إِن تَتُوبَآ إِلَى ٱللَّهِ فَقَدۡ صَغَتۡ قُلُوبُكُمَاۖ وَإِن تَظَٰهَرَا عَلَيۡهِ فَإِنَّ ٱللَّهَ هُوَ مَوۡلَىٰهُ وَجِبۡرِيلُ وَصَٰلِحُ ٱلۡمُؤۡمِنِينَۖ وَٱلۡمَلَـٰٓئِكَةُ بَعۡدَ ذَٰلِكَ ظَهِيرٌ

ইন তাতূবাইলাল্লা-হি ফাকাদ সাগাত কুলূবুকুমা- ওয়া ইন তাজা-হার-‘আলাইহি ফাইন্নাল্লা-হা হুওয়া মাওলা-হু ওয়া জিবরীলুওয়া সা-লিহুল মু’মিনীনা ওয়াল মালাইকাতুবা‘দা যা-লিকা জাহীর।উচ্চারণ

তোমরা দু’জন যদি আল্লাহর কাছে তাওবা করো (তবে তা তোমাদের জন্য উত্তম), কেননা, তোমাদের মন সরল সোজা পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গিয়েছে আর যদি তোমরা নবীর বিরুদ্ধে পরস্পর সংঘবদ্ধ হও তা হলে জেনে রাখো, আল্লাহ‌ তার অভিভাবক, তাছাড়া জিবরাঈল, নেক্‌কার ঈমানদারগণ এবং সব ফেরেশতা তার সাথী ও সাহায্যকারী। তাফহীমুল কুরআন

(হে নবী পত্নীগণ!) তোমরা যদি আল্লাহর কাছে তাওবা কর (তবে তাই হবে উচিত কাজ), কেননা তোমাদের অন্তর ঝুঁকে পড়েছে। কিন্তু তোমরা যদি নবীর বিরুদ্ধে একে অপরকে সাহায্য কর, তবে (জেনে রেখ) তার সঙ্গী আল্লাহ, জিবরাঈল ও সৎকর্মশীল মুমিনগণ। তাছাড়া ফেরেশতাগণ তার সাহায্যকারী।মুফতী তাকী উসমানী

যদি তোমরা উভয়ে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর যেহেতু তোমাদের হৃদয় ঝুকে পড়েছে (তাহলে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করবেন)। কিন্তু তোমরা যদি নাবীর বিরুদ্ধে একে অপরের পোষকতা কর তাহলে জেনে রেখ যে, আল্লাহই তার বন্ধু এবং জিবরাঈল ও সৎ আমলকারী মু’মিনগণও; উপরন্ত অন্যান্য মালাইকা/ফেরেশতারাও তার সাহায্যকারী।মুজিবুর রহমান

তোমাদের অন্তর অন্যায়ের দিকে ঝুঁকে পড়েছে বলে যদি তোমরা উভয়ে তওবা কর, তবে ভাল কথা। আর যদি নবীর বিরুদ্ধে একে অপরকে সাহায্য কর, তবে জেনে রেখ আল্লাহ জিবরাঈল এবং সৎকর্মপরায়ণ মুমিনগণ তাঁর সহায়। উপরন্তুত ফেরেশতাগণও তাঁর সাহায্যকারী।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

যদি তোমরা উভয়ে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ্ র দিকে প্রত্যাবর্তন কর তবে ভাল, কারণ তোমাদের হৃদয় তো ঝুঁকে পড়েছে। কিন্তু তোমরা যদি নবীর বিরুদ্ধে একে অপরের পোষকতা কর তবে জেনে রাখ, আল্লাহ্ই তার বন্ধু এবং জিব্রাঈল ও সৎকর্মপরায়ণ মু’মিনগণও, তা ছাড়া অন্যান্য ফেরেশতাও তার সাহায্যকারী। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

যদি তোমরা উভয়ে আল্লাহর কাছে তওবা কর (তবে তা তোমাদের জন্য উত্তম)। কারণ তোমাদের উভয়ের অন্তর বাঁকা হয়েছে, আর তোমরা যদি তার বিরুদ্ধে পরস্পরকে সাহায্য কর তবে আল্লাহই তার অভিভাবক এবং জিব্রীল ও সৎকর্মশীল মু’মিনরাও। তাছাড়া অন্যান্য ফেরেশতারাও তার সাহায্যকারী।আল-বায়ান

তোমরা দু’জন যদি অনুশোচনাভরে আল্লাহর দিকে ফিরে আস (তবে তা তোমাদের জন্য উত্তম), তোমাদের অন্তর (অন্যায়ের দিকে) ঝুঁকে পড়েছে, তোমরা যদি নবীর বিরুদ্ধে একে অপরকে সহযোগিতা কর, তবে (জেনে রেখ) আল্লাহ তার মালিক-মনিব-রক্ষক। আর এ ছাড়াও জিবরীল, নেককার মু’মিনগণ আর ফেরেশতাগণও তার সাহায্যকারী।তাইসিরুল

যদি তোমরা উভয়ে আল্লাহ্‌র দিকে ফেরো, কেননা তোমাদের হৃদয় ইতিপূর্বেই ঝোঁকে গেছে। কিন্ত যদি তোমরা দুজনে তাঁর বিরুদ্ধে পৃষ্ঠপোষকতা কর তাহলে আল্লাহ্ -- তিনিই তাঁর রক্ষাকারী বন্ধু, আর জিব্রীল ও পুণ্যবান মুমিনগণ, আর উপরন্ত ফিরিশ্‌তারাও পৃষ্ঠপোষক।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

মূল ইবারত হচ্ছে, فَقَدْ صَغَتْ قُلُوبُكُمَا صغو আরবী ভাষায় বেঁকে যাওয়া এবং তেড়া হয়ে যাওয়া অর্থে ব্যবহৃত হয়। শাহ ওয়ালীউল্লাহ সাহেব এ আয়াতাংশের অনুবাদ করেছেনঃ هرائيه كج شده استدل شما এবং শাহ রফিউদ্দীন সাহেব অনুবাদ করেছেনঃ “তোমাদের অন্তর বাঁকা হয়ে গিয়েছে।” হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ), আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ), সুফিয়ান সাওরী এবং দাহহাক এর অর্থ করেছেন زَاغَتْ قُلُوبُكُمَا অর্থাৎ সোজা পথ থেকে তোমাদের মন সরে গিয়েছে। এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইমাম রাযী (রঃ) বলেনঃ عَدَلَتْ وَمَالَتْ عَنِ الْحَقِّ وَهَوَ حَقَّ الرَّسُوْلُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ হক থেকে বিচ্যুত হয়েছে। আর হক অর্থ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হক। আল্লামা আলুসীর ব্যাখ্যা হচ্ছে,

مَالَتْ عَنِ الْوَاجِبِ مِنْ مُوَافِقَتِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم يَحِبُّ مَا يُحِبُّهُ وَكِرَاهَةَ مَايَكْرَهُهُ اِلَى مُخَالِفَتِهِ-

অর্থাৎ রসূলুল্লাহ ﷺ যা পছন্দ করেন তা পছন্দ করা এবং যা অপছন্দ করেন তা অপছন্দ করার ব্যাপারে তাঁর সাথে মিল রেখে চলা তোমাদের জন্য অবশ্য করণীয়। কিন্তু এ ব্যাপারে তোমাদের মন তাঁর সাথে সাজুয্য রক্ষা করে চলা থেকে বিচ্যুত হয়ে তাঁর বিরোধিতা করার দিকে বেঁকে গিয়েছে।

মূল আয়াতাংশ হচ্ছে وَإِنْ تَظَاهَرَا عَلَيْهِ تظاهر অর্থ কারো বিরুদ্ধে পরস্পর সহযোগিতা করা অথবা কারো বিরুদ্ধে বেঁকে বসা। শাহ ওয়ালীউল্লাহ এ আয়াতাংশের অনুবাদ করেছেনঃ اكر بايم متفق شويد بر رنجا يرن يبغمبر “যদি নবীকে কষ্ট দেয়ার জন্য ঐক্যবদ্ধ হও।” শাহ আবদুল কাদের সাহেবের অনুবাদ হলোঃ “তোমরা দু’জন যদি তাঁর ওপর চড়াও হও।” মাওলানা আশরাফ আলী সাহেবের অনুবাদ হলো, তোমরা দুই জন যদি নবীর বিরুদ্ধে এভাবেই কাজকর্ম করতে থাক। মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী সাহেব এ আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ “যদি তোমরা দুই জন এভাবে কাজকর্ম করতে এবং ক্ষোভ দেখাতে থাক।”

আয়াতে স্পষ্টভাবে দুই জন মহিলাকে সম্বোধন করা হয়েছে। আয়াতের পূর্বাপর প্রসঙ্গ থেকে জানা যায় যে, ঐ দু’জন মহিলা ছিলেন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র স্ত্রীদের অন্তর্ভুক্ত। কেননা এই সূরার প্রথম আয়াত থেকে পঞ্চম আয়াত পর্যন্ত একাদিক্রমে নবীর ﷺ পবিত্র স্ত্রীদের বিষয়াদিই আলোচিত হয়েছে। কুরআন মজীদের বাচনভঙ্গি থেকে এতটুকু বিষয় প্রকাশ পাচ্ছে। এখন প্রশ্ন ঐ দু’জন স্ত্রী ছিলেন কে কে? আর যে কারণে এ তিরস্কার করা হলো সেই বিষয়টিই বা কি ছিল। এ বিষয়ের বিস্তারিত বর্ণনা আমরা হাদীস শরীফে দেখতে পাই। মুসনাদে আহমাদ, বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী ও নাসায়ী হাদীস গ্রন্থে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস কর্তৃক একটি বিস্তারিত বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে যাতে কিছুটা শাব্দিক তারতম্য সহ এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহ আনহু বলেনঃ

আমি অনেক দিন থেকে মনে করছিলাম হযরত উমরকে (রাঃ) জিজ্ঞেস করবো, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীদের মধ্যে যে দু’জন তাঁর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হয়েছিলেন এবং যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করেছিলেন إِنْ تَتُوبَا إِلَى اللَّهِ فَقَدْ صَغَتْ قُلُوبُكُمَا তারা কে? কিন্তু তার ভয়াল ব্যক্তিত্বের কারণে আমার সে সাহস হতো না। শেষ পর্যন্ত হজ্জ্বে গেলে আমিও তাঁর সাথে গেলাম। ফিরে আসার সময় পথিমধ্যে এক জায়গায় তাঁকে অযু করানোর সময় আমি সুযোগ পেয়ে গেলাম এবং বিষয়টি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। জবাবে তিনি বললেনঃ তাঁরা ছিলেন হযরত আয়েশা (রাঃ) এবং হাফসা (রাঃ)। তারপর তিনি বলতে শুরু করলেন, আমরা কুরাইশীরা আমাদের স্ত্রীদের দমিয়ে রাখতে অভ্যস্ত ছিলাম। আমরা মদীনায় আসলে এখানে এমন অনেক লোক পেলাম যাদের স্ত্রীরা তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে ছিল। ফলে আমাদের স্ত্রীরাও তাদের থেকে এ শিক্ষা গ্রহণ করতে শুরু করলো। একদিন আমি আমার স্ত্রীর প্রতি অসন্তুষ্ট হলে বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলাম যে, সে-ও আমাকে পাল্টা জবাব দিচ্ছে (মুল ভাষা হচ্ছে فاذا هى تراجعنى )। সে আমার কথার প্রত্যুত্তর করলো---এটা আমার অত্যন্ত খারাপ লাগলো। সে বললোঃ আমি আপনার কথার প্রত্যুত্তর করছি তাতে আপনি রাগান্বিত হচ্ছেন কেন? আল্লাহর শপথ! রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণ তো তাঁকে কথায় কথায় জবাব দিয়ে থাকেন (মুল ভাষা হচ্ছে ليراجعنه )। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ আবার নবীর ﷺ প্রতি সারা দিন অসন্তুষ্ট থাকেন (বুখারীর বর্ণনায় আছে নবী ﷺ সারা দিন তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন)। এ কথা শুনে আমি বাড়ী থেকে বের হলাম এবং হাফসার (রাঃ) কাছে গেলাম। [হযরত উমরের (রা) কন্যা এবং নবীর ﷺ স্ত্রী।] আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলামঃ তুমি কি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথার প্রত্যুত্তর করো? সে বললোঃ হাঁ। আমি আরো জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের মধ্যে কেউ কি সারাদিন নবীর ﷺ প্রতি অসন্তুষ্ট থাকে? [বুখারীর বর্ণনা হচ্ছে, নবী ﷺ সারা দিন তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট থাকেন।] সে বললোঃ হাঁ। আমি বললামঃ তোমাদের মধ্য থেকে যে মহিলা এরূপ করে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তোমাদের মন থেকে কি এ ভয় দূর হয়ে গিয়েছে যে, আল্লাহর রসূলের অসন্তুষ্টির কারণে আল্লাহও তার প্রতি অসন্তুষ্টি হবেন এবং সে ধ্বংসের মধ্যে নিপতিত হবে? কখনো রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথার প্রত্যুত্তর করবে না। (এখানেও একই শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে لاتراجعى এবং তাঁর কাছে কোন জিনিসের দাবীও করবে না। আমার সম্পদ থেকে যা ইচ্ছা তুমি চেয়ে নিও। তোমার সতীন [অর্থাৎ হযরত আয়েশা (রাঃ)] তোমার চাইতে অধিক সুন্দরী এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অধিক প্রিয়। তাঁর কারণে তুমি আত্মপ্রতারিত হয়ো না। এরপর আমি সেখান থেকে বের হয়ে উম্মে সালামার (রাঃ) কাছে গেলাম এবং এ ব্যাপারে তাঁর সাথে কথা বললাম। তিনি ছিলেন আমার আত্মীয়া। তিনি আমাকে বললেনঃ খাত্তাবের বেটা; তুমি তো দেখছি অদ্ভূত লোক! প্রত্যেক ব্যাপারে তুমি হস্তক্ষেপ করছ! এমন কি এখন রসূলুল্লাহ ﷺ এবং তাঁর স্ত্রীদের ব্যাপারেও হস্তক্ষেপ করতে চলেছ। তাঁর এই কথায় আমি সাহস হারিয়ে ফেললাম। এরপর হঠাৎ আমার এক আনসার প্রতিবেশী রাত্রি বেলায় আমার বাড়ীতে এসে আমাকে ডাকলেন। আমরা দু’জন পালা করে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে হাজির হতাম এবং যার পালার দিন যে কথা হতো তা একে অপরকে বলতাম। এই সময়টা ছিল এমন যখন আমাদের বিরুদ্ধে গাসসানীদের আক্রমনের বিপদাশংকা দেখা দিয়েছিল। তার আহবানে আমি বের হলে সে বললঃ একটি মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ গাসসানীরা কি আক্রমণ করে বসেছে? সে বললঃ না তার চেয়েও বড় ঘটনা ঘটেছে। রসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন। আমি বললামঃ হাফসা ব্যর্থ ও ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। বুখারীর ভাষা হচ্ছেঃ رَغَمَ أَنْفُ حَفْصَةَ وَعَائِشَةَ এমনটা ঘটবে আমি প্রথমেই আশঙ্কা করেছিলাম।

কাহিনীর পরবর্তী অংশ আমরা উল্লেখ করলাম না। এ অংশে হযরত উমর (রাঃ) বলেছেনঃ তিনি পরদিন সকালে নবীর ﷺ খেদমতে হাজির হয়ে কিভাবে তাঁর ক্রোধ নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছেন। আমরা মুসনাদে আহমাদ ও বুখারীর বর্ণিত হাদীসসমূহ একত্রিত করে এ কাহিনী বিন্যস্ত করেছি। এতে হযরত উমর (রাঃ) যে مراجعت শব্দ ব্যবহার করেছেন এখানে তার আভিধানিক অর্থ গ্রহণ করা যেতে পারে না। বরং পূর্বাপর বিষয় থেকে আপনা আপনি প্রকাশ পায় যে, এ শব্দটি প্রতি উত্তর বা কথার পৃষ্ঠে কথা বলা অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে এবং হযরত উমরের (রাঃ) তাঁর কন্যাকে لاتراجعى رسول الله বলাটা স্পষ্টতঃ এ অর্থে বলা হয়েছে যে, নবীর ﷺ সাথে বাদানুবাদ করো না। কেউ কেউ এই অনুবাদকে ভুল বলে থাকেন। তাদের আপত্তি হচ্ছে, مراجعت শব্দের অর্থ পাল্টা জবাব দেয়া অথবা কথার পৃষ্ঠে কথা বলা ঠিক, কিন্তু বাদানুবাদ করা ঠিক নয়। কিন্তু আপত্তিকারী এ ব্যক্তিবর্গ এ বিষয়টি উপলব্ধি করেন না যে, কম মর্যাদার লোক যদি তার চেয়ে বড় মর্যাদার ব্যক্তিকে পাল্টা জবাব দেয় কিংবা কথার পৃষ্ঠে কথা বলে তাহলে তাকেই বাদানুবাদ করা বলে। উহাদরণস্বরূপ, বাপ যদি ছেলেকে কোন কারণে তিরস্কার বা শাসন করে অথবা তাঁর কোন কাজে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে আর ছেলে যদি তাতে আদবের সাথে চুপ থাকা বা ওজর পেশ করার পরিবর্তে পাল্টা জবাব দিতে থাকে, তাহলে একে বাদানুবাদ ছাড়া আর কিছু বলা যেতে পারে না। কিন্তু ব্যাপারটা যখন বাপ এবং ছেলের মধ্যেকার না হয়ে বরং আল্লাহর রসূল এবং তাঁর উম্মাতের কোন লোকের মধ্যেকার ব্যাপার হয় তাহলে একজন নির্বোধই কেবল এ কথা বলতে পারে যে, এটা বাদানুবাদ নয়।

আমাদের এই অনুবাদকে কিছু লোক বেআদবী বা অশিষ্টতা বলে আখ্যায়িত করে। অথচ তা বেআদবী কেবল তখনই হতো যদি আমরা হযরত হাফসা (রাঃ) সম্পর্কে নিজের পক্ষ থেকে এ ধরনের ভাষা প্রয়োগ করার দুঃসাহস দেখাতাম। আমরা তো হযরত উমরের (রাঃ) কথার সঠিক অর্থ তুলে ধরেছি। আর তিনি তাঁর মেয়েকে তার ত্রুটির জন্য তিরস্কার করতে গিয়ে এ কথাটি বলেছেন। একে বেআদবী বলার অর্থ হচ্ছে, হয় পিতাও তার নিজের মেয়েকে শাসন বা তিরস্কারের সময় আদবের সাথে কথা বলবে অথবা তার তিরস্কার মিশ্রিত ভাষার অনুবাদকারীর নিজের পক্ষ থেকে মার্জিত ও শিষ্ট ভাষা বানিয়ে দেবে।

এক্ষেত্রে সত্যিকার ভেবে দেখার বিষয় হচ্ছে, ব্যাপারটা যদি এ রকম হালকা ও মামুলী ধরনের হতো যে, নবী ﷺ তাঁর স্ত্রীদের কিছু বললে তাঁরা পাল্টা জবাব দিতেন, তাহলে তাকে এতো গুরুত্ব কেন দেয়া হলো যে, কুরআন মজীদে আল্লাহ তা’আলা নিজে সরাসরি নবীর ﷺ ঐ স্ত্রীদেরকে কঠোরভাবে সতর্ক করে দিলেন? আর হযরত উমরই (রাঃ) বা এ বিষয়টিকে এত মারাত্মক মনে করলেন কেন যে, প্রথমে নিজের মেয়েকে তিরস্কার করলেন এবং তারপর এক এক করে নবীর ﷺ পবিত্র স্ত্রীগণের প্রত্যেকের ঘরে গিয়ে তাঁদেরকে আল্লাহর অসন্তুষ্টির ভয় দেখিয়ে সাবধান করলেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তাঁর মতে রসূলুল্লাহ ﷺ কি এমন চড়া মেজাজের ছিলেন যে, অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যাপারেও স্ত্রীদের প্রতি অসন্তুষ্ট হতেন? তাছাড়া (মা’য়াযাল্লাহ) তাঁর দৃষ্টিতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেজাজ এতই কঠোর ছিল যে, এ ধরনের কথায় অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি একবার সব স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে তার নিজের কুঠরিতে নির্জন জীবন গ্রহণ করেছিলেন, কেউ যদি এসব প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে তাহলে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় সে অবশ্যই দু’টি পথের যে কোন একটি গ্রহণ করতে বাধ্য হবে। হয় তার কাছে নবীর ﷺ পবিত্র স্ত্রীদের সম্মান ও মর্যাদার বিষয় এত বড় হয়ে দেখা দেবে যে, সে এজন্য আল্লাহ ও তাঁর রসূলের দোষ-ত্রুটিরও পরোয়া করবে না। অথবা সোজাসুজি এ কথা মেনে নিতে হবে যে, সেই সময় নবীর ﷺ ঐসব পবিত্র স্ত্রীদের আচরণ প্রকৃতই এমন আপত্তিকর হয়ে গিয়েছিল যে, তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হওয়ার ব্যাপারে রসূলের ভূমিকা ন্যায়সঙ্গত ছিল এবং তাঁর চেয়ে অধিক ন্যায়সঙ্গত ছিল আল্লাহ তা’আলার ভূমিকা যে কারণে নবীর ﷺ পবিত্র স্ত্রীদের এই আচরণ সম্পর্কে কঠোর সতর্ক বাণী উচ্চারণ করেছেন।

অর্থাৎ রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে জোট পাকিয়ে তোমরা কেবল নিজের ক্ষতিই ডেকে আনবে। কারণ আল্লাহ‌ যাঁর প্রভু এবং জিবরাঈল, সমস্ত ফেরেশতা ও সৎকর্মশীল ঈমানদারগণ যাঁর সঙ্গী ও সহযোগী তাঁর বিরুদ্ধে জোট পাকিয়ে কেউ-ই সফলতা লাভ করতে পারে না।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

একথা বলা হচ্ছে হযরত আয়েশা (রাযি.) ও হযরত হাফসা (রাযি.) উভয়কে। অধিকাংশ মুফাসসির এর ব্যাখ্যা করেছেন ‘তোমাদের অন্তর সত্য থেকে অন্য দিকে ঝুঁকে পড়েছে।’ অর্থাৎ সত্য-সঠিক পথ থেকে সরে গিয়েছে। কিন্তু কারও কারও মতে এর ব্যাখ্যা হল তোমাদের অন্তর তাওবার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। কাজেই তোমাদের তাওবা করে ফেলা উচিত।

তাফসীরে জাকারিয়া

৪. যদি তোমরা উভয়ে আল্লাহর কাছে তাওবাহ কর (তবে তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর), কারণ তোমাদের হৃদয় তো ঝুঁকে পড়েছে। কিন্তু তোমরা যদি নবীর বিরুদ্ধে একে অন্যের পোষকতা কর(১) তবে জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ্‌ তার সাহায্যকারী এবং জিবরীল ও সৎকর্মশীল মুমিনরাও। তাছাড়া অন্যান্য ফেরেশতাগণও তার সহযোগিতাকারী।(২)

(১) ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, আমি উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতে চাইলাম। আমি তাকে বললামঃ কোন সে দুই নারী, যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে একে অন্যের পোষকতা করেছে? আমার কথা শেষ হতে না হতেই তিনি বললেনঃ “তারা হল আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ও হাফসা (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা)। (বুখারী: ৪৯১৪)

(২) অর্থাৎ যদি তোমরা অবস্থানে অনড় থাক, তবে আল্লাহ, তিনি তো তার বন্ধু ও সাহায্যকারী, অনুরূপভাবে জিবরীল ও সৎকর্মশীল মুমিনরাও। আল্লাহ নিজে তার সাহায্য করবেন, অনুরূপভাবে জিবরীল ও আল্লাহর ঈমানদার নেক বান্দারাও তাকে সাহায্য করবেন। তাকে সাহায্য না করার কেউ থাকবে না। আর আল্লাহ, জিবরীল ও সৎবান্দাদের সাহায্যের পরে ফেরেশতারাও তার সাহায্যকারী। তারা তাকে সাহায্য করবেন। (ফাতহুল কাদীর)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(৪) যদি তোমরা উভয়ে (অনুতপ্ত হয়ে) আল্লাহর নিকট তওবা কর, তাহলে (আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন),(1) নিশ্চয় তোমাদের হৃদয় ঝুঁকে পড়েছে।(2) কিন্তু তোমরা যদি নবীর বিরুদ্ধে একে অপরের পৃষ্ঠপোষকতা (সাহায্য) কর, তবে জেনে রেখো যে, আল্লাহই তার বন্ধু এবং জিবরীল ও সৎকর্মপরায়ণ বিশ্বাসীগণও, এ ছাড়া ফিরিশতাগণও তার সাহায্যকারী। (3)

(1) অথবা তোমাদের তওবা কবুল করে নেওয়া হবে। এখানে শর্ত (إِنْ تَتُوْبَا) এর জওয়াব ঊহ্য আছে।

(2) অর্থাৎ, সত্য থেকে সরে গেছে। আর তা হল, তাঁদের এমন জিনিস পছন্দ করা, যা ছিল নবী (সাঃ)-এর কাছে অপছন্দনীয়। (ফাতহুল ক্বাদীর)

(3) অর্থাৎ, নবী (সাঃ)-এর ব্যাপারে তোমরা ঐক্যবদ্ধ হলেও তাঁর কিছুই বিগড়ে যাবে না। কারণ, তাঁর সাহায্যকারী (মওলা) তো আল্লাহ, মুমিনগণ এবং ফিরিশতাগণও।