হুমুল্লাযীনা কাফারূওয়া সাদ্দূকুম ‘আনিল মাছজিদিল হার-মি ওয়াল হাদইয়া মা‘কূফান আইঁ ইয়াবলুগা মাহিল্লাহূ ওয়ালাও লা-রিজা-লুম মু’মিনূনা ওয়া নিছাউম মু’মিনা-তুল্লাম তা‘লামূহুম আন তাতাঊহুম ফাতুসীবাকুম মিনহুম মা‘আররতুম বিগাইরি ‘ইলমিন লিইউদখিলাল্লা-হু ফী রহমাতিহী মাইঁ ইয়াশাউ লাও তাঝাইয়ালূলা‘আযযাবনাল্লাযীনা কাফারূমিনহুম ‘আযা-বান আলীমা-।উচ্চারণ
এরাই তো সেসব লোক যারা কুফরী করেছে, তোমাদেরকে মসজিদে হারামে যেতে বাধা দিয়েছে এবং কুরবানীর উটসমূহকে কুরবানী গাহে পৌঁছতে দেয়নি। ৪৩ যদি (মক্কায়) এমন নারী পুরুষ না থাকতো যাদেরকে তোমরা চিন না অজান্তে তাদেরকে পদদলিত করে ফেলবে এবং তাদের কারণে তোমরা বদনাম কুড়াবে এমন আশঙ্কা না থাকতো (তাহলে যুদ্ধ থামানো হতো না। তা বন্ধ করা হয়েছে এ কারণে) যে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা যেন তাঁর রহমতের মধ্যে স্থান দেন। সেসব মু’মিন যদি আলাদা হয়ে যেতো তাহলে (মক্কাবাসীদের মধ্যে) যারা কাফের ছিল আমি অবশ্যই তাদেরকে কঠিন শাস্তি দিতাম। ৪৪ তাফহীমুল কুরআন
এরাই তো তারা, যারা কুফর অবলম্বন করেছে, তোমাদেরকে মসজিদুল হারাম থেকে নিবৃত্ত করেছে এবং আবদ্ধ অবস্থায় দাঁড়ানো কুরবানীর পশুগুলিকেও যথাস্থানে পৌঁছতে বাধা দিয়েছে। #%২৩%# যদি (মক্কায়) কিছু মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী না থাকত, যাদের সম্পর্কে তোমরা জান না যে, তোমরা তাদেরকে পিষে ফেলতে, ফলে তাদের কারণে তোমরা অজ্ঞাতসারে ক্ষতিগ্রস্ত হতে #%২৪%# (তবে আমি ওই কাফেরদের সাথে সন্ধির পরিবর্তে তোমাদেরকে যুদ্ধে লিপ্ত করতাম। কিন্তু আমি যুদ্ধ রোধ করেছি) এজন্য যে, আল্লাহ যাকে চান নিজ রহমতের ভেতর দাখিল করেন। #%২৫%# (অবশ্য) সেই মুসলিমগণ যদি সেখান থেকে সরে যেত তবে আমি তাদের (অর্থাৎ মক্কাবাসীদের) মধ্যে যারা কাফের, তাদেরকে যন্ত্রণাময় শাস্তি দিতাম। #%২৬%#মুফতী তাকী উসমানী
তারাইতো কুফরী করেছিল এবং নিবৃত্ত করেছিল তোমাদেরকে মাসজিদুল হারাম হতে এবং বাধা দিয়েছিল কুরবানীর জন্য আবদ্ধ পশুগুলিকে যথাস্থানে পৌঁছতে। তোমাদের যুদ্ধের আদেশ দেয়া হত, যদি না থাকত এমন কতকগুলি মু’মিন নর ও নারী যাদেরকে তোমরা জাননা, তাদেরকে তোমরা পদদলিত করতে অজ্ঞাতসারে। ফলে তাদের কারণে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে। যুদ্ধের নির্দেশ দেয়া হয়নি এ জন্য যে, তিনি যাকে ইচ্ছা নিজ অনুগ্রহ দান করবেন, যদি তারা পৃথক হত, আমি তাদের মধ্যস্থিত কাফিরদেরকে মর্মন্তদ শাস্তি দিতাম।মুজিবুর রহমান
তারাই তো কুফরী করেছে এবং বাধা দিয়েছে তোমাদেরকে মসজিদে হারাম থেকে এবং অবস্থানরত কোরবানীর জন্তুদেরকে যথাস্থানে পৌছতে। যদি মক্কায় কিছুসংখ্যক ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী না থাকত, যাদেরকে তোমরা জানতে না। অর্থাৎ তাদের পিষ্ট হয়ে যাওয়ার আশংকা না থাকত, অতঃপর তাদের কারণে তোমরা অজ্ঞাতসারে ক্ষতিগ্রস্ত হতে, তবে সব কিছু চুকিয়ে দেয়া হত; কিন্তু এ কারণে চুকানো হয়নি, যাতে আল্লাহ তা’আলা যাকে ইচ্ছা স্বীয় রহমতে দাখিল করে নেন। যদি তারা সরে যেত, তবে আমি অবশ্যই তাদের মধ্যে যারা কাফের তাদেরকে যন্ত্রনাদায়ক শস্তি দিতাম।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান
এরাই তো কুফরী করেছিল এবং নিবৃত্ত করেছিল তোমাদেরকে মসজিদুল-হারাম হতে ও বাধা দিয়েছিল কুরবানীর জন্যে আবদ্ধ পশুগুলিকে যথাস্থানে পৌঁছতে। তোমাদেরকে যুদ্ধের আদেশ দেওয়া হত যদি না থাকত এমন কতক মু’মিন নর ও নারী যাদেরকে তোমরা জান না, তোমরা তাদেরকে পদদলিত করতে অজ্ঞাতসারে, ফলে তাদের কারণে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে। যুদ্ধের নির্দেশ দেওয়া হয় নাই এজন্যে যে, তিনি যাকে ইচ্ছা নিজ অনুগ্রহ দান করবেন। যদি এরা পৃথক হত, আমি এদের মধ্যে কাফিরদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তি দিতাম। ইসলামিক ফাউন্ডেশন
তারাইতো কুফরী করেছিল এবং তোমাদেরকে আল-মাসজিদুল হারাম থেকে বাধা দিয়েছিল আর কুরবানীর পশুগুলোকে কুরবানীর স্থানে পৌঁছতে বাধা দিয়েছিল। যদি মুমিন পুরুষরা ও মুমিন নারীরা না থাকত, যাদের সম্পর্কে তোমরা জান না যে, তোমরা অজ্ঞাতসারে তাদেরকে পদদলিত করবে, ফলে তাদের কারণে তোমরা দোষী হতে কিন্তু আমি তাদের উপর কর্তৃত্ব দিয়েছি যাতে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা স্বীয় রহমতে প্রবেশ করাবেন। যদি তারা পৃথক থাকত, তাহলে তাদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে তাদেরকে আমি অবশ্যই যন্ত্রণাদায়ক আযাব দিতাম।আল-বায়ান
কুফুরী তো তারাই করেছিল আর তোমাদেরকে মাসজিদুল হারাম থেকে বাধা দিয়েছিল। বাধা দিয়েছিল কুরবানীর পশুগুলোকে কুরবানীর স্থানে পৌঁছতে। মু’মিন পুরুষ আর মু’মিন নারীরা যদি (মাক্কায় কাফিরদের মাঝে) না থাকত যাদের সম্পর্কে তোমরা জান না আর অজ্ঞতাবশতই তোমরা তাদেরকে পর্যুদস্ত করে দিবে যার ফলে তোমাদের উপর কলঙ্ক লেপন হবে-এমন সম্ভাবনা না থাকত, তাহলে তোমাদেরকে যুদ্ধের আদেশ দেয়া হত। যুদ্ধের আদেশ দেয়া হয়নি যাতে আল্লাহ যাকে ইচ্ছে তাঁর রহমাতের মধ্যে শামিল করে নিতে পারেন। (মাক্কায় অনেক মু’মিন আর কাফিররা একত্রিত না থেকে) যদি তারা পৃথক হয়ে থাকত, তাহলে আমি তাদের মধ্যে কাফিরদেরকে ভয়াবহ শাস্তি দিতাম।তাইসিরুল
এরাই তারা যারা অবিশ্বাস পোষণ করেছিল এবং তোমাদের বাধা দিয়েছিল পবিত্র মসজিদ থেকে, আর উৎসর্গীকৃত পশুদের বাধা দিয়েছিল তাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে। আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা যদি না থাকতো তাহলে তাদের তোমরা না-জেনে তাদের দলিত করতে, ফলে তাদের কারণে অজানিতভাবে এক নিন্দনীয় অপরাধ তোমাদের পাকড়াতো, এ-জন্য যে আল্লাহ্ যেন যাকে ইচ্ছা করেন তাঁর করুণার মধ্যে দাখিল করতে পারেন। তারা যদি আলাদা হয়ে থাকত তাহলে তাদের মধ্যের যারা অবিশ্বাস পোষণ করে তাদের আমরা নিশ্চয় শাস্তি দিতাম মর্মন্তুদ শাস্তিতে।মাওলানা জহুরুল হক
৪৩
অর্থাৎ ইসলামের জন্য যে আন্তরিকতা নিয়ে নিঃস্বার্থভাবে তোমরা জীবন বাজি রাখতে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলে এবং বিনা বাক্যে যেভাবে রসূলের আনুগত্য করেছিলে আল্লাহ তা দেখেছিলেন। তিনি এও দেখেছিলেন যে, কাফেররা সত্যিই বাড়াবাড়ি করছে। তোমাদের হাতে তৎক্ষণাৎ সেখানেই তাদেরকে শাস্তি দেয়া ছিল পরিস্থিতির দাবী। কিন্তু এসব সত্ত্বেও একটি বৃহত্তর কল্যাণের জন্য তিনি তোমাদের হাতে তাদের ওপর এবং তাদের হাত তোমাদের ওপর উত্তোলিত হওয়া থেকে বিরত রেখেছিলেন।
৪৪
আল্লাহ তা’আলা যে উদ্দেশ্য ও কৌশলের কারণে হুদাইবিয়াতে যুদ্ধ হতে দেননি এটাই সে উদ্দেশ্য ও কৌশল। এ উদ্দেশ্য ও কৌশলের দু’টি দিক আছে। একটি হচ্ছে সে সময় মক্কায় এমন অনেক নারী ও পুরুষ বর্তমান ছিলেন। যারা হয় তাদের ঈমান গোপন রেখেছিলেন নয়তো তাদের ঈমান গ্রহণ সম্পর্কে সবার জানা থাকলেও নিজেদের অসহায়ত্বের কারণে হিজরত করতে সক্ষম ছিলেন না এবং জুলুম-নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলো। যদি এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধ সংঘটিত হতো এবং মুসলমানরা কাফেরদেরকে চরমভাবে পর্যুদস্ত করে পবিত্র মক্কায় প্রবেশ করতো তাহলে অজানা ও অচেনা হওয়ার কারণে কাফেরদের সাথে এ মুসলমানরাও নিহত হতো। এ কারণে মুসলমারা নিজেরও দুঃখ ও পরিতাপে দগ্ধ হতো এবং আরবের মুশরিকরাও একথা বলার সুযোগ পেয়ে যেতো যে, যুদ্ধের ময়দানে নিজেদের দ্বীনি ভাইয়ের হত্যা করতেও এসব লোক দ্বিধাবোধ করেনা। তাই আল্লাহ তা’আলা অসহায় এ মুসলমানদের প্রতি দয়া পরবশ হয়ে এবং সাহাবীদেরকে মনোকষ্ট ও বদনাম থেকে রক্ষার জন্য এক্ষেত্রে যুদ্ধ সংঘটিত হতে দেননি। এ উদ্দেশ্য ও কৌশলের আরেকটি দিক এই যে, আল্লাহ তা’আলা কুরাইশদেরকে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পরাজিত করে মক্কা বিজিত করাতে চাচ্ছিলেন না। বরং তিনি চাচ্ছিলেন, দুই বছরের মধ্যে তাদেরকে চারদিক থেকে ঘেরাও করে এমন অসহায় করে ফেলবেন যেন কোন প্রতিরোধ ছাড়াই তারা পরাজিত হয় এবং সমগ্র গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে আল্লাহর রহমের মধ্যে প্রবেশ করে। মক্কা বিজয়ের সময় এ ঘটনাটিই ঘটেছিল।
এক্ষেত্রে একটি আইনগত বিতর্ক দেখা দেয়। যদি আমাদের এ কাফেরদের মধ্যে যুদ্ধ চলতে থাকে এবং কাফেরদের কব্জায় কিছু সংখ্যক মুসলিম নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধ থাকে আর তাদেরকে তারা মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সামনে নিয়ে আসে কিংবা আমরা কাফেরদের যে শহরের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছি সেখানে কিছু মুসলিম বসতি থেকে থাকে, কিংবা কাফেরদের যুদ্ধ জাহাজ আক্রমণের পাল্লায় এসে পড়ে এবং কাফেররা তার মধ্যে কিছু সংখ্যক মুসলমানকে রেখে দেয় তাহলে এরূপ পরিস্থিতিতে আমরা কি তাদের ওপর গোলাবর্ষণ করতে পারি? এ প্রশ্নের জবাবে ফকীহগণ যেসব সিদ্ধান্ত ও মতামত দিয়েছেন তা নিম্নরূপঃ
ইমাম মালেক (র) বলেন, এরূপ পরিস্থিতিতে গোলাবর্ষণ না করা উচিত। এ আয়াতটিকে তিনি এর দলীল হিসেবে পেশ করেন। তার বক্তব্য হচ্ছে, আল্লাহ তা’আলা মুসলমানদের রক্ষার জন্যই তা হুদাইবিয়াতে যুদ্ধ হতে দেননি। (আহকামুল কুরআন-ইবনুল আরাবী)। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা একটা দুর্বল দলীল। আয়াতের মধ্যে এমন কোন শব্দ নেই যা থেকে এ বিষয় প্রতীয়মান হয় যে, এরূপ পরিস্থিতিতে হামলা করা হারাম ও না জায়েয। এর দ্বারা বড় জোর এতটুকু কথা প্রমাণিত হয় তা হচ্ছে, এ পরিস্থিতিতে মুসলমানদের রক্ষা করার জন্য হামলা করা থেকে বিরত থাকা যেতে পারে, যদি বিরত থাকার ক্ষেত্রে এআশঙ্কা সৃষ্টি না হয় যে, কাফেররা মুসলামানদের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করবে, কিংবা তাদের বিরুদ্ধে আমাদের বিজয় লাভ করার সুযোগ হাত ছাড়া হয়ে যাবে।
ইমাম আবু হানীফা (রা.), ইমাম আবু ইউসূফ (র), ইমাম যুফার (র) এবং ইমাম মুহাম্মাদ (র) বলেন, এ পরিস্থিতিতে গোলাবর্ষণ করা সম্পূর্ণরূপে জায়েয। এমনকি কাফেররা যদি মুসলমানদের শিশুদেরকেও ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সামনে খাড়া করে তবুও তাদের ওপর গোলা বর্ষণ করায় কোন দোষ নেই। এ অবস্থায় যেসব মুসলমান মারা যাবে তাদের জন্য কাফ্ফারা বা রক্তপণও মুসলমানদের ওপর ওয়াজিব হবে না। (আহকামুল কুরআন-জাসসাস, ইমাম মুহাম্মাদের কিতাবুস সিয়ার, অনুচ্ছেদঃ কাতউল মায়ে আন আহলিল হারব)।
ইমাম আওযায়ী এবং লাইস ইবনে সা’দ বলেন, কাফেররা যদি মুসলমানদের ঢাল বানিয়ে সামনে ধরে তাহলে তাদের ওপর গুলি চালানো উচিত নয়। অনুরূপ আমরা যদি জানতে পারি যে, তাদের যুদ্ধ জাহাজে আমাদের বন্দীও আছে তাহলে সে অবস্থায় উক্ত যুদ্ধ জাহাজ না ডুবানো উচিত। কিন্তু আমরা যদি তাদের কোন শহরের ওপর আক্রমণ চালাই এবং জানতে পারি যে, ঐ শহরে মুসলমানও আছে তাহলেও তাদের ওপর গোলাবর্ষণ করা জায়েয। কারণ, আমাদের গোলা কেবল মুসলমানদের ওপরই পড়বে তা নিশ্চিত নয়। আর কোন মুসলমান যদি এ গোলাবর্ষনের শিকার হয়ও তাহলে তা আমাদের পক্ষ থেকে মুসলমানদের উদ্দেশ্যমূলক হত্যা হবে না, বরং তা হবে আমাদের ইচ্ছা বাইরের একটা দুর্ঘটনা। (আহকামুল কুরআন-জাসসাস)।
এ ব্যাপারে ইমাম শাফেয়ীর (র) মাযহাব হলো, এ অবস্থায় যদি গোলাবর্ষণ অনিবার্য না হয় তাহলে ধ্বংসের হাত থেকে মুসলমানদের রক্ষা করার চেষ্টা চালানো উত্তম যদিও এক্ষেত্রে গোলাবর্ষণ করা হারাম নয় তবে নিঃসন্দেহে মাকরূহ। তবে প্রকৃতই যদি গোলাবর্ষণের প্রয়োজন দেখা দেয় এবং সন্দেহ থাকে যে, এরূপ না করা হলে যুদ্ধ পরিস্থিতি কাফেরদের জন্য লাভজনক এবং মুসলমানদের জন্য ক্ষতিকর হবে তাহলে সে ক্ষেত্রে গোলাবর্ষণ করা জায়েয। তবে এ পরিস্থিতিতে ও মুসলমানদের রক্ষা করার যথাসাধ্য প্রচেষ্টা চালাতে হবে। তাছাড়া ইমাম শাফেয়ী এ মতও পোষণ করেন যে, যদি কাফেররা যুদ্ধের ময়দানে কোন মুসলমানকে ঢাল বানিয়ে ধরে এবং কোন মুসলমান তাকে হত্যা করে তাহলে তার দু’টি অবস্থা হতে পারেঃ এক, হত্যাকারীর জানা ছিল যে, সে মুসলমান। দুই, সে জানতো না যে, সে মুসলমান। প্রথম অবস্থায় রক্তপণ ও কাফ্ফারা উভয়টিই তার ওপর ওয়াজিব এবং দ্বিতীয় অবস্থায় শুধু কাফ্ফারা ওয়াজিব। (মুগনিউ মুহতাজ)।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম যেহেতু উমরা আদায়ের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন, তাই কুরবানী করার উদ্দেশ্যে সাথে পশুও নিয়েছিলেন, যেগুলোকে হরমে পৌঁছে কুরবানী করা বিধেয় ছিল। কাফেরদের বাধার কারণে সেগুলোকে হুদায়বিয়াতেই দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। যে স্থানে নিয়ে কুরবানী করার কথা, সেখানে সেগুলোকে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
২৫. তারাই তো কুফরী করেছিল এবং বাধা দিয়েছিল তোমাদেরকে মসজিদুল হারাম হতে ও বাধা দিয়েছিল কুরবানীর জন্য আবদ্ধ পশুগুলোকে যথাস্থানে পৌছতে।(১) আর যদি মুমিন পুরুষরা ও মুমিন নারীরা না থাকত, যাদের সম্পর্কে তোমরা জান না যে, তোমরা অজ্ঞাতসারে তাদেরকে পদদলিত করবে, ফলে তাদের কারণে তোমরা অপরাধী ও দোষী সাব্যস্ত হতে, (তবে অবশ্যই তিনি যুদ্ধের অনুমতি দিতেন। কিন্তু আল্লাহ তোমাদেরকে তখন এর অনুমতি দেন নি)(২) যাতে তিনি যাকে ইচ্ছে নিজ অনুগ্রহে প্রবেশ করাবেন।(৩) যদি তারা(৪) পৃথক হয়ে থাকত, তবে অবশ্যই আমরা তাদের মধ্যে কাফিরদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিতাম।(৫)
(১) হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন হুদাইবিয়ার কাছাকাছি ছিলেন, কুরাইশরা কিনানাহ গোত্রের এক লোককে রাসূলের সাথে কথা বলার জন্য পাঠাল। সে এবং তার সাথীরা যখন রাসূলের কাছাকাছি আসল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ হচ্ছে অমুক। সে এমন এক সম্প্রদায়ের লোক যারা হাদঈ এর পশুর সম্মান করে। সুতরাং তোমরা সেগুলোকে একত্রিত করে তার সামনে পাঠাও ৷ সাহাবায়ে কিরাম তাই করলেন আর তারা তালবিয়াহ পাঠ করতে করতে তার সামনে আসলেন। সে যখন এ অবস্থা দেখল। বলল, সুবহানাল্লাহ! এদেরকে আল্লাহর ঘর থেকে বাধা দেয়া ঠিক হবে না। তারপর সে ফিরে গিয়ে বললঃ আমি তো হাদঈর উটকে কালাদা (পশুর গলায় পশম বা চুলের মালা) পরানো ও চিহ্নিত অবস্থায় দেখেছি। আমি চাইনা তাদেরকে আল্লাহর ঘর থেকে বাধা দেয়া হোক’৷ (বুখারী ২৭৩২)
(২) উপরোক্ত অংশটুকু উহ্য রয়েছে। (জালালাইন)
(৩) অর্থাৎ যুদ্ধ করার অনুমতি না দেয়ার পিছনে দু'টি উদ্দেশ্য কাজ করেছে। এক. দুনিয়াবী উদ্দেশ্য, তা হচ্ছে, মক্কায় যারা এখনও ঈমানদার রয়ে গেছে, কিন্তু তাদের সম্পর্কে কেউ জানে না, তারা যেন তোমাদের হাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, আর তোমরাই তোমাদের দ্বীনী ভাইদের হত্যার কারণে মনঃকষ্টে না থাক। অপমান বোধ না কর। দুই. আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহ্ চাচ্ছেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ ঈমান এনে তার রহমতে শামিল হয়ে যাবে। (সা’দী)
(৪) অর্থাৎ যাদের ঈমান সম্পর্কে তোমাদের জানা নেই, এমন মুমিন নারী ও পুরুষরা যদি আলাদা আলাদা থাকত। আর যুদ্ধের সময় তাদেরকে রক্ষা করা সম্ভব হতো, তবে অবশ্যই তিনি তাদেরকে শাস্তি দিতেন। (সা’দী, মুয়াস্সার)
(৫) تزيل শব্দের আসল অর্থ বিচ্ছিন্ন হওয়া। (ফাতহুল কাদীর)
(২৫) তারাই তো অবিশ্বাস করেছিল এবং তোমাদেরকে ‘মাসজিদুল হারাম’ হতে নিবৃত্ত করেছিল এবং কুরবানীর জন্য আবদ্ধ পশুগুলোকে কুরবানীগাহে পৌঁছতে বাধা দিয়েছিল।(1) যদি এমন কতকগুলো বিশ্বাসী নর ও নারী না থাকত, যাদেরকে তোমরা জান না, (2) অর্থাৎ তাদেরকে তোমরা পদদলিত করতে; ফলে তাদের কারণে অজ্ঞাতসারে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে;(3) (তাহলে তোমাদেরকে যুদ্ধের আদেশ দেওয়া হত।(4) কিন্তু তা দেওয়া হয়নি) এ জন্যে যে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে নিজ করুণায় শামিল করবেন।(5) যদি তারা পৃথক হত, তাহলে আমি তাদের মধ্যে অবিশ্বাসীদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তি দিতাম। (6)
(1) هَدْيٌ ঐ পশুকে বলা হয়, যেটাকে হজ্জ বা উমরাহ পালনকারী ব্যক্তি সঙ্গে করে মক্কা নিয়ে যেত। অথবা সেখানে থেকেই ক্রয় করে জবাই করত। مَحِلٌّ (হালাল হওয়ার স্থান) থেকে সেই কুরবানগাহ (কুরবানী করার জায়গা)-কে বুঝানো হয়েছে, যেখানে নিয়ে গিয়ে পশু যবেহ করা হয়। জাহেলিয়াতের যুগে এ স্থানটি ছিল উমরা আদায়কারীদের জন্য (ক্ষুদ্র) মারওয়া পাহাড়ের পাশে এবং হাজীদের জন্য ছিল মিনা। তবে ইসলামে যবেহ করার জায়গা মক্কা, মিনা এবং সমগ্র হারাম সীমানা। مَعْكُوْفًا শব্দটি হল, ‘হাল’ (যা পূর্বের অবস্থা বর্ণনা করে)। অর্থাৎ, এই পশুগুলো এই অপেক্ষায় আবদ্ধ ছিল যে, মক্কায় নিয়ে গিয়ে তাদেরকে কুরবানী করা হবে। অর্থ হল, এই কাফেররাই তোমাদেরকেও মসজিদে হারামে প্রবেশ করতে বাধা দিয়েছিল এবং তোমাদের সাথে যে পশুগুলো ছিল তাদেরকেও কুরবানীগাহে পৌঁছতে দেয়নি।
(2) অর্থাৎ, মক্কায় তারা নিজেদের ঈমান গোপন করে বাস করছিল।
(3) কাফেরদের সাথে যুদ্ধ বাধলে সম্ভাবনা ছিল যে, এরাও মারা যেত এবং তোমাদের ক্ষতি হত। مَعَرَّةً এর প্রকৃত অর্থ হল, দোষ। কিন্তু উদ্দেশ্য হল, কাফফারা, এমন দোষ ও লজ্জা, যা কাফেরদের পক্ষ থেকে তোমাদের ঘাড়ে চাপত। অর্থাৎ, এক তো ভুলবশতঃ হত্যার দায়ে দিয়্যাত (হত্যার অর্থদন্ড) দিতে হত এবং দ্বিতীয়তঃ কাফেরদের এই তিরস্কার শুনতে হত যে, এরা আপন মুসলিম ভাইদেরও হত্যা করে।
(4) এটা হল لَوْلاَ (যদি) এর ঊহ্য উত্তর। অর্থাৎ, এ ব্যাপার না হলে, তোমাদেরকে মক্কায় প্রবেশ এবং কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ করার অনুমতি দিয়ে দেওয়া হত।
(5) বরং মক্কাবাসীদেরকে অবসর দেওয়া হয়। যাতে আল্লাহ যাকে চান, তাকে ইসলাম গ্রহণ করার তাওফীক দেন।
(6) تَزَيَّلُوْا এর অর্থ تَمَيَّزُوْا অর্থাৎ, মক্কায় অবস্থিত মুসলিমরা যদি কাফেরদের থেকে পৃথকভাবে বসবাস করত, তবে আমি তোমাদেরকে মক্কাবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অনুমতি দিতাম এবং তোমাদের হাতে তাদেরকে হত্যা করাতাম। আর এইভাবে তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিতাম। ‘মর্মন্তুদ শাস্তি’ বলতে এখানে হত্যা, বন্দী ও পরাজিত হওয়াকে বুঝানো হয়েছে।