ওয়াল্লাযীনা ইউজা-হিরূনা মিন্নিছাইহিম ছু ম্মা ইয়া‘ঊদূ না লিমা-ক-লূফাতাহরীরু রকাবাতিম মিন কাবলি আইঁ ইয়াতামাছছা- যা-লিকুম তূ‘আজূনা বিহী ওয়াল্লাহু বিমা-তা‘মালূনা খাবীর।উচ্চারণ
যারা ৭ নিজের স্ত্রীর সাথে “যিহার” করে বসে এবং তারপর নিজের বলা সে কথা প্রত্যাহার করে ৮ এমতাবস্থায় তারা পরস্পরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি ক্রীতদাসকে মুক্ত করতে হবে। এর দ্বারা তোমাদের উপদেশ দেয়া হচ্ছে। ৯ তোমরা যা করো আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত। ১০ তাফহীমুল কুরআন
যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে জিহার করে, তারপর তারা তাদের সে কথা প্রত্যাহার করে নেয়, তাদের কর্তব্য একটি গোলাম আযাদ করা তারা (স্বামী-স্ত্রী) একে অন্যকে স্পর্শ করার আগে। এই উপদেশ তোমাদেরকে দেওয়া হচ্ছে। তোমরা যা-কিছু কর আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগত।মুফতী তাকী উসমানী
যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে ‘‘যিহার’’ করে এবং পরে তাদের উক্তি প্রত্যাহার করে, তাহলে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাস মুক্ত করতে হবে - এই নির্দেশ তোমাদেরকে দেয়া হল। তোমরা যা কর আল্লাহ তা সম্যক অবগত।মুজিবুর রহমান
যারা তাদের স্ত্রীগণকে মাতা বলে ফেলে, অতঃপর নিজেদের উক্তি প্রত্যাহার করে, তাদের কাফফারা এই একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাসকে মুক্তি দিবে। এটা তোমাদের জন্যে উপদেশ হবে। আল্লাহ খবর রাখেন তোমরা যা কর।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
যারা নিজেদের স্ত্রীগণের সঙ্গে যিহার করে এবং পরে এদের উক্তি প্রত্যাহার করে, তবে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাস মুক্ত করতে হবে, এটা দিয়ে তোমাদেরকে উপদেশ দেওয়া যাচ্ছে। তোমরা যা কর আল্লাহ্ তার খবর রাখেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
আর যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে ‘যিহার’ করে অতঃপর তারা যা বলেছে তা থেকে ফিরে আসে, তবে একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাস মুক্ত করবে। এর মাধ্যমে তোমাদেরকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। আর তোমরা যা কর, সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত।আল-বায়ান
যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে জিহার করে, অতঃপর তারা যে কথা বলেছে তা প্রত্যাহার করে নেয় তবে পরস্পরকে স্পর্শ করার পূর্বে তাদেরকে একটি দাস মুক্ত করতে হবে, এর দ্বারা তোমাদেরকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে। তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন।তাইসিরুল
আর যারা তাদের স্ত্রীদের থেকে 'যিহার’ করে, তারপর তারা যা বলেছে তা প্রত্যাহার করে, সেক্ষেত্রে একে-অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে একটি দাসের মুক্তিদান। এইটির দ্বারাই তোমাদের নির্দেশ দেওয়া হলো। আর তোমরা যা করছ সে-সন্বন্ধে আল্লাহ্ চির- ওয়াকিফহাল।মাওলানা জহুরুল হক
৭
এখান থেকে যিহারের আইনগত আদেশ নিষেধ শুরু হয়েছে। এসব বিধি-বিধান সঠিকভাবে উপলব্ধি করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র যুগে যিহারের যেসব ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল তা সামনে থাকা জরুরী। কেননা, যিহারের বিধি-বিধান সম্পর্কিত এসব আয়াত নাযিল হওয়ার পর সংঘটিত ঘটনাসমূহের ক্ষেত্রে নবী (সা.) যেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন তা থেকেই ইসলামে যিহার সম্পর্কিত বিস্তারিত বিধি-বিধান গৃহীত হয়েছে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের বর্ণনা অনুসারে আওস ইবনে সামেত আনসারীর ঘটনাই ইসলামে যিহার সম্পর্কিত সর্ব প্রথম ঘটনা। তাঁর স্ত্রী খাওলার ফরিয়াদের জওয়াবে আল্লাহ তা’আলা এসব আয়াত নাযিল করেছেন। বিভিন্ন বর্ণনাকারীর নিকট থেকে মুহাদ্দিসগণ এ ঘটনার যে বিস্তারিত বিবরণ উদ্ধৃত করেছেন তাতে অনেক খুঁটি-নাটি মতভেদ আছে। তবে আইনগত গুরুত্ব বহন করে এরূপ উপাদান সম্পর্কে সবাই প্রায় একমত। এসব বর্ণনার সারকথা হলো, বৃদ্ধাবস্থায় হযরত আওস ইবনে সামেত কিছুটা খিটমিটে মেজাজের হয়ে গিয়েছিলেন। কোন কোন বর্ণনা অনুসারে তার মধ্যে কতকটা পাগলামী ভাব সৃষ্টি হয়েছিল। এ বিষয়টি বুঝানোর জন্য বর্ণনাকারীগণ كان به لمم বাক্য ব্যবহার করেছেন। আরবী ভাষায় لمم শদ্ব দ্বারা পাগলামী বুঝানো হয় না, বরং এমন একটি অবস্থাকে বুঝানো হয় যাকে আমরা বাংলায়, “ক্রোধে পাগল হয়ে যাওয়া” কথাটি দ্বারা বুঝিয়ে থাকি। এ অবস্থায় তিনি পূর্বেও কয়েকবার স্ত্রীর সাথে যিহার করেছিলেন। কিন্তু স্ত্রীর সাথে ঝগড়া বিবাদ করে তার দ্বারা পুনরায় এ ঘটনা সংঘটিত হওয়া ছিল ইসলামে সর্ব প্রথম ঘটনা। এ ঘটনার পর তার স্ত্রী রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হাজির হয় এবং পূরা ঘটনা বর্ণনা করার পর বলেন হে আল্লাহর রসূল, আমার এবং আমার সন্তানাদির জীবনকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার কোন অবকাশ আছে কি? নবী (সা.) এর জওয়াব দিয়েছিলেন বিভিন্ন বর্ণনাকারী তা বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে উদ্ধৃত করেছেন। কোন কোন বর্ণনার ভাষা হলো, “এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমাকে কোন নির্দেশ দেয়া হয়নি।” কোন কোন বর্ণনার ভাষা হলো, “আমার ধারণা তুমি তার জন্য হারাম হয়ে গিয়েছো।” আবার কোন কোন বর্ণনায় আছে, তিনি বললেন, “তুমি তার জন্য হারাম হয়ে গিয়েছো।” এ জবাব শুনে তিনি কাকুতি ও আহাজারী করতে শুরু করলেন। তিনি বারবার নবীকে ﷺ বললেনঃ সে তো তালাকের শব্দ বলেনি। আপনি এমন কোন পন্থা বলুন যার দ্বারা আমি আমার সন্তানাদি এবং বুড়ো স্বামীর জীবন ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা পায়। কিন্তু নবী (সা.) প্রতিবার তাকে একই জবাব দিচ্ছিলেন। ইতিমধ্যে নবীর ﷺ ওপর অহী নাযিল হওয়ার অবস্থা দেখা দিল এবং এ আয়াতগুলো নাযিল হলো। এরপর তিনি তাকে বললেন, কোন কোন বর্ণনা অনুসারে তার স্বামীকে ডেকে বললেনঃ একটি ক্রীতদাসকে মুক্ত করতে হবে। সে এতে তার অক্ষমতা প্রকাশ করলে বললেনঃ লাগাতার দুইমাস রোযা রাখতে হবে। সে বললো তার অবস্থা এমন যে, দিনে তিনবার পানাহার না করলে তার দৃষ্টি শক্তি ক্ষীণতর হতে থাকে। তিনি বললেনঃ তাহলে ৬০ জন মিসকীনকে খাদ্য খাওয়াতে হবে। সে বললো তার সে সামর্থ্য নেই। তবে আপনি যদি সাহায্য করেন তাহলে পারবো। তিনি তাকে ৬০ জন মিসকীনকে দু’বার খাওয়ানোর মত খাদ্য দিলেন। বিভিন্ন রেওয়ায়াতে প্রদত্ত এ খাদ্যের বিভিন্ন পরিমাণ বর্ণনা করা হয়েছে। কোন কোন বর্ণনায় আছে, নবী (সা.) যে পরিমাণ খাদ্য দিয়েছিলেন হযরত খাওলা নিজেও তার স্বামীকে সে পরিমাণ খাদ্য দিয়েছিলেন যাতে তিনি কাফফারা আদায় করতে পারেন (ইবনে জারীর, মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, ইবনে আবী হাতেম)।
যিহারের দ্বিতীয় ঘটনা ছিল সালামা ইবনে সাখার বায়দীর ঘটনা। তাঁর যৌন শক্তি ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে কিছু বেশী। রমযান মাস আসলে সে আশঙ্কায় রমযানের শেষ অবধি সময়ের জন্য স্ত্রীর সাথে যিহার করলো যাতে রোযা অবস্থায় দিনের বেলায় অধৈর্যের কাজ করে না বসে। কিন্তু সে নিজের এ সংকল্প রক্ষা করতে পারেনি। এক রাতে সে স্ত্রীর কাছে চলে যায় এবং তারপর লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সব কিছু খুলে বলে। তিনি বললেন, একজন ক্রীতদাস মুক্ত করো। সে বললো, আমার কাছে আমার স্ত্রী ছাড়া আর কেউ নেই যাকে আমি মুক্ত করতে পারি। তিনি বললেন, একাধারে দুই মাস রোযা রাখো। সে বললো, রোযা অবস্থায় অধৈর্য হয়েই তো আমি এ মসিবতে জড়িয়ে পড়েছি। নবী (সা.) বললেন, তাহলে ৬০ জন মিসকীনকে খেতে দাও। সে বললো, আমি এত দরিদ্র যে, উপোস করে রাত কাটিয়েছি। তখন নবী (সা.) বনী যুরাইকের যাকাত আদায়কারীর নিকট থেকে তাকে একটা খাদ্য দিলেন যাতে সে তা ৬০ জন মিসকীনকে বণ্টন করে দিতে পারে এবং নিজের সন্তানাদির প্রয়োজন পূরণ করার জন্যও কিছু রাখতে পারে। (মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী)।
নাম উল্লেখ না করে তৃতীয় ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে যে, এক ব্যক্তি তার স্ত্রীর সাথে যিহার করলো এবং কাফফারা আদায় করার পূর্বেই তার সাথে সহবাস করলো। পরে নবী (সা.) এর কাছে এ বিষয়ের সমাধান জানতে চাইলে তিনি তাকে নির্দেশ দিলেন কাফফারা আদায় না করা পর্যন্ত স্ত্রীর নিকট থেকে দূরে থাকো। (আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে মাজাহ)।
চতুর্থ ঘটনাটি হলো, রসূলুল্লাহ ﷺ শুনলেন এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বোন সম্বোধন করে ডাকছে। এতে তিনি রাগান্বিতভাবে বললেনঃ সে কি তোমার বোন? তবে এটিকে তিনি যিহার হিসেবে গণ্য করলেন না। (আবু দাউদ)
এ চারটি ঘটনার নির্ভরযোগ্য বর্ণনা সূত্রে বর্ণিত হাদীসসমূহে পাওয়া যায়। পরবর্তী আয়াতসমূহে কুরআন মজীদের ‘যিহার’ সম্পর্কিত যে নির্দেশ আছে এসব হাদীসের সাহায্যে তা ভালভাবে বুঝা যেতে পারে।
৮
মূল আয়াতাংশ হচ্ছে, ثُمَّ يَعُودُونَ لِمَا قَالُوا । একথাটির শাব্দিক অনুবাদ হবে, “তারা যা বলেছে যদি সেদিকে ফিরে যায়” কিন্তু আরবী ভাষা ও বাকরীতি অনুসারে এর অর্থ নিরূপণে বড় রকমের মতভেদ হয়েছে।
এর একটি অর্থ হতে পারে, যিহারের শব্দাবলী একবার মুখ থেকে বের হওয়ার পর পুনরায় তা বলবে। জাহেরিয়া, বুকাইর ইবনুল আশাজ্জ এবং ইয়াহইয়া ইবনে যিহাদ আল ফাররা এ অর্থের সমর্থক। আতা ইবনে আবী রাবাহর একটি মতও এর সমর্থন করে বলে বর্ণিত হয়েছে। তাঁদের মতে একবার যিহার করলে তা ক্ষমার যোগ্য। তবে কেউ যদি বার বার তা করে তাহলে তাকে কাফফারা দিতে হবে। তবে দু’টি কারণে এ ব্যাখ্যা স্পষ্ট ভুল। একটি কারণ হলো, আল্লাহ তা’আলা যিহার অর্থহীন ও মিথ্যা কথা ঘোষণা করে তার জন্য শাস্তি নির্ধারণ করেছেন। এখন একথা কি কল্পনা করা যায় যে, কেউ একবার মিথ্যা এবং অর্থহীন কথা বললে তা মাফ হবে কিন্তু দ্বিতীয়বার বললে শাস্তির উপযুক্ত হবে? এটি ভুল হওয়ার দ্বিতীয় কারণ হলো, রসূলুল্লাহ ﷺ যিহারকারী কোন লোককেই একথা জিজ্ঞেস করেননি যে, সে একবার যিহার করেছে না দুইবার।
এ আয়তাংশের দ্বিতীয় অর্থ হলো, জাহেলী যুগে যেসব লোক এ কাজ করতে অভ্যস্ত ছিল তারা যদি ইসলামের যুগেও তা করে তাহলে এটা হবে তাদের শাস্তি। এক্ষেত্রে এর অর্থ হবে যিহার করা মূলত একটা শাস্তিযোগ্য কাজ। যে ব্যক্তিই তার স্ত্রীর উদ্দেশ্যে মুখ থেকে যিহারের শব্দাবলী উচ্চারণ করবে সে পরে তার স্ত্রীকে তালাক দিক বা তার স্ত্রী মারা যাক কিংবা সে তার স্ত্রীর সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক রক্ষা না করার সংকল্প করুক তাতে কিছু আসে যায় না। সর্বাবস্থায় তাকে কাফফারা দিতে হবে। ফকীহদের মধ্যে তাউস, মুহাজিদ, শা’বী যুহরী, সুফিয়ান সাওরী এবং কাতাদা এমত পোষণ করেছেন। তাঁদের মতে যিহার করার পর স্ত্রী যদি মারা যায় তাহলে কাফফারা আদায় না করা পর্যন্ত স্বামী তার পরিত্যক্ত সম্পদের উত্তরাধীকারী হবে না।
এ আয়াতাংশের তৃতীয় অর্থ হচ্ছে, যিহারের শব্দাবলী মুখ থেকে উচ্চারণের পর ব্যক্তি যা বলেছে তা প্রত্যাহার করে এবং যদি তার প্রতিকার করতে চায়। অন্য কথায় عَادَ لِمَا قَالَ অর্থ সে যদি তার কথা থেকে ফিরে যায়।
এর চতুর্থ অর্থ হলো, যিহার করার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তার জন্য যে জিনিস হারাম করে নিয়েছিল তা যদি আবার নিজের জন্য হালাল করে নিতে চায়। অন্য কথায় عَادَ لِمَا قَالَ অর্থ হচ্ছে, যে ব্যক্তি হারাম করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এখন সে পুনরায় তা হালাল করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অধিকাংশ ফিকাহবিদ শেষোক্ত দু’টি অর্থের মধ্যে যে কোন একটিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
৯
অন্য কথায় তোমাদেরকে শিষ্ট ও ভদ্র আচরণ শিখানোর জন্য এ নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যাতে মুসলিম সমাজের মানুষ এ জাহেলী কু আচরণ পরিত্যাগ করে এবং তোমাদের মধ্য থেকে কেউই যেন এ অর্থহীন কাজ না করে। যদি স্ত্রীর সাথে বিবাদ না করে কোন উপায় না থাকে তাহলে সভ্য ও রুচিশীল মানুষের মত বিবাদ করো। যদি তালাকই দিতে হয় তাহলে সরাসরি তালাক দিয়ে দাও। স্ত্রীর সাথে বিবাদ হলে তাকে মা অথবা বোন বানিয়ে ছাড়তে হবে এটা কি ধরনের ভদ্রতা?
১০
অর্থাৎ কেউ যদি বাড়িতে স্ত্রীর সাথে চুপে চুপে যিহার করে বসে এবং পরে কাফফারা আদায় করা ছাড়াই স্বামী স্ত্রীর মধ্যে আগের মতই দাম্পত্য সম্পর্ক চলতে থাকে তাহলে সে সম্পর্কে দুনিয়াতে কেউ অবহিত থাক আর না থাক আল্লাহ সর্বাবস্থায়ই তা জানেন। তার জন্য আল্লাহর পাকড়াও থেকে রক্ষা পাওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়।
এবার জিহারের বিধান জানানো হচ্ছে। জিহার করার পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার অন্তরঙ্গ কার্যাবলী, যথা চুম্বন, আলিঙ্গন, সহবাস ইত্যাদি জায়েয থাকে না। হাঁ, জিহার প্রত্যাহার করে নিলে পূর্বেকার অবস্থা ফিরে আসে এবং এসব আবার জায়েয হয়ে যায়। তবে সেজন্য কাফফারা দেওয়া জরুরি। কী কাফফারা দিতে হবে? আয়াতে বলা হয়েছে, কারও পক্ষে যদি একটি গোলাম আযাদ করা সম্ভব হয়, তবে তাকে গোলাম আযাদের দ্বারা কাফফারা আদায় করতে হবে। যদি কোন ব্যক্তির পক্ষে তা সম্ভব না হয়, (যেমন আজকাল গোলামের কোন অস্তিত্বই নেই) তবে তাকে একটানা দু’মাস রোযা রাখতে হবে। আর যদি বার্ধক্য, অসুস্থতা ইত্যাদির কারণে কারও পক্ষে রোযা রাখাও সম্ভব না হয়, তবে সে ষাটজন মিসকীনকে দু’বেলা পেট ভরে খানা খাওয়াবে; এর দ্বারাও কাফফারা আদায় হয়ে যাবে। কাফফারা আদায়ের পর স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য হালাল হয়ে যায়।
৩. আর যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে এবং পরে তাদের উক্তি প্রত্যাহার করে(১), তবে একে অন্যকে স্পর্শ করার আগে একটি দাস মুক্ত করতে হবে, এ দিয়ে তোমাদেরকে উপদেশ দেয়া যাচ্ছে। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত।
(১) ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা يَعُودُونَ শব্দের অর্থ করেছেন يندمون অর্থাৎ একথা বলার পর তারা অনুতপ্ত হয় এবং স্ত্রীর সাথে মেলামেশা করতে চায়। (দেখুন: বাগভী) এই আয়াত থেকে আরও জানা গেল যে, স্ত্রীর সাথে মেলামেশা হালাল হওয়ার উদ্দেশ্যেই কাফফারা ওয়াজিব হয়েছে। খোদ যিহার কাফফারার কারণ নয়। বরং যিহার করা এমন গোনাহ, যার কাফ্ফারা হচ্ছে তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। আয়াত শেষে (وَإِنَّ اللَّهَ لَعَفُوٌّ غَفُورٌ) বলে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। তাই কোনো ব্যক্তি যদি যিহার করার পর স্ত্রীর সাথে মেলামেশা করতে না চায়, তবে কোনো কাফফারা দিতে হবে না। তবে স্ত্রীর অধিকার ক্ষুন্ন করা না জায়েয। স্ত্রী দাবী করলে কাফফারা আদায় করে মেলামেশা করা অথবা তালাক দিয়ে মুক্ত করা ওয়াজিব। স্বামী স্বেচ্ছায় এরূপ না করলে স্ত্রী আদালতে রুজু হয়ে স্বামীকে এরূপ করতে বাধ্য করতে পারে। (দেখুন: কুরতুবী)
(৩) যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে ‘যিহার’ করে এবং পরে তাদের উক্তি প্রত্যাহার করে,(1) তাহলে (এর প্রায়শ্চিত্ত) একে অপরকে স্পর্শ করার পূর্বে(2) একটি দাসের মুক্তিদান। এর দ্বারা তোমাদেরকে সদুপদেশ দেওয়া হচ্ছে। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তার খবর রাখেন।
(1) এখন এই বিধানকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হচ্ছে। রুজু’ বা প্রত্যাহার করা মানেঃ স্ত্রীর সাথে সহবাস করতে চাওয়া।
(2) অর্থাৎ, সহবাস করার পূর্বে কাফফারা আদায় করবে। (ক) একটি ক্রীতদাস স্বাধীন করবে। (খ) তা না পারলে লাগাতার কোন বিরতি ছাড়াই দু’ মাস রোযা রাখবে। যদি রাখতে রাখতে মধ্যখানে কোন শরীয়তী কারণ ছাড়াই রোযা বন্ধ করে দেয়, তাহলে পুনরায় আবার নতুনভাবে প্রথম থেকে দু’ মাসের রোযা পূর্ণ করতে হবে। আর শরীয়তী কারণ বলতে যেমন, অসুস্থতা বা সফরে যাওয়া ইত্যাদি। (গ) যদি লাগাতার দু’মাস রোযা রাখতে না পারে, তবে ষাটজন মিসকীনকে (এক বেলা) আহার করাবে। কেউ কেউ বলেন, প্রত্যেক মিসকীনকে দুই মুদ্দ (অর্ধসা’ অর্থাৎ, সওয়া এক কিলো), আবার কেউ বলেন, এক মুদ্দ (গম বা চাল) দিলেই যথেষ্ট হবে। তবে কুরআনের আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, খাবার পেটপুরে খাওয়াতে হবে অথবা পেট ভরে যায় এতটা পরিমাণ খাদ্য দিতে হবে। অনুরূপ সকল মিসকীনকে একই সাথে খাওয়ানোও জরুরী নয়, বরং একাধিক কিস্তীর মাধ্যমে এ সংখ্যা পূরণ করা যেতে পারে। (ফাতহুল ক্বাদীর) তবে এটা জরুরী যে, যতক্ষণ না নির্দিষ্ট সংখ্যা পূরণ হয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রীর সাথে সহবাস করা জায়েয হবে না।