وَوَجَدَكَ ضَآلّٗا فَهَدَىٰ

ওয়া ওয়াজাদাকা দাল্লান ফাহাদা-।উচ্চারণ

তিনি তোমাকে পথ না পাওয়া অবস্থায় পান, তারপর তিনিই পথ দেখান। তাফহীমুল কুরআন

এবং তোমাকে পেয়েছিলেন, পথ সম্পর্কে অনবহিত; অতঃপর তোমাকে পথ দেখিয়েছেন। মুফতী তাকী উসমানী

তিনি তোমাকে পেলেন পথ সম্পর্কে অনবহিত, অতঃপর তিনি পথের নির্দেশ দিলেন।মুজিবুর রহমান

তিনি আপনাকে পেয়েছেন পথহারা, অতঃপর পথপ্রদর্শন করেছেন।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

তিনি তোমাকে পাইলেন পথ সম্পর্কে অনবহিত, এরপর তিনি পথের নির্দেশ দিলেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আর তিনি তোমাকে পেয়েছেন পথ না জানা অবস্থায়। অতঃপর তিনি পথনির্দেশ দিয়েছেন।আল-বায়ান

তিনি তোমাকে পেয়েছিলেন পথের দিশা-হীন, অতঃপর দেখালেন সঠিক পথ।তাইসিরুল

আর তিনি তোমাকে পান দিশাহারা, কাজেই তিনি পথনির্দেশ দেন।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

মূলে “দাল্লান”( ضالا ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এটি এসেছে “দালালাত” ( ضلا لت ) থেকে। এর কয়েকটি অর্থ হয়। এর একটি অর্থ গোমরাহী। দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, এক ব্যক্তি পথ জানে না, এক জায়গায় গিয়ে সে সামনে বিভিন্ন পথ দেখে কোন পথে যাবে তা ঠিক করতে না পেরে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। এর আর একটি অর্থ হচ্ছে হারিয়ে যাওয়া বা হারানো জিনিস। আরবী প্রবাদে বলা হয়, (ضَلَّ الْمَاءُفِى اللَّبَنِ ) অর্থাৎ পানি দুধের মধ্যে হারিয়ে গেছে। মরুভূমির মধ্যে যে গাছটি একাকি দাঁড়িয়ে থাকে এবং তার আশেপাশে কোন গাছ থাকে না তাকেও আরবীতে “দাল্লাহ” বলা হয়। নষ্ট হয়ে যাওয়া অর্থেও “দালাল” (ضلال ) বলা হয়। আবার গাফলতির জন্যও “দালাল” ব্যবহার করা হয়। যেমন কুরআন মজীদে এর দৃষ্টান্ত” দেখা যায়। (لَايَضِلُّ رَبِّىْ وَ لاَ يَنْسَى ) অর্থাৎ আমার রব না গাফেল হন আর না তিনি ভুলে যান। (ত্বা-হা ৫২) এই বিভিন্ন অর্থের মধ্য থেকে প্রথম অর্থটি এখানে খাপ খায় না। কারণ ইতিহাসে রসূলের শৈশব থেকে নিয়ে নবুওয়াত লাভ করার পূর্ব পর্যন্ত সময় কালের যেসব অবস্থা লিপিবদ্ধ রয়েছে তাতে কোথাও তিনি কখনো মূর্তিপূজা, শিরক বা নাস্তিক্যবাদে লিপ্ত হয়েছিলেন অথবা তাঁর জাতির মধ্যে যেসব জাহেলী কার্যকলাপ, রীতিনীতি ও আচার আচরণের প্রচলন ছিল তার সাথেও তিনি কোনক্রমে জড়িত হয়েছিলেন বলে সামান্যতম কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাই (وَوَجَدَكَ ضَالاَْ ) বাক্যে কোনক্রমেই এ অর্থ হতে পারে না যে, আল্লাহ‌ তাঁকে বিশ্বাস ও কর্মের দিক থেকে গোমরাহ হিসেবে পেয়েছিলেন। তবে অন্যান্য অর্থগুলো কোন না কোনভাবে এখানে খাপ খেতে পারে। বরং বিভিন্ন দিক থেকে হয়তো প্রত্যেকটি অর্থই এখানে কার্যকর হতে পারে। নবুওয়াত লাভের পূর্বে নবী ﷺ আল্লাহর অস্তিত্বে ও তাঁর একত্বে বিশ্বাসী ছিলেন, এতে সন্দেহ নেই। সে সময়তাঁর জীবন গোনাহ মুক্ত এবং নৈতিক গুণাবলী সমন্বিত ছিল। কিন্তু সত্যদ্বীন এবং তার মূলনীতি ও বিধান সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। যেমন কুরআনে বলা হয়েছেঃ مَا كُنۡتَ تَدۡرِىۡ مَا الۡكِتٰبُ وَلَا الۡاِيۡمَانُ অর্থাৎ “তুমি জানতে না কিতাব কি এবং ঈমানই বা কি।” (আশশুরা ৫২ আয়াত) এ আয়াতের এ অর্থও হতে পারে যে, নবী (সা.) একটি জাহেলী সমাজের বুকে হারিয়ে গিয়েছিলেন এবং নবুওয়াত লাভের আগে একজন পথপ্রদর্শক ও পথের দিশা দানকারী হিসেবে তাঁর ব্যক্তিত্ব সুস্পষ্ট হয়ে সামনে আসেনি। এর এ অর্থও হতে পারে যে, জাহেলিয়াতের মরুভূমিতে আপনি দাঁড়িয়েছিলেন একটি নিসঙ্গ বৃক্ষের মতো। এই বৃক্ষের ফল উৎপাদনের ও চারাগাছবৃদ্ধি করে আর একটি বাগান তৈরি করার যোগ্যতা ছিল। কিন্তু নবুওয়াতের পূর্বে এ যোগ্যতা কোনো কাজে লাগেনি। এ অর্থে হতে পারে যে, মহান আল্লাহ‌ আপনাকে অসাধারণ ক্ষমতা দান করেছিলেন। জাহেলিয়াতের অনুপযোগী ও বিরোধী পরিবেশেতা নষ্ট হতে বসেছিল। “দালাল” কে গাফলতির অর্থেও ব্যবহার করা যেতে পারে। অর্থাৎ নবুওয়াত লাভের পরে আল্লাহ‌ তাঁকে যেসব জ্ঞান ও সত্যের সাথে পরিচিত করিয়েছেন ইতিপূর্বে তিনি সেগুলো থেকে গাফেল ছিলেন। কুরআনেও এক জায়গায় বলা হয়েছে। وَاِنۡ كُنۡتَ مِنۡ قَبۡلِهٖ لَمِنَ الۡغٰفِلِيۡنَ “আর যদিও তুমি ইতিপূর্বে এসব বিষয়ে গাফেল ছিলে।” (ইউসুফ ৩) এছাড়াও দেখুন সূরা আল বাকারাহ ২৮৩ আয়াত এবং আশ শু’আরা ২০ আয়াত)

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

অর্থাৎ ওহী নাযিল হওয়ার আগে তিনি শরীয়তের বিধি-বিধান সম্পর্কে অনবগত ছিলেন। আল্লাহ তাআলা ওহীর মাধ্যমে তাঁকে শরীয়ত দান করলেন। তাছাড়া কোন কোন বর্ণনায় এমন কিছু ঘটনার উল্লেখ আছে, যাতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন কোন সফরে পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন। আল্লাহ তাআলা অস্বাভাবিকভাবে তাকে ঠিক পথে পৌঁছিয়ে দেন। হতে পারে আয়াতে এ জাতীয় ঘটনার প্রতিও ইশারা করা হয়েছে।

তাফসীরে জাকারিয়া

৭. আর তিনি আপনাকে পেলেন পথ সম্পর্কে অনবহিত, অতঃপর তিনি পথের নির্দেশ দিলেন।(১)

(১) দ্বিতীয় নি'আমত হচ্ছে, আপনাকে ضال পেয়েছি। এ শব্দটির অর্থ পথভ্রষ্টও হয় এবং অনভিজ্ঞ, অনবহিত বা গাফেলও হয়। এখানে দ্বিতীয় অর্থই উদ্দেশ্য। নবুওয়ত লাভের পূর্বে তিনি আল্লাহর বিধি-বিধান সম্পর্কে, ঈমান সম্পর্কে অনবহিত ছিলেন। অতঃপর নবুওয়তের পদ দান করে তাকে পথনির্দেশ দেয়া হয়, যা তিনি জানতেন না তা জানানো হয়; সর্বোত্তম আমলের তৌফিক দেওয়া হয়। (কুরতুবী, মুয়াস্‌সার)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

৭। তিনি তোমাকে পেলেন পথহারা অবস্থায়, অতঃপর তিনি পথের নির্দেশ দিলেন। (1)

(1) অর্থাৎ, তুমি দ্বীন, শরীয়ত ও ঈমান সম্বন্ধে অজ্ঞাত ছিলে। আমি তোমাকে পথ দেখালাম, নবুঅত দিলাম এবং তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করলাম। ইতিপূর্বে তুমি হিদায়াতের জন্য পেরেশান ছিলে।