أَلَمۡ تَرَ كَيۡفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِأَصۡحَٰبِ ٱلۡفِيلِ

আলাম তার কাইফা ফা‘আলা রব্বুকা বিআসহা-বিল ফীল।উচ্চারণ

তুমি কি দেখনি তোমার রব হাতিওয়ালাদের সাথে কি করেছেন? তাফহীমুল কুরআন

তুমি কি দেখনি তোমার প্রতিপালক হাতিওয়ালাদের সাথে কী ব্যবহার করেছেন? মুফতী তাকী উসমানী

তুমি কি দেখনি যে, তোমার রাব্ব হস্তি অধিপতিদের কিরূপ (পরিণতি) করেছিলেন?মুজিবুর রহমান

আপনি কি দেখেননি আপনার পালনকর্তা হস্তীবাহিনীর সাথে কিরূপ ব্যবহার করেছেন?মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তুমি কি দেখ নাই, তোমার প্রতিপালক হস্তী-অধিপতিদের প্রতি কী করেছিলেন ? ইসলামিক ফাউন্ডেশন

তুমি কি দেখনি তোমার রব হাতীওয়ালাদের সাথে কী করেছিলেন?আল-বায়ান

তুমি কি দেখনি (কা‘বা ঘর ধ্বংসের জন্য আগত) হাতীওয়ালাদের সঙ্গে তোমার প্রতিপালক কীরূপ ব্যবহার করেছিলেন?তাইসিরুল

তুমি কি দেখো নি তোমার প্রভু কেমন করেছিলেন হস্তি-বাহিনীর প্রতি?মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

বাহ্যত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু মূলত এখানে শুধু কুরাইশদেরকেই নয় বরং সমগ্র আরববাসীকেই সম্বোধন করা হয়েছে। তারা এই সমগ্র ঘটনা সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত ছিল। কুরআন মজীদের বহু স্থানে ‘আলাম তারা’ (তুমি কি দেখনি?) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নয় বরং সাধারণ লোকদেরকে সম্বোধন করাই উদ্দেশ্য। উদাহরণ স্বরূপ নিম্নোক্ত আয়াতগুলো দেখুনঃ ইবরাহীম ১৯ আয়াত, আল হাজ্জ ১৮ ও ৬৫ আয়াত, আন নূর ৪৩ আয়াত, লোকমান ২৯ ও ৩১ আয়াত, ফাতের ২৭ আয়াত এবং আয্ যুমার ২১ আয়াত) তাছাড়া দেখা শব্দটি এক্ষেত্রে ব্যবহার করার কারণ হচ্ছে এই যে, মক্কায় ও তার আশেপাশে এবং আরবের বিস্তৃত এলাকায় এ আসহাবে ফীলের ঘটনাটি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছে এ ধরনের বহু লোক সে সময় জীবিত ছিল। কারণ তখনো এই ঘটনার পর চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ বছরের বেশী সময় অতিবাহিত হয়ে যায়নি। লোক মুখে প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ সরাসরি এত বেশী বেশী সূত্রে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল যার ফলে এটা প্রায় সব লোকেরই চোখে দেখা ঘটনার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল।

এই হাতিওয়ালা কারা ছিল, কোথায় থেকে এসেছিল, কি উদ্দেশ্যে এসেছিল এসব কথা আল্লাহ‌ এখানে বলছেন না। কারণ এগুলো সবাই জানতো।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

ইশারা আবরাহার সেনাবাহিনীর প্রতি, যারা কাবা শরীফের উপর হামলা চালানোর জন্য হাতির উপর সওয়ার হয়ে এসেছিল। [الفيل ‘ফীল’ মানে হাতি। এরই থেকে সূরাটির নাম হয়েছে সূরা ফীল]। আবরাহা ছিল ইয়ামানের শাসক। সে ইয়ামানে এক জমকালো গির্জা নির্মাণ করে ইয়ামানবাসীদের মধ্যে ঘোষণা করে দিয়েছিল, এখন থেকে কেউ আর হজ্জ করার জন্য মক্কায় যাবে না। এই গির্জাকেই বায়তুল্লাহ মনে করবে। আরবের মানুষ যদিও মূর্তিপূজক ছিল, কিন্তু হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের তালীম ও তাবলীগের কারণে কাবা শরীফের মর্যাদা তাদের অন্তরে বদ্ধমূল ছিল। কাজেই আবরাহার এ ঘোষণার কারণে তাদের অন্তরে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও ঘৃণা সৃষ্টি হল। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটল এভাবে যে, কেউ গিয়ে রাতের বেলা সেই গীর্জায় মলত্যাগ করে আসল। কোন-কোন বর্ণনায় আছে, গীর্জাটির একাংশে আগুনও লাগিয়ে দিয়েছিল। আবরাহা এ ঘটনা শুনে আক্রোশে উম্মত্ত হয়ে উঠল। সে এমনই দিশেহারা হয়ে পড়েছিল যে, এর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এক বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করে ফেলল এবং তাদের নিয়ে মক্কা মুকাররমার পথে যাত্রা করল। পথে আরবের কয়েকটি গোত্র তার সঙ্গে যুদ্ধ করল, কিন্তু আবরাহার বিশাল বাহিনীর কাছে তারা পরাস্ত হল। শেষ পর্যন্ত সে মক্কা মুকাররমার কাছাকাছি ‘মুগাম্মাস’ নামক এক স্থানে পৌঁছে গেল। পর দিন ভোরে যখন বাইতুল্লাহ শরীফের দিকে অগ্রসর হতে চাইল, তখন তার হাতি কিছুতেই সে দিকে যেতে চাইল না। ঠিক এ মুহূর্তেই সাগরের দিক থেকে আশ্চর্য ধরনের এক ঝাঁক পাখি উড়ে আসল এবং আবরাহার গোটা বাহিনীর উপর দিয়ে আকাশ ছেয়ে ফেলল। প্রতিটি পাখি তিনটি করে কঙ্কর বহন করছিল। তারা সেগুলো সৈন্যদের উপর বর্ষণ করল। সে কঙ্করে এমন কাজ হল যা গোলা-বারুদ দিয়েও সম্ভব হয় না। যার উপরই সে কঙ্কর পড়ত তার শরীর ভেদ করে তা মাটিতে ঢুকে যেত। এ আযাব দেখে সবগুলো হাতি পালাতে শুরু করল। কিছু সৈন্য তো সেখানেই ধ্বংস হল। আর যারা পালিয়েছিল, তাদের সকলেও রাস্তায় মারা গেল। আবরাহার মৃত্যু হল সর্বাপেক্ষা দৃষ্টান্তমূলকভাবে। তার সারা দেহে এমন বিষ ছড়িয়ে পড়ল যে, তাতে শরীরের জোড়ায়-জোড়ায় পচন ধরল। এ অবস্থায়ই তাকে ইয়ামানে নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে গলে-পচে একদম খতম হয়ে গেল। তার দুই মাহুত মক্কা মুকাররমায় থেকে গিয়েছিল। তারা অন্ধ ও বিকলাঙ্গ হয়ে গিয়েছিল। এ ঘটনাটি ঘটেছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের সামান্য আগে। হযরত আয়েশা ও তাঁর বোন হযরত আসমা (রাযি.) সেই অন্ধ লোক দু’টিকে দেখেছিলেন। (বিস্তারিত জানার জন্য মাআরিফুল কুরআন দেখুন)। এ সূরার ঘটনাটি উল্লেখ করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সান্তনা দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার শক্তি অনেক বড়। যারা আপনার দুশমনীতে কোমর বেঁধে লেগেছে শেষ পর্যন্ত তারাও হাতিওয়ালাদের মত ধ্বংস হবে।

তাফসীরে জাকারিয়া

১. আপনি কি দেখেন নি(১) আপনার রব হাতির অধিপতিদের প্রতি কী করেছিলেন?

(১) এখানে أَلَمْ تَرَ “আপনি কি দেখেননি” বলা হয়েছে। বাহ্যত এর দ্বারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে, অথচ এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্মের কিছুদিন পূর্বেকার ঘটনা। কোন কোন মুফাসসির এর সমাধানে বলেন, এখানে শুধু কুরাইশদেরকেই নয় বরং সমগ্র আরববাসীকেই সম্বোধন করা হয়েছে। তারা এই সমগ্র ঘটনা সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত ছিল। কুরআন মজিদের বহু স্থানে ‘আলাম তারা’ বা আপনি কি দেখেননি? শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নয় বরং সাধারণ লোকদেরকে সম্বোধন করাই উদ্দেশ্য। (কুরতুবী)

অপর কোন কোন তাফসীরবিদ বলেন, যে ঘটনা এরূপ নিশ্চিত যে, তা ব্যাপকভাবে প্রত্যক্ষ করা হয়, সে ঘটনার জ্ঞানকেও দেখা বলে ব্যক্ত করা হয়; যেন এটা চাক্ষুষ ঘটনা। তাছাড়া, এক পর্যায়ে দেখাও প্রমাণিত আছে; যেমন কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, আয়েশা ও আসমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা দুজন হস্তীচালককে অন্ধ, বিকলাঙ্গ ও ভিক্ষুকরূপে দেখেছিলেন। বাইহাকী: দালায়েলুন নাবুওয়াহ, ১/৫২) (আত-তাহরীর ওয়াততানওয়ীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

১। তুমি কি দেখনি যে, তোমার প্রতিপালক হাতি-ওয়ালাদের সাথে কিরূপ (আচরণ) করেছিলেন? (1)

(1) যারা ইয়ামান দেশ হতে কা’বাগৃহকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে এসেছিল। ألَم تَرَ এর অর্থ হল ألَم تَعلَم অর্থাৎ, তুমি কি জান না? এখানে জিজ্ঞাসা সাব্যস্তের জন্য ব্যবহার হয়েছে। অর্থ হল, তুমি জান অথবা ঐসব লোকেরা জানে, যারা তোমার যুগের। এরূপ এ জন্যই বলা হয়েছে যে, এই ঘটনা ঘটার পর খুব বেশী দিন অতিবাহিত হয়নি। শুদ্ধ প্রমাণ অনুযায়ী এই ঘটনা সেই বছর ঘটেছিল, যে বছরে মহানবী (সাঃ)-এর জন্ম হয়। আর আরবদের মাঝে এই ঘটনা বড় প্রসিদ্ধ ছিল।

সংক্ষিপ্ত আকারে আবরাহার হস্তী বাহিনীর ঘটনা নিম্নরূপঃ-

হাবশার বাদশাহর তরফ থেকে ইয়ামান দেশে আবরাহা গভর্নর ছিল। সে ‘সানআ’তে একটি খুব বড় গির্জা নির্মাণ করাল। আর চেষ্টা করল, যাতে লোকেরা কা’বাগৃহ ত্যাগ করে ইবাদত ও হজ্জ-উমরাহর জন্য এখানে আসে। এ কাজ মক্কাবাসী তথা অন্যান্য আরব গোত্রের জন্য অপছন্দনীয় ছিল। অতএব তাদের মধ্যে একজন আবরাহার নির্মাণকৃত উপাসনালয়ে পায়খানা করে নোংরা করে দিল। আবরাহার নিকট খবর পৌঁছল যে, গির্জাকে কেউ নোংরা ও অপবিত্র করে দিয়েছে। যার প্রতিক্রিয়ায় সে কা’বা ঘরকে ধ্বংস করার দৃঢ়সংকল্প করে নিল। সে বহু সংখ্যক সৈন্যসহ মক্কার উপর হামলা করার উদ্দেশ্যে রওনা হল। কিছু হাতীও তাদের সাথে ছিল। মক্কার নিকট পৌঁছে সৈন্যরা (মক্কার সর্দার) নবী (সাঃ)-এর দাদার উটগুলি দখল করে নিল। এ ব্যাপারে আব্দুল মুত্তালিব আবরাহাকে বললেন, আমার উটসমূহকে ফিরিয়ে দিন; যা আপনার সৈন্যরা ধরে রেখেছে। (আবরাহা বলল, এখন আমরা তোমাদের কা’বা ধ্বংস করতে এসেছি, আর তুমি কেবল উট ছেড়ে দেওয়ার দাবী কর? তিনি বললেন, উটগুলি আমার। তাই আমি সেগুলির হিফাযত চাই।) বাকী থাকল কা’বা ঘরের ব্যাপার যাকে আপনি ধ্বংস করতে এসেছেন, তো সেটা হল আপনার ব্যাপার আল্লাহর সাথে। কা’বা হল আল্লাহর ঘর। তিনিই হলেন তার হিফাযতকারী। আপনি জানেন আর বায়তুল্লাহর মালিক আল্লাহ জানেন। অতঃপর যখন এই সৈন্যদল (মিনার কাছে) ‘মুহাসসার’ উপত্যকার নিকট পৌঁছল, তখন আল্লাহ তাআলা একটি পাখীর দলকে প্রেরণ করলেন যাদের ঠোঁটে এবং পায়ে পোড়া মাটির কাঁকর ছিল যা ছোলা অথবা মসুরীর দানা সমপরিমাণ ছিল। পাখীরা উপর থেকে সেই কাঁকর বর্ষণ করতে লাগল। যে সৈন্যকে এই কাঁকর লাগল সে গলে গেল, তার শরীর হতে গোশত খসে পড়ল এবং পরিশেষে সে মারা গেল। ‘সানআ’ পৌঁছতে পৌঁছতে খোদ আবরাহারও একই পরিণাম হল। এইভাবে আল্লাহ তাআলা নিজ ঘরের হিফাযত করলেন। (আয়সারুত তাফাসীর)