হুয়াল্লাযীআখরজাল্লাযীনা কাফারূ মিন আহলিল কিতা-বি মিন দিয়া-রিহিম লিআওওয়ালিল হাশরি মা-জানানতম আইঁ ইয়াখরুজুওয়া জান্নুআন্নাহুম মানি‘আতুহুম হুসূনুহুম মিনাল্লা-হি ফাআতা-হুমুল্লা-হু মিন হাইছুলাম ইয়াহতাছিবূ ওয়া কাযাফা ফী কুলূবিহিমুররু‘বা ইউখরিবূনা বুয়ূতাহুম বিআইদীহিম ওয়া আইদিল মু’মিনীনা ফা‘তাবিরূ ইয়াউলিল আবসা-র।উচ্চারণ
তিনিই আহলে কিতাব কাফেরদেরকে প্রথম আক্রমণেই ২ তাদের ঘরবাড়ী থেকে বের করে দিয়েছেন। ৩ তোমরা কখনো ধারণাও কর নাই যে, তারা বের হয়ে যাবে। তারাও মনে করে বসেছিলো যে, তাদের দুর্গসমূহ তাদেরকে আল্লাহর হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে। ৪ কিন্তু আল্লাহ এমন এক দিক থেকে তাদের ওপর চড়াও হয়েছেন, যে দিকের ধারণাও তারা করতে পারেনি। ৫ তিনি তাদের মনে ভীতি সঞ্চার করে দিয়েছেন। ফল হয়েছে এই যে, তারা নিজ হাতেও নিজেদের ঘর-বাড়ী ধ্বংস করছিলো এবং মু’মিনদের হাত দিয়েও ধ্বংস করেছিলো। ৬ অতএব, হে দৃষ্টিশক্তির অধিকারীরা, ৭ শিক্ষাগ্রহণ করো। তাফহীমুল কুরআন
তিনিই কিতাবীদের মধ্যে যারা কাফের তাদেরকে প্রথম সমাবেশেই তাদের ঘর-বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছেন। (হে মুসলিমগণ!) তোমরা কল্পনাও করনি তারা বের হয়ে যাবে। তারাও মনে করেছিল তাদের দুর্গগুলি তাদেরকে আল্লাহ হতে রক্ষা করবে। অতঃপর আল্লাহ তাদের কাছে এমন দিক থেকে আসলেন যা তারা ধারণাও করতে পারেনি। আল্লাহ তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করলেন। ফলে তারা নিজেদের হাতে নিজেদের ঘর-বাড়ি ধ্বংস করে ফেলছিল এবং মুসলিমদের হাতেও। সুতরাং হে চক্ষুষ্মানেরা! তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।মুফতী তাকী উসমানী
তিনিই কিতাবীদের মধ্যে যারা কাফির তাদেরকে প্রথম সমাবেশেই তাদের আবাসভূমি হতে বিতাড়িত করেছিলেন। তোমরা কল্পনাও করনি যে, তারা নির্বাসিত হবে এবং তারা মনে করেছিল যে, তাদের দুর্ভেদ্য দুর্গগুলি তাদেরকে রক্ষা করবে আল্লাহ হতে; কিন্তু আল্লাহর শাস্তি এমন এক দিক হতে এলো যা ছিল তাদের ধারনাতীত এবং তাদের অন্তরে তা ত্রাসের সঞ্চার করল। তারা ধ্বংস করে ফেলল তাদের বাড়ীঘর নিজেদের হাতে এবং মু’মিনদের হাতেও। অতএব হে চক্ষুম্মান ব্যক্তিবর্গ! তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর!মুজিবুর রহমান
তিনিই কিতাবধারীদের মধ্যে যারা কাফের, তাদেরকে প্রথমবার একত্রিত করে তাদের বাড়ী-ঘর থেকে বহিস্কার করেছেন। তোমরা ধারণাও করতে পারনি যে, তারা বের হবে এবং তারা মনে করেছিল যে, তাদের দূর্গগুলো তাদেরকে আল্লাহর কবল থেকে রক্ষা করবে। অতঃপর আল্লাহর শাস্তি তাদের উপর এমনদিক থেকে আসল, যার কল্পনাও তারা করেনি। আল্লাহ তাদের অন্তরে ত্রাস সঞ্চার করে দিলেন। তারা তাদের বাড়ী-ঘর নিজেদের হাতে এবং মুসলমানদের হাতে ধ্বংস করছিল। অতএব, হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ, তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
তিনিই কিতাবীদের মধ্যে যারা কাফির তাদেরকে প্রথমবার সমবেতভাবে তাদের আবাসভূমি হতে বিতাড়িত করেছিলেন। তোমরা কল্পনাও কর নাই যে, এরা নির্বাসিত হবে এবং এরা মনে করেছিল এদের দুর্গগুলি এদেরকে রক্ষা করবে আল্লাহ্ হতে ; কিন্তু আল্লাহ্ র শাস্তি এমন এক দিক হতে এলো যা ছিল এদের ধারণাতীত এবং এদের অন্তরে তা ত্রাসের সঞ্চার করল। এরা ধ্বংস করে ফেলল নিজেদের বাড়িঘর নিজেদের হাতে এবং মু’মিনদের হাতেও; অতএব হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ! তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা কুফরী করেছিল তিনিই তাদেরকে তাদের ঘর-বাড়ী থেকে বের করে দিয়েছিলেন প্রথমবারের মত। তোমরা ধারণাও করনি যে, তারা বেরিয়ে যাবে। আর তারা ধারণা করেছিল যে, তাদের দুর্গগুলো তাদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু আল্লাহর আযাব এমন এক দিক থেকে আসল যা তারা কল্পনাও করতে পারেনি এবং তিনি তাদের অন্তরসমূহে ত্রাসের সঞ্চার করলেন, ফলে তারা তাদের বাড়ী-ঘর আপন হাতে ও মুমিনদের হাতে ধ্বংস করতে শুরু করল। অতএব হে দৃষ্টিমান লোকেরা তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।’আল-বায়ান
কিতাবধারীদের অন্তর্ভুক্ত কাফিরদেরকে আক্রমণের প্রথম ধাপেই তিনিই তাদের বাড়ী থেকে বের ক’রে দিলেন। তোমরা ধারণাও করনি যে, তারা বের হবে। আর তারা মনে করেছিল যে, তাদের দূর্গগুলো তাদেরকে আল্লাহ (’র কবল) থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু আল্লাহ তাদেরকে এমন দিক থেকে পাকড়াও করলেন যা তারা ভাবতেও পারেনি। তিনি তাদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করলেন। তারা তাদের নিজেদের হাত দিয়েই নিজেদের ঘরবাড়ী ধ্বংস করল, আর মু’মিনদের হাতেও (ধ্বংস করাল)। অতএব হে দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষেরা! তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।তাইসিরুল
তিনিই সেইজন যিনি গ্রন্থধারীদের মধ্যের যারা অবিশ্বাস পোষণ করেছিল তাদের বিতাড়িত করে দিয়েছিলেন তাদের বাড়িঘর থেকে প্রথমকার সমাবেশে। তোমরা ভাবো নি যে তারা বেরিয়ে যাবে, আর তারা ভেবেছিল যে তাদের দুর্গগুলি তাদের সংরক্ষণ করবে আল্লাহ্র বিরুদ্ধে, কিন্ত আল্লাহ্ তাদের কাছে এসে পৌঁছেছিলেন এমন এক দিক থেকে যা তারা ধারণা করে নি, আর তিনি তাদের অন্তরে ভয় সঞ্চার করেছিলেন, তারা তাদের বাড়িঘর বিনষ্ট করেছিল তাদের নিজেদের হাত দিয়ে, আর মুমিনদের হাত দিয়ে। অতএব তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো, হে চক্ষুষ্মান্ লোকেরা!মাওলানা জহুরুল হক
২
মূল শব্দ হলো لِأَوَّلِ الْحَشْرِ । হাশর ( (حشر) ) শব্দের অর্থ বিক্ষিপ্ত জনতাকে একত্র করা অথবা ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ব্যক্তিদের একত্রিত করে বের হওয়া। আর لِأَوَّلِ الْحَشْرِ এর অর্থ হলো, প্রথমবার একত্রিত হওয়ার সাথে অথবা প্রথমবার একত্রিত হওয়ার সময়ে। এখন প্রশ্ন হলো, এখানে প্রথম হাশর বলতে কি বুঝানো হয়েছে? এ ব্যাপারে মুফাসসিরগণ ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। একদলের মতে এর অর্থ মদীনা থেকে বনী নাযীরের বহিষ্কার। একে প্রথম হাশর এই অর্থে বলা হয়েছে যে, তাদের দ্বিতীয় হাশর হয়েছিলো হযরত ‘উমরের (রা.) সময়ে। এই সময় ইহুদী ও খৃস্টানদেরকে আরব উপদ্বীপ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। আর তাদের শেষ হাশর হবে কিয়ামতের দিন। দ্বিতীয় দলের মতে এর অর্থ হলো মুসলমানদের সৈন্য সমাবেশের ঘটনা যা বনী নাযীর গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য করা হয়েছিল সুতরাং لِأَوَّلِ الْحَشْرِ এর অর্থ হলো, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য মুসলমানরা সবেমাত্র একত্রিত হয়েছিলো। লড়াই ও রক্তপাতের কোন অবকাশই সৃষ্টি হয়নি। ইতিমধ্যেই আল্লাহ তা’আলার কুদরাতের তারা দেশান্তরিত হতে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছে। অন্য কথায় এখানে এ বাক্যাংশটি আক্রমণের “প্রথম চোটে” বা “প্রথম আঘাতে” অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলবী এর অনুবাদ করেছেনঃ در اول جمع كردن لشكر । শাহ আবদুল কাদের সাহেবের অনুবাদ হলোঃ ( يهل هى بهير هوت ) আমাদের মতে এই দ্বিতীয় অর্থটিই এ আয়াতাংশের সঠিক ও বোধগম্য অর্থ।
৩
এখানে প্রথমেই একটি বিষয় বুঝে নেয়া উচিত, যাতে বনী নাযীরের বহিষ্কারের ব্যাপারে কোন মানসিক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সৃষ্টি না হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বনী নাযীর গোত্রের যথারীতি একটি লিখিত চুক্তি ছিল। এ চুক্তিকে তারা বাতিলও করেছিলো না যে, তার কোন অস্তিত্ব নেই মনে করা চলে। তবে যে কারণে তাদের ওপর আক্রমণ চালানো হয়েছিল তা হলো, এই চুক্তি লংঘনের অনেকগুলো ছোট বড় কাজ করার পর তারা এমন একটি কাজ করে বসেছিল যা সুস্পষ্টভাবে চুক্তিভংগেরই নামান্তর। অর্থাৎ তারা চুক্তির অপর পক্ষ মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিল। আর তাও এমনভাবে প্রকাশ হয়ে পড়লো যে, সেজন্য তাদেরকে চুক্তিভংগের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হলে তারা তা অস্বীকার করতে পারেনি। এরপর রসূলুল্লাহ ﷺ তাদেরকে দশদিন সময় দিয়ে এই মর্মে চরমপত্র দিলেন যে, এই সময়ের মধ্যেই তোমরা মদীনা ছেড়ে চলে যাও। অন্যথায় তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবে। এই চরম পত্র ছিল সম্পূর্ণরূপে কুরআন মজীদের নির্দেশ অনুসারে। কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ “যদি তোমরা কোন কওমের পক্ষ থেকে বিশ্বাসভংগের (চুক্তিলংঘনের)আশঙ্কা কর তাহলে সেই চুক্তি প্রকাশ্যে তাদের কাছে ফিরিয়ে দাও।” (সূরা আল আনফাল-৫৮) এ কারণে তাদের বহিষ্কারকে আল্লাহ তা’আলা তাঁর নিজের কাজ বলে ঘোষণা করেছেন। কারণ, তা ছিল আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক। যেন তাদেরকে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম ও মুসলমানগণ বহিষ্কার করেননি, বরং আল্লাহ তা’আলা নিজে বহিষ্কার করেছেন। দ্বিতীয় যে কারণটির জন্য তাদের বহিষ্কারকে আল্লাহ তা’আলা নিজের কাজ বলে ঘোষণা করেছেন তা পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে।
৪
একথাটি বুঝার জন্য মনে রাখা দরকার যে, বনী নাযীর শত শত বছর ধরে এখানে প্রভাব প্রতিপত্তির সাথে বসবাস করে আসছিল। মদীনার বাইরে তাদের গোটা জনবসতি একই সাথে ছিল। নিজের গোত্রের লোকজন ছাড়া আর কোন গোত্রের লোকজন তাদের মধ্যে ছিল না। গোটা বসতি এলাকাকে তারা একটি দুর্গে রূপান্তিরিত করেছিল। সাধারণত বিশৃংখলাপূর্ণ ও নিরাপত্তাহীন উপজাতীয় এ এলাকায় ঘর-বাড়ী যেভাবে নির্মাণ করা হয়ে থাকে তাদের ঘর-বাড়ীও ঠিক তেমনিভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল। এগুলো ছিল ছোট ছোট দুর্গের মত। তাছাড়া তাদের সংখ্যাও সেই সময়ের মুসলমানদের সংখ্যার চেয়ে কম ছিল না। এমনকি মদিনার অভ্যন্তরেও বহু সংখ্যক মুনাফিক তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করতো। তাই মুসলমানরাও কখনো এ আশা করেনি যে, লড়াই ছাড়া শুধু আবরোধের কারণেই দিশেহারা হয়ে তারা নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে চলে যাবে। বনু নাযীর গোত্রের লোকজন নিজেরাও একথা কল্পনা করেনি যে, কোন শক্তি মাত্র ছয় দিনের মধ্যেই তাদের হাত থেকে এ জায়গা ছিনিয়ে নেবে। তাদের পূর্বে যদিও বনু কায়নুকা গোত্রকে বহিষ্কার করা হয়েছিলো এবং নিজেদের বীরত্বের অহংকার তাদের কোন কাজেই আসেনি। কিন্তু তারা ছিল মদীনার অভ্যন্তরে এক মহল্লার অধিবাসী। তাদের নিজেদের স্বতন্ত্র কোন দুর্গ-প্রাকার বেষ্টিত জনপদ ছিল না। তাই বনীনাযীর গোত্র মনে করতো যে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের টিকে থাকতে না পারা অযৌক্তিক বা অসম্ভব কিছু ছিল না। পক্ষান্তরে তারা নিজেদের সুরক্ষিত জনপদ এবং মজবুত দুর্গসমূহ দেখে ধারণাও করতে পারতো না যে, এখান থেকে কেউ তাদের বহিষ্কার করতে পারে। এ কারণে রসূলুল্লাহ ﷺ তাদেরকে দশ দিনের মধ্যে মদীনা ছেড়ে চলে যাওয়ার চরমপত্র দিলে তারা অত্যন্ত ধৃষ্টতার সাথে খোলাখুলি জবাব দিল, আমরা এখান থেকে চলে যাব না। আপনার কিছু করার থাকলে করে দেখতে পারেন।
এখানে একটি প্রশ্ন দেখা দেয়। প্রশ্নটি হলো, আল্লাহ তা’আলা কিভাবে একথা বললেন যে, তারা মনে করে নিয়েছিলো তাদের ছোট ছোট দুর্গের মত বাড়ীঘর তাদেরকে আল্লাহর হাত থেকে রক্ষা করবে? বনী নাযীর কি সত্যি সত্যিই জানতো যে, তাদের মোকাবিলা মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে নয়, বরং খোদ আল্লাহর সাথে? আর এটা জানার পরেও কি তারা একথা বিশ্বাস করেছিল যে, তাদের দুর্গসমূহ আল্লাহর হাত থেকে তাদের রক্ষা করতে পারবে? যারা ইহুদী জাতির মানসিকতা এবং তাদের শত শত বছরের ঐতিহ্য সম্পর্কে অবহিত নয় এরূপ প্রত্যেক ব্যক্তির মনে এ প্রশ্ন দ্বিধা ও সংশয়ের সৃষ্টি করবে। সাধারণ মানুষ সম্পর্কে কেউ ধারণাও করতে পারে না যে, আল্লাহর সাথে মোকাবিলা হচ্ছে সচেতনভাবে একথা জেনে শুনেও তারা এ ধরণের খোশ খেয়ালে মত্ত থাকবে এবং ভাববে যে, তাদের দুর্গ এবং অস্ত্রশস্ত্র তাদেরকে আল্লাহর থেকে রক্ষা করবে। এ কারণে একজন অনভিজ্ঞ লোক এখানে আল্লাহ তা’আলার এ বাণীর অর্থ করবেন এই যে, বনী নাযীর বাহ্যত নিজেদের সুদৃঢ় দুর্গসমূহ দেখে ভুল ধারণা করে বসেছিল যে, তারা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তাদের মোকাবিলা ছিল আল্লাহর সাথে। এ আক্রমণ থেকে তাদের দুর্গসমূহ তাদের রক্ষা করতে সক্ষম ছিল না। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার হলো, এই পৃথিবীতে ইহুদীরা একটি অদ্ভুত জাতি যারা জেনে বুঝেও আল্লাহর মোকাবিলা করে আসছে। তারা আল্লাহর রসূলদেরকে আল্লাহর রসূল জেনেও হত্যা করেছে এবং অহংকারে বুক ঠুকে বলেছে, আমরা আল্লাহ রসূলকে হত্যা করেছি। এ জাতির লোকগাঁথায় রয়েছে যে “তাদের পূর্বপূরুষ হযরত ইয়া’কূবের (আ) সাথে আল্লাহ তা’আলার সারা রাত ধরে কুস্তি হয়েছে এবং ভোর পর্যন্ত লড়াই করেও আল্লাহ তা’আলা তাকে পরাস্ত করতে পারেনি। অতঃপর ভোর হয়ে গেলে আল্লাহ তা’আলা তাকে বললেনঃ এখন আমাকে যেতে দাও। এতে ইয়া’কূব (আ) বললেনঃ যতক্ষণ না তুমি আমাকে বরকত দেবে ততক্ষণ আমি তোমাকে যেতে দেব না। আল্লাহ তা’আলা তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার নাম কি? তিনি বললেনঃ ইয়া’কূব। আল্লাহ তা’আলা বললেনঃ ভবিষ্যতে তোমার নাম ইয়া’কূব হবে না বরং ‘ইসরাঈল’ হবে। কেননা তুমি খোদা ও মানুষের সাথে শক্তি পরীক্ষা করে বিজয়ী হয়েছো।” দেখুন ইহুদীদের পবিত্র গ্রন্থের (The Holy Scriptures) আধুনিকতম অনুবাদ, প্রকাশক, জুয়িশ পাবলীকেশন সোসাইটি অব আমেরিকা, ১৯৫৪, আদিপুস্তক অধ্যায় ৩২, শ্লোক ২৫ থেকে ২৯। খৃস্টানদের অনুদিত বাইবেলেও এ বিষয়টি একইভাবে বর্ণিত হয়েছে। ইহুদীদের অনুবাদের ফুটনোটে ‘ইসরাঈল ‘শব্দের অর্থ লেখা হয়েছেঃ (He who Striveth with God) অর্থাৎ যিনি খোদার সাথে শক্তি পরীক্ষা করেন। ইনসাইক্লোপেডিয়া অব বাইবেলিকাল লিটারেচারে খৃস্টান পুরোহিতগণ ইসরাঈল শব্দের ব্যাখ্যায় লিখেছেনঃ (Wreslter with God) “খোদার সাথে কুস্তি লড়নেওয়ালা।” হোশেয় পুস্তকে হযরত ইয়াকূবের পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে,”তিনি তাঁর যৌবনে খোদার সাথে কুস্তি লড়েছেন। তিনি ফেরেশতার সাথে কুস্তি করে বিজয়ী হয়েছেন। “(অধ্যায় ১২, শ্লোক ৪) অতএব একথা স্পস্ট যে, বনী ইসরাঈলরা মহান সেই ইসরাঈলের বংশধর যার সম্পর্কে তাদের বিশ্বাস হলো, তিনি খোদার সাথে শক্তি পরীক্ষা করেছিলেন এবং তাঁর সাথে কুস্তি লড়েছিলেন। তাই খোদার সাথে মোকাবিলা একথা জেনে বুঝেও খোদার বিরুদ্ধে লড়তে প্রস্তুত হওয়া তাদের জন্য এমন কি আর কঠিন কাজ? এ কারণে তাদের নিজেদের স্বীকারোক্তি অনুসারে তারা আল্লাহর নবীদের হত্যা করেছে এবং একই কারণে তাদের নিজেদের স্বীকারোক্তি অনুসারে তারা আল্লাহর নবীদের হত্যা করেছে এবং একই কারণে তাদের নিজেদের ধারণা অনুসারে তারা হযরত ঈসাকে শূলে চড়িয়েছে এবং বুক ঠুকে বলেছেঃ (إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللَّهِ ) (আমরা আল্লাহর রসূল মাসীহ ‘ঈসা ইবনে মারয়ামকে হত্যা করেছি।) তাই মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রসূল একথা জেনে বুঝেও তারা যদি তাঁর বিরুদ্ধে লড়াই করে থাকে তাহলে তা তাদের ঐতিহ্য বিরোধী কোন কাজ নয়। তাদের জনসাধারণ না জানলেও পণ্ডিত-পুরোহিত ও আলেম সমাজ ভাল করেই জানতো যে, তিনি আল্লাহর রসূল। এ বিষয়ের কয়েকটি প্রমাণ কুরআন মজীদেই বর্তমান। (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, তাফহীমুল কুরআন, আল বাকারাহ, টিকা ৭৯-৯৫; সাফ্ফাত, টীকা ৭০-৭৩।
৫
আল্লাহ তা’আলার তাদের ওপর চড়াও হওয়ার অর্থ এ নয় যে, তিনি অন্য কোন স্থানে ছিলেন সেখান থেকে তাদের ওপর চড়াও হয়েছেন। বরং এটি একটি রূপক বাক্য। এরূপ ধারণা দেয়াই মূলত উদ্দেশ্য যে, আল্লাহর বিরুদ্ধে মোকাবিলার সময় তাদের ধারণা ছিল, শুধু একটি পন্থায় আল্লাহ তাদের ওপর বিপদ আনতে পারেন। তাহলো সামনাসামনি কোন সেনাবাহিনী তাদের বিরুদ্ধে নিয়ে আসা। আর তারা মনে করতো যে, দুর্গাভ্যন্তরে আশ্রয় নিয়ে তারা সে বিপদ ঠেকাতে পারবে। কিন্তু এমন একটি পথে তিনি তাদের ওপর হামলা করেছেন, যে দিক থেকে কোন বিপদ আসার আদৌ কোনআশঙ্কা তারা করতো না। সে পথটি ছিল এই যে, ভিতর থেকেই তিনি তাদের মনোবল ও মোকাবিলার ক্ষমতা নিঃশেষ ও অন্তসারশূন্য করে দিলেন। এরপর তাদের অস্ত্রশস্ত্র এবং দুর্গ কোন কাজেই আসেনি।
৬
অর্থাৎ ধ্বংসসাধিত হয়েছে দু’ভাবে। যে দুর্গের মধ্যে তারা আশ্রয় নিয়েছিল। মুসলমানরা বাইরে থেকে অবরোধ করে তা ভেঙ্গে ফেলতে শুরু করলো। আর ভেতর থেকে তারা নিজেরা প্রথমত মুসলমানদের প্রতিহত করার জন্য স্থানে স্থানে কাঠ ও পাথরের প্রতিবন্ধক বসালো এবং সেজন্য নিজেদের ঘর দড়জা ভেঙ্গে ভেঙ্গে আবর্জনা জমা করলো। এরপর যখন তারা নিশ্চিত বুঝতে পারলো যে, এ জায়গা ছেড়ে তাদেরকে চলে যেতেই হবে তখন তারা নিজেদের হাতে নিজেদের ঘরবাড়ী ধ্বংস করতে শুরু করলো যাতে তা মুসলমানদের কোন কাজে না আসে। অথচ এক সময় বড় শখ করে তারা এসব বাড়ীঘর নির্মাণ করে সাজিয়ে গুছিয়েছিল। এরপর তারা যখন এই শর্তে রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সন্ধি করলো যে, তাদের প্রাণে বধ করা হবে না এবং অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া আর যাই তারা নিয়ে যেতে সক্ষম হবে নিয়ে যেতে পারবে তখন যাওয়ার বেলায় তারা ঘরের দরজা, জানালা এবং খুঁটি পর্যন্ত উপড়িয়ে নিয়ে গেল। এমনকি অনেকে ঘরের কড়িকাঠ এবং কাঠের চাল পর্যন্ত উঠের পিঠে তুলে দিল।
৭
এই ঘটনার মধ্যে শিক্ষা গ্রহণের কয়েকটি দিক আছে। সংক্ষিপ্ত ও জ্ঞানগর্ভ এই আয়াতাংশে সে দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। এই ইহুদীরা মূলত অতীত নবীদেরই উম্মাত ছিল। তারা আল্লাহকে বিশ্বাস করতো, কিতাববিশ্বাস করতো, পূর্ববর্তী নবীদের বিশ্বাস করতো এবং আখেরাত বিশ্বাস করতো। এসব বিচারে তারা ছিল মূলত সাবেক মুসলমান। কিন্তু তারা যখন দ্বীন ও আখলাককে উপেক্ষা করে শুধু নিজেদের প্রবৃত্তির লালসা এবং পার্থিব উদ্দেশ্য ও স্বার্থ উদ্ধারের জন্য স্পষ্ট ও খোলাখুলীভাবে ন্যায় ও সত্যের প্রতি শত্রুতা পোষণের নীতি অবলম্বন করলো এবং নিজেদের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির কোন তোয়াক্কাই করলো না তখন আল্লাহ তা’আলার অনুগ্রহ-দৃষ্টিও আর তাদের প্রতি রইলো না। তা না হলে একথা সবারই জানা যে, তাদের সাথে আল্লাহ তা’আলার কোন ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল না। তাই এই পরিণাম দেখিয়ে সর্বপ্রথম মুসলমানদের উপদেশ গ্রহণ করতে বলা হয়েছে যেন ইহুদীদের মত তারাও নিজেদেরকে খোদার প্রিয়পাত্র ও আদরের সন্তান মনে করে না বসে এবং এই খামখেয়ালীতে মগ্ন না হয় যে, আল্লাহর শেষ নবীর উম্মত হওয়াটাই তাদের জন্য আল্লাহর অনুগ্রহ ও সাহায্য লাভের গ্যারান্টি। এর বাইরে দ্বীন ও আখলাকের কোন দাবী পূরণ তাদের জন্য জরুরী নয়। সাথে সাথে গোটা দুনিয়ার সেই সব লোককেও এ ঘটনা থেকে উপদেশ গ্রহণ করতে বলা হয়েছে যারা জেনে বুঝে সত্যের বিরোধিতা করে এবং নিজেদের সম্পদ ও শক্তি এবং উপায়-উপকরণের উপর এতটা নির্ভর করে যে, মনে করে তা তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করবে। মদীনার ইহুদীদের একথা অজানা ছিল না যে, মুহাম্মাদ ﷺ কোন কওম বা গোত্রের মান মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য কাজ করছেন না। বরং তিনি একটি আদর্শিক দাওয়াত পেশ করছেন। এ দাওয়াতের লক্ষ গোটা দুনিয়ার সব মানুষ। এ দাওয়াত গ্রহণ করে যে কোন জাতি, গোষ্ঠি ও দেশের মানুষ কোন প্রকার বৈষম্য ছাড়াই তাঁর উম্মাত হিসেবে গণ্য হতে পারে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিজ খান্দানের লোকজনের মুসলিম সমাজে যে মর্যাদা ছিল হাবশার বেলাল (রা.), রোমের সুহাইব (রা.) এবং পরস্যের সালমানের (রা.) ও সেই একই মর্যাদা ছিল, এটা তারা নিজ চোখে দেখছিল। তাই কুরাইশ, খাযরাজ ও আওস গোত্রের লোকেরা তাদের ওপর আধিপত্য কায়েম করবে এআশঙ্কা তাদের সামনে ছিল না। নবী ﷺ যে আদর্শিক দাওয়াত পেশ করছিলেন তা যে অবিকল সেই দাওয়াত যা তাদের নবী-রসূলগণ পেশ করে এসেছেন, এ বিষয়টিও তাদের অজানা ছিল না। এ দাবীও তো তিনি করেননি যে, তিনি নতুন একটি দ্বীন নিয়ে এসেছেন যা ইতিপূর্বে আর কেউ আনেনি। এখন তোমরা নিজেদের দ্বীন বা জীবন ব্যবস্থা ছেড়ে আমার এই দ্বীন বা আদর্শ গ্রহণ করো। বরং তাঁর দাবী ছিল, এটা যে সেই একই দ্বীন, সৃষ্টির শুরু থেকে আল্লাহর নবী-রসূলগণ যা নিয়ে এসেছেন। প্রকৃতই এটা যে সেই দ্বীন তার সত্যতা তারা তাওরাত থেকে প্রমাণ করতে পারতো। এর মৌল নীতিমালার সাথে নবী-রসূলের দ্বীনের মৌল নীতিমালার কোন পার্থক্য নেই। এ কারণেই কুরআন মজীদে তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছেঃ (آمِنُوا بِمَا أَنْزَلْتُ مُصَدِّقًا لِمَا مَعَكُمْ وَلَا تَكُونُوا أَوَّلَ كَافِرٍ بِهِ ) (তোমরা ঈমান আনো আমার নাযিলকৃত সেই শিক্ষার ওপরে যা তোমাদের কাছে পূর্ব থেকেই বিদ্যমান শিক্ষার সত্যায়নকারী। সবার আগে তোমরাই তার অস্বীকারকারী হয়ো না) মুহাম্মাদ ﷺ কেমন চরিত্র ও আখলাকের লোক। তাঁর দাওয়াত কবুল করে মানুষের জীবনে কেমন সর্বত্মক বিপ্লব সাধিত হয়েছে তা তারা চাক্ষুষ দেখছিল। আনসারগণ দীর্ঘদিন থেকে তাদের নিটক প্রতিবেশী। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তাদের অবস্থা যা ছিল তাও তারা দেখেছে। আর এখন ইসলাম গ্রহণের পর তাদের যে অবস্থা হয়েছে তাও তাদের সামনে বর্তমান। এভাবে দাওয়াত, দাওয়াতদাতা ও দাওয়াত গ্রহণকারীদের পরিণাম ও ফলাফল সবই তাদের কাছে স্পষ্ট ছিল। এসব দেখে এবং জেনে বুঝেও তারা শুধু নিজেদের বংশগত গোঁড়ামি এবং পার্থিব স্বার্থের খাতিরে এমন একটি জিনিসের সন্দেহ করার কোন অবকাশ অন্তত তাদের জন্য ছিল না। এই সজ্ঞান শত্রুতার পরেও তারা আশা করতো, তাদের দুর্গ তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করবে। অথচ গোটা মানব ইতিহাস, একথার সাক্ষী যে, আল্লাহর শক্তি যার বিরুদ্ধে নিয়োজিত হয় কোন অস্ত্রই তাকে রক্ষা করতে পারে না।
‘প্রথম সমাবেশ’-এর দু’রকম ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কোন কোন মুফাসসির বলেন, এর দ্বারা মুসলিম বাহিনীর সমাবেশ বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ ইয়াহুদীদের সাথে তাদের যুদ্ধের দরকার হয়নি; বরং প্রথমে যখন তারা তাদেরকে উৎখাতের জন্য সমবেত হয়, তখনই তারা পরাজয় মেনে নেয়। কিন্তু অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে এর দ্বারা নির্বাসিত হওয়ার জন্য বনূ নাজীরের ইয়াহুদীদের নিজেদের সমাবেশকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ নির্বাসিত হওয়ার জন্য এটাই ছিল ইয়াহুদীদের প্রথম সমাবেশ। এর আগে তাদের কখনও এরূপ সমাবেশের দরকার পড়েনি। এর ভেতর সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রয়েছে যে, এটা ছিল তাদের প্রথম নির্বাসন। এরপর তাদেরকে আরও এক নির্বাসনের সম্মুখীন হতে হবে। সুতরাং হযরত উমর (রাযি.)-এর আমলে তাদেরকে পুনরায় খায়বার থেকে নির্বাসিত করা হয়।
২. কিতাবীদের মধ্যে যারা কুফরী করেছিল তিনিই তাদেরকে প্রথম সমাবেশের জন্য তাদের আবাসভূমি থেকে বিতাড়িত করেছিলেন।(১) তোমরা কল্পনাও করনি যে, তারা বেরিয়ে যাবে। আর তারা মনে করেছিল যে, তাদের দুর্গগুলো তাদেরকে রক্ষা করবে আল্লাহ্র পাকড়াও থেকে; কিন্তু আল্লাহ্ তাদের কাছে এমনভাবে আসলেন যা তারা কল্পনাও করেনি। আর তিনি তাদের অন্তরে ত্রাসের সঞ্চার করলেন। ফলে তারা ধ্বংস করে ফেলল নিজেদের বাড়ি-ঘর নিজেদের হাতে এবং মুমিনদের হাতেও(২); অতএব হে চক্ষুষ্মান ব্যাক্তিগন তোমরা উপদেশ গ্ৰহণ কর।
(১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনা পৌঁছে রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কারণে সর্বপ্রথম মদিনায় ও তৎপার্শ্ববর্তী এলাকায় বসবাসকারী ইয়াহূদী গোত্রসমূহের সাথে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, ইয়াহূদীরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হবে না এবং কনো আক্রমণকারীকে সাহায্য করবে না। তারা আক্রান্ত হলে মুসলিমরা তাদেরকে সাহায্য করবে। শান্তিচুক্তিতে আরও অনেক ধারা ছিল। এমনিভাবে বনু নাদীরসহ ইয়াহূদীদের সকল গোত্র এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। মদীনা থেকে দুই মেইল দূরে বনু নাদীরের বসতি, দূর্বেদ্য দূর্গ্য এবং বাগ-বাগিচা ছিল। ওহুদ যুদ্ধ পর্যন্ত বাহ্যতঃ তাদেরকে এই শান্তিচুক্তির অনুসারী দেখা যায়। কিন্তু ওহুদ যুদ্ধের পরে বিশ্বাসঘাতকতা ও গোপন দুরভিসন্ধি শুরু করে দেয়। এই বিশ্বাসঘাতকতার সূচনা এভাবে হয় যে, বনু নাদ্বীরের জনৈক সর্দার কা’ব ইবনে আশরাফ ওহুদ যুদ্ধের পর আরও চল্লিশজন ইয়াহূদীদের সাথে নিয়ে মক্কা পৌঁছে এবং ওহুদ যুদ্ধ ফেরত কুরাইশী কাফেরদের সাথে সাক্ষাৎ করে।
দীর্ঘ আলোচনার পর উভয় পক্ষের মধ্যের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার চুক্তি চুড়ান্ত হয়। চুক্তি সম্পাদনের পর কা’ব ইবনে আশরাফ মদীনায় ফিরে এলে জিবরীল আলাইহিস সালাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আদ্যোপান্ত ঘটনা এবং চুক্তির বিবরণ বলে দেন। এরপর বনু নাদ্বীর আরও অনেক চক্রান্ত করতে থাকে। তন্মধ্যে একটি আলোচ্য আয়াতের সাথে সম্পর্কিত যার কারণে তাদেরকে মদীনা থেকে চলে যেতে হয়। ঘটনাটি হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় আগমন করার পর ইয়াহুদীদের সাথে সম্পাদিত শান্তিচুক্তির একটি শর্ত এই ছিল যে, কারো দ্বারা ভুলবশত: হত্যা হয়ে গেলে মুসলিম ও ইয়াহুদী সবাই এর রক্তের বিনিময় পরিশোধ করবে।
একবার আমর ইবনে উমাইয়া দমরীর হাতে দুটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এর রক্ত বিনিময় আদায় করা মুসলিম-ইয়াহুদী সকলেরই কর্তব্য ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য মুসলিমদের কাছ থেকে চাঁদা তুললেন। অতঃপর চুক্তি অনুযায়ী ইয়াহুদীদের কাছ থেকেও রক্ত বিনিময়ের অর্থ গ্রহণ করার ইচ্ছা করলেন। সে মতে তিনি বনু-নাদ্বীর গোত্রের কাছে গমন করলেন। তারা দেখল যে, রাসূলকে হত্যা করার এটাই প্রকৃষ্ট সুযোগ। তাই তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এক জায়গায় বসিয়ে দিয়ে বলল, আপনি এখানে অপেক্ষা করুন। আমরা রক্ত বিনিময়ের অর্থ সংগ্ৰহ করার ব্যবস্থা করছি। এরপর এরা গোপনে পরামর্শ করে স্থির করল যে, তিনি যে প্রাচীরের নীচে উপবিষ্ট আছেন, এক ব্যক্তি সেই প্রাচীরের উপরে উঠে একটি বিরাট ও ভারী পাথর তার উপর ছেড়ে দিবে, যাতে তার মৃত্যু ঘটে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তৎক্ষণাৎ ওহির মাধ্যমে এই চক্রান্তের বিষয় অবগত হয়ে গেলেন। তিনি সে স্থান ত্যাগ করে চলে এলেন এবং ইয়াহুদীদেরকে বলে পাঠালেনঃ তোমরা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে চুক্তি লঙ্ঘন করেছ। অতএব, তোমাদেরকে দশ দিনের সময় দেয়া হলো। এই সময়ের মধ্যে তোমরা যেখানে ইচ্ছা চলে যাও। এই সময়ের পর কেউ এ স্থানে দৃষ্টিগোচর হলে তার গর্দান উড়িয়ে দেয়া হবে।
বনু-নাদ্বীর মদিনা ত্যাগ করে চলে যেতে সম্মত হলে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই মুনাফিক তাদেরকে বাধা দিয়ে বললঃ তোমরা এখানেই থাক। অন্যত্র যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমার অধীনে দুই হাজার যোদ্ধার একটি বাহিনী আছে। তারা প্ৰাণ দিবে, কিন্তু তোমাদের গায়ে একটি আঁচড়ও লাগতে দিবে না। বনু-নাদ্বীর তাদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সদৰ্পে বলে পাঠালঃ আমরা কোথাও যাব না। আপনি যা করতে পারেন, করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে সাথে নিয়ে বনুনাদ্বীর গোত্রকে আক্রমণ করলেন। বনু-নাদ্বীর দুর্গের ফটক বন্ধ করে বসে রইল এবং মুনাফিকরাও আত্মগোপন করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে চতুর্দিক থেকে অবরোধ করলেন এবং তাদের খজুর বৃক্ষে আগুন ধরিয়ে দিলেন এবং কিছু কর্তন করিয়ে দিলেন। অবশেষে নিরূপায় হয়ে তারা নির্বাসনদণ্ড মেনে নিল।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই অবস্থায়ও তাদের প্রতি সৌজন্য প্রদর্শন করে আদেশ দিলেন, আসবাবপত্র যে পরিমাণ সঙ্গে নিয়ে যেতে পার, নিয়ে যাও। তবে কোনো অস্ত্ৰ-শস্ত্র সঙ্গে নিতে পারবে না। এগুলো বাজেয়াপ্ত করা হবে। সে মতে বনু-নাদ্বীরের কিছু লোক সিরিয়ায় এবং কিছু লোক খাইবরে চলে গেল। সংসারের প্রতি অসাধারণ মোহের কারণে তারা গৃহের কড়ি-কাঠ, তক্তা ও কপাট পর্যন্ত উপড়িয়ে নিয়ে গেল। ওহুদ যুদ্ধের পর চতুর্থ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে এই ঘটনা সংঘটিত হয়। এরপর উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তার খেলাফতকালে তাদেরকে পুনরায় অন্যান্য ইয়াহুদীদের সাথে খাইবর থেকে সিরিয়ায় নির্বাসিত করেন। এই নির্বাসনদ্বয়ই ‘প্রথম সমাবেশ’ ও ‘দ্বিতীয় সমাবেশ’ নামে অভিহিত। প্রথম হাশর রাসূলের যুগে আর দ্বিতীয় হাশর হয়েছিলো উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে। উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর সময়ে ইয়াহুদী ও নাসারাদেরকে আরব উপদ্বীপ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তাদের শেষ হাশর হবে কিয়ামতের দিন। কোন কোন আলেমের মতে এখানে প্রথম হাশর অর্থ প্রথম সমাবেশ। অর্থাৎ বনী নাদীর গোত্রের করার জন্য মুসলিমরা সবেমাত্র একত্রিত হয়েছিলো। লড়াই ও রক্তপাতের কোন অবকাশই সৃষ্টি হয়নি। ইতিমধ্যেই আল্লাহ তা'আলার কুদরাতে তারা দেশান্তরিত হতে প্ৰস্তুত হয়ে গিয়েছে। (দেখুন: ইবন কাসীর,কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর)
(২) গৃহের দরজা, কপাট ইত্যাদি নিয়ে যাওয়ার জন্যে তারা নিজেদের হাতে নিজেদের গৃহ ধ্বংস করছিল। পক্ষান্তরে তারা যখন দুর্গের অভ্যন্তরে ছিল, মুসলিমগণ তাদের গৃহ ও গাছপালা ধ্বংস করছিল। (দেখুন: ইবন কাসীর, ফাতহুল কাদীর)
(২) তিনিই আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা অবিশ্বাসী, তাদেরকে প্রথম সমাবেশেই তাদের আবাসভূমি হতে বিতাড়িত করেছেন।(1) তোমরা কল্পনাও করনি যে, তারা নির্বাসিত হবে এবং তারা মনে করেছিল যে, তাদের দুর্গগুলো তাদেরকে আল্লাহ (এর শাস্তি) হতে রক্ষা করবে;(2) কিন্তু আল্লাহ (এর শাস্তি) তাদের এমন এক দিক হতে এল, যা ছিল তাদের ধারণার বাইরে(3) এবং তাদের অন্তরে তা ত্রাসের সঞ্চার করল।(4) তারা তাদের বাড়ী-ঘর ধ্বংস করছিল নিজেদের হাতে(5) এবং মুমিনদের হাতেও।(6) অতএব হে চক্ষুষমান ব্যক্তিগণ! তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। (7)
(1) মদীনার উপকণ্ঠে ইয়াহুদীদের তিনটি গোত্র বসবাস করত। বানু-নায্বীর, বানু-কুরাইযা এবং বানু-ক্বাইনুক্বা। মদীনায় হিজরতের পর নবী (সাঃ) এদের সাথে সন্ধিচুক্তিও করেছিলেন। কিন্তু এরা গোপনে ষড়যন্ত্র করত এবং মক্কার কাফেরদের সাথেও তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে সম্পর্ক রেখেছিল। এমনকি, একদা যখন নবী (সাঃ) তাদের কাছে গিয়েছিলেন, বানু-নাযবীর গোত্রের লোকেরা উপর থেকে রসূল (সাঃ)-এর উপর একটি ভারী পাথর ফেলে তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে রেখেছিল। যথা সময়ে অহীর মাধ্যমে এ ব্যাপারে তাঁকে অবহিত করে দেওয়া হয়। তিনি নিরাপদে সেখান থেকে চলে আসেন এবং তাদের চুক্তি ভঙ্গের কারণে রসূল (সাঃ) তাদের উপর সসৈন্যে আক্রমণ করেন। এরা কিছু দিন তাদের দুর্গে অবরুদ্ধ থেকে অবশেষে প্রাণভিক্ষা স্বরূপ দেশত্যাগ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। আর রসূল (সাঃ) তা গ্রহণ করেন। এ ঘটনাকে أَوَّل الحَشْر (প্রথম সমাবেশ) বলে এই জন্য আখ্যায়িত করা হয়েছে যে, এটা ছিল তাদের নির্বাসন। আর এটা হয়েছিল মদীনা থেকে। এখান থেকে তারা খায়বারে গিয়ে বসতি স্থাপন করেছিল। এখান হতে উমার (রাঃ) তাদেরকে পুনরায় বহিষ্কার করে শাম (সিরিয়ার) দিকে বিতাড়িত করেন। যার ব্যাপারে বলা হয় যে, এখানেই প্রত্যেক মানুষের সর্বশেষ হাশর (সমাবেশ তথা কিয়ামত-কোর্ট) হবে।
(2) কারণ, তারা অতি মজবুত দুর্গ নির্মাণ করে রেখেছিল। আর এ নিয়ে তাদের গর্বও ছিল এবং মুসলিমরাও মনে করতেন যে, অতি সহজে এ দুর্গ জয় করা সম্ভব হবে না।
(3) আর তা এই ছিল যে, রসূল (সাঃ) তাদেরকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলেছিলেন যা তাদের ধারণা ও চিন্তার বাইরে ছিল।
(4) এই ত্রাস ও ভীতির কারণেই তারা বহিষ্কার হতে প্রস্তুত হয়েছিল। তা না হলে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই (মুনাফিকদের সর্দার) এবং অন্যান্য লোকেরা তাদের কাছে বার্তা পাঠিয়ে ছিল যে, তোমরা মুসলিমদের সামনে নতি স্বীকার করবে না, আমরা তোমাদের সাথে আছি। এ ছাড়া মহান আল্লাহ নবী করীম (সাঃ)-কে এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন যে, এক মাসের দূরত্বে অবস্থিত শত্রুর মধ্যেও তাঁর ভীতি সঞ্চারিত হয়ে যেত। ফলে তাদের মধ্যে কঠিন আতঙ্ক ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়ে গেল এবং সব রকমের উপায়-উপকরণ থাকা সত্ত্বেও তারা অস্ত্র ফেলে দিয়ে কেবল এই শর্তটা মুসলিমদেরকে মেনে নিতে বলল যে, যতটা পরিমাণ জিনিসপত্র তারা বয়ে নিয়ে যেতে পারবে, ততটা পরিমাণ জিনিসপত্র তাদেরকে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হোক। সুতরাং এই অনুমতি পাওয়ার পর বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তারা নিজেদের বাড়ীর দরজা পর্যন্ত তুলে ফেলে!
(5) অর্থাৎ, যখন তারা নিশ্চিত হয়ে গেল যে, দেশ থেকে বহিষ্কার হতেই হবে, তখন তারা অবরোধ অবস্থায় ভিতর থেকেই নিজেদের বাড়ীগুলোকে ধ্বংস করতে শুরু করে দিল। যাতে তা মুসলমানদেরও যেন কোন কাজে না আসে। অথবা অর্থ হল, আসবাব-পত্র নিয়ে যাওয়ার অনুমতি থেকে পূর্ণরূপে উপকৃত হওয়ার জন্য নিজেদের উটগুলোতে সাধ্যমত আসবাব বোঝাই করার জন্য নিজেদের ঘরগুলোকেও ভেঙ্গে-চুরে যা নেওয়ার তা নিয়ে উটের উপর রেখে নিল।
(6) বাইরে থেকে মুসলিমরাও তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করার কাজে লেগে ছিলেন, যাতে তাদেরকে গ্রেফতার করা সহজ হয়। অথবা অর্থ হল, তাদের ভাঙ্গা-চোরা ঘরগুলো থেকে অবশিষ্ট আসবাব বের করার এবং তা সংগ্রহ করার জন্য মুসলিমদেরকে আরো অনেক কিছুই নষ্ট করতে হয়।
(7) এ থেকে যে, কিভাবে আল্লাহ তাদের অন্তরে মুসলিমদের ভয় ঢুকিয়ে দেন। অথচ তারা এক শক্তিশালী এবং বহু উপায়-উপকরণের অধিকারী (রণকুশল) গোত্র ছিল। কিন্তু যখন মহান আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত অবকাশ শেষ হয়ে গেল এবং তিনি তাদেরকে নিজ পাকড়াও-এর পঞ্জার মধ্যে করার চূড়ান্ত ফায়সালা করে নিলেন, তখন না তাদের শক্তি-সামর্থ্য এবং উপায়-উপকরণ কোন কাজে এল, আর না অন্য কোন সাহায্যকারীরা তাদের কোন সাহায্য করতে পারল।