۞جَعَلَ ٱللَّهُ ٱلۡكَعۡبَةَ ٱلۡبَيۡتَ ٱلۡحَرَامَ قِيَٰمٗا لِّلنَّاسِ وَٱلشَّهۡرَ ٱلۡحَرَامَ وَٱلۡهَدۡيَ وَٱلۡقَلَـٰٓئِدَۚ ذَٰلِكَ لِتَعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ يَعۡلَمُ مَا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِي ٱلۡأَرۡضِ وَأَنَّ ٱللَّهَ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمٌ

জা‘আলাল্লা-হুল কা‘বাতাল বাইতাল হার-মা কিয়া-মাল লিন্না-ছি ওয়াশশাহরল হার-মা ওয়াল হাদইয়া ওয়াল কালাইদা যা-লিকা লিতা‘লামূআন্নাল্লা-হা ইয়া‘লামুমাফিছছামা-ওয়া-তি ওয়ামা-ফিল আরদিওয়াআন্নাল্লা-হা বিকুল্লি শাইয়িন ‘আলীম।উচ্চারণ

আল্লাহ পবিত্র কাবা ঘরকে মানুষের জন্য (সমাজ জীবন) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পরিণত করেছেন আর হারাম মাস, কুরবানীর পশু ও গলায় মালা পরা পশুগুলোকেও (এ কাজে সহায়ক বানিয়ে দিয়েছেন) ১১৩ যাতে তোমরা জানতে পারো যে, আল্লাহ‌ আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত জানেন এবং তিনি সব জিনিসের জ্ঞান রাখেন। ১১৪ তাফহীমুল কুরআন

আল্লাহ কাবাকে যা অতি মর্যাদাপূর্ণ ঘর, মানুষের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার মাধ্যম বানিয়েছেন। তাছাড়া মর্যাদাপূর্ণ মাসসমূহ, নজরানার পশু এবং (তাদের গলার) মালাসমূহকেও (নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার মাধ্যম বানিয়েছেন), তা এজন্য #%৭৪%# যাতে তোমরা জানতে পার আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীতে যা-কিছু আছে আল্লাহ তা জানেন এবং আল্লাহ সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত।মুফতী তাকী উসমানী

সম্মানিত গৃহ কা‘বাকে আল্লাহ মানুষের স্থিতিশীলতার কারণ রূপে তৈরী করেছেন এবং সম্মানিত মাসসমূহকে, হারামে কুরবানীর জন্তুকে এবং সেই পশুকেও যার গলায় বিশেষ ধরণের বেড়ী পড়ানো হয়েছে। এটা এ জন্য যেন তোমরা দৃঢ় বিশ্বাস রাখ যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ আকাশসমূহ ও যমীনস্থিত সব বস্তুরই খবর রাখেন, আর নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ব বিষয়ে মহাজ্ঞানী।মুজিবুর রহমান

আল্লাহ সম্মানিত গৃহ কাবাকে মানুষের স্থীতিশীলতার কারণ করেছেন এবং সম্মানিত মাসসমূকে, হারাম কোরবানীর জন্তুকে ও যাদের গলায় আবরণ রয়েছে। এর কারণ এই যে, যাতে তোমরা জেনে নাও যে, আল্লাহ নভোমন্ডল ও ভুমন্ডলের সব কিছু জানেন এবং আল্লাহ সর্ব বিষয়ে মহাজ্ঞানী।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

পবিত্র কা‘বাগৃহ, পবিত্র মাস, কুরবানীর জন্যে কা‘বায় প্রেরিত পশু ও গলায় মালা পরিহিত পশুকে আল্লাহ্ মানুষের কল্যাণের জন্যে নির্ধারণ করেছেন। এটা একারণে যে, তোমরা যেন জানতে পার-যা কিছু আসমান ও যমীনে আছে আল্লাহ্ তা জানেন এবং আল্লাহ্ তো সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আল্লাহ সম্মানিত গৃহ কা‘বাকে, সম্মানিত মাসকে*, হাদয়ি** ও কালায়িদ*** কেও মানুষের কল্যাণের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। এটা এ জন্য যে, তোমরা যেন জানতে পার, আল্লাহ আসমানসমূহে যা আছে এবং যমীনে যা আছে তা জানেন। আর আল্লাহ সব কিছু সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।আল-বায়ান

পবিত্র ক্বা‘বাগৃহকে আল্লাহ তোমাদের জন্য (জীবনে) প্রতিষ্ঠার উপকরণ করে দিয়েছেন, আর হারাম মাস, কুরবানীর উদ্দেশে ক্বা‘বায় প্রেরিত পশু এবং তাকে চিহ্নিত করার গলার মালাকেও। এটা এজন্য যাতে তোমরা জানতে পার যে, যা কিছু আসমানসমূহে আছে আর যা কিছু যমীনে আছে, আল্লাহ তা জানেন, আর আল্লাহ সকল বিষয়ে সবচেয়ে বেশি অবহিত।তাইসিরুল

আল্লাহ্ পবিত্র গৃহ কা'বাকে বানিয়েছেন মানুষের জন্য এক অবলন্বন, আর পবিত্র মাস, আর উৎসর্গকৃত পশুদের, আর মালা- পরানো উটদের। এ-সব এই জন্য যে তোমরা যেন জানতে পারো -- আল্লাহ্ জানেন যা-কিছু আছে মহাকাশমন্ডলে ও যা-কিছু আছে পৃথিবীতে, আর আল্লাহ্ সব-কিছু সন্বন্ধে সর্বজ্ঞাতা।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

১১৩

আরবে কাবা ঘরের মর্যাদা কেবলমাত্র একটি ইবাদতগৃহ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত ছিল না বরং নিজের কেন্দ্রীয় অবস্থান ও পবিত্রতম ভাবমূর্তির কারণে এরই ওপর সারাদেশের অর্থনৈতিক ও তামাদ্দুনিক জীবনধারায় নির্ভরশীল ছিল। হজ্জ ও উমরাহর জন্য সারাদেশ কাবা ঘরের দিকে ধাবিত হতো। হজ্জ উপলক্ষ্যে এ সম্মিলনের কারণে বিশৃংখল ও বিক্ষিপ্ত আরবদের মধ্যে একটি ঐক্য সূত্র সৃষ্টি হতো। বিভিন্ন অঞ্চল ও গোত্রের লোকেরা নিজেদের মধ্যে তামাদ্দুনিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করতো। কাব্য সম্মেলন ও কবিতা প্রতিযোগিতার ফলে তাদের ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি সাধিত হতো। বাণিজ্যিক লেনদেনের ফলে সারাদেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূর্ণ হতো। হারাম মাসগুলোর কারণে আরবরা বছরের এক-তৃতীয়াংশ সময় লাভ করতো শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য। এ সময় তাদের কাফেলা দেশের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত অবাধে চলাফেরা করতো। কুরবানীর পশু ও বিচিত্র বর্ণের ঝলমলে মালা জড়ানো পশু দলের উপস্থিতিও তাদের এ চলাফেরায় বিরাট সাহায্য যোগাতো। কারণ মানত ও নযরানার আলামত হিসেবে যেসব পশুর গলায় ঝলমলে মালা শোভা পেতো তাদের দেখে ভক্তিতে আরবদের মাথা নত হয়ে আসতো। এ সময় কোন লুটেরা আরব গোত্র তাদের ওপর আক্রমণ চালাবার দুঃসাহস করতো না।

১১৪

অর্থাৎ এ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে চিন্তা করলে তোমরা নিজেরাই তোমাদের দেশের অর্থনৈতিক ও তামাদ্দুনিক জীবনে এর একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়ে যাবে যে, আল্লাহ তাঁর নিজের সৃষ্টির কল্যাণ ও প্রয়োজন সম্পর্কে কত গভীর জ্ঞানের অধিকারী এবং নিজের এক একটি বিধানের সাহায্যে তিনি মানব জীবনের বিভিন্ন বিভাগকে কত ব্যাপকভাবে উপকৃত করছেন। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের পূর্বে অশান্তি ও অরাজকতার মধ্য দিয়ে যে শত শত বছর অতিবাহিত হয়েছে, সে সময় তোমরা নিজেরাই নিজেদের স্বার্থ ও প্রয়োজন সম্পর্কে অবগত ছিলে না। তখন তোমরা নিজেদের ধ্বংস সাধনের নেশায় উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলে। কিন্তু আল্লাহ তোমাদের প্রয়োজন জানতেন। তিনি শুধুমাত্র কাবাঘরকে তোমাদের কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে তোমাদের জন্য এমন ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন যার ফলে তোমাদের জাতীয় জীবন সুরক্ষিত হয়ে গিয়েছিল। অন্যান্য অসংখ্য বিষয় বাদ দিয়ে যদি শুধুমাত্র এ একটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করো তাহলে তোমাদের নিশ্চিত বিশ্বাস জন্মাবে যে, আল্লাহ তোমাদের যে বিধান দিয়েছেন তার আনুগত্য করার মধ্যেই তোমাদের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এর মধ্যে তোমাদের জন্য এমন সব কল্যাণ রয়েছে যেগুলো উপলব্ধি করার ক্ষমতা তোমাদের নেই এবং নিজেদের হাজারো চেষ্টা সাধনা দ্বারাও সেগুলোকে বাস্তবে রূপায়িত করা তোমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

কাবা শরীফ ও মর্যাদাপূর্ণ মাসসমূহ যে শান্তি ও নিরাপত্তার ‘কারণ’, সেটা স্পষ্ট। যেহেতু এর ভেতর যুদ্ধ করা হারাম। যে পশু নজরানা হিসেবে হারামে নিয়ে যাওয়া হত, তার গলায় মালা পরিয়ে দেওয়া হত, যাতে দর্শক বুঝতে পারে এ পশু হারামে যাচ্ছে। ফলে কাফির, মুশরিক এমনকি দস্যুরাও তার পেছনে লাগত না। কাবা শরীফ যে নিরাপত্তার কারণ, মুফাসসিরগণ তার আরেকটি ব্যাখ্যা করেছেন এই যে, যত দিন কাবা শরীফ বিদ্যমান থাকবে, ততদিন কিয়ামত হবে না। এক সময় কাবা শরীফকে তুলে নেওয়া হবে এবং তারপরই কিয়ামত সংঘটিত হবে।

তাফসীরে জাকারিয়া

৯৭. পবিত্র কা'বা ঘর, পবিত্র মাস, হাদঈ ও গলায় মালা পরানো পশুকে(১) আল্লাহ মানুষের কল্যাণের(২) জন্য নির্ধারিত করেছেন। এটা এ জন্য যে, তোমরা যেন জানতে পার, নিশ্চয় যা কিছু আসমানসমূহে ও যমীনে আছে আল্লাহ তা জানেন এবং নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।

(১) এ আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা চারটি বস্তুকে মানুষের প্রতিষ্ঠা, স্থায়িত্ব ও শান্তির কারণ বলে উল্লেখ করছেন। প্রথমতঃ কা'বা। আরবী ভাষায় কা'বা চতুষ্কোণবিশিষ্ট গৃহকে বলা হয়। জাহেলিয়াত যুগেও আল্লাহ্ তা'আলা আরবদের মনে হারাম শরীফের সম্মান প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ফলে শান্তি ও নিরাপত্তা অব্যাহত ছিল। দ্বিতীয় বস্তুটি হচ্ছে, সম্মানিত মাস। সম্মানিত মাস বলে এখানে কারও কারও মতে, জিলহজ্জ মাস বোঝানো হয়েছে। অপর কারও কারও মতে, এর দ্বারা হারাম মাসসমূহ বোঝানো হয়েছে। আর তা হচ্ছে, রজব, জিলকদ, জিলহজ ও মুহাররাম।

তৃতীয় বস্তু হচ্ছে, ‘হাদঈ’। হারাম শরীফে যে জন্তুকে তামাত্তু ও কেরান হজের কারণে যবাই করতে হয়, তাকে হাদঈ বলা হয়। যে ব্যক্তির সাথে এরূপ জন্তু থাকত, সে নির্বিবাদে পথ চলতে পারত; তাকে কেউ কিছু বলত না। এভাবে কুরবানীর জন্তুও ছিল শান্তি ও নিরাপত্তার অন্যতম উপায়। চতুর্থ বস্তুটি হচ্ছে, قلائد এ শব্দটি قلادة শব্দের বহুবচন। এর অর্থ, গলার হার। আরবে প্রথা প্রচলিত ছিল যে, কেউ হজের উদ্দেশ্যে বের হলে চিহ্নস্বরূপ তার হাদঈর গলায় একটি হার পরিয়ে দিত। ফলে কেউ তাকে কোন কষ্ট দিত না। এ কারণে قلادة শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপায় হয়ে যায়। (ফাতহুল কাদীর)

(২) قيام ও قوام এর অর্থ ঐসব বস্তু, যার উপর কোন বস্তুর স্থায়িত্ব নির্ভরশীল। তাই (قِيَامًا لِلنَّاسِ) এর অর্থ হবে এই যে, কাবা ও তৎসম্পর্কিত বস্তুসমূহ মানুষের প্রতিষ্ঠা ও স্থায়িত্বের কারণ এবং উপায়। এর উপরই তাদের জীবিকা ও দ্বীন নির্ভরশীল। এর মাধ্যমেই তাদের দ্বীন ও দুনিয়ার কর্মকাণ্ড সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের মধ্যে যারা ভীত তারা সেখানে নিরাপত্তা পায়। যারা ব্যবসায়ী তারা ব্যবসায় লাভবান হয়। যারা ইবাদাত করতে চায়, তারা নির্বিঘ্ন ইবাদাত করতে পারে (ফাতহুল কাদীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(৯৭) আল্লাহ পবিত্র গৃহ কা’বাকে, পবিত্র মাসকে, কুরবানীর জন্য কা’বায় প্রেরিত পশু ও গলায় মাল্যপরিহিত পশুকে মানুষের স্থিতিশীলতার কারণ নির্ধারিত করেছেন।(1) এটি এ জন্য যে, তোমরা যেন জানতে পার, যা কিছু আকাশে ও ভূমন্ডলে আছে, তা নিশ্চয়ই আল্লাহ জানেন এবং আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।

(1) কাবাগৃহকে শরীফ, সম্মানিত বা পবিত্র গৃহ এই জন্যই বলা হয় যে, তার সীমানায় শিকার করা, গাছ কাটা ইত্যাদি নিষিদ্ধ। অনুরূপভাবে যদি সেখানে বাপের হত্যাকারীও সামনে পড়ে যায়, তবুও তার কিছু করা যাবে না। আর কা’বাকে মানুষের স্থিতিশীলতার কারণ নির্ধারিত করা হয়েছে; যার উদ্দেশ্য হল; এর দ্বারা মক্কাবাসীর নিয়ম-শৃংখলা ও সমাজ-ব্যবস্থা ভালো থাকে এবং তাদের অর্থনৈতিক ও জৈবিক চাহিদা পূরণের উপায়ও লাভ হয়। অনুরূপ পবিত্র (রজব, যুলক্বাদাহ, যুলহিজ্জাহ ও মুহাররম) মাস এবং হারামে নিয়ে যাওয়া হাদী (গলায় কিছু বেঁধে চিহ্নিত কুরবানীর) পশুও মানুষের স্থিতিশীলতার কারণ। কেননা, উল্লিখিত সমস্ত জিনিস দ্বারাও মক্কাবাসীরা উক্ত উপকারিতা উপভোগ করে থাকে।