কুল ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা হা-দূ ইন ঝা‘আমতুম আন্নাকুম আওলিয়াউ লিল্লা-হি মিন দূনিন্না-ছি ফাতামান্নাউল মাওতা ইন কুনতুম সা-দিকীন।উচ্চারণ
তুমি বল, হে ইহুদী হয়ে যাওয়া লোকগণ! ১০ তোমরা যদি ভেবে থাকো যে, অন্য সব মানুষ বাদ দিয়ে কেবল তোমরাই আল্লাহর প্রিয়পাত্র, ১১ আর তোমাদের এ ধারণার ক্ষেত্রে তোমরা যদি সত্যবাদী হয়ে থাকো, ১২ তাফহীমুল কুরআন
(হে রাসূল!) বল হে ইয়াহূদীগণ, যদি তোমাদের দাবি এই হয় যে, তোমরাই আল্লাহর বন্ধু, অন্য কোন মানুষ নয়। তবে মৃত্যু কামনা কর যদি তোমরা সত্যবাদী হও। মুফতী তাকী উসমানী
বলঃ হে ইয়াহুদীরা! যদি তোমরা মনে কর যে, তোমরাই আল্লাহর বন্ধু, অন্য কোন মানবগোষ্ঠী নয়; তাহলে তোমরা মৃত্যু কামনা কর, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।মুজিবুর রহমান
বলুন হে ইহুদীগণ, যদি তোমরা দাবী কর যে, তোমরাই আল্লাহর বন্ধু-অন্য কোন মানব নয়, তবে তোমরা মৃত্যু কামনা কর যদি তোমরা সত্যবাদী হও।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
বল, ‘হে ইয়াহূদীরা! যদি তোমরা মনে কর তোমরাই আল্লাহ্ র বন্ধু, অন্য কোন মানবগোষ্ঠী নয় ; তবে তোমরা মৃত্যু কামনা কর, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
বল, হে ইয়াহুদীরা, যদি তোমরা মনে কর যে, (অন্য) মানুষেরা নয়, কেবল তোমরাই আল্লাহর বন্ধু, তাহলে তোমরা মৃত্যু কামনা কর, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।আল-বায়ান
বল- ‘হে ইয়াহূদী হয়ে যাওয়া লোকেরা! তোমরা যদি মনে কর যে, অন্য সব লোককে বাদ দিয়ে কেবল তোমরাই আল্লাহর বন্ধু, তাহলে তোমরা মৃত্যু কামনা কর, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো।তাইসিরুল
বলো -- "ওহে যারা ইহুদী মত পোষণ কর! যদি তোমরা মনে কর যে লোকজনকে বাদ দিয়ে তোমরাই আল্লাহ্র বন্ধুবান্ধব, তাহলে তোমরা মৃত্যু কামনা করো, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।"মাওলানা জহুরুল হক
১০
এ বিষয়টি লক্ষণীয় যে, এখানে, “হে ইহুদীরা” বলা হয়নি। বলা হয়েছে “হে ইহুদী হয়ে যাওয়ার লোকগণ” অথবা “যারা ইহুদীবাদ গ্রহণ করেছো।” এর কারণ হলো, মূসা আলাইহিস সালাম এবং তাঁর আগের ও পরের নবী-রাসূগগণ আসল যে দ্বীন এনেছিলেন, তা ছিল ইসলাম। এসব-রসূলদের কেউই ইহুদী ছিলেন না এবং তাদের সময়ে ইহুদীদের সৃষ্টিও হয়েছিল না। এই নামে এ ধর্মের সৃষ্টি হয়েছে বহু পরে। ইয়াকুব আলাইহিস সালামের চতুর্থ পুত্র ইয়াহুদার বংশোদ্ভুত গোত্রটির নামানুসারে এ ধর্মের নামকরণ হয়েছে। হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালামের পরে তার সাম্রাজ্যে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেলে এই গোত্রটি ইয়াহুদীয়া নামক রাষ্ট্রটির মালিক হয় এবং বনী ইসরাঈলদের অন্যান্য গোত্রগুলো নিজেদের একটি আলাদা রাষ্ট্র কায়েম, করে যা সামেরিয়া নামে খ্যাত হয়। পরবর্তীকালে আসিরীয়রা সামেরিয়াকে শুধু ধ্বংসই করেনি, বরং এই রাষ্ট্রটির প্রতিষ্ঠাতা ইসরাঈলী গোত্রগুলোর নাম-নিশানা পর্যন্ত মিটিয়ে দিয়েছে। এরপরে শুধু ইয়াহুদা এবং তার সাথে বিন ইয়ামীনের বংশ অবশিষ্ট থাকে। কিন্তু তার ওপর ইয়াহুদা বংশের প্রভাব ও আধিপত্যের কারণে তাদের জন্য ইয়াহুদ শব্দটির প্রয়োগ হতে থাকে। ইহুদী ধর্মযাজক, রিব্বী এবং আহবাররা নিজেদের ধ্যান-ধারণা, মতবাদ ও ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ অনুযায়ী এই বংশের মধ্যে আকীদা-বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান এবং ধর্মীয় বিধি-বিধানের যে কাঠামো শত শথ বছর ধরে নির্মাণ করেছে তার নাম ইহুদীবাদ। খৃস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী থেকে এই কাঠামো নির্মাণ শুরু হয় এবং খৃস্টীয় পঞ্চম শতক পর্যন্ত চলতে থাকে। আল্লাহর রসূলদের আনীত আল্লাহর হিদায়াতের উপাদান খুব সামান্যই এতে আছে এবং যা আছে তার চেহারাও অনেকখানি বিকৃত হয়েছে। এ কারণে কুরআন মজীদের অধিকাংশ স্থানে তাদেরকে الَّذِينَ هَادُوا বলে সম্বোধন করা হয়েছে। অর্থাৎ সেই সব লোক যারা ইহুদী হয়ে গিয়েছে বা ইহুদীবাদ গ্রহণ করেছে। তাদের মধ্যকার সবাই আবার ইসরাঈলী ছিল না। যেসব অইসরাঈলী ইহুদীবাদ গ্রহণ করেছিল তারাও এর মধ্যে ছিল। কুরআন মজীদে যেখানে বনী ইসরাঈল জাতিকে সম্বোধন করা হয়েছে সেখানে “হে বনী ইসরাঈল” বলা হয়েছে। আর যেখানে ইহুদী ধর্মের অনুসারীদের সম্বোধন করা হয়েছে সেখানে الَّذِينَ هَادُوا বলা হয়েছে।
১১
কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে তাদের এই দাবী বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমনঃ তারা বলেন, ইহুদীরা ছাড়া কেউ জান্নাতে যাবে না। (আল বাকারাহ, ১১১)। দোযখের আগুন আমাদের কখনো স্পর্শ করতে না। আর আমাদেরকে যদি নিতান্তই শাস্তি দেয়া হয় তাহলে মাত্র কয়েক দিনের জন্য দেয়া হবে (আল বাকারাহ, ৮০; আলে ইমরান, ২৪)। আমরা আল্লাহর বেটা এবং তাঁর প্রিয়পাত্র (আল মায়েদা, ১৮)। ইহুদীদের ধর্মগ্রন্থসমূহেও এ ধরনের কিছু দাবী-দাওয়া দেখা যায়। সারা বিশ্বে অন্তত এতটুকু কথা জানে যে, তারা নিজেদেরকে আল্লাহর বাছাই করা সৃষ্টি বলে থাকে। তারা এরূপ এক খোশ খেয়ালে মত্ত যে, তাদের সাথে খোদার একটা বিশেষ সম্পর্ক আছে যা অন্য কোন মানব গোষ্ঠীর সঙ্গে নেই।
১২
এখানে কুরআন মজীদে একথাটি দ্বিতীয়বারের মত ইহুদীদের সম্বোধন করে বলা হয়েছে। প্রথম সূরা বাকারায় বলা হয়েছিল, এদের বলো, আল্লাহর কাছে সমস্ত মানুষকে বাদ দিয়ে আখেরাতকের ঘর যদি কেবল তোমাদের জন্যই নির্দিষ্ট থেকে থাকে আর এ বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তোমরা যদি সত্যবাদী হয়ে থাকো তাহলে মৃত্যু কামনা করো। কিন্তু যেসব অপকর্ম তারা করেছে তার কারণে তারা কখনো মৃত্যু করবে না। আল্লাহ জালেমদের খুব ভাল করেই জানেন। বরং তোমরা দেখবে তারা কোন না কোন কোনভাবে বেঁচে থাকতে সমস্ত মানুষের চেয়ে এমনকি মুশরিকদের চেয়েও বেশী লালায়িত। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আকাঙ্ক্ষা করে হাজার বছর বেঁচে থাকার। অথচ দীর্ঘ আয়ূ লাভ করলেও তা তাদেরকে এই আযাব থেকে রক্ষা করতে পারবেনা। তাদের সমস্ত কৃতকর্মেই আল্লাহর দৃষ্টিতে আছে (আয়াত ৯৪-৯৬)। এ কথাটিই এখানে পুনরায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এটা শুধু পুনরুক্তিই নয়। সূরা বাকারার আয়াতগুলোতে একথা বলা হয়েছে। তখন, যখন ইহুদীদের সাথে মুসলমানদের কোন যুদ্ধ হয়নি। কিন্তু এই সূরায় তার পুনরুক্তি করা হয়েছে এমন এক সময় যখন তাদের সাথে ইতিপূর্বে কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পর আরবভুমিতে চূড়ান্তভাবে তাদের শক্তি চূর্ণ করা হয়েছে। পূর্বে সূরা বাকারায় যে কথা বলা হয়েছিল এসব যুদ্ধ এবং তাদের পরিণাম অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষন দুই ভাবেই তা প্রমাণ করে দিয়েছিল। মদীনা এবং খায়বারে সংখ্যার দিক দিয়ে ইহুদী শক্তি কোনভাবেই মুসলমানদের তুলনায় কম ছিল না এবং উপায়-উপকরণ ও তাদের চেয়ে অনেক বেশী ছিল। তাছাড়া আরবের মুশরিকদের ধ্বংস করার জন্য তারা মুনাফিকরাও তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করছিল। কারণ মুসলমানদের ধ্বংস করার জন্য তারা বদ্ধপরিকর ছিল। কিন্তু এই অসম মোকাবিলায় যে জিনিসটি মুসলমানদের বিজয়ী এবং ইহুদীদের পরাজিত করেছিল তা ছিল এই যে, মুসলমানগণ আল্লাহর পথে মৃত্যুবরণ করতে ভীত হওয়া তো দূরের কথা বরং হৃদয়ের গভীর থেকে মৃত্যু কামনা করতো এবং মরণপণ করে যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তো। কারণ, তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তারা আল্লাহর পথে লড়াই করছে। আর এ বিষয়ে ও পূর্ণ বিশ্বাস ছিল যে, এ পথে শাহাদাত বরণকারীর জন্য রয়েছে জান্নাত। অপরদিকে ইহুদীদের অবস্থা ছিল এই যে, তারা কোন পথেই জান দিতে প্রস্তুত ছিল না; না খোদার পথে, না নিজের কওমের পথে এবং না নিজের জান, মাল ও ইজ্জত রক্ষার পথে। যে ধরনের জীবনই হোক না কেন তাদের প্রয়োজন ছিল কেবল বেঁচে থাকার। এ জিনিসটিই তাদেরকে ভীরু ও কাপুরুষ বানিয়ে দিয়েছিল।
এই একই কথা সূরা বাকারায়ও বলা হয়েছে (২ : ৯৫)। ইয়াহুদীদের জন্য এটা খুবই সহজ চ্যালেঞ্জ ছিল। তাদের পক্ষে সামনে এসে একথা বলে দেওয়া কিছু কঠিন ছিল না যে, ‘আমরা মৃত্যু কামনা করছি’। কিন্তু তাদের কেউ একথা বলার জন্য সামনে আসল না। কারণ তারা জানত, এ চ্যালেঞ্জ আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে। কাজেই মৃত্যু কামনা করলে তা পূরণে দেরি হবে না, সঙ্গে-সঙ্গেই তাদের মরতে হবে।
৬. বলুন, হে ইয়াহুদী হয়ে যাওয়া লোকরা! যদি তোমরা মনে কর যে, তোমরাই আল্লাহর বন্ধু, অন্য লোকেরা নয়(১); তবে তোমরা মৃত্যু কামনা কর, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।
(১) কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে তাদের এই দাবী বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, তারা বলত: “ইয়াহুদীরা ছাড়া কেউই জান্নাতে যাবে না” (সূরা আল-বাকারাহ: ১১১)। “জাহান্নামের আগুন আমাদের কখনো স্পর্শ করবে না। আর আমাদেরকে যদি নিতান্তই শাস্তি দেয়া হয় তাহলে মাত্র কয়েক দিনের জন্য দেয়া হবে” (সূরা আল-বাকারাহ: ৮০, সূরা আলে ইমরান: ২৪)। “আমরা আল্লাহর বেটা এবং তাঁর প্রিয়পাত্র”। (সূরা আল-মায়েদাহ: ১৮)।
(৬) বল, ‘হে ইয়াহুদীগণ! যদি তোমরা মনে কর যে, তোমরাই আল্লাহর বন্ধু, অন্য কোন মানবগোষ্ঠী নয়, (1) তাহলে তোমরা মৃত্যু কামনা কর; (2) যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’ (3)
(1) যেমন, তারা বলত যে, ‘আমরা আল্লাহর বেটা এবং তাঁরই প্রিয় বান্দা।’ (সূরা মায়েদাহঃ১৮) এবং দাবী করত যে, ‘জান্নাতে কেবল তারাই প্রবেশ করবে যারা ইয়াহুদী এবং খ্রিষ্টান হবে।’ (বাক্বারাহ ১১১ আয়াত)
(2) যাতে তোমরা সেই মর্যাদা-সম্মান অর্জন করতে পার, যা তোমাদের ধারণা অনুযায়ী তোমাদের জন্য হওয়া উচিত।
(3) কারণ, যে এ ব্যাপারে প্রত্যয়ী হয় যে, মরার পর তার জন্য রয়েছে জান্নাত, সে সেখানে সত্বর পৌঁছতে চায়। হাফেয ইবনে কাসীর এর তফসীর করেছেন, ‘মুবাহালা’র জন্য আহবান করা। অর্থাৎ, তাদেরকে বলা হল যে, তোমরা যদি মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর নবুঅতকে অস্বীকার করার ব্যাপারে এবং এবং আল্লাহর প্রিয় ও বন্ধু হওয়ার দাবীতে সত্যবাদী হও, তবে মুসলিমদের সাথে ‘মুবাহালা’ কর। অর্থাৎ, মুসলিম ও ইয়াহুদী উভয়ে মিলে আল্লাহর কাছে দু’আ করবে যে, ‘হে আল্লাহ! আমাদের উভয়ের মধ্যে যে মিথ্যাবাদী, তাকে মৃত্যু দান কর।’ (সূরা বাক্বারার ৯৪ নং আয়াতের টীকা দ্রষ্টব্যঃ)