مِنَ ٱلۡجِنَّةِ وَٱلنَّاسِ

মিনাল জিন্নাতি ওয়ান্না-ছ।উচ্চারণ

সে জিনের মধ্য থেকে হোক বা মানুষের মধ্য থেকে। তাফহীমুল কুরআন

সে জিনদের মধ্য হতে হোক বা মানুষের মধ্য হতে। মুফতী তাকী উসমানী

জিনের মধ্য হতে অথবা মানুষের মধ্য হতে।মুজিবুর রহমান

জ্বিনের মধ্য থেকে অথবা মানুষের মধ্য থেকে।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

‘জিনের মধ্য হতে এবং মানুষের মধ্য হতে।’ইসলামিক ফাউন্ডেশন

জিন ও মানুষ থেকে।আল-বায়ান

(এই কুমন্ত্রণাদাতা হচ্ছে) জিন্নের মধ্য হতে এবং মানুষের মধ্য হতে।তাইসিরুল

জিনের অথবা মানুষের মধ্যে থেকে।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

কোন কোন বিশেষজ্ঞদের মতে এ শব্দগুলোর অর্থ হচ্ছে, প্ররোচনা দানকারীরাও দুই ধরনের লোকদের মনে প্ররোচনা দান করে। এক, জিন ও দুই, মানুষ। এ বক্তব্যটি মেনে নিলে এখানে ناس নাস জিন ও মানুষ উভয়কে বুঝাবে এবং তাঁরা বলেন, এমনটি হতে পারে। কারণ, কুরআনে যখন رِجَالٌ (পুরুষরা) শব্দটি জিনদের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন সূরা জিনের ৬ নং আয়াতে দেখা যায় এবং যখন نَفَرٌ (দল) শব্দটির ব্যবহার জিনদের দলের ব্যাপারে হতে পারে, যেমন সূরা আহকাফের ২৯ আয়াতে দেখা যায়, তখন পরোক্ষভাবে ‘নাস’ শব্দের মধ্যে মানুষ ও জিন উভয়ই শামিল হতে পারে। কিন্তু এ মতটি সঠিক নয়। কারণ ناس – انس and اِنْسَانُ শব্দগুলো আভিধানিক দিকে দিয়েই جن (জিন) শব্দের বিপরীতধর্মী। জিন-এর আসল মানে হচ্ছে গোপন সৃষ্টি। আর জিন মানুষের দৃষ্টি থেকে গোপন থাকে বলেই তাকে জিন বলা হয়। বিপরীতপক্ষে ‘নাস’ ও ‘ইনস’ শব্দগুলো মানুষ অর্থে এজন্য বলা হয় যে তারা প্রকাশিত, তাদের চোখে দেখা যায় এবং ত্বক অনুভব করা যায়। সূরা কাসাসের ২৯ আয়াতে آنَسَ مِنْ جَانِبِ الطُّورِ نَارًا বলা হয়েছে। এখানে اَنَسَ (আ-নাসা) মানে رَاى (রাআ) অর্থাৎ হযরত মূসা (আঃ) “তুর পাহাড়ের কিনারে আগুন দেখেন।” সূরা আন নিসার ৬ নং আয়াতে বলা হয়েছেঃ فَإِنْ آنَسْتُمْ مِنْهُمْ رُشْدًا “যদি তোমরা অনুভব করো, এতিম শিশুদের এখন বুঝসুঝ হয়েছে।

اَنَسْتُمْ (আ-নাসতুম) মানে اَحْسَسْتُمْ (আহসাসতুম) বা رَايْتُمْ (রাআইতুম)। কাজেই আরবী ভাষার প্রচলিত রীতি অনুযায়ী ‘নাস’ শব্দটির মানে জিন হতে পারে না।

তাই এখানে আয়াতটির সঠিক মানে হচ্ছে, “এমন প্ররোচনা দানকারীর অনিষ্ট থেকে যে মানুষের মনে প্ররোচনা দান করে সে জিনদের মধ্য থেকে হোক বা মানুষদের মধ্য থেকে।” অর্থাৎ অন্য কথায় বলা যায়, প্ররোচনা দান করার কাজ জিন শয়তানরাও করে আবার মানুষ শয়তানরাও করে। কাজেই এ সূরায় উভয়ের অনিষ্ট থেকে পানাহ চাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কুরআন থেকে এ অর্থের সমর্থন পাওয়া যায় এবং হাদীস থেকেও। কুরআনে বলা হয়েছেঃ

وَكَذَلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِيٍّ عَدُوًّا شَيَاطِينَ الْإِنْسِ وَالْجِنِّ يُوحِي بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُورًا

“আর এভাবে আমি জিন শয়তান ও মানুষ শয়তানদেরকে প্রত্যেক নবীর শত্রু বানিয়ে দিয়েছি, তারা পরস্পরের কাছে মনোমুগ্ধকর কথা ধোঁকা ও প্রতারণার ছলে বলতে থাকে।” (আল আন’আম, ১১২)

আর হাদীসে ইমাম আহমাদ, নাসাঈ ও ইবনে হিব্বান, হযরত আবু যার গিফারী (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে হাযির হলাম। তখন তিনি মসজিদে বসেছিলেন। তিনি বললেন, আবু যার! তুমি নামায পড়েছো? আমি জবাব দিলাম, না। বললেন, ওঠো এবং নামায পড়ো! কাজেই আমি নামায পড়লাম এবং তারপর আবার এসে বসলাম। তিনি বললেনঃ

يَا أبَا ذَرٍّ نَعَوَّذْ بِاللَّهِ مِنْ شَرِّ شَيَاطِينِ الإِنْسِ وَالْجِنِّ-

“হে আবু যার! মানুষ শয়তান ও জিন শয়তানের অনিষ্ট থেকে আল্লাহ‌র পানাহ চাও!” আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! মানুষের মধ্যেও কি আবার শয়তান হয়? বললেন, হ্যাঁ।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

সূরা আনআমে (৬ : ১১২) বলা হয়েছে, শয়তান যেমন জিন্নদের মধ্যে হয়, তেমনি মানুষের মধ্যেও হয়। তবে জিন্ন শয়তানদেরকে চোখে দেখা যায় না। তারা অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। আর মানুষ শয়তানদেরকে চোখে দেখা যায়। তারা এমন সব কথাবার্তা বলে, যা শুনলে অন্তরে নানা রকমের কুচিন্তা জাগ্রত হয়। তাই এ আয়াতে উভয় রকম কুমন্ত্রণাদাতা থেকে আল্লাহ তাআলার আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। এ সূরায় যদিও শয়তানের কুমন্ত্রণা দেওয়ার শক্তির কথা জানানো হয়েছে, কিন্তু সেই সঙ্গে আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনার নির্দেশ দিয়ে এটাও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার কাছে পানাহ চাইলে এবং তাঁর যিকির করলে শয়তান দূরে সরে যায়। সূরা নিসায়(৪ : ৭৬) বলা হয়েছে, তার কৌশল দুর্বল এবং তার এ শক্তি নেই যে, মানুষকে গুনাহ করতে বাধ্য করবে। সূরা ইবরাহীমে (১৪ : ২২) খোদ শয়তানের স্বীকারোক্তি বর্ণনা করা হয়েছে যে, ‘মানুষের উপর আমার কোন আধিপত্য নেই’। বস্তুত শয়তান যে মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করে এটা মানুষের জন্য এক পরীক্ষা। যে ব্যক্তি তার ধোঁকায় পড়তে অস্বীকার করে এবং এজন্য আল্লাহ তাআলার কাছে পানাহ চায়, শয়তান তার কোন ক্ষতি করতে পারে না। কুরআন মাজীদের সূচনা হয়েছিল সূরা ফাতিহা দ্বারা। তাতে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা ও গুণাবলী উল্লেখ করার পর তাঁরই কাছে সরল পথের হেদায়াত দান করার জন্য দোয়া করা হয়েছিল। এবার সমাপ্তি টানা হয়েছে সূরা ‘নাস’ দ্বারা। এতে শয়তানের অনিষ্ট থেকে পানাহ চাওয়া হয়েছে। এভাবে সরল পথে চলার ক্ষেত্রে শয়তানের পক্ষ হতে যে বাধার সৃষ্টি হতে পারত, তা অপসারণের পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে নফস ও শয়তান উভয়ের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন আমীন। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা নিজ ফযল ও করমে আজ ১৭ই রমযানুল মুবারক ১৪২৯ হিজরী মোতাবেক ১৮ই সেপ্টেম্বর ২০০৮ খ্রি. তারিখে কুরআন মাজীদের এ খেদমতকে সমাপ্তিতে পৌঁছিয়েছেন (অনুবাদের কাজ শেষ করিয়েছেন আজ ২৯ শে মহররম ১৪৩২ হিজরী মোতাবেক ৫ই জানুয়ারি ২০১১ খ্রি.)। হে আল্লাহ! কোনও মুখ ও কোনও কলম আপনার শোকর আদায়ের ক্ষমতা রাখে না। কত মহান আপনি! এক মূল্যহীন বিন্দুকে আপনার মহা মর্যাদাবান কালামের খেদমত করার সৌভাগ্য দিয়েছেন! হে আল্লাহ! আপনি যখন এ তাওফীক দিয়েছেন তখন মেহেরবাণী করে একে কবুলও করে নিন। এর উছিলায় এই অকর্মণ্য তরজমাকারীর জন্য কবর থেকে হাশর পর্যন্ত প্রতিটি ধাপকে সহজ করে দিন এবং এ খেদমতকে আখেরাতের পুঁজি বানিয়ে দিন। পাঠকের অন্তরে এর মাধ্যমে কুরআন মাজীদকে বোঝার, এর উপর আমল করার এবং এর মহিমান্বিত বার্তা ও আবেদনকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার প্রেরণা সৃষ্টি করে দিন। (হে আল্লাহ! এই একই দোয়া অধম গুনাহগার -অনুবাদকও আপনার দরবারে করছে। মেহেরবাণী করে কবুল করে নিন) আমীন।

তাফসীরে জাকারিয়া

৬. জিনের মধ্য থেকে এবং মানুষের মধ্য থেকে।(১)

(১) এখানে দুটি অর্থ হতে পারে। প্রথমটি হল, শয়তান জিন ও মানুষ-উভয় প্রকার মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়। এ অর্থে এখানে ناس বলে জিন ও মানুষ সকলকে বুঝানো হয়েছে। দ্বিতীয় মতটি হল: কুমন্ত্রণাদাতা শয়তান জিনদের মধ্য থেকেও হয়, মানুষের মধ্য থেকেও হয়। এ মতটিই শক্তিশালী। (ইবন কাসীর) অতএব সারমর্ম এই দাঁড়াল যে, আল্লাহ্ তা'আলা রাসূলকে তাঁর আশ্রয় প্রার্থনার শিক্ষা দিয়েছেন জিন-শয়তানের অনিষ্ট থেকে এবং মানুষ-শয়তানের অনিষ্ট থেকে। জিন-শয়তানের কুমন্ত্রণা হল অলক্ষ্যে থেকে মানুষের অন্তরে কোন কথা রাখা। শয়তান যেমন মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দেয়, তেমনিভাবে মানুষের নফসও মানুষকে কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপন নফসের অনিষ্ট থেকেও আশ্রয় প্রার্থনা শিক্ষা দিয়েছেন। হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “হে আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় চাই, আমার নফসের অনিষ্ট থেকে, শয়তানের অনিষ্ট থেকেও এবং তার শির্ক (বা জাল) থেকেও।” (আবু দাউদ: ৫০৬৭, তিরমিযী: ৩৩৯২, মুসনাদে আহমাদ: ১/৯)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

৬। জ্বিন ও মানুষের মধ্য হতে। (1)

(1) অর্থাৎ, এই কুমন্ত্রণাদাতা হল দুই শ্রেণীর। (১) শয়তান জ্বিনঃ শয়তান জ্বিনদেরকে মহান আল্লাহ মানুষকে ভ্রষ্ট করার ক্ষমতা দিয়ে রেখেছেন। এ ছাড়া প্রত্যেক মানুষের সাথে একজন শয়তান সাথী হিসাবে সদা বিদ্যমান থাকে; সেও তাকে ভ্রষ্ট করার প্রচেষ্টায় থাকে। হাদীসের মধ্যে বর্ণিত হয়েছে যে, যখন নবী (সাঃ) ঐ কথা লোকদেরকে বললেন, তখন সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনার সাথেও কি শয়তান বিদ্যমান থাকে। তিনি উত্তরে বললেন, ‘‘হ্যাঁ, আমার সাথেও থাকে। তবে আল্লাহ তাআলা তার বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য দান করেছেন; যার ফলে সে আমার অনুগত হয়ে গেছে। সে আমাকে মঙ্গল ব্যতীত কিছু আদেশ করে না।’’ (সহীহ মুসলিম, কিয়ামতের বিবরণ অধ্যায়)

অনুরূপ অন্য হাদীসে এসেছে যে, একদা নবী (সাঃ) যখন ই’তিকাফ অবস্থায় ছিলেন তখন তাঁর পবিত্রা সহধর্মিণী স্বাফিয়্যাহ (রাঃ)  তাঁর সাক্ষাতে (মসজিদে) এলেন। সময়টা রাত্রিবেলা ছিল। সাক্ষাতের পর তিনি তাঁকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাঁর সঙ্গে বের হলেন। রাস্তায় দুই আনসারী সাহাবী পার হচ্ছিলেন। তিনি তাঁদেরকে ডেকে বললেন, ‘‘এটি আমার স্ত্রী স্বাফিয়্যাহ বিন্তে হুয়াই।’’ তাঁরা আরজ করলেন যে, ‘আপনার সম্পর্কে কি আমাদের কোন কুধারণা হতে পারে হে আল্লাহর রসূল?!’ তিনি বললেন, ‘‘তা তো ঠিক কথা। কিন্তু শয়তান যে মানুষের রক্ত-ধমনীতে রক্তের মতই প্রবাহিত হয়। আমার আশঙ্কা হল যে, হয়তো বা সে তোমাদের মনে কোন সন্দেহ প্রক্ষিপ্ত করে দিতে পারে।’’ (সহীহ বুখারী, আহকাম অধ্যায়)

(২) মানুষ শয়তানঃ মানুষের মধ্যে কিছু শয়তান আছে যারা উপদেষ্টা, হিতাকাঙ্ক্ষী ও দয়াবানরূপে এসে অপরকে ভ্রষ্ট হতে উদ্বুদ্ধ করে।

কোন কোন উলামা বলেন, শয়তান যাদেরকে ভ্রষ্ট করে, তারা হল দুই শ্রেণীর। অর্থাৎ, শয়তান মানুষকে যেমন ভ্রষ্ট করে তেমনি জ্বিনকেও ভ্রষ্ট করে থাকে। তবে এখানে মানুষের অন্তরের উল্লেখ তার ভ্রষ্টতার তুলনামূলক আধিক্যের কারণে করা হয়েছে। নচেৎ জ্বিন সম্প্রদায়ও শয়তানের কুমন্ত্রণায় ভ্রষ্টতার শিকার হয়। কিছু সংখ্যক উলামা বলেন, কুরআনে জ্বিনদের জন্যও ‘রিজাল’ (পুরুষ মানুষ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। (সূরা জিন ৬ নং আয়াত) সুতরাং তারাও মানুষ শব্দে শামিল।