لِّيَغۡفِرَ لَكَ ٱللَّهُ مَا تَقَدَّمَ مِن ذَنۢبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ وَيُتِمَّ نِعۡمَتَهُۥ عَلَيۡكَ وَيَهۡدِيَكَ صِرَٰطٗا مُّسۡتَقِيمٗا

লিয়াগফির লাকাল্লা-হুমা- তাকাদ্দামা মিন যামবিকা ওয়ামা- তাআখখার ওয়াইউতিম্মা নি‘মাতাহূ‘আলাইকা ওয়া ইয়াহদিয়াকা সির-তামমুছতাকীমা-।উচ্চারণ

যাতে আল্লাহ‌ তোমার আগের ও পরের সব ত্রুটি-বিচ্যুতি মাফ করে দেন, তোমার জন্য তাঁর নিয়ামতকে পূর্ণতা দান করেন, তাফহীমুল কুরআন

যাতে আল্লাহ তোমার অতীত ও ভবিষ্যতের সমস্ত ত্রুটি ক্ষমা করেন, তোমার প্রতি তাঁর নি‘আমত পূর্ণ করেন এবং তোমাকে সরল পথে পরিচালিত করেন। মুফতী তাকী উসমানী

যেন আল্লাহ তোমার অতীত ও ভবিষ্যৎ ত্রুটিসমূহ মার্জনা করেন এবং তোমার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করেন ও তোমাকে সরল পথে পরিচালিত করেন।মুজিবুর রহমান

যাতে আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যত ত্রুটিসমূহ মার্জনা করে দেন এবং আপনার প্রতি তাঁর নেয়ামত পূর্ণ করেন ও আপনাকে সরল পথে পরিচালিত করেন।মাওলানা মুহিউদ্দিন খান

যেন আল্লাহ্ তোমার অতীত ও ভবিষ্যত ত্রুটিসমূহ মার্জনা করেন এবং তোমার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করেন ও তোমাকে সরল পথে পরিচালিত করেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন

যেন আল্লাহ তোমার পূর্বের ও পরের পাপ ক্ষমা করেন, তোমার উপর তাঁর নিআমত পূর্ণ করেন আর তোমাকে সরল পথের হিদায়াত দেন।আল-বায়ান

যাতে আল্লাহ তোমার আগের ও পিছের যাবতীয় ভুলভ্রান্তি ক্ষমা করেন, তোমার উপর তাঁর নি‘মাত পূর্ণ করেন এবং তোমাকে সরল সঠিক পথে পরিচালিত করেন।তাইসিরুল

এ জন্য যে আল্লাহ্ যেন তোমাকে মুক্তি দিতে পারেন তোমার সেই সব অপরাধ থেকে যা গত হয়ে গেছে ও যা রয়ে গেছে, আর যেন তোমার উপরে তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণাঙ্গ করতে পারেন, আর যেন তোমাকে পরিচালিত করতে পারেন সহজ-সঠিক পথ দিয়ে, --মাওলানা জহুরুল হক

তাফহীমুল কুরআন

যে পরিবেশ পরিস্থিতিতে একথাটি বলা হয়েছে তা মনে রাখলে স্পষ্ট বুঝা যায়, ইসলামের সাফল্য ও বিজয়ের জন্য রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নেতৃত্বে মুসলমানগণ বিগত ১৯ বছর ধরে যে চেষ্টা-সাধনা করে আসছিলেন তার মধ্যে যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি ও দুর্বলতা রয়ে গিয়েছিলো এখানে সেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি ও দুর্বলতা ক্ষমা করার কথা বলা হয়েছে। এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি কি তা কোন মানুষের জানা নেই। বরং মানবীয় বিবেক-বুদ্ধি এ চেষ্টা-সাধনার মধ্যে কোন ত্রুটি ও অপক্কতা খুঁজে পেতে একেবারেই অক্ষম। কিন্তু আল্লাহ‌ তা’আলার দৃষ্টিতে পূর্ণতার যে অতি উচ্চ মানদণ্ড রয়েছে তার বিচারে ঐ চেষ্টা সাধনার মধ্যে এমন কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল যার কারণে মুসলমানগণ আরবের মুশরিকদের বিরুদ্ধে এত দ্রুত চূড়ান্ত বিজয় লাভ করতে পারতেন না। আল্লাহ‌ তা’আলার বাণীর তাৎপর্য হচ্ছে, তোমরা যদি ঐ সব ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে চেষ্টা সাধনা করতে তাহলে আরব বিজিত হতে আরো দীর্ঘ সময় দরকার হতো। কিন্তু এসব দুর্বলতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে কেবল নিজের মেহেরবানী দ্বারা আমি তোমাদের অপূর্ণতা দূর করেছি এবং হুদাইবিয়া নামক স্থানে তোমাদের জন্য সে বিজয় ও সফলতার দ্বার উন্মক্ত করে দিয়েছি যা স্বাভাবিকভাবে তোমাদের প্রচেষ্টা দ্বারা অর্জিত হতো না।

এখানে একথাটিও ভালভাবে উপলব্ধি করা দরকার যে, কোন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যে দল চেষ্টা-সাধনা চালাচ্ছে তার ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য সে দলের নেতাকে সম্বোধন করা হয়। তার অর্থ এ নয় যে, ঐ সব ত্রুটি ও দুর্বলতা উক্ত নেতার ব্যক্তিগত ত্রুটি ও দুর্বলতা। গোটা দল সম্মিলিত ভাবে যে চেষ্টা-সাধনা চালায় ঐ সব ত্রুটি ও দুর্বলতা সে দলের সম্মিলিত চেষ্টা-সাধনার। কিন্তু নেতাকে সম্বোধন করে বলা হয়, আপনার কাজে এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি বর্তমান।

তা সত্ত্বেও যেহেতু রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, আল্লাহ‌ তা’আলা তাঁর পূর্বপর সব ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দিয়েছেন, তাই সাধারণভাবে এ শব্দগুলো থেকে এ বিষয়টিও বুঝা যায় যে, আল্লাহর কাছে তাঁর রসূলের সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি (যা কেবল তাঁর উচ্চ মর্যাদার বিচারে ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল) ক্ষমা করে দেয়া হয়েছিল। এ কারণে সাহাবায়ে কিরামের যখন নবীকে ﷺ ইবাদাতের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক রকমের কষ্ট করতে দেখতেন তখন বলতেন, আপনার পূর্বাপর সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি তো ক্ষমা করা হয়েছে। তারপরও আপনি এত কষ্ট করেন কেন? জবাবে নবী (সা.) বলতেনঃ) أَفَلاَ أَكُونُ عَبْدًا شَكُورًا “আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দাও হবো না? ” (আহমাদ, বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ)।

নিয়ামতকে পূর্ণতা দানের অর্থ হচ্ছে মুসলমানরা স্বস্থানে সব রকম ভয়-ভীতি, বাধা-বিপত্তি এবং বাইরের সব রকম হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থেকে পুরোপুরি ইসলামী সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ইসলামী আইন-কানুন অনুসারে জীবন যাপনের স্বাধীনতা ভোগ করবে এবং পৃথিবীতে আল্লাহর বিধানকে উঁচু করে তুলে ধরার শক্তি লাভ করবে। কূফর ও পাপাচারের আধিপত্য যা আল্লাহর দাসত্বের পথে বাধা এবং আল্লাহর বিধানকে সমুন্নত করার প্রচেষ্টায় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় তা ঈমানদারদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ। কুরআন এ বিপদকেই ফিতনা বলে আখ্যায়িত করে। এ ফিতনা থেকে মুক্তি পেয়ে যখন তারা এমন একটি শান্তি ও আবাস লাভ করে যেখানে আল্লাহর দ্বীন পূর্ণরূপে হুবহু বাস্তবায়িত হতে পারে এবং সাথে সাথে এমন উপায়-উপকরণও লাভ করে যার দ্বারা আল্লাহর যমীনে কুফর ও পাপাচারের স্থানে ঈমান ও তাকওয়ার শাসন চালু করতে পারে তখন তা হয় তাদের জন্য আল্লাহর নিয়ামতের পরিপূর্ণতা দান। মুসলমানরা যেহেতু রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমেই আল্লাহর এ নিয়ামত লাভ করেছিলো, তাই আল্লাহ‌ তা’আলা নবীকে ﷺ সম্বোধন করেই বলছেনঃ আমি তোমার জন্য আমার নিয়ামতকে পরিপূর্ণতা দান করতে চাচ্ছিলাম, আর সে জন্যই তোমাকে এই বিজয় দান করেছি।

তাফসীরে মুফতি তাকি উসমানী

পূর্বে সূরা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ১৯ নং আয়াতের টীকায় বলা হয়েছে যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষ্পাপ ছিলেন। তাঁর দ্বারা কোনও রকম গুনাহ সংঘটিত হতে পারত না। তা সত্ত্বেও মামুলি কিসিমের ভুল-ত্রুটি হয়ে গেলেও তিনি তাকে নিজের অপরাধ গণ্য করতেন এবং সেজন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। এখানে সে রকম ভুল-ত্রুটিই বোঝানো উদ্দেশ্য।

তাফসীরে জাকারিয়া

২. যেন আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যত ত্রুটিসমূহ মার্জনা করেন এবং আপনার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করেন। আর আপনাকে সরল পথের হেদায়াত দেন,

তাফসীরে আহসানুল বায়ান

(২) যেন আল্লাহ তোমার অতীত ও ভবিষ্যতের ত্রুটিসমূহ মার্জনা করেন(1) এবং তোমার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করেন(2) ও তোমাকে সরল পথে পরিচালিত করেন। (3)

(1) মহানবী (সাঃ)-এর ‘অতীত ও ভবিষ্যতের ত্রুটিসমূহ’-এর অর্থ, এমন সব বিষয়াদি, যা ত্যাগ করাই উত্তম অথবা এমন সব জিনিস, যা তিনি (সাঃ) স্বীয় জ্ঞান, অনুমান ও প্রচেষ্টার আলোকে করেছেন, কিন্তু আল্লাহ তা পছন্দ করেননি। যেমন, আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ) ইত্যাদির ঘটনা প্রভৃতি; যার উপর সূরা ‘আবাসা’ অবতীর্ণ হয়। অনুরূপ আচরণ ও বিষয়গুলি যদিও কোন পাপ এবং তাঁর নিষ্পাপ হওয়ার পরিপন্থী কাজ ছিল না, তবুও তাঁর সুউচ্চ মর্যাদা হিসাবে এগুলোকেও ত্রুটি ও কমি গণ্য করা হয়েছে এবং এরই উপর ক্ষমার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। لِيَغْفِرَ তে ل ‘লাম’ অক্ষরটি কারণ বর্ণনার জন্য ব্যবহূত হয়েছে। অর্থাৎ, সুস্পষ্ট এই বিজয় দানের তিনটি কারণ আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। এটা ত্রুটি মার্জনার কারণ এই জন্য যে, এই সন্ধির পর ইসলাম গ্রহণকারীদের সংখ্যা বহু বেড়ে যায়। যার ফলে নবী করীম (সাঃ)-এর মহা পুণ্য ও সওয়াব খুব বর্ধিত হয়। আর পুণ্যরাশি পাপরাশিকে মোচন করে দেয়।

(2) এই দ্বীনকে বিজয়ী করে, যার প্রতি তুমি মানুষকে দাওয়াত দাও। অথবা বিজয় ও সাফল্য দিয়ে। কেউ কেউ বলেছেন, ক্ষমা লাভ এবং হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকাই হল নিয়ামতের পরিপূর্ণতা। (ফাতহুল ক্বাদীর)

(3) অর্থাৎ, তার উপর অবিচল থাকার সৌভাগ্য দান করেন। হিদায়াতের উচ্চ থেকে উচ্চতর মর্যাদা দানে ধন্য করেন।