لَمۡ يَكُنِ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ مِنۡ أَهۡلِ ٱلۡكِتَٰبِ وَٱلۡمُشۡرِكِينَ مُنفَكِّينَ حَتَّىٰ تَأۡتِيَهُمُ ٱلۡبَيِّنَةُ

লাম ইয়াকুনিল্লাযীনা কাফারূমিন আহলিল কিতা-বি ওয়াল মুশরিকীনা মুনফাক্কীনা হাত্তাতা’তিয়াহুমুল বাইয়িনাহ।উচ্চারণ

আহলি কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কাফের ছিল তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ না আসা পর্যন্ত তারা (নিজেদের কুফরী থেকে) বিরত থাকতে প্রস্তুত ছিল না। তাফহীমুল কুরআন

যারা কুফরী করেছে সেই কিতাবী ও মুশরিকগণ ততক্ষণ পর্যন্ত নিবৃত্ত হওয়ার ছিল না, যতক্ষণ না তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ আসে। মুফতী তাকী উসমানী

কিতাবীদের মধ্যে যারা কুফরী করেছিল এবং মুশরিকরা আপন মতে অবিচল ছিল তাদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমান না আসা পর্যন্ত।মুজিবুর রহমান

আহলে-কিতাব ও মুশরেকদের মধ্যে যারা কাফের ছিল, তারা প্রত্যাবর্তন করত না যতক্ষণ না তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ আসত।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

কিতাবীদের মধ্যে যারা কুফরী করেছিল তারা এবং মুশরিকরা আপন মতে অবিচলিত ছিল যে পর্যন্ত না তাদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমাণ এলো- ইসলামিক ফাউন্ডেশন

কিতাবীদের মধ্যে যারা কুফরী করে তারা ও মুশরিকরা, তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ না আসা পর্যন্ত (নিজদের অবিশ্বাসে) অটল থাকবে।আল-বায়ান

কিতাবধারীদের মধ্যে যারা কাফির ছিল তারা আর মুশরিকরা (তাদের ভ্রান্ত মত ও পথ হতে) সরে আসত না যতক্ষণ না তাদের কাছে আসত সুস্পষ্ট প্রমাণ।তাইসিরুল

গ্রন্থধারীদের মধ্যে থেকে যারা অবিশ্বাস পোষণ করে আর বহুখোদাবাদীরা তাদের ছাড়ানো যাচ্ছিল না যতক্ষণ না তাদের কাছে এসেছে সুস্পষ্ট প্রমাণ --মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

আহলি কিতাব ও মুশরিক উভয় দলই কুফরী কর্মকাণ্ডে জড়িত হলেও দু’দলকে দু’টি পৃথক নাম দেয়া হয়েছে। যাদের কাছে আগের নবীদের আনা কোন আসমানী কিতাব ছিল, তা যত বিকৃত আকারেই থাক না কেন, তারা তা মেনে চলতো, তাদেরকে বলা হয় আহলি কিতাব। আর যারা কোন নবীর অনুসারী ছিল না। কোন আসমানী কিতাবও মানতো না তারা মুশরিক। কুরআন মজীদের বহু স্থানে আহলি কিতাবদের শির্কের উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন খৃস্টানদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ “তারা বলে, আল্লাহ‌ তিন খোদার একজন।”(আল মায়েদাহ ৭৩) “তারা মসীহকেও খোদা বলে।”(আল মায়েদাহ ১৭) “তারা মসীহকে আল্লাহর পুত্র গণ্য করে।” (আত তাওবা ৩০) আবার ইহুদিদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ “তারা উযাইরকে আল্লাহর পুত্র বলে”(আত তাওবা ৩০) কিন্তু এসব সত্ত্বে কুরআনের কোথাও তাদের জন্য মুশরিক পরিভাষা ব্যবহার করা হয়নি। বরং তাদের উল্লেখ করা হয়েছে “আহলি কিতাব” বা “যাদের কিতাব দেয়া হয়েছিল” শব্দের মাধ্যমে। অথবা ইয়াহুদ ও নাসারা শব্দদ্বয়ের মাধ্যমে। কারণ তারা তাওহিদী ধর্ম মানতো, তারপর শিরক করতো। বিপরীত পক্ষে অ-আহলি কিতাবদের জন্য পারিভাষিক পর্যায়ে মুশরিক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ তারা শিরককেই আসল ধর্ম গণ্য করতো। তাওহীদকে তারা পুরোপুরি ও চূড়ান্তভাবে অস্বীকার করতো। এ দু’টি দলের মধ্যকার এ পার্থক্যটা শুধুমাত্র পরিভাষার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না, শরীয়াতের বিধানের মধ্যেও এ পার্থক্য ছিল। আহলি কিতাবরা আল্লাহর নাম নিয়ে যদি কোন হালাল প্রাণীকে সঠিক পদ্ধতিতে যবেহ করে তাহলে তা মুসলমানের জন্য হালাল গণ্য করা হয়েছে। তাদের মেয়েদেরকে বিয়ে করারও অনুমতি দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে মুশরিকদের যবেহ করা প্রাণীও হালাল নয় এবং তাদের মেয়েদেরকে বিয়ে করারও অনুমতি দেয়া হয়নি।

এখানে কুফরী শব্দটিকে ব্যাপক অর্থে বর্ণনা করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রকার কুফরী দৃষ্টিভংগী এর অন্তর্ভুক্ত। যেমন কেউ এই অর্থে কাফের ছিল যে, সে আদৌ আল্লাহকে মানতো না। আবার কেউ আল্লাহকে মানতো ঠিকই কিন্তু তাঁকে একমাত্র মাবুদ বলে মানতো না। বরং আল্লাহর সত্ত্বা ও তাঁর সার্বভৌম কর্তৃত্বের গুণাবলী ও ক্ষমতায় কোন না কোনভাবে অন্যদেরকে শরীক করে তাদের বন্দেগীও করতো। কেউ আল্লাহর একত্ব স্বীকার করতো কিন্তু এ সত্ত্বেও আবার কোন না কোন্ ধরনের শিরকও করতো। কেউ আল্লাহকে মানতো কিন্তু তাঁর নবীদেরকে মানতো না এবং নবীদের মাধ্যমে যে হেদায়াত এসেছিল তাকে মানতে অস্বীকার করতো। কেউ এক নবীকে মানতো কিন্তু অন্য নবীকে অস্বীকার করতো। মোটকথা, বিভিন্ন ধরনের কুফরীতে লোকেরা লিপ্ত ছিল। এখানে ‘আহলি কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কাফের ছিল’ একথা বলার অর্থ এ নয় যে, তাদের মধ্যে তাহলে কিছু লোক ছিল যারা কুফরীতে লিপ্ত ছিল না। বরং এর অর্থ হচ্ছে, কুফরীতে লিপ্ত দু’টি দল ছিল, একটি আহলি কিতাব ও অন্যটি মুশরিক। এখানে মিন (مِنْ) শব্দটি কতক বা কিছু অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। বরং ‘মিন’এখানে বর্ণনামূলক। যেমন সূরা হজ্জের ৩০ আয়াতে বলা হয়েছেঃ فَاجۡتَنِبُوۡا الرِّجۡسَ مِنَ الۡاَوۡثَانِ অর্থাৎ মূর্তিদের অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকো। এর অর্থ এ নয় যে, মূর্তিদের মধ্যে যে অপবিত্রতা আছে তা থেকে দূরে থাকো। তেমনি اَلَّذِيْنَكَفَرُوْامِنْ اَهْلِ الْكِتَلبِ والْمُشْرِكِيْن এর অর্থও হচ্ছেঃ যারা কুফরী করে, যারা আহলে কিতাব ও মুশরিকদের দলের অন্তর্ভুক্ত। এর অর্থ এ নয় যে, এই দু’টি দলের মধ্য থেকে যারা কুফরী করে।

অর্থাৎ একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ এসে তাদেরকে কুফরীর প্রতিটি গলদ ও সত্য বিরোধী বিষয় বুঝাবে এবং যুক্তি-প্রমাণের সাহায্যে সুস্পষ্ট পদ্ধতিতে সত্য সঠিক পথ তাদের সামনে পেশ করবে, এছাড়া এই কুফরীর অবস্থা থেকে বের হবার আর কোন পথ তাদের সামনে ছিল না। এর মানে এ নয় যে, এ সুস্পষ্ট প্রমাণটি এসে যাবার পর তারা সবাই কুফরী পরিত্যাগ করবে। বরং এর মানে হচ্ছে এই প্রমাণটির অনুপস্থিতিতে তাদের এই অবস্থার মধ্য থেকে বের হয়ে আসা সম্ভবপরই ছিল না। তবে তার আসার পরও তাদের মধ্য থেকে যারা নিজেদের কুফরীর ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল তার দায়িত্ব তাদের ওপরই বর্তায়। এরপর তারা আল্লাহর কাছে অভিযোগ করতে পারবে না যে, আপনি আমাদের হোদায়াতের কোন ব্যবস্থা করেননি। এই ধরনের কথা কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নভাবে বলা হয়েছে। যেমন সুরা নাহলে বলা হয়েছেঃ وَعَلَى اللّٰهِ قَصۡدُ السَّبِيۡلِ “সোজা পথ দেখানো আল্লাহরই দায়িত্ব।” (৯ আয়াত) সূরা লাইলে বলা হয়েছেঃ اِنَّ عَلَيۡنَا لَلۡهُدٰى‌ۖ “পথ দেখাবার দায়িত্ব আমার।” (১২ আয়াত)

اِنَّاۤ اَوۡحَيۡنَاۤ اِلَيۡكَ كَمَاۤ اَوۡحَيۡنَاۤ اِلٰى نُوۡحٍ وَّالنَّبِيّٖنَ مِنۡۢ بَعۡدِهٖ‌ۚ .......................... رُّسُلاً مُّبَشِّرِيۡنَ وَمُنۡذِرِيۡنَ لِئَلَّا يَكُوۡنَ لِلنَّاسِ عَلَى اللّٰهِ حُجَّةٌۢ بَعۡدَ الرُّسُلِ‌ؕ

“আমি তোমার প্রতি ঠিক তেমনিভাবে অহী পাঠিয়েছি যেভাবে নূহ ও তারপর নবীদের প্রতি পাঠিয়ে ছিলাম------------------এই রসূলদেরকে সুসংবাদ দানকারী ও সতর্ককারী করা হয়েছে যাতে রসূলদের পর লোকদের জন্য আল্লাহর বিরুদ্ধে কোন যুক্তি না থাকে।” (আন নিসা ১৬৩-১৬৫ আয়াত)

يٰۤاَهۡلَ الۡكِتٰبِ قَدۡ جَآءَكُمۡ رَسُوۡلُنَا يُبَيِّنُ لَكُمۡ عَلٰى فَتۡرَةٍ مِّنَ الرُّسُلِ اَنۡ تَقُوۡلُوۡا مَا جَآءَنَا مِنۡۢ بَشِيۡرٍ وَّلَا نَذِيۡرٍ‌ فَقَدۡ جَآءَكُمۡ بَشِيۡرٌ وَّنَذِيۡرٌ‌ؕ

“হে আহলি কিতাব! রসূলদের সিলসিলা দীর্ঘকাল বন্ধ থাকার পর প্রকৃত সত্যকে সুস্পষ্ট করার জন্য তোমাদের কাছে আমার রসূল এসেছে। যাতে তোমরা বলতে না পারো আমাদের কাছে না কোন সুসংবাদ দানকারী এসেছিল, না এসেছিল কোন সতর্ককারী। কাজেই নাও, এখন তোমাদের কাছে সুসংবাদদানকারী এসে গেছে এবং সতর্ককারীও।” (আল মায়েদাহ ১৯)

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

এ আয়াতসমূহে নবী হিসেবে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তা এই যে, জাহেলী যুগে যারা কাফের ছিল, তাতে তারা মুশরিক ও পৌত্তলিক হোক বা কিতাবী, তারা তাদের কাছে এক সুস্পষ্ট প্রমাণ তথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাব না হওয়া পর্যন্ত কুফর পরিত্যাগ করার ছিল না। সুতরাং যারা মুক্তমন নিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথাবার্তা সম্পর্কে চিন্তা করেছে তারা বাস্তবিকই কুফর থেকে তাওবা করে ঈমান এনেছে। অবশ্য যারা স্বভাবগতভাবেই জেদী মানসিকতার ছিল তারা এ নি‘আমত থেকে বঞ্চিত থেকেছে।

তাফসীরে জাকারিয়া

১. আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে এবং মুশরিকরণ(১), তারা নিবৃত্ত হবে না যতক্ষন না তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ আসবে(২)—

(১) আহলে কিতাব ও মুশরিক উভয় দলই কুফরী কর্মকাণ্ডে জড়িত হলেও দু’দলকে দুটি পৃথক নাম দেয়া হয়েছে। যাদের কাছে আগের নবীদের আনা কোন আসমানী কিতাব ছিল, তা যত বিকৃত আকারেই থাক না কেন, তারা তা মেনে চলতো, তাদেরকে বলা হয় আহলি কিতাব; আর তারা হল ইয়াহুদী ও নাসারীগণ। আর যারা মূর্তি-পূজারী বা অগ্নি-পূজারী, তারা-ই মুশরিক। (ইবন কাসীর)

(২) অর্থাৎ তারা তাদের কুফরী থেকে নিবৃত্ত হবে না যতক্ষণ না একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ এসে তাদেরকে কুফরীর প্রতিটি গলদ ও সত্য বিরোধী বিষয় বুঝাবে এবং যুক্তিপ্রমাণের সাহায্যে সুস্পষ্ট পদ্ধতিতে সত্য সঠিক পথ তাদের সামনে পেশ করবে, এর মাধ্যমে তারা কুফরী থেকে বের হতে পারবে। এর মানে এ নয় যে, এই সুস্পষ্ট প্রমাণটি এসে যাবার পর তারা সাবাই কুফরী পরিত্যাগ করবে। তবে তার আসার পরও তাদের মধ্য থেকে যারা নিজেদের কুফরীর ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল তার দায়িত্ব তাদের ওপরই বর্তায়। এরপর তারা আল্লাহর কাছে অভিযোগ করতে পারবে না যে, আপনি আমাদের হেদায়াতের কোন ব্যবস্থা করেননি। আল্লাহ অন্যত্র বলেন, “অনেক রাসূল পাঠিয়েছি যাদের কথা আগে আমি আপনাকে বলেছি এবং অনেক রাসূল, যাদের কথা আপনাকে বলিনি এবং মূসার সাথে আল্লাহ সাক্ষাত কথা বলেছিলেন। এই রাসূলদেরকে সুসংবাদদানকারী ও সতর্ককারী করা হয়েছে যাতে রাসূলদের পর লোকদের জন্য আল্লাহর বিরুদ্ধে কোন যুক্তি না থাকে।” (সূরা আন-নিসা: ১৬৪–১৬৫)

আরও বলেন, “হে আহলে কিতাব! রাসূলদের সিলসিলা দীর্ঘকাল বন্ধ থাকার পর প্রকৃত সত্যকে সুস্পষ্ট করার জন্য তোমাদের কাছে আমার রাসূল এসেছে। যাতে তোমরা বলতে না পারো আমাদের কাছে না কোন সুসংবাদদানকারী এসেছিল, না এসেছিল কোন সতর্ককারী। কাজেই নাও, এখন তোমাদের কাছে সুসংবাদদানকারী এসে গেছে এবং সতর্ককারীও।” (সূরা আল-মায়িদাহ: ১৯)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

১। আহলে কিতাব(1) ও মুশরিকদের(2) মধ্যে যারা কুফরী করেছিল, তারা আপন মতে অবিচলিত ছিল, যতক্ষণ না এল তাদের নিকট সুস্পষ্ট প্রমাণ;

(1) এ থেকে উদ্দেশ্য ইয়াহুদী ও নাসারা (খ্রিষ্টান)।

(2) ‘মুশরিক’ (অংশীবাদী) বলে আরব এবং অনারবের ঐ সমস্ত লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে যারা অগ্নি ও মূর্তি পূজা করত। مُنفَكِّين মানে বিরত বা বিচলিত। البَيِّنة (দলীল বা সুস্পষ্ট প্রমাণ) বলে নবী (সাঃ)-কে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ, ইয়াহুদী ও নাসারা, আরব এবং অনারবের মুশরিক বা অংশীবাদীরা নিজেদের কুফর ও শিরক থেকে ফিরে আসার নয়; যতক্ষণ পর্যন্ত না মুহাম্মাদ (সাঃ) তাদের নিকট পবিত্র কুরআনসহ এসে উপস্থিত হয়েছেন এবং তাদের অজ্ঞতা ও ভ্রষ্টতা ব্যক্ত করে তাদেরকে ইসলামের প্রতি আহবান করেছেন।