ছানাফরুগু লাকুম আইয়ুহাছছাকালা-ন।উচ্চারণ
ওহে পৃথিবীর দুই বোঝা ২৯ তোমাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আমি অতি শীঘ্রই তোমাদের প্রতি একাগ্রভাবে মনোনিবেশ করবো। ৩০ তাফহীমুল কুরআন
ওহে দুই ওজনদার সৃষ্টি! আমি শীঘ্রই তোমাদের (হিসাব নেওয়ার) জন্য মুক্ত হয়ে যাব। মুফতী তাকী উসমানী
হে মানুষ ও জিন! আমি শীঘ্রই তোমাদের প্রতি মনোনিবেশ করব।মুজিবুর রহমান
হে জিন ও মানব! আমি শীঘ্রই তোমাদের জন্যে কর্মমুক্ত হয়ে যাব।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
হে মানুষ ও জিন! আমি শীঘ্রই তোমাদের প্রতি মনোনিবেশ করব, ইসলামিক ফাউন্ডেশন
হে মানুষ ও জিন, আমি অচিরেই তোমাদের (হিসাব-নিকাশ গ্রহণের) প্রতি মনোনিবেশ করব।আল-বায়ান
(দায়িত্বের) ভারে ভারাক্রান্ত ওহে (জ্বিন ও মানুষ) দু’ (জাতি)! অতি শীঘ্র (কর্মমুক্ত হয়ে তোমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য) আমি তোমাদের প্রতি মনোনিবেশ করব,তাইসিরুল
অবিলন্বে আমরা তোমাদের বিষয়ে হিসেব-নিকেশ নেব, হে দুই বৃহৎশক্তিবর্গ!মাওলানা জহুরুল হক
২৯
মূল আয়াতে ছাকালান ثقلان শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর মূল ধাতু ثقل। ثقل অর্থ বোঝা। আর ثقل বলা হয় এমন বোঝাকে যা সওয়ারী বা বাহনের ওপর চাপানো হয়েছে ثقل শব্দের শাব্দিক অনুবাদ হবে “দুই বোঝা” এখানে এ শব্দটি জ্বীন ও মানুষকে বুঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ, এ দু’টি জাতিকেও পৃথিবী পৃষ্ঠে বোঝা হিসেবে চাপানো হয়েছে এবং পূর্ব থেকে সেই সব জ্বীন ও মানুষকে উদ্দেশ্য করেই কথা বলা হচ্ছে, যারা তাদের রবের আনুগত্য ও দাসত্ব থেকে বিচ্যুত হয়েছে। তাছাড়া পরবর্তী ৪৫ আয়াতেও তাদেরকেই সম্বোধন করা হয়েছে। সেজন্য তাদেরকে ايها الثقلان বলে সম্বোধন করা হয়েছে। অর্থাৎ স্রষ্টা যেন তাঁর এই দু’টি অযোগ্য সৃষ্টিকে বলছেনঃ তোমরা যারা আমার পৃথিবীর ওপর বোঝা হয়ে আছ, তোমাদের সাথে বুঝাপড়ার জন্য অবসর গ্রহণ করবো।
৩০
এখন আল্লাহ তা’আলা এমন ব্যস্ত যে এসব অবাধ্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করার অবকাশ তিনি পান না, একথার অর্থ তা নয়। প্রকৃতপক্ষে একথার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ একটি বিশেষ সময়সূচী নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। সেই সময়সূচী অনুসারে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তিনি এ পৃথিবীতে মানুষ ও জিনদের বংশের পর বংশ সৃষ্টি করতে থাকবেন এবং তাদেরকে পৃথিবীর এ পরীক্ষাগারে এনে কাজ করার সুযোগ দেবেন। তারপর একটা নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষার এ ধারা হঠাৎ বন্ধ করে দেয়া হবে এবং সে সময়ে বিদ্যমান সমস্ত জ্বীন ও মানুষকে একই সময়ে হঠাৎ ধ্বংস করে দেয়া হবে। তারপর মানব ও জিন উভয় জাতির জবাবদিহির জন্য তার কাছে আরো একটি সময় নির্দিষ্ট করা আছে। সেই সময় জ্বীন ও মানব জাতির সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ লোকদেরকে পুনরায় জীবিত করে একই সময় একত্রিত করা হবে। এ সময়সূচীর প্রতি লক্ষ রেখে বলা হয়েছে, এখনো আমি প্রথম পর্যায়ের কাজ করছি। দ্বিতীয় পর্যায়ের সময় এখনো আসেনি। তাই তৃতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু করার কোন প্রশ্নই আসে না। তবে ঘাবড়াবেন না। খুব শীঘ্রই সে সময়টি এসে যাচ্ছে যখন আমি তোমাদের খবর নেয়ার জন্য অবসর নেব। এখানে অবসরহীনতার অর্থ এই নয় যে, এখন কোন কাজ আল্লাহ তা’আলাকে এমনভাবে ব্যস্ত রেখেছে যে, অন্য কাজ করার অবকাশই তিনি পাচ্ছেন না। বরং এর ধরন ও প্রকৃতি হচ্ছে, যেমন কেউ বিভিন্ন কাজ সম্পাদনের জন্য একটি সময়সূচী প্রস্তুত করে রেখেছেন এবং সেই অনুসারে যে কাজের সময় এখনো আসেনি সে কাজ সম্পর্কে বলছেন, আমি সে কাজের জন্য আদৌ প্রস্তুত নই।
এখানে ‘মুক্ত হওয়া’ কথাটি প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। বোঝানো হচ্ছে, এখন তো আল্লাহ তাআলা জগতের অন্যান্য কাজ আঞ্জাম দিচ্ছেন। এখন তিনি হিসাব গ্রহণের দিকে মনোযোগ দেননি। তবে সেই সময় আসন্ন, যখন তিনি হিসাব গ্রহণের দিকে মনোযোগী হবেন। প্রকাশ থাকে যে, ৪৪ নং আয়াত পর্যন্ত জাহান্নামীদের আযাব সম্পর্কে আলোচনা। অথচ তার সাথেও প্রতিটি স্থানে বলা হয়েছে, ‘সুতরাং তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নি‘আমত অস্বীকার করবে?’ প্রশ্ন হয় এক্ষেত্রে নি‘আমত কী? উত্তর এই যে, আল্লাহ তাআলা যে সেই বিভীষিকাময় শাস্তি সম্পর্কে আগেই সতর্ক করে দিয়েছেন, এটাই তার এক বিরাট নি‘আমত। তোমরা এ নি‘আমত অস্বীকার করো না। তাছাড়া এই যে শাস্তির কথা বলা হচ্ছে, এটা আল্লাহ তাআলার নি‘আমতকে অস্বীকার করার পরিণাম। এ পরিণাম জানা সত্ত্বেও কি তোমরা তার নি‘আমতসমূহ অস্বীকার করে যাবে?
৩১. হে মানুষ ও জিন্ন! আমরা অচিরেই তোমাদের (হিসাব নিকাশের) প্রতি মনোনিবেশ করব(১),
(১) ثقلان শব্দটি ثقل এর দ্বি-বচন। যে বস্তুর ওজন ও মূল্যমান সুবিদিত, আরবী ভাষায় তাকে ثقل বলা হয়। এখানে মানব ও জিন জাতিদ্বয় বুঝানো হয়েছে। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِنِّىْ تَارِكٌ فِيْكُم الثَّقَلَيْنِ অর্থাৎ আমি দুটি ওজনবিশিষ্ট ও সম্মানার্হ বিষয় ছেড়ে যাচ্ছি। (মুসনাদে আহমাদ: ৪/৩৭১) আলোচ্য আয়াতে জিন ও মানব জাতিকে এই অর্থের দিকে দিয়েই ثقلان বলা হয়েছে। কারণ পৃথিবীতে যত প্রাণী বসবাস করে, তাদের মধ্যে জিন ও মানব সৰ্বাধিক ওজন বিশিষ্ট ও সম্মানার্হ। سنفرغ শব্দটি فراغ থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ কর্মমুক্ত হওয়া। এর বিপরীত কর্মব্যস্ততা। فراغ শব্দ থেকে দুটি বিষয় বুঝা যায়- (এক) পূর্বে কোন কাজে ব্যস্ত থাকা এবং (দুই) এখন সেই কাজ সমাপ্ত করে কর্মমুক্ত হওয়া। উভয় বিষয় সৃষ্টজীবের মধ্যে প্রসিদ্ধ ও সুবিদিত। (কুরতুবী) ইবনুল আরাবী, আবু আলী আল-ফারেসী প্রমুখের মতে এখানে কর্মব্যস্ততা উদ্দেশ্য। (ফাতহুল কাদীর)
(৩১) হে মানুষ ও জ্বিন! আমি শীঘ্রই তোমাদের (হিসাব-নিকাশের) জন্য অবসর গ্রহণ করব। (1)
(1) এর অর্থ এই নয় যে, আল্লাহর অবসর বা অবকাশ নেই। বরং (মানুষের চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী) এটা একটি কথার কথা বলা হয়েছে। যার উদ্দেশ্য ধমক ও ভীতি-প্রদর্শন; অর্থঃ মনোনিবেশ করব। ثَقَلاَنِ (মানুষ ও জ্বিনকে) এই কারণে বলা হয়েছে যে, তাদের উপর শরীয়তের সমস্ত কিছুর ভার ও দায়িত্ব চাপানো হয়েছে। পক্ষান্তরে এই ভার ও বোঝ থেকে অন্য সৃষ্টি মুক্ত।