ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূইযা-কীলা লাকুম তাফাছ ছাহূফিল মাজা-লিছি ফাফছাহূ ইয়াফছাহিল্লা-হু লাকুম ওয়া ইযা-কীলানশুঝূফানশুঝূইয়ারফা‘ইল্লা-হুল্লাযীনা আমানূমিনকুম ওয়াল্লাযীনা ঊতুল ‘ইলমা দারজা-তিও ওয়াল্লা-হু বিমা- তা‘মালূনা খাবীর।উচ্চারণ
হে ঈমানদারগণ! মজলিসে জায়গা করে দিতে বলা হলে জায়গা করে দিও, আল্লাহ তোমাদেরকে প্রশস্ততা দান করবেন। ২৬ আর যখন চলে যেতে বলা হবে, তখন চলে যেও। ২৭ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার ও যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাদের মর্যাদা আল্লাহ উন্নীত করবেন। ২৮ বস্তুত আল্লাহ তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত। তাফহীমুল কুরআন
হে মুমিনগণ! তোমাদেরকে যখন বলা হয়, মজলিসে অন্যদের জন্য স্থান সংকুলান করে দাও, তখন স্থান সংকুলান করে দিও। আল্লাহ তোমাদের জন্য স্থান সংকুলান করে দেবেন এবং যখন বলা হয়, উঠে যাও, তখন উঠে যেও। তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে ও যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় উন্নত করবেন। তোমরা যা-কিছু কর আল্লাহ সে সম্বন্ধে পরিপূর্ণ অবগত।মুফতী তাকী উসমানী
হে মু’মিনগণ! যখন তোমাদের বলা হয় মজলিসের স্থান প্রশস্ত করে দাও, তখন তোমরা স্থান করে দিবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য স্থান প্রশস্ত করে দিবেন এবং যখন বলা হয় উঠে যাও, তখন উঠে যাবে। তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় উন্নত করবেন; আল্লাহ লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন, তোমরা যা কর সেই সম্পর্কে আল্লাহ সবিশেষ অবহিত।মুজিবুর রহমান
মুমিনগণ, যখন তোমাদেরকে বলা হয়ঃ মজলিসে স্থান প্রশস্ত করে দাও, তখন তোমরা স্থান প্রশস্ত করে দিও। আল্লাহর জন্যে তোমাদের জন্য প্রশস্ত করে দিবেন। যখন বলা হয়ঃ উঠে যাও, তখন উঠে যেয়ো। তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দিবেন। আল্লাহ খবর রাখেন যা কিছু তোমরা কর।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
হে মু’মিনগণ! যখন তোমাদেরকে বলা হয়, মজলিসে স্থান প্রশস্ত করে দাও, তখন তোমরা স্থান করে দিও, আল্লাহ্ তোমাদের জন্যে স্থান প্রশস্ত করে দিবেন এবং যখন বলা হয়, ‘উঠে যাও’, তোমরা উঠে যেও। তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ্ তাদেরকে মর্যাদায় উন্নত করবেন; তোমরা যা কর আল্লাহ্ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
হে মুমিনগণ, তোমাদেরকে যখন বলা হয়, ‘মজলিসে স্থান করে দাও’, তখন তোমরা স্থান করে দেবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য স্থান করে দেবেন। আর যখন তোমাদেরকে বলা হয়, ‘তোমরা উঠে যাও’, তখন তোমরা উঠে যাবে। তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় সমুন্নত করবেন। আর তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত।আল-বায়ান
হে মু’মিনগণ! তোমাদেরকে যখন বলা হয়- ‘বৈঠক প্রশস্ত করে দাও’, তখন তোমরা তা প্রশস্ত করে দিবে, আল্লাহ তোমাদেরকে প্রশস্ততা দান করবেন। আর যখন বলা হয়- ‘তোমরা উঠে যাও’, তখন তোমরা উঠে যাবে। তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে আর যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় উচ্চ করবেন। তোমরা যা কর আল্লাহ তার খবর রাখেন।তাইসিরুল
ওহে যারা ঈমান এনেছ! যখন তোমাদের বলা হয় মজলিস-গুলোয় জায়গা করে দাও, তখন জায়গা করে দিয়ো, আল্লাহ্ তোমাদের জন্য জায়গা করে দেবেন। আর যখন বলা হয় উঠে দাঁড়াও, তখন উঠে দাঁড়িয়ো, তোমাদের মধ্যের যারা ঈমান এনেছে ও যাদের জ্ঞান দেওয়া হয়েছে আল্লাহ্ তাদের স্তরে স্তরে মর্যাদায় উন্নত করবেন। আর তোমরা যা করছ সে-সন্বন্ধে আল্লাহ্ চির-ওয়াকিফহাল।মাওলানা জহুরুল হক
২৬
সূরার ভূমিকায় এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কতক মুফাসসির এ আদেশকে শুধুমাত্র রসূল ﷺ এর মজলিসের মধ্যে সীমিত মনে করেছেন। তবে ইমাম মালেক প্রমূখের এ মতটিই সঠিক যে, মুসলমানদের সকল বৈঠকাদির জন্য এটি একটি স্থায়ী বিধি। আল্লাহ ও তাঁর রসূল মুসলিম জাতিকে যে সামাজিক রীতি-নীতি, আদব আখলাক ও আচার-ব্যবহার শিখিয়েছেন। এটি তার অন্যতম। আগে থেকে কিছু লোক বসে আছে এমন একটি মজলিসে যখন আরো কিছু লোক যোগ দেবে, তখন আগের সমবেত লোকদের মধ্যে এ সৌজন্য বোধ থাকা বাঞ্ছনীয় যে, স্বতপ্রবৃত্ত হয়ে নবাগতদের জন্য জায়গা করে দেবে এবং নিজেরা যথাসম্ভব চেপে বসে তাদের বসার সুযোগ করে দেবে। আবার নবাগতদের মধ্যেও এতটা ভদ্রতা থাকা উচিত যে, তারা যেন জোর জবরদস্তির সাথে ভেতরে না ঢোকে এবং একজনকে উঠিয়ে দিয়ে তার জায়গায় বসার চেষ্টা না করে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর ও হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত হাদীসে রসূল ﷺ বলেছেনঃ
لا يقيم الرجل الرجل من مجلسه فيجلس فيه ولكن تفسحوا وتوسعوا-
“কেউ যেন কাউকে উঠিয়ে তার জায়গায় না বসে। তোমরা বরং স্বেচ্ছায় অন্যদের জন্য জায়গা করে দাও।” (মুসনাদে আহমাদ, বুখারী, মুসলিম)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস বর্ণনা করেন যে, রসূল (সাঃ) বলেছেনঃ
لا يحل لرجل ان يفرق بين اثنين الا باذنهما
“দু’জনের মাঝখানে তাদের অনুমতি ছাড়া জোর পূর্বক চেপে বসা বৈধ নয়।” (মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী)
২৭
আবদুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম জানান যে, লোকেরা রসূল ﷺ এর মজলিসে দীর্ঘ সময় বসে থাকতো এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বসে থাকার চেষ্টা করতো। এতে অনেক সময় রসূল ﷺ এর কষ্ট হতো। তাঁর বিশ্রামের যেমন বিঘ্ন ঘটতো, তেমনি কাজকর্মেও অসুবিধার সৃষ্টি হতো। এজন্য এ আদেশ নাযিল হয় যে, যখন চলে যেতে বলা হয় তখন চলে যাও। (ইবনে জারীর ও ইবনে কাসীর)
২৮
অর্থাৎ এরূপ ভেবো না যে, রসূল ﷺ এর মজলিসে অন্যদেরকে জায়গা করে দিতে গিয়ে যদি তোমাদের তার কাছ থেকে একটু দূরে গিয়ে বসতে হয় তাহলে তোমাদের সম্মান হানি ঘটবে, কিংবা তোমাদেরকে চলে যেতে বলা হলে তোমাদের অবমাননা হবে। মর্যাদা বৃদ্ধির আসল উৎস হলো ঈমান ও ইসলামী জ্ঞান। রসূল ﷺ এর মজলিসে কে তাঁর কতটা নিকটে বসলো এবং কে কত বেশী সময় বসে কাটালো, তা দ্বারা কারো সম্মান নিরূপিত হয় না। কেউ যদি রসূল ﷺ এর খুব কাছাকাছি বসতে পারে। তাহলেই যে তার মর্যাদা বেড়ে যাবে তা নয়। মর্যাদা বাড়বে তারই যার ঈমান ও ইসলামী জ্ঞান বেশী হবে। অনুরূপভাবে কেউ যদি বেশী সময় বসে থেকে আল্লাহর রসূলকে বিব্রত করে তাহলে সে বরঞ্চ মূর্খতার কাজই করে। শুধুমাত্র রসুলের ﷺ কাছে অধিকতর মর্যাদা হবে সে ব্যক্তির যে রসূল ﷺ এর সাহচর্য দ্বারা ঈমান ও ইসলামী জ্ঞানের মত অমূল্য সম্পদ আহরণ করেছে এবং মু’মিন সুলভ স্বভাব ও চরিত্র অর্জন করেছে।
এ আয়াতের প্রেক্ষাপট নিম্নরূপ, একবার মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববীর চত্বরে, যাকে ‘সুফফা’ বলা হয়ে থাকে, অবস্থান করছিলেন। তার আশপাশে বহু সাহাবীও বসা ছিলেন। এ অবস্থায় আরও কয়েকজন সাহাবী এসে উপস্থিত হলেন, যারা বদরের যুদ্ধে শরীক ছিলেন এবং তাদের উচ্চ মর্যাদার অধিকারী মনে করা হত। মজলিসে বসার জায়গা না পেয়ে তাঁরা দাঁড়িয়ে থাকলেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মজলিসের লোকদেরকে বললেন, তারা যেন চাপাচাপি করে বসে আগন্তুকদেরকে বসার সুযোগ করে দেয়। তারপরও যখন তাদের বসার মত যথেষ্ট জায়গা হল না, তখন তিনি কাউকে কাউকে বললেন, তারা যেন উঠে জায়গা খালি করে দেয়। মজলিসে কিছু মুনাফেকও ছিল। তাদের কাছে বিষয়টা খারাপ লাগল। বসা লোককে উঠিয়ে অন্যকে বসতে দেওয়া হবে এটা তারা মানতে পারছিল না। বস্তুত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজের সাধারণ নিয়মও এরূপ ছিল না। সম্ভবত সে দিন মুনাফেকরা আগত সাহাবীগণকে বসতে দিতে কুণ্ঠাবোধ করছিল। আর সে কারণে তিনি তাদেরকে উঠিয়ে দিয়ে থাকবেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঐ আয়াত নাযিল হয়। এতে এক তো সাধারণ নিয়ম বলে দেওয়া হয়েছে যে, মজলিসে উপস্থিত লোকদের উচিত আগন্তুকদেরকে বসার সুযোগ করে দেওয়া। দ্বিতীয় হুকুম দেওয়া হয়েছে, মজলিস-প্রধান যদি আগন্তুকদের জন্য জায়গা খালি করার প্রয়োজন বোধ করেন, তবে আগে থেকে বসা লোকদেরকেও তিনি উঠে যাওয়ার হুকুম দিতে পারেন। আর তখন তাদের কর্তব্য হয়ে যাবে নিজেরা উঠে গিয়ে আগন্তুকদেরকে বসতে দেওয়া। তবে নতুন আগমনকারী নিজে থেকে কাউকে উঠিয়ে দেওয়ার এখতিয়ার রাখে না। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীসে এ রকমই শিক্ষা দিয়েছেন।
১১. হে ঈমানদারগণ! যখন তোমাদেরকে বলা হয়, মজলিসে স্থান প্রশস্ত করে দাও, তখন তোমরা স্থান প্রশস্ত করে দিও, আল্লাহ তোমাদের জন্য স্থান প্ৰশস্ত করে দেবেন।(১) আর যখন বলা হয়, উঠ, তখন তোমরা উঠে যাবে।(২) তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ্ তাদেরকে মর্যাদায় উন্নত করবেন; আর তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।(৩)
(১) বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মসজিদে মুনাফিকরা মজলিস পূর্ণ করে বসে থাকত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে আগন্তুকদের জন্য জায়গা করে দিতে বলতেন। কিন্তু তারা নির্বিকার থাকত। তখন আল্লাহ্ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করে তাদের সাবধান করে দেন। এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের কেউ যেন কাউকে উঠিয়ে দিয়ে সেখানে না বসে, বরং জায়গা করে দাও, আল্লাহও তোমাদের জন্য তা করে দেবেন।” (বুখারী: ৬২৭০, মুসলিম: ২১৭৭) ইসলাম মজলিসের সাথে সম্পর্কিত আরও কিছু শিষ্টাচার নির্ধারণ করে দিয়েছেন, যেমন: কেউ কারো জন্য নিজের বসার জায়গা ছেড়ে দিতে হবে না। বরং অন্যকে জায়গা করে দিবে। (মুসনাদে আহমাদ: ২/৩৩৮, ৪৮৩)
অন্য হাদীসে এসেছে, অপর কাউকে বসাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন। বরং তোমরা প্রশস্ত কর এবং বড় করে নাও” ৷ (বুখারী: ২৬৭০) তাই কোন ব্যক্তি আগমন করলে তার জন্য কি দাঁড়াতে হবে? এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে দ্বিমত আছে। কারও কারও মতে, আগমনকারীর জন্য দাঁড়ানোর অনুমতি আছে। তারা তাদের মতের সপক্ষে রাসূলের হাদীস “তোমরা তোমাদের নেতার প্রতি দাঁড়িয়ে যাও” (বুখারী: ৩০৪৩, মুসলিম: ১৭৬৮) কিন্তু অধিকাংশ আলেমগণ এটা করতে নিষেধ করেছেন, তাদের দলীল হলো, রাসূলের হাদীস, “কেউ যদি এটা পছন্দ করে যে, মানুষ তার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে, তবে সে যেন জাহান্নামে তার অবস্থান করে নিল।” (তিরমিযী: ২৭৫৫)
তারা পূর্ববর্তী হাদীসে উত্তরে বলেন, হাদীসের শব্দ হলো, (قُوْمُوْا إِلَى سَيِّدِكُمْ) যার অর্থ, তোমরা দাঁড়িয়ে তোমাদের নেতার প্রতি ধাবিত হও। এর অন্য বর্ণনায় এসেছে, (قُوْمُوْا إِلَى سَيِّدِكم فَأَنْزِلُوْه) অর্থাৎ “তোমরা তোমাদের নেতার প্রতি ধাবিত হয়ে তাকে নামিয়ে নাও” (মুসনাদে আহমাদ: ৬/১৪১–১৪২) এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট বুঝা গেল যে, এখানে তাকে ঘোড়া থেকে নামিয়ে নেয়ার জন্যই দাঁড়াতে বলা হয়েছে। কারণ; তিনি যুদ্ধে আহত হয়েছিলেন সে জন্য হাঁটতে অক্ষম ছিলেন। ফলে তাকে বাহন থেকে নামিয়ে নেয়ার প্রয়োজন ছিল। সুতরাং কারো জন্য দাঁড়ানোর পক্ষে শক্তিশালী কোন প্রমাণ নেই।
কোন কোন আলেম অবশ্য এ ব্যাপারে বিস্তারিত মতামত দিয়েছেন। তাদের মতে, সাধারণ অবস্থায় যেভাবে মানুষ মানুষকে দাঁড়াতে বাধ্য করে সেভাবে জায়েয নেই, তবে কেউ সফর থেকে আসলে বা কোনো ক্ষমতাশীলের ও তার সম্মানের দিকে খেয়াল রেখে দাঁড়িয়ে যাওয়া জায়েয এবং এটা হিকমতেরও চাহিদা। যেমনিভাবে সাহাবায়ে কিরাম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম সা'দ ইবনে মুআয এর মধ্যে তার নির্দেশ ও ফয়সালা বেশী গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর হয়। কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় কাউকে দেখলেই দাঁড়াতে হবে এটা শরীআত সমর্থিত নয়। বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, “সাহাবায়ে কিরামের নিকট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রিয় ব্যক্তি কেউ ছিলেন না। কিন্তু তিনি যখন মজলিসে আগমন করতেন তখন তারা দাঁড়াতো না, কারণ; তারা জানতো যে, তিনি তা অপছন্দ করেন।” (মুসনাদে আহমাদ: ৩/১৩২, তিরমিযী: ২৭৫৪)
এমনকি সাহাবায়ে কিরাম যখনই রাসূলের মজলিসে আসতেন তখনই তারা যেখানে বসা শেষ হয়েছে সেখানে বসতেন। (আবু দাউদ: ৪৮২৫, তিরযিময়ী: ২৭২৫) তবে সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে যারা রাসূলের নৈকট্যপ্ৰাপ্ত ছিলেন তারা আসলে স্বাভাবিকভাবেই সাহাবায়ে কিরাম তাদের জন্য জায়গা করে দিতেন। আর রাসূলই এ ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “তোমাদের মধ্যে যারা জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান তারা যেন আমার কাছে থাকে”। (মুসলিম: ৪৩২, আবু দাউদ: ৬৭৪) সে হিসেবে আবু বকর সাধারনত তার ডান পাশে, উমর বাম পাশে, উসমান ও আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম সামনে বসতেন। কারণ: তারা ওহী লিখতেন। তবে কোন ক্রমেই কারও অনুমতি ব্যতীত দু’জনের মাঝখানে বসে দু'জনের মধ্যে পৃথকীকরণ করা যাবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “কোন লোকের পক্ষে এটা জয়েয নয় যে, সে দু'জনের মাঝে পৃথকীকরণ করে বসবে তাদের অনুমতি ব্যতীত”। (আবু দাউদ: ৪৮৪৫, তিরমিযী: ২৭৫২, মুসনাদে আহমাদ: ২/২১৩)
(২) মুজাহিদ বলেন, এখানে “উঠ” বলে যাবতীয় কল্যাণকর কাজ করার জন্য নির্দেশ বুঝানো হয়েছে, অর্থাৎ যখনই তোমাদেরকে শত্রুর মোকাবিলায় দাঁড়াতে, অথবা সৎকাজ করতে বা কোন হক আদায় করতে বলা হয় তখনই তোমরা তা করতে সচেষ্ট হবে। কাতাদাহ বলেন, এর অর্থ যখনই তোমাদেরকে কোন কল্যাণকর কাজের আহবান জানানো হয় তখনই তোমরা তার প্রতি সাড়া দিও। (কুরতুবী)
(৩) অর্থাৎ কাউকে তার বসা থেকে সরে অন্যকে বসার জায়গা করে দেয়া বা রাসূল ও দ্বীনী নেতারা যদি কাউকে বের হতে বলে যদি তোমরা কর তবে এটা মনে করো না যে, এর দ্বারা তোমাদের সম্মানের কোন কমতি করা হচ্ছে বা তোমাদেরকে অবমুল্যায়ণ করা হচ্ছে। বরং আল্লাহর নিকট এ নির্দেশ পালনের মধ্যেই সম্মান ও মর্যাদা রয়েছে। আল্লাহ তার এ ত্যাগ কখনো খাটো করে দেখবেন না। তিনি তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে পুরস্কৃত করবেন। কেননা; যে কেউ মহান আল্লাহর দিক বিবেচনা করে বিনম্র হয় মহান আল্লাহ তার মর্যাদা বুলন্দ করে দেন। আর তার স্মরণকে উচু করে দেন। আর এ জন্যই পরবর্তী আয়াতাংশে বলা হয়েছে, “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় উন্নত করবেন। আর আল্লাহ তোমরা যা কর সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।” তিনি ভাল করেই জানেন কারা উচু মর্যাদা পাওয়ার অধিকারী আর কারা নয়। (ইবন কাসীর)
আবুত তোফায়েল আমের ইবনে ওয়াসিলা বলেন, উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু নাফে’ ইবনে হারেসকে উসফান নামক স্থানে দেখা পেলেন। তিনি তাকে মক্কার গভর্ণর নিযুক্ত করেছিলেন। উমর তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি উপত্যকাবাসী (মক্কা) এর উপর কাকে দায়িত্ব দিয়ে এসেছ? আমের বললেন, আমি ইবনে আবযার উপর তাদের দায়িত্ব দিয়েছি। উমর বললেন, ইবনে আবযা কে? তিনি বললেন, আমাদের এক দাস। উমর বললেন, তাদের উপর তুমি দাসকে দায়িত্বশীল করেছ? তিনি বললেন, হে আমিরুল মুমিনীন! সে আল্লাহর কিতাবের একজন সুপাঠক, ফারায়েজ সম্পর্কে পণ্ডিত ও বিচারক। তখন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, তাহলে শোন, আমি তোমাদের নবীকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ এ কুরআন দ্বারা কাউকে উচ্চ মর্যাদায় আসীন করবেন। আর কাউকে অধঃপতন ঘটাবেন।” (মুসলিম: ৮১৭)
(১১) হে বিশ্বাসীগণ! যখন তোমাদেরকে বলা হয়, ‘মজলিসে স্থান প্রশস্ত কর’, (1) তখন তোমরা প্রশস্ত করে দাও। আল্লাহ তোমাদের জন্য প্রশস্ততা দেবেন। (2) আর যখন বলা হয়, ‘উঠে যাও’, তখন তোমরা উঠে যাও। (3) তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে বহু মর্যাদায় উন্নত করবেন। (4) আর তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।
(1) এখানে মুসলিমদেরকে মজলিসের আদব শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। মজলিস একটি সাধারণ শব্দ যা এমন সকল মজলিসকেই বুঝানো হয়েছে, যেখানে মুসলিম কল্যাণ ও পুণ্য লাভের উদ্দেশ্যে একত্রিত হয়। তাতে তা ওয়ায-নসীহতের মজলিস (জলসা) হোক বা জুমআর মজলিস। (তাফসীর ক্বুরত্বুবী) ‘প্রশস্ত কর’ মানে (নড়ে-সরে বসে) মজলিসের জায়গা প্রশস্ত কর, যাতে পরে আগত ব্যক্তিদের জন্য বসার জায়গা থাকে। মজলিসের জায়গা এমন সংকীর্ণ করে রেখো না, যাতে পরে আগত ব্যক্তিদেরকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় অথবা কোন বসা মানুষকে উঠিয়ে বসতে হয়। আর এ দু’টি জিনিসই নৈতিকতার বিপরীত। যেহেতু রসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘‘কোন ব্যক্তি যেন অন্য ব্যক্তিকে তার স্থান থেকে উঠিয়ে সেখানে না বসে। বরং মজলিসের জায়গাকে প্রশস্ত করে নাও।’’
(বুখারীঃ জুমুআহ অধ্যায়, মুসলিমঃ সালাম অধ্যায়)
(2) অর্থাৎ, মহান আল্লাহ এর প্রতিদান স্বরূপ তোমাদেরকে জান্নাতে অতীব প্রশস্ত স্থান দান করবেন অথবা যেখানেই তোমরা প্রশস্ততা কামনা করবে, সেখানেই তিনি তা দান করবেন। যেমন, বাড়ীতে প্রশস্ততা, রুযীতে প্রশস্ততা এবং কবরে প্রশস্ততা। সব জায়গাতেই তোমাদেরকে প্রশস্ততা দান করবেন।
(3) অর্থাৎ, জিহাদের জন্য, নামাযের জন্য অথবা যে কোন ভাল কাজের জন্য। অথবা অর্থ হল, যখন মজলিস থেকে উঠে চলে যেতে বলা হবে, তখন সত্বর উঠে চলে যাও। মুসলিমদেরকে এ নির্দেশ এ জন্য দেওয়া হল যে, সাহাবায়ে কেরাম নবী (সাঃ)-এর মজলিস থেকে উঠে যাওয়া পছন্দ করতেন না। আর এতে এমন লোকদের অসুবিধা হত, যাঁরা নবী (সাঃ)-এর সাথে নির্জনে কোন কথা বলতে চাইতেন।
(4) অর্থাৎ, ঈমানদারদের মর্যাদা বেঈমানদারদের উপরে এবং (ঈমানদার) শিক্ষিতদের মর্যাদা (অশিক্ষিত) সাধারণ ঈমানদারদের থেকে অনেক উচ্চ করবেন। যার অর্থ হল, ঈমানের সাথে দ্বীনী জ্ঞান ও শিক্ষা থাকা অধিক মর্যাদা লাভের কারণ।