يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ إِن جَآءَكُمۡ فَاسِقُۢ بِنَبَإٖ فَتَبَيَّنُوٓاْ أَن تُصِيبُواْ قَوۡمَۢا بِجَهَٰلَةٖ فَتُصۡبِحُواْ عَلَىٰ مَا فَعَلۡتُمۡ نَٰدِمِينَ

ইয়াআইয়ুহাল্লাযীনা আ-মানূইন জাআকুম ফা-ছিকু ম বিনাবাইন ফাতাবাইয়ানূআন তুসীবূকাওমাম বিজাহা-লাতিন ফাতুসবিহূ‘আলা-মা-ফা‘আলতুম না-দিমীন।উচ্চারণ

হে ঈমান গ্রহণকারীগণ, যদি কোন ফাসেক তোমাদের কাছে কোন খবর নিয়ে আসে তাহলে তা অনুসন্ধান করে দেখ। এমন যেন না হয় যে, না জেনে শুনেই তোমরা কোন গোষ্ঠীর ক্ষতি করে বসবে এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে। তাফহীমুল কুরআন

হে মুমিনগণ! কোন ফাসেক যদি তোমাদের কাছে কোন সংবাদ নিয়ে আসে, তবে ভালোভাবে যাচাই করে দেখবে, যাতে তোমরা অজ্ঞতাবশত কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বস। ফলে নিজেদের কৃতকর্মের কারণে তোমাদেরকে অনুতপ্ত হতে হয়।মুফতী তাকী উসমানী

হে মু’মিনগণ! যদি কোন পাপাচারী তোমাদের নিকট কোন বার্তা আনয়ণ করে, তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে যাতে অজ্ঞতা বশতঃ তোমরা কোন সম্প্রদায়কে ক্ষতিগ্রস্ত না কর এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।মুজিবুর রহমান

মুমিনগণ! যদি কোন পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোন সংবাদ আনয়ন করে, তবে তোমরা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশতঃ তোমরা কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত না হও।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

হে মু’মিনগণ! যদি কোন পাপাচারী তোমাদের নিকট কোন বার্তা আনয়ন করে, তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে, পাছে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোন সম্প্রদায়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে বস, এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্যে তোমাদেরকে অনুতপ্ত হতে হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশন

হে ঈমানদারগণ, যদি কোন ফাসিক তোমাদের কাছে কোন সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা যাচাই করে নাও। এ আশঙ্কায় যে, তোমরা অজ্ঞতাবশত কোন কওমকে আক্রমণ করে বসবে, ফলে তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।আল-বায়ান

হে মু’মিনগণ! কোন পাপাচারী যদি তোমাদের কাছে কোন খবর নিয়ে আসে, তাহলে তার সত্যতা যাচাই করে লও, তা না হলে তোমরা অজ্ঞতাবশতঃ কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে বসবে, অতঃপর তোমরা যা করেছ সেজন্য তোমাদেরকে অনুতপ্ত হতে হবে।তাইসিরুল

ওহে যারা ঈমান এনেছ! যদি কোনো সত্যত্যাগী কোনো খবর নিয়ে তোমাদের কাছে আসে তখন তোমরা যাচাই করে দেখবে, পাছে অজানতে তোমরা কোনো লোকদলকে আঘাত করে বস, আর পরক্ষণেই দুঃখ কর তোমরা যা করেছ সেজন্য।মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

অধিকাংশ মুফাসসিরদের মতে এ আয়াতটি ওয়ালিদ ইবনে উকবা আবী মু’আইত সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। এর পটভূমি হচ্ছে, বনী মুসতালিক গোত্র মুসলমান হলে রসূলুল্লাহ ﷺ তাদের থেকে যাকাত আদায় করে আনার জন্য ওয়ালীদ ইবনে উকবাকে পাঠালেন। সে তাদের এলাকায় পৌঁছে কোন কারণে ভয় পেয়ে গেল এবং গোত্রের লোকদের কাছে না গিয়েই মদীনায় ফিরে গিয়ে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এ বলে অভিযোগ করলো যে, তারা যাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছে। এ খবর শুনে নবী (সা.) অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হলেন এবং তাদের শায়েস্তা করার জন্য এক দল সেনা পাঠাতে মনস্থ করলেন। কোন কোন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি সেনাদল পাঠিয়েছিলেন এবং কোন কোনটিতে বর্ণিত হয়েছে যে, পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। মোটকথা, এ বিষয়েই সবাই একমত যে, এ সময় বনী মুসতালিক গোত্রের নেতা হারেস ইবনে দ্বেরার (উম্মুল মু’মিনীন হযরত জুয়াইরিয়ার পিতা) এক প্রতিনিধি দল নিয়ে নবীর ﷺ খেদমতে হাজির হন। তিনি বললেনঃ আল্লাহর কসম যাকাত দিতে অস্বীকৃতি এবং ওয়ালীদকে হত্যা করার চেষ্টা তো দূরের কথা তার সাথে আমাদের সাক্ষাত পর্যন্ত হয়নি। আমরা ঈমানের ওপর অবিচল আছি এবং যাকাত প্রদানে আদৌ অনিচ্ছুক নই। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে এ আয়াত নাযিল হয়। এ ঘটনাটি ইমাম আহমাদ, ইবনে আবী হাতেম, তাবারানী এবং ইবনে জারীর সামান্য শাব্দিক পার্থক্যসহ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, হারেস ইবনে দ্বেরার মুজাহিদ, কাতাদা, আব্দুর রহমান ইবনে আবী লায়লা, ইয়াযীদ, ইবনে রূমান, দ্বহহাক এবং মুকাতিল ইবনে হাইয়ান থেকে উদ্ধৃত করেছেন। হযরত উম্মে সালামা বর্ণিত হাদীসে পুরো ঘটনাটি এভাবেই বর্ণিত হয়েছে। তবে সেখানে সুস্পষ্টভাবে ওয়ালিদের নামের উল্লেখ নেই।

এ নাজুক পরিস্থিতিতে যখন একটি ভিত্তিহীন খবরের ওপর নির্ভর করার কারণে একটি বড় ভুল সংঘটিত হওয়ার উপক্রম হয়েছিলো, সে মুহূর্তে আল্লাহ তা’আলা মুসলমানদেরকে এ মৌলিক নির্দেশটি জানিয়ে দিলেন যে, যখন তোমরা এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ খবর পাবে যার ভিত্তিতে বড় রকমের কোন ঘটনা সংঘটিত হতে পারে, তখন তা বিশ্বাস করার পূর্বে খবরের বাহক কেমন ব্যক্তি তা যাঁচাই করে দেখো। সে যদি কোন ফাসেক লোক হয় অর্থাৎ যার বাহ্যিক অবস্থা দেখেই প্রতীয়মান হয় যে, তার কথা নির্ভরযোগ্য নয় তাহলে তার দেয়া খবর অনুসারে কাজ করার পূর্বে প্রকৃত ঘটনা কি তা অনুসন্ধান করে দেখো। আল্লাহর এ হুকুম থেকে শরীয়াতের একটি নীতি পাওয়া যায় যার প্রয়োগ ক্ষেত্র অত্যন্ত ব্যাপক। এ নীতি অনুসারে যার চরিত্র ও কাজ-কর্ম নির্ভরযোগ্য নয় এমন কোন সংবাদদাতার সংবাদের ওপর নির্ভর করে কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা জাতির বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ ইসলামী সরকারের জন্য বৈধ নয়। এ নীতির ভিত্তিতে হাদীস বিশারদগণ হাদীস শাস্ত্রে, “জারহ ও তা’দীল” --এর নীতি উদ্ভাবন করেছেন। যাতে যাদের মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসমূহ পরবর্তী বংশধরদের কাছে পৌঁছেছিলো তাদের অবস্থা যাঁচাই বাছাই করতে পারেন। তাছাড়া সাক্ষ্য আইনের ক্ষেত্রে ফকীহগণ নীতি নির্ধারণ করেছেন যে, এমন কোন ব্যাপারে ফাসেক ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না যার দ্বারা শরীয়াতের কোন নির্দেশ প্রমাণিত হয় কিংবা কোন মানুষের ওপর কোন অধিকার বর্তায়। তবে এ ব্যাপারে পণ্ডিতগণ একমত যে, সাধারণ পার্থিব ব্যাপারে প্রতিটি খবরই যাঁচাই ও অনুসন্ধান করা এবং খবরদাতার নির্ভরযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া জরুরী নয়। কারণ আয়াতে نيأ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এ শব্দটি সব রকম খবরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, শুধু গুরুত্বপূর্ণ খবরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এ কারণে ফকীহগণ বলেন, সাধারণ এ খুঁটিনাটি ব্যাপারে এ নীতি খাটে না। উদাহরণস্বরূপ আপনি কারো কাছে গেলেন এবং বাড়ীতে প্রবেশ করার অনুমতি চাইলেন। বাড়ীর ভিতর থেকে কেউ এসে বললো, আসুন। এক্ষেত্রে আপনি তার কথার ওপর নির্ভর করে প্রবেশ করতে পারেন। বাড়ীর মালিকের পক্ষ থেকে অনুমতির সংবাদদাতা সৎ না অসৎ এক্ষেত্রে তা দেখার প্রয়োজন নেই। অনুরূপ ফকীহগণ এ ব্যাপারেও একমত যেসব লোকের ফাসেকী মিথ্যাচার ও চারিত্রিক অসততার পর্যায়ের নয়, বরং আকীদা-বিকৃতির কারণে ফাসেক বলে আখ্যায়িত তাদের সাক্ষ্য এবং বর্ণনাও গ্রহণ করা যেতে পারে। শুধু আকীদা খারাপ হওয়া তাদের সাক্ষ্য ও বর্ণনা গ্রহণ করার ব্যাপারে প্রতিবন্ধক নয়।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

এ আয়াতের শানে নুযুল সম্পর্কে হাফেজ ইবনে জারীর (রহ.) ও অন্যান্য মুফাসসিরগণ একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। ঘটনাটির সারমর্ম নিম্নরূপ, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ওয়ালীদ ইবনে উকবা (রাযি.)কে আরবের বিখ্যাত গোত্র বনু মুস্তালিকের কাছে যাকাত উসুল করার জন্য পাঠিয়েছিলেন। তিনি যখন তাদের কাছাকাছি পৌঁছলেন, দেখতে পেলেন লোকালয়ের বাইরে তাদের বহু লোক জড়ো হয়ে আছে। আসলে তারা এসেছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেরিত দূত হিসেবে তাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য। কিন্তু ওয়ালীদ ইবনে উকবা (রাযি.) মনে করলেন, তারা হামলা করার জন্য বের হয়ে এসেছে। কোন কোন বর্ণনায় আছে, তাঁর ও বনু মুস্তালিকের মধ্যে জাহেলী যুগে কিছুটা শত্রুতাও ছিল। তাই হযরত ওয়ালীদ (রাযি.)-এর ভয় হল তারা সেই পুরানো শত্রুতার জের ধরে তাকে আক্রমণ করবে। সুতরাং তিনি মহল্লায় প্রবেশ না করে সেখান থেকেই মদীনা মুনাওয়ারায় ফিরে আসলেন এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানালেন, বনু মুস্তালিক যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত খালেদ ইবনুল ওয়ালীদ (রাযি.)কে ঘটনা তদন্ত করে দেখতে বললেন এবং নির্দেশ দিলেন, যদি প্রমাণিত হয় সত্যিই তারা অবাধ্যতা করেছে, তবে তাদের সাথে জিহাদ করবে। তদন্ত করে দেখা গেল, আসলে তারা অভ্যর্থনা জানানোর জন্য বের হয়েছিল। যাকাত দিতে তারা আদৌ অস্বীকার করেনি। তারই পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়াত নাযিল হয়েছে। উপরিউক্ত বর্ণনার ভিত্তিতে কেউ কেউ বলেন, আয়াতে যে ফাসেক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, তার দ্বারা ওয়ালীদ ইবনে উকবা (রাযি.)কে বোঝানো হয়েছে। প্রশ্ন ওঠে যে, একজন সাহাবীকে ‘ফাসেক’ সাব্যস্ত করলে তা দ্বারা তো সাহাবায়ে কেরামের ‘আদালত’ (বিশ্বস্ততা)-এর বিষয়টা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু এর উত্তর দেওয়া হয়েছে যে, কোন কোন সাহাবীর দ্বারা কদাচিৎ গুনাহ হয়ে গেলেও তাদেরকে তাওবার তাওফীক দেওয়া হয়েছে। কাজেই তা দ্বারা সমষ্টিগতভাবে তাদের আদালত নষ্ট হয়ে যায় না। তবে বাস্তব কথা হল, এ ঘটনা সম্পর্কে যেসব বর্ণনা পাওয়া যায়, প্রথমত তা সনদের দিক থেকে শক্তিশালী নয়, তাও আবার একেক বর্ণনা একেক রকমের। দ্বিতীয়ত এ ঘটনার ভিত্তিতে হযরত ওয়ালীদ (রাযি.)কে ফাসেক সাব্যস্ত করার যুক্তিসঙ্গত কোন কারণ নেই। কেননা এ ঘটনায় তিনি বুঝে শুনে কোন মিথ্যা বলেননি। তিনি যা করেছিলেন তা কেবলই ভুল বোঝাবুঝির ব্যাপারে আর এ রকম কাউকে ফাসেক বলা যেতে পারে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় ব্যাপারটা হয়ত এ রকম হয়েছিল যে, হযরত ওয়ালীদ (রাযি.) যখন বনু মুস্তালিকের এলাকায় পৌঁছলেন আর ওদিকে গোত্রের বহু লোক সেখানে জড়ো হচ্ছিল, তখন কোন দুষ্ট লোক তাকে বলে থাকবে, এরা আপনার সাথে লড়বার জন্য জড়ো হয়েছে। আয়াতে সেই দুষ্ট লোকটাকেই ফাসেক বলা হয়েছে। আর হযরত ওয়ালীদ (রাযি.)কে সতর্ক করা হয়েছে যে, একা সেই দুষ্ট লোকটার দেওয়া তথ্যের উপর নির্ভর করে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ তাঁর ঠিক হয়নি। উচিত ছিল তার আগে বিষয়টা যাচাই করে নেওয়া। একটি রেওয়ায়াত দ্বারাও এ ব্যাখ্যার পক্ষে সমর্থন মেলে। হাফেজ ইবনে জারীর (রহ.) রেওয়ায়াতটি উদ্ধৃত করেছেন এবং তাতে আছে, فحدثه الشيطان انهم يريدون قتله ‘শয়তান তাকে জানালো যে, তারা তাকে হত্যা করতে চায়’ (তাফসীরে ইবনে জারীর, ২২ খণ্ড, ২৮৬ পৃ.)। বোঝা যাচ্ছে, শয়তান কোন মানুষের বেশে এসে তাকে এই মিথ্যা তথ্য দিয়েছিল। কাজেই আয়াতের ‘ফাসেক’ শব্দটিকে অযথা একজন সাহাবীর উপর খাটানোর কী দরকার, যখন তিনি যা করেছিলেন সেটা কেবলই তার বুঝের ভুল ছিল? বরং শব্দটিকে যে সংবাদদাতা হযরত ওয়ালীদ (রাযি.)কে মিথ্যা সংবাদ দিয়েছিল তার উপর খাটানোই বেশি যুক্তিযুক্ত। তবে ঘটনা যাই হোক না কেন, কুরআন মাজীদের রীতি হল, আয়াতের শানে নুযুলে বিশেষ কোন ঘটনা থাকলেও তাতে ব্যবহৃত শব্দাবলী হয়ে থাকে সাধারণ, যাতে তা দ্বারা মূলনীতিরূপে কোন বিধান জানা যায়। এ আয়াতের সে সাধারণ বিধান হল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া কোন ফাসেক ব্যক্তির দেওয়া সংবাদের উপর আস্থা রাখা উচিত নয়, বিশেষত সে সংবাদের ফলে যদি কারও ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে।

তাফসীরে জাকারিয়া

৬. হে ঈমানদারগণ!(১) যদি কোন ফাসিক তোমাদের কাছে কোন বার্তা নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখ, এ আশঙ্কায় যে, অজ্ঞতাবশত তোমরা কোন সম্প্রদায়কে আক্রমণ করে বসবে, ফলে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য তোমাদেরকে অনুতপ্ত হতে হবে।

(১) এ আয়াত নাযিল হওয়ার একটি কারণ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, তা হলো, বনিল-মুস্তালিক গোত্রের সরদার, উম্মুল মুমিনিন জুয়াইরিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর পিতা হারেস ইবনে দ্বিরার বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খেদমতে উপস্থিত হলে তিনি আমাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং যাকাত প্রদানের আদেশ দিলেন। আমি ইসলামের দাওয়াত কবুল করতঃ যাকাত প্রদানে স্বীকৃত হলাম এবং বললামঃ এখন আমি স্বগোত্রে ফিরে গিয়ে তাদেরকেও ইসলাম ও যাকাত প্রদানের দাওয়াত দেব। যারা আমার কথা মানবে এবং যাকাত দেবে আমি তাদের যাকাত একত্রিত করে আমার কাছে জমা রাখব।

আপনি অমুক মাসের অমুক তারিখ পর্যন্ত কোনো দূত আমার কাছে প্রেরণ করবেন, যাতে আমি যাকাতের জমা অর্থ তার হাতে সোপর্দ করতে পারি। এরপর হারেস যখন ওয়াদা অনুযায়ী যাকাতের অর্থ জমা করলেন এবং দূত আগমনের নির্ধারিত মাস ও তারিখ অতিক্রান্ত হওয়ার পরও কোনো দূত আগমন করল না, তখন হারেস আশঙ্কা করলেন যে, সম্ভবতঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো কারণে আমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন। নতুবা ওয়াদা অনুযায়ী দূত না পাঠানোর কোন কারণ থাকতে পারে না। হারেস এই আশঙ্কার কথা ইসলাম গ্রহণকারী নেতৃস্থানীয় লোকদের কাছেও প্রকাশ করলেন এবং সবাই মিলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খেদমতে উপস্থিত হওয়ার ইচ্ছা করলেন।

এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্ধারিত তারিখে ওলিদ ইবনে ওকবা রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে যাকাত গ্রহণের জন্য পাঠিয়ে দেন। কিন্তু পথিমধ্যে ওলিদ ইবনে ওকবা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর মনে ধারণা জাগ্রত হয় যে, এই গোত্রের লোকদের সাথে তার পুরাতন শক্ৰতা আছে। কোথাও তারা তাকে পেয়ে হত্যা না করে ফেলে। এই ভয়ের কথা চিন্তা করে তিনি সেখান থেকেই ফিরে আসেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- কে যেয়ে বলেন যে, তারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে এবং আমাকে হত্যা করারও ইচ্ছা করেছে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাগান্বিত হয়ে খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর নেতৃত্বে একদল মুজাহিদ প্রেরণ করলেন।

এদিকে মুজাহিদ বাহিনী রওয়ানা হলো এবং ওদিকে হারেস জিজ্ঞাসা করলেনঃ আপনারা কোন গোত্রের প্রতি প্রেরিত হয়েছেন? উত্তর হলোঃ আমরা তোমাদের প্রতিই প্রেরিত হয়েছি। হারেস কারণ জিজ্ঞেস করলে তাকে ওলিদ ইবনে ওকবা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে প্রেরণ ও তার প্রত্যাবর্তনের কাহিনী শুনানো হলো এবং ওলিদের এই বিবৃতিও শুনানো হলো যে, বনিল-মুস্তালিক গোত্র যাকাত দিতে অস্বীকার করে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছে। এ কথা শুনে হারেস বললেনঃ সে আল্লাহর কসম, যিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- কে রাসূল করে প্রেরণ করেছেন, আমি ওলিদ ইবনে ওকবাকে দেখিওনি। সে আমার কাছে যায়নি।

অতঃপর হারেস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে উপস্থিত হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি কি যাকাত দিতে অস্বীকার করেছ এবং আমার দূতকে হত্যা করতে চেয়েছ? হারেস বললেনঃ কখনই নয়; সে আল্লাহর কসম, যিনি আপনাকে সত্য পয়গামসহ প্রেরণ করেছেন, সে আমার কাছে যায়নি এবং আমি তাকে দেখিওনি। নির্ধারিত সময়ে আপনার দূত যায়নি দেখে আমার আশঙ্কা হয় যে, বোধ হয়, আপনি কোন ত্রুটির কারণে আমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন। তাই আমরা খেদমতে উপস্থিত হয়েছি। হারেস বলেন, এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সূরা হুজুরাতের আলোচ্য আয়াতটি অবতীর্ণ হয়। (মুসনাদে আহমাদ: ৪/২৭৯, ৩/৪৮৮)

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(৬) হে বিশ্বাসীগণ! যদি কোন পাপাচারী তোমাদের নিকট কোন বার্তা আনয়ন করে, তাহলে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে;(1) যাতে অজ্ঞতাবশতঃ তোমরা কোন সম্প্রদায়কে আঘাত না কর এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।

(1) এই আয়াতটি অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে অলীদ ইবনে উকবা (রাঃ) সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। যাঁকে নবী করীম (সাঃ) বানু-মুসত্বালিক গোত্রের যাকাত আদায় করার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু তিনি (রাস্তা থেকেই ফেরৎ) এসে খামকা রিপোর্ট দিলেন যে, তারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে। আর এই খবরের ভিত্তিতে নবী করীম (সাঃ) তাদের বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণের ইচ্ছা করলেন। কিন্তু পরক্ষণে জানতে পারলেন যে, এ খবর ভুল ছিল এবং অলীদ (রাঃ) সেখানে যানইনি। তবে সনদ ও বাস্তবতা উভয় দিক দিয়ে এই বর্ণনা সহীহ নয়। তাই এই ধরনের কথা রসূল (সাঃ)-এর একজন সাহাবী সম্পর্কে বলা ঠিক নয়। তবে হ্যাঁ, আয়াতের শানে নুযুলের প্রতি দৃকপাত না করেই বলা যায় যে, এতে অতি গুরুত্বপূর্ণ এমন একটি নীতি বর্ণনা করা হয়েছে, যা বৈয়াক্তিক ও সামাজিক উভয় জীবনে বড় গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক ব্যক্তি এবং প্রত্যেক শাসকের দায়িত্ব হল, তাদের কাছে যে সংবাদই আসে -- বিশেষ করে চরিত্রহীন, ফাসেক (চুগোলখোর, গীবতকারী) ও ফাসাদী প্রকৃতির লোকদের পক্ষ হতে, সে ব্যাপারে প্রথমে যাচাই করে দেখা। যাতে ভুল বুঝে কারো বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়।