। তারপর যে জাহেলিয়াতের ওপর তারা জোর দিয়ে আসছিল এবং যাকে কোনক্রমেই ত্যাগ করতে তারা প্রস্তুত ছিল না, তার কিছুটা ব্যাখ্যা এখন এখানে করা হচ্ছে। তাদের সামনে তাদের সে “জুলুমের স্বরূপ” তুলে ধরা হচ্ছে যার ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে তারা কোন সফলতার মুখ দেখার আশা করতে পারে না।
১০৫
তারা একথা স্বীকার করতো, পৃথিবীর মালিক হচ্ছেন আল্লাহ। তিনিই গাছপালা ও শস্যাদি উৎপন্ন করেন। তাছাড়া যেসব গবাদি পশুকে তারা বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করে তাদের স্রষ্টাও আল্লাহ। কিন্তু এ ব্যাপারে তাদের ধারণা ছিল, তাদের প্রতি আল্লাহ এই যেসব অনুগ্রহ করেছেন এগুলো তাদের প্রতি স্নেহ মমতা ও করুণার ধারা বর্ষণকারী দেব-দেবী, ফেরেশতা, জিন, তারকা ও পূর্ববর্তী সৎব্যক্তিবর্গের পবিত্র আত্মার বদৌলতেই সম্ভব হয়েছে। এজন্য তারা নিজেদের ক্ষেতের ফসল ও গৃহপালিত পশু থেকে দু’টি অংশ উৎসর্গ করতো। একটি অংশ উৎসর্গ করতো আল্লাহর নামে। যেহেতু তিনিই এ ফসল ও পশু তাদেরকে দান করেছেন। তাই তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। আর দ্বিতীয় অংশটি উৎসর্গ করতো নিজেদের গোত্র বা পরিবারের অভিভাবক ও পৃষ্ঠপোষক উপাস্যদের নযরানা হিসেবে। তাদের করুণা ও অনুগ্রহের ধারা অব্যাহত রাখাই ছিল এর উদ্দেশ্য। আল্লাহ সর্বপ্রথম তাদের এ জুলুমের জন্য তাদেরকে পাকড়াও করেছেন। আল্লাহ বলেন, এসব গবাদি পশু আমিই সৃষ্টি করেছি এবং আমিই এগুলো তোমাদের দান করেছি, তাহলে এজন্য অন্যদের কাছে নযরানা পেশ করছো কেন? যিনি তোমাদের প্রতি সরাসরি অনুগ্রহ ও করুণা করেছেন, তোমাদের সে মহান অনুগ্রহকারী সত্তার অনুগ্রহকে অন্যদের হস্তক্ষেপ, সহায়তা ও মধ্যস্থতার ফল গণ্য করা এবং এজন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে সে মহান অনুগ্রহকারীর অধিকারের মধ্যে তাদেরকে শরীক করা কি নিমকহারামী নয়? তারপর ইঙ্গিতে এ বলে তাদের পুনরায় সমালোচনা করেছেন যে, তারা আল্লাহর এই যে অংশ নির্ধারণ করেছে এও তাদের নিজেদের নির্ধারিত, আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত নয়। তারা নিজেরাই নিজেদের বিধায়কে পরিণত হয়েছে। নিজেরাই ইচ্ছা মতো যে অংশটা চাচ্ছে আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করছে আবার যে অংশটা চাচ্ছে অন্যদের জন্য নির্ধারণ করছে। অথচ এ দানের আসল মালিক ও সর্বময় অধিকারী হচ্ছেন আল্লাহ। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য এ দান থেকে কি পরিমাণ তাঁর জন্য উৎসর্গ করতে হবে এবং বাকি অংশের মধ্যে আর কার কার অধিকার আছে তা নির্ধারিত হতে হবে আল্লাহর দেয়া শরীয়াতের মাধ্যমে। কাজেই তারা নিজেরা নিজেদের মনগড়া বাতিল পদ্ধতিতে আল্লাহর জন্য যে অংশ উৎসর্গ করে এবং যে অংশ গরীব ও অভাবীদের মধ্যে দান করে দেয়, তাও কোন সৎকাজ হিসেবে গণ্য হবে না। আল্লাহর দরবারে তার গৃহীত হবার কোন কারণ নেই।
১০৬
তারা আল্লাহর নামে যে অংশ নির্ধারণ করতো নানা ধরনের চালবাজীর আশ্রয় নিয়ে তার মধ্যেও বিভিন্ন প্রকার কমতি করতে থাকতো এবং প্রত্যেকবার নিজেদের মনগড়া শরীকদের অংশ বাড়াবার প্রচেষ্টা চালাতো, তাদের কর্মনীতির প্রতি এখানে সূক্ষ্ম বিদ্রূপ করা হয়েছে। এ থেকে একথা প্রকাশ হতো যে, নিজেদের মনগড়া উপাস্যদের সাথে তাদের যে মানসিক যোগ আছে তা আল্লাহর সাথে নেই। যেমন আল্লাহর নামে যেসব শস্য বা ফল নির্ধারণ করা হতো তার মধ্য থেকে কিছু পড়ে গেলে তা মনগড়া মাবুদদের অংশে শামিল করা হতো আর মনগড়া মাবুদের অংশ থেকে কিছু পড়ে গেলে বা আল্লাহর অংশে পাওয়া গেলে তা আবার মনগড়া মাবুদদের অংশে ফেরত দেয়া হতো। শস্য ক্ষেত্রের যে অংশ মনগড়া মাবুদদের নযরানার জন্য নির্দিষ্ট ছিল সেদিক থেকে যদি আল্লাহর নযরানার জন্য নির্দিষ্ট অংশের দিকে পানির ধারা প্রবাহিত হতো তাহলে তার সমস্ত ফসল মনগড়া মাবুদদের অংশে দিয়ে দেয়া হতো। কিন্তু এর বিপরীত ঘটনা ঘটলে আল্লাহর অংশে কোন বৃদ্ধি করা হতো না। কোন বছর দুর্ভিক্ষের কারণে যদি নযরানার ফসল খেয়ে ফেলার প্রশ্ন দেখা দিতো, তাহলে আল্লাহর ভাগের ফসল খেয়ে ফেলা হতো। কিন্তু মনগড়া শরীকদের ভাগের ফসলে হাত লাগানো হতো না। ভয় করা হতো, এ অংশে হাত দিলে কোন বালা-মুসিবত নাযিল হয়ে যাবে। কোন কারণে শরীকদের অংশ কম হয়ে গেলে আল্লাহর অংশ থেকে কেটে তা পূরণ করে দেয়া হতো। কিন্তু আল্লাহর অংশ কম হয়ে গেলে শরীকদের অংশ থেকে একটি দানাও সেখানে ফেলা হতো না। এ কর্মনীতির সমালোচনা করা হলে নানা ধরনের মুখরোচক ও চিত্তাকর্ষক ব্যাখ্যার অবতারণা করা হতো। যেমন বলা হতো, আল্লাহ তো কারোর মুখাপেক্ষী নন। তাঁর অংশ কিছু কম হয়ে গেলেও তাঁর কোন পরোয়া নেই। আর শরীকরা তো আল্লাহর বান্দা। তারা আল্লাহর মতো অভাবহীন নয়। কাজেই তাদের এখানে সামান্য কমবেশী হলেও তারা আপত্তি জানায়।
এ কাল্পনিক ধারণা ও কুসংস্কারগুলোর মূল কোথায় প্রোথিত ছিল তা বুঝার জন্য এটা জানা প্রয়োজন যে, আরবের মুর্খ ও অজ্ঞ লোকেরা নিজেদের ধন-সম্পদ থেকে আল্লাহর জন্য যে অংশ নির্ধারণ করতো তা গরীব মিসকীন, মুসাফির, এতিম ইত্যাদির সাহায্যের কাজে ব্যয়িত হতো। আর মনগড়া শরীকদেরকে নযরানা দেবার জন্য যে অংশ নির্ধারণ করতো তা হয় সরাসরি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পেটে চলে যেতো অথবা পূজার বেদীমূলে অর্ঘরূপে পেশ করা হতো এবং এভাবে তাও পরোক্ষভাবে পূজারী ও সেবায়েতদের ঝুলিতে গিয়ে পড়তো। এজন্যই শত শত বছর ধরে এ স্বার্থ শিকারী ধর্মীয় নেতারা ক্রমাগতভাবে উপদেশ দানের মাধ্যমে অজ্ঞ জনতার মনে একথা বসিয়ে দিয়েছিল যে, আল্লাহর অংশ কিছু কম হয়ে গেলে ক্ষতি নেই কিন্তু “আল্লাহর প্রিয়পাত্রদের” অংশে কিছু কম হওয়া উচিত নয় বরং সম্ভব হলে সেখানে কিছু বেশী হয়ে থাকাটাই ভালো।
এখান থেকে ১৪৪ নং আয়াত পর্যন্ত আরব মুশরিকদের কতগুলো ভিত্তিহীন রসম-রেওয়াজ বর্ণনা করা হচ্ছে। তারা যৌক্তিক ও জ্ঞানগত কোনও ভিত্তি ছাড়াই বিভিন্ন কাজকে নানা রকম মনগড়া কারণে হালাল বা হারাম সাব্যস্ত করেছিল, যেমন নিষ্ঠুরভাবে সন্তান হত্যা। তাদের কারও কন্যা সন্তান জন্ম নিলে তাকে নিজের জন্য লজ্জার বিষয় মনে করত। তাই তাকে মাটির নিচে জ্যান্ত পুঁতে রাখত। অনেকে কন্যা সন্তান জীবিত কবর দিত এ কারণে যে, তাদের বিশ্বাস ছিল, ফিরিশতাগণ আল্লাহর কন্যা। তাই মানুষের জন্য কন্যা সন্তান রাখা সমীচীন নয়। অনেক সময় পুত্র সন্তানকেও খাদ্যাভাবের ভয়ে হত্যা করত। অনেকে মান্নত করত, আমার দশম সন্তান পুত্র হলে তাকে দেবতা বা আল্লাহর নামে বলি দেব। এছাড়া তারা তাদের শস্য ও গবাদি পশুর ক্ষেত্রেও আজব-আজব বিশ্বাস তৈরি করে নিয়েছিল। তার একটি এ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। তারা তাদের ক্ষেতের ফসল ও গবাদি পশুর দুধ বা গোশতের একটা অংশ আল্লাহর জন্য ধার্য করত (যা মেহমান ও গরীবদের পেছনে খরচ করা হত) এবং একটা অংশ দেব-দেবীর নামে ধার্য করত, যা দেব-মন্দিরে নিবেদন করা হত এবং তা মন্দির কর্তৃপক্ষ ভোগ করত। প্রথমত আল্লাহর সঙ্গে দেব-দেবীদেরকে শরীক করে তাদের জন্য ফসলাদির অংশ নির্ধারণ করাটাই একটা বেহুদা কাজ ছিল। তার উপর অতিরিক্ত নষ্টামি ছিল এই যে, আল্লাহ নামে যে অংশ রাখত, তা থেকে কিছু দেবতাদের অংশে চলে গেলে সেটাকে দূষণীয় মনে করত না। পক্ষান্তরে দেবতাদের অংশ থেকে কোনও জিনিস আল্লাহর নামের অংশে চলে গেলে সঙ্গে-সঙ্গে তা ওয়াপস নিয়ে নিত। এমনিভাবে যদি দুর্ভিক্ষ দেখা দিত বা অন্য কোন কারণে ফসলহানি হত, তখন আল্লাহর ভাগেরটা নিজেরা খেয়ে ফেলত, কিন্তু দেব-দেবীর ভাগে হাত দিত না। তারা বলত, আল্লাহর তো কোন অভাব নেই, কিন্তু আমাদের দেবতাদের অভাব আছে। তারা এমনই অজ্ঞতার জগতে বাস করত যে, চিন্তা করত না সেই দেবতাগণ মাবুদ হলে তাদের অভাব থাকে কি করে এবং অভাব থাকলে তারা মাবূদ হয় কি করে। বস্তুত অন্ধ বিশ্বাসে যাদের মন-মস্তিষ্ক আচ্ছন্ন থাকে, এ রকম সুস্পষ্ট স্ববিরোধিতা ও মোটা দাগের বিভ্রান্তিও তাদের চোখে ধরা পড়ে না।
১৩৬. আল্লাহ যে শস্য ও গবাদি পশু সৃষ্টি করেছেন সে সবের মধ্য থেকে তারা আল্লাহর জন্য এক অংশ নির্দিষ্ট করে এবং নিজেদের ধারণা অনুযায়ী বলে, এটা আল্লাহর জন্য এবং এটা আমাদের শরীকদের(১) জন্য। অতঃপর যা তাদের শরীকদের অংশ তা আল্লাহর কাছে পৌছায় না এবং যা আল্লাহর অংশ তা তাদের শরীকদের কাছে পৌছায়, তারা যা ফয়সালা করে তা কতই না নিকৃষ্ট।(২)
(১) অর্থাৎ মূর্তি, বিগ্রহ ইত্যাদি যাদেরকে তারা আল্লাহর সাথে শরীক নির্ধারণ করেছে তাদের জন্য। (মুয়াসসার)
(২) এ আয়াতে মুশরিকদের একটি বিশেষ পথভ্রষ্টতা ব্যক্ত করা হয়েছে। আরবদের অভ্যাস ছিল যে, শস্যক্ষেত্র, বাগান এবং ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে যা কিছু আমদানী হত, তার এক অংশ আল্লাহর জন্য এবং এক অংশ উপাস্য দেব-দেবীর নামে পৃথক করে রাখত। আল্লাহর নামের অংশ থেকে গরীব-মিসকীনকে দান করা হতো এবং দেব-দেবীর অংশ মন্দিরের পূজারী, সেবায়েত ও রক্ষকদের জন্য ব্যয় করতো। প্রথমতঃ এটাই কম অবিচার ছিল না যে, যাবতীয় বস্তু সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ এবং সমুদয় উৎপন্ন ফসলও তিনিই দান করেছেন, কিন্তু আল্লাহ প্রদত্ত বস্তুসমূহের মধ্যে প্রতিমাদেরকে অংশীদার করা হত। তদুপরি তারা আরো অবিচার করত এই যে, কখনো উৎপাদন কম হলে তারা কমের ভাগটি আল্লাহর অংশ থেকে কেটে নিত, অথচ মুখে বলতঃ আল্লাহ তো সম্পদশালী, অভাবমুক্ত, তিনি আমাদের সম্পদের মুখাপেক্ষী নন।
এরপর প্রতিমাদের অংশ এবং নিজেদের ব্যবহারের অংশ পুরোপুরি নিয়ে নিত। আবার কোন সময় এমনও হত যে, প্রতিমাদের কিংবা নিজেদের অংশ থেকে কোন বস্তু আল্লাহর অংশে পড়ে গেলে তা হিসাব ঠিক করার জন্য সেখান থেকে তুলে নিত। পক্ষান্তরে যদি আল্লাহর অংশ থেকে কোন বস্তু নিজেদের কিংবা প্রতিমাদের অংশে পড়ে যেত, তবে তা সেখানেই থাকতে দিত এবং বলতঃ আল্লাহ অভাবমুক্ত, তার অংশ কম হলেও ক্ষতি নেই। কুরআনুল কারীম তাদের এ পথভ্রষ্টতার উল্লেখ করে বলেছেঃ (سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ) অর্থাৎ তাদের এ বিচার পদ্ধতি অত্যন্ত বিশ্রী ও একপেশে। যে আল্লাহ তাদেরকে এবং তাদের সমুদয় বস্তু-সামগ্রীকে সৃষ্টি করেছেন, প্রথমতঃ তারা তার সাথে অপরকে অংশীদার করেছে। তদুপরি তার অংশও নানা ছলনা ও কৌশলে অন্য দিকে পাচার করে দিয়েছে।
কাফেরদের প্রতি হুশিয়ারীতে মুসলিমদের জন্য শিক্ষাঃ এ হচ্ছে মুশরিকদের একটি পথভ্রষ্টতা ও ভ্রান্তির জন্য হুশিয়ারী। এতে ঐসব মুসলিমের জন্যও শিক্ষার চাবুক রয়েছে, যারা আল্লাহ প্রদত্ত জীবন ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পূর্ণ কার্যক্ষমতাকে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করে। বয়স ও সময়ের এক অংশকে তারা আল্লাহর ইবাদাতের জন্য নির্দিষ্ট করে; অথচ জীবনের সমস্ত সময় ও মুহুর্তকে তারই ইবাদাত ও আনুগত্যের ওয়াকফ করে মানবিক প্রয়োজনাদি মেটানোর জন্য তা থেকে কিছু সময় নিজের জন্য বের করে নেয়াই সঙ্গত ছিল।
সত্য বলতে কি, এরপরও আল্লাহর যথার্থ কৃতজ্ঞতা আদায় হতো না। কিন্তু আমাদের অবস্থা এই যে, দিনরাত্রির চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে যদি কিছু সময় আমরা আল্লাহর ইবাদাতের জন্য সময় পুরোপুরি ঠিক রেখে তার সমস্তটুকু আল্লাহর জন্য নির্ধারিত সময় তথা সালাত, তেলাওয়াত ও ইবাদাতের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের থেকে কেটে নেই। কোন অতিরিক্ত কাজের সম্মুখীন হলে কিংবা অসুখ-বিসুখ হলে সর্বপ্রথম এর প্রভাব ইবাদাতের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের উপর পড়ে। এটা নিঃসন্দেহে অবিচার, অকৃতজ্ঞতা এবং অধিকার হরণ। আল্লাহ আমাদেরকে এবং সব মুসলিমদেরকে এহেন গৰ্হিত কাজ থেকে বাঁচিয়ে রাখুন।
(১৩৬) আল্লাহ যে শস্য ও গবাদি পশু সৃষ্টি করেছেন, তার মধ্য হতে তারা আল্লাহর জন্য এক অংশ নির্দিষ্ট করে এবং নিজেদের ধারণানুযায়ী বলে, ‘এ আল্লাহর জন্য এবং এ আমাদের দেবতাদের জন্য।’(1) যা তাদের দেবতাদের অংশ তা আল্লাহর কাছে পৌঁছে না(2) এবং যা আল্লাহর অংশ তা তাদের দেবতাদের কাছে পৌঁছে।(3) তারা যা মীমাংসা করে তা কত নিকৃষ্ট!
(1) এই আয়াতে মুশরিকদের সেই আকীদা ও আমলের একটি নমুনা পেশ করা হয়েছে, যা তারা নিজেরাই গড়ে রেখেছিল। তারা জমির ফসল এবং পশুসম্পদের কিছু অংশ আল্লাহর জন্য এবং কিছু অংশ তাদের মনগড়া উপাস্যদের জন্য নির্দিষ্ট করে নিত। আল্লাহর অংশকে অতিথি ও ফকীর-মিসকীনদের উপর এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার কাজে ব্যয় করত। আর মূর্তিদের অংশকে তাদের পুরোহিত-পান্ডাদের উপর এবং তাদের প্রয়োজনাদি পূরণে ব্যয় করত। আর যদি মূর্তিদের জন্য নির্দিষ্ট অংশের ফসল আশা অনুরূপ না ফলত, তাহলে আল্লাহর অংশ থেকে বের করে তাতে শামিল করে নিত। কিন্তু এর বিপরীত হলে (অর্থাৎ, আল্লাহর অংশের ফসল আশা অনুরূপ না হলে), মূর্তিদের অংশ থেকে কিছু বের না করে বলত যে, আল্লাহ তো অভাবমুক্ত।
(2) অর্থাৎ, আল্লাহর অংশে ঘাটতি হলে দেবতাদের নির্দিষ্ট অংশ থেকে দান-খয়রাত করে না।
(3) পক্ষান্তরে মূর্তিদের জন্য নির্দিষ্ট অংশে ঘাটতি হলে আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট অংশ থেকে নিয়ে তাদের স্বার্থে ও প্রয়োজনাদিতে ব্যয় করত। অর্থাৎ, আল্লাহর তুলনায় মূর্তিদের মাহাত্ম্য এবং তাদের ভয় ওদের হৃদয়ে বেশী ছিল। বর্তমানের মুশরিকদের আচরণ থেকেও এটা প্রত্যক্ষ করা যেতে পারে।